ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

ঘন ঘন পড়ালেখার পদ্ধতি পরিবর্তন করে দেশের শিক্ষার মান কতটা বিজ্ঞানসম্মত শিশু মনের জন্যে? স্থায়ী আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বিশ্বমানের  কবে হবে? এতসব প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে অভিভাবকদের মাথায়। মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে পরিচিত প্রবাদটিতে প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষককে বুঝানো হত। সেই শিক্ষকগণও হিমসিম খাচ্ছেন সৃজনশীল পাঠদানে।

সম্প্রতি হয়ে গেল প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীর (পিএসসি)  ইংরেজি পরীক্ষা। এই বিষয়ের প্রশ্নপত্রে ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে একটি প্রশ্নের নিন্দা চলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জুড়ে। সচেতন ব্যক্তি মাত্রই শংকিত যে এভাবে কোমলমতি শিশুমনে  ধর্মশিক্ষার বদলে ধর্মের বিভাজন শেখানো হচ্ছে। আর তাই প্রশ্নপত্রে শিশুদের মধ্যে ধর্মীয় বিভাজনকে স্পষ্ট করে এমন প্রশ্ন সংযোজনে প্রতিবাদে সরব হয়ে উঠেছে ফেইসবুক। ২০১৬ সালে পিএসসি পরীক্ষার প্রথম দিনে রোববার ইংরেজি বিষয়ের ওই পরীক্ষা হয়। প্রশ্নপত্রে সৈকত ইসলাম নামে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রের বাবা-মা, তাদের পেশা ও তাদের অবস্থান নিয়ে একটি অনুচ্ছেদ দেওয়া হয়। অনুচ্ছেদ থেকে মোট চারটি প্রশ্নের উত্তর করতে বলা হয়। প্রথম প্রশ্নের মধ্যে  দশটি প্রশ্ন ছিল, উত্তরপত্রে শুধু শূন্যস্থানের উত্তরটি লিখতে বলা হয়। এখানে প্রতিটি উত্তরের জন্য বরাদ্দ ছিল এক নম্বর ।  দশটি প্রশ্নের তৃতীয়টি ছিল সেই সমালোচিত প্রশ্ন: Saikat is a –

(a) Muslim
(b) Hindu
(c) Christian
(d) Buddhist

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে প্রকাশিত খবরের [প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় ‘সাম্প্রদায়িক’ প্রশ্ন নিয়ে সরব ফেইসবুক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ২২ নভেম্বর ২০১৬] সূত্র ধরে কয়েকজন ফেসবুকেে এ ধরনের প্রশ্নকে সাম্প্রদায়িক মানসিকতা বলেও মন্তব্য করেছেন। এসবই কী সৃজনশীল শিক্ষার ফলাফল? কেন প্রশ্ন আসে না- মানব কল্যাণে কোনটি  বেশি প্রয়োজন?
১. মানুষের সেবায় নিজেকে তৈরী করা।
২. অপরের বিপদে এগিয়ে যাওয়া
৩. মিথ্যে কথা না বলা
৪. মানব সেবার মানসিকতা।

অথবা ধর্ম নিয়েই যদি প্রশ্ন করতে হয় তবে, আমাদের দেশ স্বাধীনতায় কোন ধর্মের লোক মুক্তিযুদ্ধ করেছে? উত্তর – সকল ধর্মের বাঙলি। তাহলে বুঝতে পারতাম সৃজনশীল প্রশ্নে  শিশুর কোমল মনে বাঙালি সত্তা জাগ্রত হবে।

২০১৪ সালের কথা। আমার মেয়ের বয়স তখন ছয় বছর। সে স্ট্যান্ডার্ড ওয়ানে পড়ে। সিলেটের অতি সাধারণ একটি প্রাইভেট স্কুলে। হঠাৎ একদিন সকালে স্কুলে যাবার আগে আমাকে বলে, বাবা আমি হিন্দু না মুসলিম? উত্তর আমার জানা নেই!  কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলাম। তারপর বললাম, মা আমরা মানুষ, প্রত্যেক জাতির, বর্ণের মানুষেরই ধর্ম আছে। যার নাম হিন্দু অথবা মুসলিম অথবা বৌদ্ধ ইত্যাদি। মেয়ের সাথে স্কুলে হেঁটে যেতে যেতে, কথা আর এলোমেলো সব প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে ওর প্রশ্নের কারণটা জানতে পারি।  স্কুলে ওর সহপাঠিরা ওকে প্রশ্ন করে, তুমি হিন্দু না মুসলিম?

আমার মেয়ের কথা আমাকে অনেকটা ভাবিয়ে তোলে। আমি হিন্দু? মুসলিম? বৌদ্ধ? বা অন্য কোনো কিছু? আজ বাবা হয়ে বুঝতে পারছি পারিবারিক শিক্ষা কতটা জরুরি। সকালে ছোট শিশুদের স্কুলে পাঠানোর আগে মক্তবে পাঠানো হয়, আরবি শিক্ষার জন্যে। পারিবারিক ও সামাজিক ভাবে ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে শিশুমনে বিভাজন শুরু হলে ডিজিটাল যুগে চাঁদে যুদ্ধাপরাধীর ছবি তো দেখবেই। তাই পারিবারিক শিক্ষাই পারবে ধর্ম আর বিধর্ম নিয়ে সমাধান দিয়ে সুশিক্ষিত করতে। পারবে পরিবার, সমাজ, জাতি, দেশকে সুশিক্ষার আলো জ্বালানো শেখাতে। পুঁথিগত শিক্ষা আর সামাজিক শিক্ষার মানদণ্ডে আর কত জন পিতাকে এরকম অবুঝ মনের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে?

শিশুর জন্য বাবা-মার আদর আছে, ভালোবাসা আছে। কিন্তু আসলে আমাদের সমাজে সুশিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বড় ধরণের ঘাটতি রয়েছে। শিশু মনের বিকাশের ধারা, তার বড় হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া বোঝা উচিত। দেহের গঠনে বড় হওয়া নয়, মানসিক গঠনে বড় হওয়ার ব্যাপারে লক্ষ্য রাখা উচিত। মানসিক গঠনে প্রথমে পারিবারিক শিক্ষা এরপর সামাজিক শিক্ষা। আর জাতীয় ভাবে যদি নামের মাধ্যমে ধর্মের বিভাজন শেখানো হয়, তাহলে বুঝতে হবে, দেশের ভবিষ্যত তালেবানদের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি অনেকগুলো টিভি চ্যানেল রয়েছে। কিন্তু এর কোনটিতেই শিশুতোষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হয় না। বিদেশি কার্টুন দেখা ছাড়া, জড় পদার্থ হওয়া ছাড়া  শিশুরা আর কী শিখবে? বড় শহরগুলোতে শিশুদের খেলার জন্য মাঠ নেই। টিভিই তাদের কাছে বিনোদনের এক মাত্র মাধ্যম, কিন্তু টিভিতে যদি শিশুদের জন্য শিক্ষামূলক কোন অনুষ্ঠান না দেখানো হয় তবে শিশুরা টিভি দেখে কী শিখবে?

সুস্থ্য সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে যদি শিশুদের সুশিক্ষা দেওয়া যায়, তবে এসব শিশুরাই দেশের অমূল্য সম্পদে পরিণত হবে। আর যদি তা করা না যায়, তবে আমরা জাতিগতভাবে ধ্বংসের মুখে পড়ব। এখন বেশিরভাগ শিশু-কিশোররা একটা ভালো গল্পের বই পড়ার পরিবর্তে সারাদিন ইন্টারনেট, ফেসবুক আর কার্টুন নিয়ে মেতে থাকে। সারাদিন ফেসবুকে চ্যাটিং-মেসেজিং এর জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের। কারও কারও ফেসবুকিয় বন্ধুত্ব রূপ নিচ্ছে প্রেমের সম্পর্কে। ইন্টারনেটকে লেখাপড়ার কাজে ব্যবহার করা যায়, কিন্তু ছেলেমেয়েরা এর হাজার-হাজার সুফলকে বেছে না নিয়ে বেছে নিচ্ছে এর খারাপ দিকটাই।

আমরা একবিংশ শতাব্দির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে ধর্মের সঠিক চর্চা করে, অনুসন্ধান করে বিকশিত করি যে প্রত্যেক ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে, কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আগামি প্রজন্মকে সুন্দর আলোর দিক দেখাব।  আমরা বীর বাঙালি। আমরা আমাদের দেশকে যুদ্ধ করে স্বাধীন করেছি। ধর্ম, বর্ণ, জাতি, গোষ্ঠি নির্বিশেষে অস্ত্র ধরেছি স্বাধীনতার পক্ষে। সেই সখ্যতা রক্ষার জন্য এখনই সময় একতার মেল বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। সকল শিশুর সুশিক্ষা গ্রহণ করার পরিবেশ তৈরি করলে, তাহলেই সম্ভব হবে দেশকে এগিয়ে নিয়া যাওয়া।