ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

1907519_10206232399558690_8832347198333527368_n

বিচিত্র নেশা ও ঝোঁকের অধিকারী এবং অবহেলিত প্রচার বিমূখ একজন জীবিকার সংগ্রামী সাহসী পুরুষ সুনির্মল কুমার দেবমীন। প্রাবন্ধিক এবং রম্য লেখক  নিষ্ঠাবান একজন লেখক, তাঁর লেখার বিষয় ও বৈচিত্র লক্ষণীয় । হালকা নিবন্ধের পাশাপাশি তিনি গবেষনামূলক কাজেও দক্ষতার সাক্ষর রেখেছেন। নাটক রচনায় বিশেষ করে আঞ্চলিক ভাষায় নাটক রচনায় সিদ্ধহস্ত। মীন বাবু পঞ্চাশের দশক থেকে সাহিত্যাঙ্গণে বিচরন করে আসছেন । লেখালেখির সাথে তিনি সাহিত্য ও পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন । ছাত্রজীবন থেকে কঠিন পরিশ্রমী ওই লেখকের রচনায় জীবন সংগ্রামের ছাপ স্পষ্ট ভাবে ফুটে উঠেছে তাঁর জীবনিতে।

দেবমীনের জন্ম হয় ১৩৪৯ বঙ্গাব্দের ১৭ই জ্যৈষ্ঠ রোববার (৩১শে মে ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দ) মৌলভীবাজার শহরে । তাঁর গ্রামের বাড়ি মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া থানার ৬নং কাদিপুর ইউনিয়নের উচাইল গ্রামে । তাঁর বাবা প্রয়াত প্রমোদচন্দ্র দেব ছিলেন মৌলভীবাজার দেওয়ানী আদালতের প্রতিষ্ঠিত উকিল ও তাঁর মায়ের নাম ছিল সুবর্ণ প্রভা দেবী ।

সুনির্মল কুমার দেবমীন ১৯৫৯ সনে মৌলভীবাজার সরকরি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ইষ্ট পাকিস্তান সেকেন্ডারি এডুকেশন বোর্ড, ঢাকার অধীনে প্রবেশিকা (ম্যাট্রিক) পরিক্ষা পাশ করেন । ছাত্র রাজনীতির জন্য হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন জনিত কারণে মৌলভীবাজার শহর থেকে তিনি বহিঃস্কৃত হন। এজন্য তাঁকে ময়মনসিংহ শহরস্থ নাসিরাবাদ কলেজে গিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়। ১৯৬৩ ও ১৯৬৫ সালে উক্ত কলেজ থেকেই দেবমীন ঢাকা বোর্ডের অধিনে আইএ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিনে বিএ এবং বহিরাগত পরিক্ষার্থী হিসেবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ১৯৬৮ সালে এম.এ পাশ করেন। ১৯৬৬ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সিলেট সাবডিভিশনের একমাত্র ব্যাক্তি টেলিভিশনে রেকর্ডিং করার জন্য পশ্চিম পাকিস্তান হতে নির্বাচিত হন।

তিনি ছাতক কলেজের বাংলার অধ্যাপনা করেন। ছোট বেলা থেকেই দেবমীন সাহিত্য চর্চা শুরু করেন। তাঁর প্রথম রচনা কবিতা হলেও পরবর্তীকালে তিনি গল্প, রসরচনা, রম্য রচনা ও প্রবন্ধ রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। পঞ্চম শ্রেণীতে তাঁর লেখা কবিতা ছিল হাঁস নিয়ে লিখিত। অবশ্য মাঝে মধ্যে কবিতা লিখে থাকেন, তবে কাব্যসাহিত্যের চেয়ে ইদানিং তাঁর ঝোঁক কথাসাহিত্যের উপরই বেশি। ১৯৬৩ সালে দেবমীনের পিতৃবিয়োগ ঘটে। সাময়িক আর্থিক টানাপোড়নে পড়েও আত্মবিশ্বাসি আর অপূর্ব মনোবল নিয়ে তিনি চাকুরির সাথে পড়াশোনাও অব্যাহত রাখেন। ঢাকাস্থ ইস্টল্যান্ড ইনজিনীয়ার্স ও প্লেনার্স কম্বাইনে তিনি সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সাহিত্য, সংস্কৃতিচর্চার সাথে সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগত ছাত্র হিসেবে এম.এ এবং ঢাকা ল’কলেজে উকিলাতি সম্পূর্ণ না করে, পারিবারিক কারণেই দেবমীন মৌলভীবাজার চলে আসেন ১৯৬৭ সালে। বেকার হলেও নির্বিকার না হয়ে তিনি তখন ‘জীবিকা’ নামে বিভিন্ন পত্র পত্রিকার এজেন্সী নিয়ে পড়াশোনা অব্যাহত রাখেন। এই সময়ে তিনি ও তাঁর আরো এক ভাই ও বোন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন নানা প্রতিকূলতা সত্তে¡ও। মৌলভীবাজার শহর এলাকায় মরহুম আমীনূর রশীদ চৌধুরীর বদান্যতায় তিনি প্রায় ৫ শত কপি সাপ্তাহিক যুগভেরী একাই প্রতি সপ্তাহে নিজে ফেরি দিয়ে বিক্রয় করতেন। আর্থিক অসংগতির দরুণ কোন দৈনিক পত্রিকার এজেন্সী নেয়া সম্ভব না হলেও তখন বেশ কিছু সাময়িকী ও সাপ্তাহিকী তিনি পাঠকদের পৌছান। একই সাথে যুগভেরীতে বেত্তমিজের হালখাতা নামক চটুল ও সৃজনশীল কলাম লিখতেন বলে তিনি সংবাদদাতা হিসেবে দায়িত্ব পালনেও যত্নবান থাকেন।

১৯৭২ সালে সিলেট বেতার কেন্দ্রেই সংবাদ পাঠক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। বর্তমানে তিনি ঐ কেন্দ্রের নানা ভাইয়ের আসর ছাড়াও বিভিন্ন ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। কথক ও নাট্যশিল্পী ছাড়াও তিনি এই কেন্দ্রের নাট্যকার ও ক্যাজুয়েল প্রডিউসার হিসেবে নাটক পরিচালন করে থাকেন। ১৯৭২ সালে বৈশাখী নাট্যগোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে স্পার্টাকাস বিষয়ক জটিলতা নামক মোমতাজ উদ্দিন আহমদের লেখা নাটকের ‘সূর্যকুণ্ড’ এর ভূমিকা দিয়েই তিনি সিলেটের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের কাছে পরিচিতি লাভ করেছেন । দেবমীন বর্তমানে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় স্বনামে, ছদ্ম নামে রস্ও রম্য রচনা ছাড়াও গবেষণা সমৃদ্ব প্রবন্ধ ও নিবন্ধ লিখে চলেছেন । ১৯৭৭ সনে তার সম্পাদনায় প্রকাশিত উভয় বাংলার লেখকদের রচনা সমৃদ্ব ’মুজতবা প্রসঙ্গ’ মুজতবা আলীর উপর বাংলাদেশের প্রথম আলোচনা গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় মদন মোহন কলেজ সাহিত্য পরিষদ থেকে। হিজরি পঞ্চদশ শতকের শুরুতে দেবমীন প্রকাশ করেন তার বহুল আলোচিত গ্রন্থ ’হিজরি সনের ইতিকথা’ । ’হিজরি সনের ইতিকথা’ বর্তমানে ইংরেজী সংস্করণে প্রকাশের জন্য কাজ করছেন আর এই সংস্করণে ভুমিকা দেবেন মাননীয় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ’হিজরি সনের ইতিকথা’ ইংরেজী সংস্করণ ২০১৫ সালের আগামী জুলাই বা আগষ্ট মাসে প্রকাশনা হবে। বিচিত্র নেশা ও ঝোঁকের অধিকারী দেরমীন বাংলা একাডেমী ও বাংলাদেশ-এর ইতিহাস পরিষদের একজন আজীবন সদস্য । ১৯৮১ সনে তিনি তার গবেষনা প্রবন্ধ “বঙ্গাব্দের ইতিহাস পাঠ” করতে বাংরাদেশ-এর ইতিহাস পরিষদ কর্তৃক আয়োজিত রাজশাহীর বরেন্দ্র মিউজিয়ামে অনুষ্টিত অনুষ্টানেও গিয়েছিলেন । সাংবাদিক, হকার, গ্রন্থকার, নাট্যকার, নাট্যশিল্পী, সংবাদ পাঠক, নাট্য পরিচালক, নির্দেশক ও প্রযোজক এবং অধ্যাপক সুনির্মল কুমার দেবমীন । ১৯৭৯ সনে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করেছেন । ২০০৪ সনে বিলেতে মৌলভীবাজার প্রবাসীদের উদ্যোগে দেবমীন প্রথমবার সম্মাননা পান। সেই সম্মাননার জন্য তিনি ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান। প্রায় ১১ বছর পর  ৩ এপ্রিল ২০১৫ সনে, নিজ জন্মভুমী সিলেটে কবি নজরুল অডিটেরিয়াম উদ্বোধন কালে সম্মিলিত নাট্য পরিষদের উদ্যোগে সিলেটবাসী তাঁকে সম্মাননা প্রদান করে। দেবমীনের ’মুজতবা প্রসঙ্গ’ সম্বন্ধে কোলকাতার “দেশ” ম্যাগাজিনে ১৯৭৯ সনে মন্তব্য করেছে যে, সৈয়দ মুজতবা আলী কে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ও কটি গ্রন্থ প্রকাশের জন্য সুনির্মল কুমার দেব মীন উভয় বাংলার সাহিত্যামোদীদের কাছেই প্রশংসাযোগ্য।

এত গুণে গুণান্বিত শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গণের গুণী এই ব্যক্তিত্ব ব্যক্তি জীবনে প্রচারবিমুখ ও নিভৃতচারী থাকতেই পছন্দ করেন। আর তার এই জীবনাচারের জন্যই নতুন প্রজন্মের কাছে সুনির্মল দেব মীন এক ভিন্ন গ্রহের পথভোলা সাধক হয়েই আছেন।