ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

নারী লাস্যময়ী,নারী হাস্যময়ী,নারী রহস্যময়ী। নারী মা,স্ত্রী,কন্যা,বোন,বান্ধবী। তবে এসব পরিচয় ছাড়াও বর্তমান জগতে নারীর আর একটি পরিচয় গড়ে উঠেছে,তা হল নারী ‘পণ্য’। পাঠক,আমার কথায় ক্ষিপ্ত হবেন না দয়া করে। একটু শুনুন। আমি বলতে চাই সেই সব নারীদের কথা যারা নিজেদের মান সম্মান সব কিছু হেয় প্রতিপন্ন করে নিজেদের পরিণত করছেন পণ্যতে,তবে হা,সবাই এর দলভুক্ত নন। আমরা এ ক্ষেত্রে দোষ দেই মিডিয়ার,দোষ দেই পুরুষের। আসলে কি দোষ শুধু তাদের ই? নারীদের কি কোনই দোষ নেই এ ক্ষেত্রে? তারা কি শুধুই ব্যবহৃত?

একটা উদাহরন দিতে চাই। এক মিষ্টির দোকানদার তার সব মিষ্টি রাস্তার পাশে খোলা রেখে দিল। স্বভাবতই মাছি এল ভনভনিয়ে। মিষ্টির দোকানদার মিষ্টি ঢাকতে নারাজ। কারণ তাতে তার বিজ্ঞাপন হবেনা এবং মিষ্টি বিক্রি না হবার সম্ভাবনাও বেড়ে যাবে। তাই সে তার মিষ্টি না ঢেকেই রেখে দিল এই ভেবে যে,”মিষ্টি থাকলে খানিক মাছি-টাছি আসবেই। খাক না,কতটুকুই বা আর খাবে।“ তাই আর মিষ্টি ও ঢাকা হলনা আর মাছিও বেশ মজা করে খেল।

এখন আসি মূল প্রসঙ্গে, এই উদাহরণের চরিত্র গুলোকে যদি আমি এভাবে বদলে দেই-মিষ্টির দোকানি=নারী। মিষ্টি=নারীর সম্মান। মাছি-টাছি=মিডিয়া এবং পুরুষ।

তাহলে গল্প টা কি দাঁড়ায়? খুব কি ভুল বললাম আমি? অবশ্যই এই পোস্ট টি সব নারীর জন্য নয় এমন কি মিডিয়াতে কাজ করেন এমন সবার জন্য ও নয়। কারন আমি মোটেও মিডিয়া এবং বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে নই। আমার সমস্যাটা তখনি হয় যখন দেখি নারী কে উপস্থাপন করা হয় পণ্য রুপে।

ওইদিন এক ব্লেডের বিজ্ঞাপন দেখলাম। প্রথমে ঠিকঠাকই ছিল হঠাৎ তাতে মাটি ফুঁড়ে বেরুল এক মেয়ে। যুবকের চকচকে গাল (যা কিনা হিরার মত চমকাচ্ছিল!!!) তা দেখে সে আবেগে আপ্লুত হয়ে গেল। এ পর্যন্ত ও ঠিক ছিল,তার পরেই বুঝলাম নারীটি আনন্দিত কারণ অই যুবক অই নির্দিষ্ট ব্লেড দিয়ে দাঁড়ি শেভ করেছে!!!! এটা কিভাবে সম্ভব? মানলাম একজন নারী পথচলতি কোন যুবকের চকচকে মুণ্ডিত গাল দেখে থমকে দাঁড়িয়ে আবেগাপ্লুত হতে পারে কিন্তু কখনই সে এই ভেবে আনন্দিত হবেনা যে অই যুবক ‘অমুক’ রেজারে ‘তমুক’ ব্লেড লাগিয়ে দাঁড়ি কাটে। আমি কি খুব ভুল বললাম? এখানে আমার প্রশ্ন,এই বিজ্ঞাপনে নারীর উপস্থিতি সৌন্দর্য বরধন করা ছাড়া আর কি করেছে (তাও যদি টা যৌক্তিক হত)? এখানে হয়তও অনেকে বলতে পারেন,”মানুষ সৌন্দর্যের পূজারী। অতএব সৌন্দর্য বিকশনের জন্য নারীকে ব্যবহার করা যেতেই পারে।কারন নারী সুন্দরের প্রতিক।“ তাদের জন্য আমার প্রশ্ন,তাই বলে এভাবে? যেখানে তার উপস্থিতি সৌন্দর্যের বদলে হাসির উদ্রেক করে সেখানেও তাকে আনতে হবে? তাহলে তো বেপারটা হল এমন,বাড়িতে মেহমান এসেছে।খাবার দেওয়া হল অনেক কিন্তু তারপর ও খাবারের ট্রের এক কোণা ফাকা পড়ে রইল। বাসায় তো বিস্কিট/চানাচুর আছেই,তাই গিন্নি ভাবলেন দিয়ে দেই কটা,দেখতে তো ভাল লাগবে। যদিও তিনি জানেন অন্যান্য খাবারের পর ওসব ছোঁয়ার সম্ভাবনা বড্ড কম!

