ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

আমাদের দেশে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় ‘কোচিং’ এবং ‘প্রাইভেট’ এই শব্দ দুটি বহুল আলোচিত এবং বহুল পরিচিত। জীবন গড়তে হলে ভাল রেজাল্ট করতে হবে আর ভাল রেজাল্ট করতে হলে কোচিং এবং প্রাইভেট পড়তে হবে। মাঝে মাঝে আমার কাছে মনে হয় এই ব্যাপরটি তার সীমা ছাড়িয়ে এক ভয়ানক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। কেন এমন বলছি ? তার কারন নিচে ব্যাখ্যা করছি।

আমার ছোট মামাতো ভাই,ঢাকায় থাকে। বর্তমানে সে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে এবং সে বর্তমান ব্যবস্থায় সমাপনি পরীক্ষার্থী(বিশাল অবস্থা)। তার পিতা মাতা তার আগত জীবনের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তার জন্য ৩জন গৃহশিক্ষক এবং দুইটি কোচিং বরাদ্দ করেছেন। নিঃসন্দেহে তারা যা করেছেন তা তাদের সন্তানের ভালোর কথা চিন্তা করেই করেছেন। তবে তাতে যদি কোন সমস্যা না থাকে,তাহলে সমস্যাটা কোথায়? আমার ছোট ভাই দেশের একটি স্বনামধন্য ক্যাডেট স্কুলে পড়ে। তাকে আমরা কোন টিউশন দিয়েছিলাম না। খেয়াল করলাম মেধাবি এই ছেলেটি ফলাফল ভাল করতে পারছে না। কারন পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেল তাকে আমরা কোনরকম যত্ন নেইনি মানে কোচিং অথবা গৃহশিক্ষক দেইনি। এখন সে ভাল ফলাফল করছে, কেননা প্রচলিত নিয়মে আমরা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তার যত্ন নিচ্ছি। বছরে ১০০ দিনের যে ছুটিটি সে পায় তার ৯৫% সে ব্যয় করে কোচিং এবং গৃহশিক্ষকের পেছনে। পাঠক, এতক্ষণে নিশ্চয়ই আমার আলোচনার বিষয়টি আপনাদের কাছে কাকচক্ষু পানির ন্যায় পরিষ্কার হয়েছে।

এবার আসছি আমার মূল বক্তব্যতে। এই সব স্বনামধন্য বিদ্যালয়গুলোতে ভয়ংকর হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর এই সব শিশুরা ভরতি হয়। তার মানে-(১)এরা অবশ্যই মেধাবী। স্বনামধন্য এই বিদ্যালয়গুলো অভিজ্ঞ এবং বিজ্ঞ শিক্ষকমণ্ডলী দ্বারা পরিচালিত হয়(আমাদের বিশ্বাস)। তার মানে-(২)তাদের শিক্ষা পদ্ধতি অবশ্যই উন্নত এবং কার্যকরী। যথেষ্ট দীর্ঘ সময় নিয়ে ক্লাস শিডিউল তৈরি করা হয়। তার মানে-(৩) তাদের প্রচুর পরিমানে জ্ঞান বিতরণ করা হয়।

বছরে তিন টার্ম কোন কোন বিদ্যালয়ে চার টার্ম ছাড়াও সাপ্তাহিক,পাক্ষিক এবং মাসিক পরীক্ষা নেওয়া হয়। তার মানে-(৪)সঠিক সময়ে তাদের সেসব প্রাপ্ত জ্ঞানকে ঝালিয়ে নেওয়া হয়।
চূড়ান্ত রকম চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাদের ফলাফল নির্ধারন করা হয়। তার মানে-(৫) সাগর সেঁচে মুক্তো বের করা হয়।

