ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

“তোমরা যে যা বল ভাই, বাঙালির চেয়ে রসনা বিলাসী এ পৃথিবীতে কেউ নাই”। এটা অবশ্য আমার বিশ্বাস, সবাই হয়তোবা এর সাথে একমত হবেন না। সে যাইহোক, আজ আমি আমাদের দেশের কিছু দেশীও খাবার দাবারের গল্প করব।

বাবার চাকরির সুবাদের এই অল্প বয়সেই আমি বাংলাদেশের প্রায় ৭০% অঞ্চল দেখে ফেলেছি(ব্যাপারটা নিয়ে ভিতরে ভিতরে আমি খুবি গর্বিত।কাউকে অবশ্যতা বলিনা শুধু আপনাদের বললাম)। তো এই দীর্ঘ পরিক্রমায় আমার অর্জন অনেক। তার মাঝে আমার সবচেয়ে বড় অর্জন হল আমাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের খাবারের সাথে পরিচিতি লাভ। আমি রাঁধতে খুব ভালবাসি আর খাওয়াতে তার থেকে বেশি ভালবাসি, এ কারনেই হয়তোবা রন্ধন প্রক্রিয়া এবন নিত্ত নতুন রান্না চেখে দেখার এবং করে দেখার আগ্রহ আমার মাঝে প্রবল। সে যাহোক আমার গুন বিশ্লেষণে আমি বসিনি, বসেছি খবার-দাবারের গপ্পো-সপ্প করতে।তাই শুরু করি যাত্রা-

আমার গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জ। সারা বছর যাওয়া না হলেও আমরা প্রত্যেক কোরবানি ঈদ সেখানে পালন করি। তো সেই সিরাজগঞ্জের লোকেদের মাঝে আমি একটা জিনিস খাওয়ার তুমুল আগ্রহ দেখেছি। আর তা হল-‘ঘাঁটি’। বড় কোন মাছের মাথা দিয়ে লাউ/আলু/মুগ দালের ঘণ্ট। ছোট থাকা অবস্থায় প্রচণ্ড নাক সিটকাতাম, খেয়ে বুঝলাম মানুষ এটা কেন খায়। তালা জিরা,শইলা পাতা দিয়ে রাঁধা এই বস্তুটি আমাদের বাসার সবার পছন্দ। আমদের গ্রামে তথা সিরাজগঞ্জ এবং উত্তারঞ্চলের অনেক গ্রামে আরেকটি খাদ্যদ্রব্য রান্না করা হয় যার আঞ্চলিক নাম ‘জিয়াফত’। মৃত আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন পূর্বক এই রান্নাটি করা হয়। এর আয়োজনটাও একটু ভিন্ন ধর্মী, এই আয়োজনে কোন ব্যাক্তি টাকা দেননা। তারা তাদের সামর্থ্য মত চাল,ডাল,মাংস,তেল,মসলাপাতি দান করেন। প্রকৃতপক্ষে রান্নাকৃত বস্তুটি একধরনের খিচুড়ি যার ভিতর মাংস,সবজি সব মিশানো থাকে। সে যে কি অপূর্ব সৃষ্টি তা আমি আপনাদের না খাওালে বুঝাতে পারবনা। তাছাড়া আরও আছে ছানার জিলাপি,আমিত্তি,রসগোল্লা,ঘি,দই,প্যারা সন্দেশ,খাজা,কটকটি,মাঠা,ঘোল,গজা ইত্যাদি। এ সবই বৃহত্তর উত্তারঞ্চলে তথা সারাদেশে সুপরিচিত।
কুড়িগ্রাম, রংপুর এসব অঞ্চলে থাকার ভাজ্ঞ আমার হয়েছিল। এ জায়গা গুলোর একটির কথা না বললেই নয়, আর তা হল ‘সেদল’ আঞ্চলিক উচ্চারনে ‘হেদল’। এটা শুঁটকির একটি প্রিপারেশন। পাটায় শুঁটকি,মসলা দিয়ে বেতে রোদে শুকিয়ে এই বস্তু তৈরি করা হয়। দুর্গন্ধযুক্ত এই বস্তু কিন্তু যেমন দামি তেমনি দুর্লভ। কচুর লতি, আলু ও অন্যান্য কিছু সব্জির সাথে এই খাবার নাকি অনন্য। আমি অবশ্য সাহস করে চাখিনি এ কারনেই সে আমার দুর্ভাগ্য না সৌভাগ্য তা সঠিক বলতে পারছিনা। আরেকটি খাবারের গল্প করার লোভ সাম্লাতে পারলাম না। আমরা তখন ছিলাম ঠাকুরগাঁওয়ের একটি থানায় নাম তার পীরগঞ্জ। তো সেখানে এক অদ্ভুত কম্বিনেশন আমি দেখেছি আর তা হল বোয়াল মাছের ঝোল এবং বেগুনের লাবড়া দিয়ে ভাপা পিঠা ! আমি খেয়েছি, আর তা আমার ভাল ও লেগেছে। এই কুড়িগ্রাম,লালমনিরহাট,রংপুর,গাইবান্ধা,পঞ্চগড়,শেতাবগঞ্জ,বিরগঞ্জের লকেরা আরেকটা জিনিস বানাতে ওস্তাদ আর তা হল নানা রকম ভর্তা। ভর্তা আমদের দেশের কমবেশি সব পরিবারেই খায় কিন্তু এত অপূর্ব স্বাদের ভর্তা আমি খুব কমই খেয়েছি।

তারপর আমরা চলে গেলাম সৌন্দর্যের তীর্থস্থান,আউলিয়ার দেশ সিলেটের শ্রীমঙ্গলে। চমৎকার পরিবেশ আর আবহাওয়ায় মুগ্ধ হয়েছি যতদিন থেকেছি এখানে। এখানে এসে পরিচয় হল দুটি বিশেষ জিনিসের সাথে। (১) সাতকড়া(একটি ফল) এবং (২)নাগা মরিচের আচার(ভয়ংকর!!!)। প্রথমটি এখন আমাদের প্রায় সবার কাছে সুপরিচিত। ভিটামিন সি ভরা এই ফলটি এখানে ব্যাবহার করা হয় বিভিন্ন রান্নায় বিশেষত মাংস রান্নায়। খেতে সামান্য তিতকুটে এই ফলটি সত্যিকার অর্থেই রান্নায় এনে দেয় ভিন্ন মাত্রা। আর নাগা আচারের কথা লিখতেও ভয়…মনে হচ্ছে হায়!এই বুঝি আমার পোস্টটাও ঝাল হয়ে গেল!! এত ঝাল…মাগো…!!!

চট্টগ্রাম অঞ্চলে থাকার সৌভাগ্য যদিও আমার হয়নি তবু কিছু বন্ধু বান্ধবের সুবাদে কিছু কিছু জিনিস জেনেছি। যেমন চট্টগ্রামের মানুষ শুঁটকি বড্ড ভালবাসে। খায়ও বেশ আয়েশ করে এটা তারা রাঁধেও দারুন। তবে আমাকে আকৃষ্ট করেছে সেখানকার ‘মেজবান’। খেয়েছি আর ভেবেছি… হায়!হায়!গরুর মাংস এত স্বাদ!! তারপর আমি আর আমার রান্নার সহকর্মী মানে আমার বাবা বহুবার তা চেষ্টা করেছি। খারাপ না হলেও অমন মুখে মেখে থাকা স্বাদ আনতে পারিনি কিছুতেই।

এখন আছি খুলনায়। এসে দেখি, এত নারিকেলের স্বর্গ। খুলনা,যশোর,বরিশাল,পিরোজপুর,চুয়াডাঙ্গা,রাজবাড়ী আসলে খুলনা এবং বরিশাল অঞ্চলের খাদ্যাভ্যাস আমার কাছে একইরকম লেগেছে। তবে খুলনায় এসে খেলাম এক মজার জিনিস। নাম তার “চুই-ঝাল”। এটি একরকম গাছের কাণ্ড। ছোট করে কেটে এটা বিভিন্ন মাংস রান্নায় ব্যবহার করা হয়। এর স্বাদ অনেকটাই গোলমরিচের মত। রান্নায় বেশ ঝাঁঝাল একটা ভাব আনে। চুই-ঝালের ঔষধি গুরুত্ব অপরিসীম। ঠাণ্ডার জন্য এটি অত্যন্ত উপকারী। এখানকার আরেকটি রান্নার ধরন যা আমার মন কেড়ে নিয়েছে তাহলো রান্নায় নারিকেল বাটা/দুধের ব্যাবহার। খুলনা সাতক্ষীরার চিংড়ি/ভেতকি/পার্শে মাছের সাথে নারিকেল অনবদ্য। তাছাড়াও ডালের সাথেও এর ব্যবহার খুব। ফুলকো লুচির সাথে নারকেল দুধে বুটের ডালনা যে কি চমৎকার তা ভাষায় প্রকাশ করা আমার মত অধমের পক্ষে সম্ভব না।

ঢাকা আর বাদ থাকবে কেন? এখনকার ঢাকা সারা দেশের মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে। কিন্ত রসনার কথা বলতে গেলে এক্ষেত্রে একমাত্র উল্লেখ্য ঢাকাইয়া খাবার। হ্যাঁ তাদের খাবারের কথাই বলছি যারা পরিচিত পুরান-ঢাকাইয়া বলে। খাবারের রাজ্যে এনারাই রাজা। তবে এটা ঠিক যে দেশীয় রান্নার চাইতে ঢাকাইয়া খাবারে মোঘল-পদের আধিক্যই বেশি। তবুও যুগ যুগ ধরে প্রচলিত এসব খাবার এখন আমাদের দেশ ও সংস্কৃতিরই অংশ। অপূর্ব এসব খাবারের মাঝে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের কাবাব,কোফতা,কালিয়া,রোস্ট,পোলাও,বিরানি,বিভিন্ন রকম সরবত,হরেক রকম রুটি ইত্যাদি। এসব খেতে রসনা বিলাসী মানুষেরা ছুটে যান বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় অথবা প্রণালী জানা থাকলে রেঁধে ফেলেন নিজের প্রিয় মানুষগুলোর জন্য।

শেষ করার আগে আপনাদের আরেকবার নিয়ে যেতে চাই উত্তরবঙ্গে। পড়াশোনার কারনে আমার বর্তমান আবাস দেশের শিক্ষানগরী রাজশাহীতে। রাজশাহীর আম লিচু তো ভুবনমোহিনী তাছাড়াও রয়েছে রান্নাবান্নার দিক দিয়ে তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। রাজশাহীর ডালের বড়ি আমাকে কাছে টানে খুব।বড় মাছের সাথে ডাল-কুমড়োর বড়ির ঝোল এক অপূর্ব সৃষ্টি। আরেকটি খাবার আমার খুব ভাল লেগেছে আর তা হল সাত-পুতী পিঠা। অনেকটা চিতই পিথার মত ছোট ছোট এই পিঠাটি শিতের দিনে খেতে হয় মোরগের মাংসের ঝোল দিয়ে। আর রাজশাহীর কলাইয়ের রুটির কথা কে না জানে। তার কথা নাহয় নাই হল। নাটোরে খেয়েছি কোয়েল পাখি। সেখানে কবুতরের মত খাওয়ার উদ্দেশ্যে কোয়েল পাখি পোষা হয় !

শেষ করতে চাইছি লেখাটা। তাও যেন ফুরতেই চাচ্ছে না। কত খাবারের কথা যে বাদ পড়ে গেল। আসলে ভোজন রসিক বাঙালির ভোজন তালিকা এই স্বল্প পরিসরে আঁটানো বড় দায়। যেটুকু পেরেছি,চেষ্টা করলাম। তাই বলি ভাই, খাদ্য রসিকেরা যে যতই বলুক ফ্রান্স, ইতালি, আরব্ এর কথা কিন্তু আমার দেশের শর্ষে ইলিশ-কই, মাগুর-শিঙ্গের ঝোল,শুক্ত,উচ্ছে ভাজি,আলুর দম-ডালনা,ঝিঙ্গে পোস্ত,গরু ভুনা,খাসীর ভুনা,মুরগির ঝোল,কবুতর ভুনা,লাউ চিংড়ি,কচু চিংড়ি,শুঁটকির ভর্তা-পাতুরি,মুড়িঘণ্ট,ছোট মাছের চর্চরী,আলু ভর্তা,বেগুন ভর্তা,টমেটো ভর্তা,লাউ পাতা ভর্তা, কালজিরে ভর্তা, আমের টক, কামরাঙ্গার টক,মুগ-মসুর-বুট-অড়হরের ডাল এসবের সাথে কি কোন কিছুর তুলনা আছে?
তাই আমি বলি, “তোমরা যে যা বল ভাই, বাঙালির চেয়ে রসনা বিলাসী এ পৃথিবীতে কেউ নাই”।