আরেকটি বিজ্ঞাপনে দেখলাম, এক ছেলে তার গায়ে পারফিউম মাখছে আর দূরদূরান্ত থেকে এমন কি ভিনগ্রহ(!!!) থেকে মেয়েরা টুপটাপ করে তার রুমে এসে পরছে। মানলাম এর অন্তর্নিহিত বার্তা টা খারাপ না যে-এই পারফিউম মেখে আপনি আপনার সঙ্গিনীর আকর্ষণ লাভ করবেন,কিন্তু কথা হল তার প্রকাশ টা এত অশ্লীল কেন হতে হবে? এসব বিজ্ঞাপনে নারীদের উপস্থিতি দিনদিন এতটাই অশ্লীল হয়ে পড়ছে যে পুর পরিবার কে সাথে নিয়ে কদিন পর বিজ্ঞাপন দেখাটাও দুস্কর হয়ে যাবে।

বিজ্ঞাপন ছাড়াও ফিল্ম,নাটক,মিউজিক ভিডিও তো আছেই। বর্তমানে আবার চালু হয়েছে নতুন একধারা “আইটেম সং”। এ ধারায় মুন্নি,শিলা,চিকনি চামেলিও নাচছে সাথে আমাদের সমাজও নাচছে। তোড়াতোড়া টাকার বিনিময়ে এসব মেয়েরা গানের তালে তালে শরীর দুলাচ্ছে আর শরীর লোভী দৃষ্টি তাদের গিলে খাচ্ছে। কি লাভ হচ্ছে তাদের? টাকা! হায়রে…মানুষ!টাকার তোদের এতই দরকার যে নিজের শরীরের আব্রু বেঁচে তোদের খেতে হবে!!! দুঃখজনক…

হলিউড, বলিউড, টলিউড,ঢালিউড সবাই সবাই এই স্রোতে গা ভাসিয়েছে। এরা কি একটা বারের জন্য ও চিন্তা করে দেখছে এদের টাকা কামন ধান্দাবাজিতে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এরা কন মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

সাম্প্রতিক একটি বিষয় আমাকে বেশ নাড়া দিয়েছে। আর তা হল বিখ্যাত বলিউড অভিনেত্রী ঐশ্বরিয়ার শারীরিক স্থূলতা বৃদ্ধির ব্যাপারটি। আমি বলব এই ভদ্রমহিলা একজন স্বাভাবিক নারী। অন্তত তার বিবাহ পরবর্তী জীবনে তিনি স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা এমন ই যে তাকে তার জীবনে স্বাভাবিক দেখতে নারাজ। আমাদের মনোরঞ্জন দরকার অতএব তুমি রং মেখে সঙ সেজে বসে থাক। কি অমানবিক…একজন নারী যিনি কিছুদিন হল মা হয়েছেন তার ওজন বেড়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে আমাদের কত ছিঃ ছিঃ !!! সেসব ছিঃবাদীদের কে বলছি,আপনারা কি মানুষ জাত সন্তান…? যদি তাই হয়ে থাকেন তবে বাচ্চাদান করার কষ্টকর এই প্রক্রিয়ার মাঝ দিয়ে উপনীত হওয়া একজন নারীর কাছ থেকে আপনারা কি আশা করেন? আপনারা কি জানেন না যে একজন নারী যখন মা হয় তখন টা শরীরে বিভিন্ন পরিবর্তন আসে প্রাকৃতিক নিয়মে। জানা না থাকলে আপনার মা কে জিজ্ঞেস করুন,তিনি অবশ্যই জানবেন।