মাত্র পাঁচটি কারণ আমি উল্লেখ করলাম। খুঁজে পেতে আরও হাজার পাওয়া যাবে।তবে আমার যুক্তি আমার মতে এই পাঁচটি পয়েন্টেই খণ্ডানো যাবে। উপরোক্ত কারণগুলো দেখে কি আপনাদের মনে হয়না একটি ছাত্র/ছাত্রীর ভাল ফলাফলের জন্য একটি ভাল বিদ্যালয়ই যথেষ্ট? কিন্তু না। আমাদের বর্তমান অবস্থা বলছে অন্য কথা। একজন ছাত্র কে ভাল ফলাফলের জন্য অবশ্যই শামিল হতে হচ্ছে শিক্ষার এই বাণিজ্য প্রক্রিয়ায়। কারণটা আর কিছুই না,পুরটাই অর্থনৈতিক। একজন শিক্ষক সারা মাস কোচিং এবং টিউশনে সময় দিয়ে যে টাকা আয় করেন শুধুমাত্র স্কুল শিক্ষকতার পেশা দিয়ে তার ১/৪অংশ ও আসেনা। এই কারনেই নৈতিকতার বলি দিয়ে দলে দলে তারা শামিল হচ্ছেন ‘শিক্ষা বাণিজ্যের’ রঙ্গিন মেলায় আর নিজেদের পরিণত করছেন ‘টাকা গড়ার মেশিনে’ ‘মানুষ গড়ার’ নয়। আগে বাবার মুখে শুনেছি কোন রকম গৃহশিক্ষকের সাহায্য ছাড়াই তারা জীবনের প্রতিটি পরীক্ষায় ভাল ফলাফল করেছেন। আমি বলেছি,তোমাদের সামর্থ্য ছিলনা একজন শিক্ষক রাখার। বাবা হেসে বলেন সামর্থ্যর ব্যপারটা সত্যি হলেও এটা মূল কারণ ছিলনা। বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও শুনলাম,তিনি বল্লেন,তাদের সময়ের স্কুল শিক্ষকেরা নাকি অনেক আন্তরিক ছিলেন। এ কারনে গৃহশিক্ষকের সাহায্য তাদের দরকারই ছিলনা। এক মুহূর্তে ভাবলাম, ধুর…আমাদের শিক্ষকরাও আন্তরিক আসলে বাবারা ছিলেন,”ছাগলের দলে বাছুর পরামানিক”। আসলে কি তাই? মোটেও না। এসব চিন্তা নিজেকে সান্ত্বনা দেবার অপ্রয়াস ছাড়া আর কিছুই না। ভাল স্কুল গুলোতে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করে ছেলেমেয়ে পড়িয়েও ভাল ফলাফল আনতে পারছেন না অনেক বাবা-মা। আর দুনিয়া তে টিকতে হলে ফলাফল ভাল করতেই হবে। অগ্যতা আবার ফেরত যাই ‘কোচিং’ আর ‘টিউশনে’। ভাল স্কুলগুলোর গুণগান তো গাইলাম,এবার বলি সাধারন মানের স্কুলের কথা। ভালোগুলোতে যাওবা পড়াশোনা খানিক হয় এগুলতে তো সেসবের ও কোন বালাই নেই। তবে এ ক্ষেত্রে এসব স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। অর্থনৈতিক ভাবে মোটামুটি অসচ্ছল এইসব পরিবারের ছেলে মেয়েদের খুব কম সংখ্যকেরই কপালে ম্যাট্রিক/ ইন্টার পাশ করার সৌভাগ্য জোটে। তারচেয়েও কম সংখ্যক যেতে পারে পরবর্তী ধাপে। খেয়াল করলে দেখবেন শিক্ষাটা ঠিক এখন আর গরিবের পেটে হজম হচ্ছেনা। হবেই বা কিভাবে মাসে মাসে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা তাদের কোচিং /টিউশনে খরচ করার ক্ষমতা নেই। তাই এই বঞ্চিত জনগোষ্ঠী বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্তেও বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হল, কেন এই নৈতিকতা বিমুখতা? আমি আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক খাটিয়ে যে ব্যাখ্যাটা দাঁড় করিয়েছি তা অনেকটা এরকম(ভুলত্রুটি অবশ্যই মার্জনীয় নয়,শুধরে নেবার সাপেক্ষে)-
আমাদের দেশের শিক্ষকদের কে আমরা তাদের পাওনা মর্যাদাটুকু দিতে নারাজ। কিছু কিছু স্বনামধন্য প্রাইভেট ইংরেজি/বাংলা স্কুল ছাড়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের বেতন অত্যন্ত কম। বর্তমান মূল্যস্ফীতির বাজারে এই বেতনে সংসার চালান কষ্টকর এবং অনেকাংশেই অসম্ভবপর। আমরা জাতি হিসেবে কতোটুকু আগিয়েছি আমার জানা নেই তবে মানসিকতা মোটামুটি হৈমন্তীর জামানাতেই পড়ে আছে, যে জামানায় শিক্ষকতার পেশাকে ‘ওঁচা’ ভেবে নাক সিঁটকানও হত। এ কথাটার হয়ত অনেকেই বিরুদ্ধাচারণ করবেন,কিন্তু তাদের জন্য বিপক্ষ যুক্তি ও আমার কাছে আছে,তাদের উদ্দেশে বলছি,”ধরুন আপনার মেয়ে/বোনের জন্য দুটা সমন্ধে এসেছে। একজন BCS ইঞ্জিনিয়ার আর একজন হাইস্কুলের শিক্ষক। কার পাল্লা ভারি? প্রস্তাবটা কার দিকে ছুঁড়বেন?” আমি জানি,মুখে না বললেও বেশিরভাগই ভাববেন প্রথমজনের কথা।আমার প্রশ্ন হল,দ্বিতীয় জনের কথা কেন নয়? তার মানে আবার এই নয় যে আমাদের দেশের শিক্ষকরা অবিবাহিত থাকছেন। কিন্তু আমরা কেন ভুলে যাই শিক্ষকরাই মানুষ গড়ার কারিগর। তাদের হাতেই একটা দেশের ভবিষ্যৎ এর বীজ। অতএব,শিক্ষকদের জীবন সম্মানের সাথে নির্বাহের জন্য তাদের প্রয়োজনীয় সকল সুযোগ সুবিধা দিতে হবে যাতে শিক্ষার বাণিজ্যে লিপ্ত হবার আগে তারা একটি বারের জন্য হলেও চিন্তা করেন তাদের দেশ ও জাতির কথা।

এবার বলব, শিক্ষকদের নৈতিক ঘাটতির কথা। যারা এই বাণিজ্যে লিপ্ত তারা অবশ্যই তাদের কর্ম তথা নিজ বিবেকের প্রতি আন্তরিক এবং সৎ নন। অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনের লোভে আজ তারা অন্ধ। বিজ্ঞান বিভাগের নবম-দশম শ্রেনির একজন ছাত্রের জন্য একজন ভাল গৃহশিক্ষক পেতে হলে কম করে হলেও পাঁচ থেকে আট হাজার টাকা তাকে দিতে হয়, ক্ষেত্র বিশেষে এই দাবি আরও বেশি হয়ে থাকে। আপ্নারাই বলুন আমাদের দেশের কয়জন বাবা-মার পক্ষে এটা যোগান সম্ভব? তাও তারা যোগাচ্ছেন।নিজেদের নাভিশ্বাস তুলে,শুধুমাত্র তাদের ছেলেমেয়েদের দিকে তাকিয়ে তাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে। শিক্ষকদের কাছে আমার প্রশ্ন-এই সামান্য ছাড়টুকু কি আমরা আশা করতে পারিনা? শুনেছি, এমনও অনেক শিক্ষক আছেন যাদের কাছে বাচ্চা না পড়ালে (অবশ্যই প্রাইভেট) তারা স্কুলে বাচ্চাদের নাম্বার দেননা। তবে এনাদের উদ্দেশ্যে আমার কিছু বলার নেই। শুধু আক্ষেপ-“জাতি হিসেবে আমরা ব্যর্থ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যপারে,আর তা হল মানুষ তৈরিতে।“

আরও একটি কারণ হল দিনদিন আমাদের শিক্ষকতার পেশাটি মেধাশুন্য হয়ে পড়ছে। এখন খুব কম মেধাবিই চিন্তা করে এই পেশাটিতে আসার কথা। কারন এতে রঙ্গিন টাকার হাতছানি নেই। আছে কষ্ট,শ্রম,সাধনা। তবে কি আমরা ভুলে যেতে বসেছি এই পেশার মহানুভবতা? নাকি,টাকার কাছে মহান হবার ইচ্ছাটা নিতান্তই ক্ষুদ্র?

শিক্ষার রূপরেখাও এ ক্ষেত্রে কম ভুমিকা পালন করেনা। নিত্যনতুন শিক্ষা পদ্ধতি আসছে ঠিকই কিন্তু প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক কোথায়? সৃজনশীল, সিজেপিএর মত অসংখ্য নতুন নিয়ম প্রনিত হয়েছে কিন্তু কোথায় তার কতোটুকু প্রয়োগ ঘটছে এবং তার ফলাফল ইতিবাচক না নেতিবাচক তা নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় আছে কজনের?

যাই হোক, ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আসলে প্রশ্নই করে ফেললাম বেশি। কিন্তু আসলে কিছু করার নেই। এই ব্যাপারটা পুরোটাই প্রশ্ন দিয়ে মোড়া আর এর উত্তর জানা থেকেও আমাদের অজানা। সবশেষে সমাজ,জাতি আর দেশের প্রতি আমার আহবান আসুন এই স্পর্শকাতর ব্যাপারটা নিয়ে একটু চিন্তা করি। শিক্ষার এই বাণিজ্যতে শিক্ষকেরা যতখানি জড়িত আমরাও ঠিক ততখানিই জড়িত। কতিপয় স্বার্থলোভী মানুষের কারনে আমাদের পুরো শিক্ষক সমাজের নৈতিক পদস্খলন ঘটছে,আর আমরা তা ঘটতে দিচ্ছি। দায় শুধু আপনার অথবা আমার নয়,দায় আমাদের সবার। আমরা দায়গ্রস্ত আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে।