ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

মামলা ও পুলিশি অভিযানের মুখে কোণঠাসা বিএনপি পরিস্থিতি সামাল দিতে আবার হরতালকেই বেছে নিচ্ছে।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একজন নেতাসহ ১৮ দলীয় জোটের দুজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা প্রথম আলোকে এমন তথ্য দিয়েছেন।
বিএনপিসহ জোটের এসব নেতা মনে করেন, হরতালের মতো কঠোর কর্মসূচি না দিলে তাঁদের বিরুদ্ধে সরকারের ‘দমননীতি’ আরও ব্যাপকতা লাভ করবে। এ নেতারা বলেন, হিলারি ক্লিনটনসহ একাধিক বিদেশি অতিথির আগমন উপলক্ষে আপাতত কঠোর কর্মসূচির ক্ষেত্রে বিরতি দেওয়া হয়েছে। সরকার একে দুর্বলতা ভেবে পেয়ে বসেছে। মামলা দিয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের হেনস্তা শুরু করেছে।
বিএনপির দায়িত্বশীল অপর একটি সূত্র জানায়, দলের বিশ্লেষণ হচ্ছে—তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে বিরোধী দলের দেওয়া ৯০ দিনের সময়সীমা (১০ জুন) ঘনিয়ে আসছে। এর আগেই সরকার বিএনপিকে দুর্বল করতে মামলা দিয়ে হেনস্তা করাসহ নেতাদের মধ্যে ‘গুম’ বা ‘নিখোঁজ’ হওয়ার আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে। এ ছাড়া আগামী নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীন করার লক্ষ্য সামনে রেখে বিএনপিকে ভাঙার গোপন তত্পরতা আবারও শুরু হয়েছে। আর সেটাকে এগিয়ে নিতে ‘টেস্ট কেস’ হিসেবে অপহরণ, গুম ও কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির নীতিনির্ধারণী সর্বোচ্চ পর্ষদ স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘সরকারের চিন্তা একটাই—ছলে-বলে-কৌশলে ক্ষমতায় থাকা। আর ক্ষমতায় থাকতে হলে বিএনপিকে ধ্বংস করতে হবে।’ তিনি দাবি করেন, এ প্রক্রিয়া অনেক আগে থেকে শুরু হয়েছিল। এখন আবার নতুন করে শুরু করা হয়েছে।
অবশ্য দলের স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য মওদুদ আহমদ দাবি করেন, সরকার যতই চেষ্টা করুক, বিএনপিকে কোনো দিনই ভাঙতে পারবে না। মূলত আন্দোলন বেগবান হওয়ায় সরকার তা রোধ করার জন্য মামলা, গ্রেপ্তার ও রাষ্ট্রীয় শক্তির অপব্যবহার করছে।
বিএনপি সূত্র জানায়, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দলের শীর্ষপর্যায়ের পরামর্শে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ মামলার আসামি হওয়া অন্য কেন্দ্রীয় নেতারা গ্রেপ্তার এড়াতে গা ঢাকা দিয়েছেন। সূত্রটি জানায়, উচ্চ আদালত থেকে জামিন না মিললে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব আরও কিছুদিন আত্মগোপনে থাকতে পারেন। কারণ হিসেবে সূত্রটির দাবি, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গ্রেপ্তার হলে পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে আরও মামলা দেওয়া হতে পারে। এতে তাঁর জামিন পেতে দেরি হতে পারে। আর তিনি লম্বা সময়ের জন্য কারান্তরীণ হলে, অন্য কাউকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দিতে হতে পারে। সে উদ্যোগকে কেন্দ্র করে দলে অন্তর্দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হতে পারে, যা থেকে সরকার সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। এর সঙ্গে নতুন করে কাউকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে দলের চেয়ারপারসনের আস্থা-অনাস্থার বিষয়টিও জড়িত।
এ ধরনের বিশ্লেষণ থেকে ৬ মে প্রতিবাদ সমাবেশ কর্মসূচি থেকে পরবর্তী সময়ে হরতালের মতো কর্মসূচিতে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছেন বিএনপিসহ ১৮ দলীয় জোটের নীতিনির্ধারকেরা।
বিদেশি অতিথিরা যাওয়ার পর বিএনপি আবারও হরতালে যাচ্ছে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে মওদুদ আহমদ গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা অবশ্যই হরতালে যেতে পারি। প্রয়োজনে হরতালের চেয়েও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।’ তাঁর দাবি, ইলিয়াস আলী গুমের ঘটনার পর বিরোধী দলের আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা বাড়ায় সরকার ভয় পেয়েছে। এ কারণে তারা মামলা দিয়েছে। এমনকি আইনের আশ্রয় নেওয়ার পথও তারা রুদ্ধ করে রেখেছে। গতকাল সাদা ও নিয়মিত পোশাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সুপ্রিম কোর্ট ঘেরাও করে রেখেছিল, যাতে বিএনপির নেতারা আদালতে হাজির হতে না পারেন।
দলটি আজ বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় নেতাদের আগাম জামিনের জন্য আবার চেষ্টা করবে। আজ জামিন না পেলে ৭ মে পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কারণ, এরপর শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি, তারপর রোববার বুদ্ধপূর্ণিমার ছুটি। আর হিলারি ক্লিনটন ও প্রণব মুখার্জি—দুজনই ৬ মে সন্ধ্যানাগাদ ঢাকা সফর শেষে ফিরে যাবেন। দলীয় সূত্র বলছে, তার আগে জামিন না পেলেও মির্জা ফখরুল ছাড়া বাকি নেতারা ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে নামতে পারেন। কোনো কারণে বাকিরাও যদি রাস্তায় নামতে না পারেন, তা হলে অন্য নেতাদের মাঠে নামিয়ে কর্মসূচি পালনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অবশ্য মওদুদ আহমদ বলেছেন, ‘আদালতে আইনি লড়াই এবং রাজপথে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নেতাদের ফিরিয়ে আনব। দু-এক দিনের মধ্যে তাঁরা ফিরে আসবেন।’ তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার (আজ) আবার মাহবুবউদ্দিন খোকনের জামিনের আবেদন প্রধান বিচারপতি নতুন বেঞ্চ পাঠাবেন। ওই বেঞ্চে তাঁর জামিন হলে, বাকি নেতাদের জামিনের আবেদনও একই বেঞ্চে নিয়ে যাওয়া হবে।