এখন কিছু কথা বলতে চাই সেইসব নারীদের উদ্দেশে যারা নিজেদের কে পণ্যতে রুপান্তরিত করে কলঙ্কিত করছেন পুরো নারী জাতকে। আপনাদের সমস্যার মূলটা কোথায় জানেন? আপনাদের অর্থের প্রতি লালসা। আমার কাছে তো মনে হয় আপনারা নির্বোধ। তাদের কথা বাদ দিলাম যারা বাধ্য হয়ে আসছে এসবে…কিন্তু যারা বাধ্য নয়,তারা? তারা কেন আসছে? নিজেকে কেন অন্ধকারের পথে ঠেলে দিচ্ছে? কেন কচকচে টাকার লোভে নিজেদের মান সম্মান খুইয়ে দিয়ে নগ্ন হচ্ছে ক্যামেরার সামনে? এসবের কারণ কি শুধুই টাকা? না আর ও আছে। আছে বিখ্যাত হবার লোভ। কিন্তু প্রিয়গণ ভুলে যাবেন না অই মিডিয়া আর মিডিয়ার দর্শক আপনাকে ততদিনই চিনবে যতদিন আপনার শরীর টা তাদের কাছে লোভনীয় লাগবে। একজন মডেল একজন গ্ল্যাম গার্লের খবর আমরা কজন রাখি যখন তারা বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে যায়। তাদের বার্ধক্যকের অন্তরালে তখন ঢাকা পড়ে যায় তাদের সব-মান,যশ,প্রতিপত্তি। তাদেরকেই বলছি কই আমরা তো ভুলে যাইনি বেগম রোকেয়াকে অথবা মাদার তেরেসাকে অথবা মাদাম কুরিকে অথবা জেন অস্তেনকে। কেন যাইনি ভুলে? তারা তো এসব পারতেন ও না জানতেন ও না। তাদের ভুলে যাওয়া উচিত ছিল আমাদের। ভুলিনি…ভুলব না। যতদিন পৃথিবীতে মানুষ বেঁচে থাকবে ততদিন এসব নামের স্তুতি গাইবে তারা। কারণ তারা স্বীয় প্রতিভায় মহিমান্বিত। তারা জগত কে আলোকিত করেছেন প্রতিভার দ্যুতি দিয়ে,শরীরের অলীক ছটায় নয়। আপনারা কাপড় খুলছেন, ধেইধেই করে অশ্লীল হাস্যকর নাচ নাচছেন। একবার ভেবে দেখেছেন ওই সময় দেখতে আপনাদের কেমন লাগে? আর ওই সময় কতশত মানসিকভাবে বিকৃত মানুষের দ্বারা আপনি সাইকোলজিক্যালি রেপড হন? তাই বলছি বোন,নিজেদের মানসিকতা পরিবর্তন করুন। আজ আপনি যা করছেন কাল আপনার মেয়ে/বোন তাই করবে। আপনি হাজার চেষ্টা করেও আর তখন কিছু করতে পারবেন না। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য এত কিছু কি দরকার? আপনার কাছে যদি সম্মানের সাথে ভালমত বেঁচে থাকার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ থাকে তবে কেন আপনি নিজেকে বিকিয়ে দেবেন? রুখে দাঁড়ান সেসব ডিরেক্টর/প্রডিউসারদের বিরুদ্ধে যারা আপনাকে অশ্লীল ভাবে পর্দায় উপস্থাপন করতে চায়। একবার না বলে দেখুন পারেন কিনা। আপনি কেন বোকামি করবেন? কি নেই নারীর? নারী সব ব্যাপারে অনন্যা। মিডিয়া তে কাজ করুন। স্বতঃস্ফূর্ততার সাথে করুন, অশ্লীলতার সাথে নয়।জানিয়ে দিন সমাজকে জানিয়ে দিন পৃথিবীকে যে আপনি আপনার স্বীয় প্রতিভার আলোতে আলোকিত। সেই আলো হৃদয়ে হৃদয়ে ছড়িয়ে দেবার জন্য শারীরিক আবেদনের কোন প্রয়োজন নেই।

বিঃদ্রঃ কাউকে আঘাত করা আমার উদ্দেশ্য নয়। তবুও যদি কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকি,তবে তার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী ।