ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

সুমন দে : স্বাধীনতা দিবস, ২১শে ফেব্রুয়ারি ভাষা দিবস (আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস), বিজয় দিবস, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ঘোষিত অন্য যে কোন দিবসে শিবনারায়ন দাশের পতাকাটি পরিচিত । পতাকা উৎসব দিবসে শুধু স্মরণকরি বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার স্রষ্টাকে,  এবং জাতীয় পতাকা বেসরকারি ভাবে বহুল ব্যবহার দেখতে পাই । সত্যি কী মূল্যায়ন হয়েছে বাংলাদেশেরে পতাকার স্রষ্টার ? অনুগ্রহ করে সত্যকে সম্মান দিন জাতীয় পতাকার ডিজাইনার কামরুল হাসান নয়, শিব নারায়ণ দাশ । শিব নারায়ন দাশের পতাকাটি আমাদের পরিচিত কিন্তু শিব নারায়ন দাশের নাম আমরা ক’জন জানি ? শিব নারায়ন দাশের পতাকায় মানচিত্র ছিল । সেই পতাকাই আসম আবদুর রব উড়িয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ রা মার্চ ।  সেই পতাকাই বঙ্গবন্ধু ২৩শে মার্চ উড়িয়েছিলেন ধানমন্ডি ৩২ নাম্বার বাড়িতে ।  তবে কেন শিবনারায়ন দাশের পতাকা হতে স্বাধীনতার পরে শুধু মানচিত্র বাদ দিয়ে নকল করে কামরুল হাসান আজ পতাকার ডিজাইনার হলেন । তিনি তো পরিবর্তন পরিবর্ধন করেছেন মাত্র । মূল ডিজাইনার তো শিবনারায়ন দাশই ।

আজ রোবার, ২৭শে সেপ্টেম্বর ২০১৫ সাল, দুপুরের দিকে খবর পেলাম শিবনারায়ন দাশ কিডনি রোগে আক্রান্ত, তাঁর শারিরিক অবস্থার খবর নিতে গিয়ে যুগপৎ সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক একটি স্বাক্ষাৎকার মূঠোফোনে নেয়া হল। নিম্নে তা প্রকাশ করা হল :

সুমন :  স্বাধীনতা দিবস, ২১শে ফেব্রুয়ারি  (আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস), বিজয় দিবস, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ঘোষিত অন্য যে কোন দিবসে আপনার নাম, শিবনারায়ন দাশের সম্মান ফেরত দেয়ার দাবি ওঠে বিভিন্ন মাধ্যমে । এ বিষয়ে আপনার মতামত কি ?

Flag_of_Bangladesh_(1971).svg

শিবনারায়ন দাশ :  (রাগের স্বরে ) এগুলো নিয়ে যারা ভাবার তারা ভাববে । আমাদের কাজ আমরা করেছি । এসব নিয়ে ঘাটানোরও কিছু নেই । একটা সময় দরকার ছিলো করেছি । এখন আর এসব নিয়ে এতো হৈচৈ করার কি আছে । সেই সময়টাতে আমি না থাকলে অন্য কেউ করতে পারত ।

সুমন : এখনকার প্রজন্ম বিকৃত ইতিহাস জানছে, পাঠ্যপুস্তকেও মিথ্যা প্রকাশিত হচ্ছে, সেটা নিয়ে আপনার কি ভাবনা ?

শিবনারায়ন দাশ : এখনকার প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের আপনারা শুথু এটুকু জানান, যে  কম্পিউটার  আর মোবাইলে গুতাগুতি না  করে বই পুস্তক বেশী করে পড়তে । বই পড়তে উৎসাহিত করুন ও লাইব্রেরী ওয়ার্ক করতে বলুন । তাহলে সব জানতে পারবে ।

সুমন :  আপনি যে সময়টাতে পতাকার ডিজাইন করেছিলেন  তা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইতিহাস হয়ে আছে। আপনার অবদান ইতিহাসের পাতায় উজ্জল হয়ে আছে, তবে এখন বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তক সহ অনলাইন মিডিয়া ও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে বিকৃত অবস্থায় রয়েছে কেন ?

শিবনারায়ন দাশ : এখানে সমস্থ ব্যপারটাই বিকৃত হয়ে আছে । বাংলাদেশের যে সংবিধান, পঞ্চদশ  সংশোধন করেছে সেখানে মুক্তিযুদ্ধের আর কিছু আছে ? মুখে উচ্চারণ ছাড়া আর কি কিছু আছে ? এইযে স্টেট রিলিজিওন করলেন তাতো মেনে নিলেন । দৃষ্টির অগোচরে, প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তির সাথে আতাত করে, তলে তলে ক্ষমতা আকড়ে ধরে রাখার জন্য রয়েছে প্রতিটা শাসক । মুক্তিযুদ্ধ কি দিয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ কি শেষ ? মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করা সেটা এখন বেশী প্রয়োজন । সেই অসমাপ্ত কাজের জন্য আন্দোলন করা, সেটা না করে সবই মেনে নিয়ে বসে আছি আমরা !

সুমন :  কয়েকটি হিন্দু সংগঠন সহ বিভিন্ন সংগঠন যে বর্তমানে আপনার সম্মান ফেরত দেয়ার দাবি করছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বর্তমান সরকারের কাছে ?

শিবনারায়র দাশ : শত্রু সম্পত্তি থেকে শেখ মুজিব সরকার করলেন অর্পিত সম্পত্তি, সংসদে সেটা এনে বর্তমান সরকার টালবাহানা করছে । এগুলো নিয়ে সংসদে কথা হয় ক্ষমতা ছাড়ার শেষ মুহুর্তে । এসব কথা সব সময় লঘু সম্প্রদায়ের নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত (হিন্দুদের নেতা) সরকারের মুখপাত্র হিসেবে ভুমিকা রাখেন। আজ বলেন, যাদের ঘর-বাড়ী আজকে নাই, তারা কি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে না? এই দেশে যেখানে ৩১শতাংশ জনগুষ্ঠির বসবাস ছিলো, সেই জনগুষ্ঠি আজ ৯ থেকে ৭ শতাংশে নেমে আসেছেতার মানেটা কি? এইদেশ অসাম্প্রদায়িক, সুখি-সমৃদ্ধ, সব জনগুষ্ঠি মিলেমিশে বসবাস করছে তাই কি প্রমাণ হয়মুক্তিযুদ্ধ তো এই কথা বলেনা, আমাকে বলেন মুক্তিযুদ্ধটা কোন জায়গাতে আছে?

সুমন : মুক্তিযুদ্ধ করেও তবে কি লঘু জনগুষ্ঠি মুক্ত হয় নাই?

শিবনারায়ন দাশ : স্বাধীনতা যুদ্ধে সবচাইতে নির্যাতিত হয়েছে হিন্দু জনগুষ্ঠি । ধনে. মানে, জনে, অর্থে, বিত্তে সমস্ত অস্তিত্ব বিপন্ন করেছে এই মুক্তিযুদ্ধে । সেই বিপন্ন সম্প্রদায় কি পেয়েছে? দুটা শব্দ পেয়েছে,“অর্পিত সম্পত্তি”। আর কিছু পেয়েছে ?  এই যদি অবস্থা হয় তাহলে এখানে রাজনীতিটা কি হওয়া উচিতকোন জিনিসটা নিয়ে কাজ করা উচিত ? এরকম অবস্থা আসবে কেনো ? এরকম রাজনীতি করবে কেনো? এটাতো মুক্তিযদ্ধের চেতনা নয় ! এখন যখন আপনারা আমার পিছনের কার্যকলাপ (পতাকার স্রষ্টা) নিয়ে আলাপ করেন, জিজ্ঞেস করেন আমার খুব বিরক্ত লাগে । আমি খুব বিব্রত বোধ করি । অগুলো যা হবার তাতো  হয়েই গেছে, কিন্তু এখন যে অন্যায় মাথায় করে নিয়ে দিন কাটাচ্ছি, এবং মেনে নিচ্ছি নি:শর্তে আমি সেটা মেনে নিতে পারছিনা । এই জায়গা গুলোতে কেউ জোরাল ভাবে কথা বলেনা ! আপনারা বলেন…

সুমন : ধন্যবাদ দাদা আপনার আরোগ্য কামনা করছি,

শিবনারায়ণ দাশ ও ধন্যবাদ জানালেন আমাদের পাঠকদের, সাথে করে উনার বক্তব্যগুলো বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলন জোরাল করার আহ্বান করেন। স্বাক্ষাৎকার টি নেয়া সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৫ তারিখে ।