ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

 

Sommilito-Pic-3নাটকের ইতিহাসে সিলেটের অবদান অত্যন্ত সম্প্রীতি ও হৃদ্যতার সাথেই স্মরণ করতে হয়। আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষিত বিচার ও যাচাই করতে গেলে সিলেটের নাট্যানুশীলন এবং নাট্যচর্চার এহেন ইতিহাসকে নিয়ে গর্ববোধ করতেই হয় । সিলেট রাজনৈতিক ভাবে ১৮৭৪ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর আওতা থেকে আসাম প্রদেশভুক্তির পর ১৯০৫ সালে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের অধীনে এসে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের অধীনস্থ হয় আংশিক এলাকা ছেড়ে। এহেন টানা-পোড়নেও সিলেট তার ঐতিহ্যকে যেমন ভুলে যায়নি তেমনি বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐশ্বর্যকে থেমে থাকতে দেয়নি ক্রমোন্নতির লক্ষ্য থেকে। লার্ডড়ের সঞ্জয়ের মহাভারত, ভবানন্দের হরিবংশ ইত্যাদি থেকে অনায়াসেই সিলেটের অবদান সম্পর্কিত তথ্যনির্ভরতা আমাদের আনন্দিত ও গর্বিত করে। তাছাড়াও ১৮৯৭ এবং ১৯১৮ সালের প্রবল ভূমিকম্পের জের সামলে নিয়েও জীবন ও চেতনাবোধ। ললিতকলার প্রতি এই ঐতিহ্যানুগ জীবনচেতনা থেকেই আমরা পাই আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনধারার প্রবাহকে।

সিলেটের নাট্যধারার পথিকৃৎ হিসেবে শ্রদ্ধার সাথেই স্মরণ করতে হয় কুমার গোপীকারমণও তাঁর অবদান নিয়ে এখানে আলোচনা করা থেকে নিবৃত্ত থাকছি। অবশ্য সমকালীন সময়ে নাট্যচর্চার সাথে প্রয়োজনীয় নাট্যানুশীলনে কলকাতাকেন্দ্রিক নাট্য আন্দোলনের সাথে কুমার বাহাদুরের তৎকালীন ভূমিকা ও অবদান বাস্তবিকই তাঁর দূরদর্শিতার সাক্ষরই বহন করে। সিলেটের মতো জায়গায় সেই সময়ে সস্ত্রীক নাট্যভিনয়, নাটকের ঘটনা, ধারা, গতি ও চরিত্র ইত্যাদির প্রেক্ষিতে মঞ্চ নির্মাণ ও সম্ভাব্য নির্দেশনা কুমার বাহাদুরের বিত্ততেই সম্ভব ছিল, তাঁর নাট্যনুরাগী বিশাল চিত্ত ও মানসিকতা এ ব্যাপারে সপ্রশংস ও সশ্রদ্ধ সাত্বিকতাসহ দৃষ্টি আকর্ষণ না করে পারে না। তিনি যে শুধু অভিনীত নাটকের ব্যাপারেই যত্নবান ছিলেন এমন নয়, বিভিন্ন নাট্যচর্চা ও নাটক মঞ্চায়নে সফলতায়ও তিনি ছিলেন সনিষ্ঠ ও উদার তার আর প্রমাণের অপেক্ষা করে না।

সমকালীন নাট্যধারায় অবশ্য কুমার বাহাদুরের প্রতিপক্ষ হিসেবে আমরা পাই আখালিয়ার কৈলাস দাসকে। কৈলাস দাস পিতার সঞ্চিত লক্ষাধিক টাকা কুমার বাহাদুরের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নাট্যচর্চায় ব্যয় করেও নানান কারণেই সফলতা লাভ করতে পারেননি। তবু তাঁর এহেন উদ্যো ও প্রয়াস নানা কারণেই সিলেটের নাটকের ক্রমবিকাশে উল্লেখ্য।

সিলেটের চাঁদনী ঘাটস্থ সারদা স্মৃতি ভবনের ক্ষীরোদ মেমোরিয়াল মঞ্চটির প্রসঙ্গও সম্ভবতঃ পুনরাবৃত্তিতে নিবন্ধটিকে দুষ্ট করবে বিবেচনায় আলোচনাটি সংক্ষিপ্ত করে মুধু এই টুকুই বলা সঙ্গত মনে হচ্ছে যে, ক্ষীরোদ দেবের নাটকের প্রতি আগ্রহই শুধু নয়, আমাদের নাট্যধারার উদ্যোগ উন্মেষের সাথে সাথে নাটককে সবার জন্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেবার ঐকান্তিকতাই তাঁকে তদানীন্তন নাটুকেদের হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছিলো। ক্ষীরোদ দেবই নাটককে বিশেষ করে সিলেটের নাটককে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি উপস্থাপিত করেছেন দরদের সাবলীতায়ও সচেতনতায়।

সাবেক সিলেটের নাটকের সাথে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে জড়িত যারা ছিলেন তাদের নাম জানার উপায় নেই। নাটকে নানান ভাবে অংশগ্রহণ যাঁরা করেছেন তাঁদের নাম হচ্ছেঃ বনমালী ঘোষ, ইরেশলাল সোম, বিশ্বেশ্বর রায়, প্রমথ পোদ্দার, বাদশা মিয়া, ব্যোমকেশ ঘোষ, ভানু রায়, আব্দুস সামাদ, খোকন পুরকায়স্থ, বাদল রায়, লোকনাথ পাল, যামিনী পাল, তরুণারায়, মুহম্মদ রমজান, বুলু মিয়া, রাধিকা গোস্বামী, কামরুজ্জামান, বীরেন্দ্র দাস, নুরুল হোসেন খান, আলী হায়দার খান, বীরেনদ্্র রায়, পরিমল বিকাশ দেব, লোকেশ আচার্য, ভুবন ঘোষ, সাজ্জাদুর রহমান,মাহমুদুর রহমান, হিমংশু ভটাচার্য, হিরন্ময় ভটাচার্য, নুরুজ্জামান চৌধরী, মুকুন্দ ভটাচার্য, নুরুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম, খাদেমুল ইসলাম, তুলসিলাল পান্ডে, বিলায়েত মিয়া, রণদা গুপ্ত, কালীপদ চৌধুরী, রওনক চৌধুরী, আজমল আলী চৌধুরী, রাকেন্দু লোভান, সমাদ্দার, নলীনি দাস, আব্দুল হক, আব্দুর রহিম, টিপু, বকুল, মজুমদার, কৌশিক ভট্টাচার্য, শরফ উদ্দিন, ফড়িংবাবু, অমিয় নন্দী, রণধীর সেন, মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী, ত্রিপুরেশ্বর রায়, ইনাম আহমদ, তরুণী দাস, প্রসন্নদাস, চটইবাবু, শিশু, দীপেন্দ্র দাস, প্রাণেশ দাস, নরেন্দ্র ভট্টাচার্য, নগেন্দ্র সোম, বিমলেন্দু দাস, অমলেন্দু দাস, বিনয় দাস বীরেন সোম হিমাংশু দাশগুপ্ত, বিমান দাস, ত্রিগুণা সেন, অসিত চৌধুরী, এনায়েত উল্লাহ খান, শিবু ভট্টাচার্য, খলিল উল্লা খান, হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য, সুনির্মল কুমার দেব, মীন প্রমুখ। সিলেটের প্রবীণ প্রাচীন নাট্যশিল্পীদের সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তালিকা সংগ্রহ করা সময় ও ব্যয় সাপেক্ষ বিধায় এ ব্যাপারে বিভিন্ন এলাকার শিল্পী বন্ধুদের সহযোগিতা বিনীতভাবেই অবধারিত।

আমাদের নাটকের ইতিহাসে আমরা জানতে পেরেছি যে, কুমার বাহাদুরই প্রথম তাঁর স্ত্রীর মাধ্যমে নারী ভূমিকায় নারীর অর্থাৎ মহিলা চরিত্রে মহিলা শিল্পীর অভিনয়ের ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। দীর্ঘদিন পর হলেও দ্বিতীয়বারের মতো মহিলাদের ভূমিকায় মহিলাদের নিয়ে নাটক করেছেন রণধীর সেন (১৯৮০ সালে মানণীয় বিচারপতি)। নাটকটি ছিল তারাশংকরের “দুই পুরুষ” এবং তাতে “মুখ ও মুখোশ” ছবির নায়িকা পূর্ণিমা সেনগুপ্তা ও অন্য দুজন মহিলা শিল্পী অংশ গ্রহণ করেছেন। নাটকটিতে সিলেটের কৃতিসন্তান নির্মলেন্দু চৌধুরীর কণ্ঠে গান পরিবেশিত হয়েছিল। তৃতীয়বারের মতো মহিলা ভূমিকায় মহিলা শিল্পী হিসেবে ছিলেন সিলেট জেলের সুপারিন্টেন্ডেন্ট সাহেবের মেয়ে ববি। তখন বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় মহিলা চরিত্রে যেসব পুরুষ অভিনয় করতেন তাঁদের মধ্যে দীপ্তেন্দ্র দাস, শিমু, চটইবাবু, তরুণ রায়, বাদল রায়, মোহাম্মদ রমজান, সিরাজুল ইসলাম, খাদেমুল ইসলাম, লোকেশ আচার্য, রীবেণ রায় প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।

শহর সিলেটে আগে প্রায়ই নাটক মঞ্চায়ন করা হতো লোকনাথ মেমোরিয়েল হল, মণিপুরী রাজবাড়ী, দাড়িয়াপাড়া, তাঁতীপাড়া, মঙ্গলচন্ডী বাড়ী, পসারীপট্টি, শেখঘাট, দেওযাত্রী কোর্ট, সিলেট জেল প্রভৃতি স্থানে। এছাড়াও বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন বিদ্যালয় প্রাঙ্গন, প্রশস্থ মাঠ, খেলার মাঠ ইত্যাদি স্থানেও নাটক মঞ্চস্থ হতো।

সিলেটের নাট্যশিল্পীদের অনেকেই বাংলাদেশের রেডিও, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে অভিনয় করে আসছেন। সংস্কৃতিক শিল্পীদের কথা না ধরলেও কমরুজ্জামান, ইনাম আহমেদ, খলিল উল্লাহ খান, শিবু ভট্টাচার্য, রবীন্দ্র দেবনাথ প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। কমরুজামান সাহেব বাংলাদেশের প্রথম ছায়াছবি “মুখ ও মুখোশ”-এ অভিনয় করে সিলেটের নাট্যানুরাগী সংস্কৃতিসেবীদের হৃদয় জয় করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন।  একই ছবিতে ইনাম আহমদ সাহেব ও সিলেট বাসীর সংস্কৃতি চেতনায় অফুরান অনুপ্রেরণা জুগিয়ে সৃষ্টি করেছেন অনেক ইতিহাস।

নাটক করে এবং নাটকের সাথে জড়িত থেকেও সিলেটের অনেক কৃতি ব্যক্তিত্ব আজ আমাদের শ্রদ্ধা অর্জন করে দেশ ও জাতির সেবায় রয়েছেন নিরলস ভাবে। জানি না আজ তাঁর তাঁদের অতীত জীবনের এই স্মৃতিগুলো ভেবে দেখেন কিনা। কিন্তু আমরা তাঁদের অবদান ভূমিকার গুরুত্ব ও তাৎপর্য নিয়ে গর্ব ও গৌরব বোধ করছি, করবো। এ প্রসঙ্গে প্রথমেই প্রাক্তন মেয়র কলকাতা, প্রাক্তন ভাইস চ্যান্সেলর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, ভারতের মাননীয় মন্ত্রী ড. ত্রিগুণা সেনের নাম অত্যন্ত সানন্দেই উচ্চারণ করছি। রায়বাহাদুর প্রমোদ দত্তের বহিপ্রাঙ্গনে তিনি “বিরিতি বাবা” নাটকে অভিনয় করেছেন। চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার জনাব আলী হায়দার খানও “টিপু সুলতান” নাটকে মসিয়েলালীর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। অসিত চৌধুরীর বাবা চাকুরী করতেন সিলেটে। অসিত চৌধুরী পড়াশুনা ও নাট্যচর্চা সিলেটই করেছেন। এই অসিত চৌধুরীর কলকাতাস্থ ছায়াবাণী লিমিটেডের পক্ষে তৈরী করেন রবীন্দ্রনাথের “কাবুলীওয়ালা” যুগান্তকারী চিত্রকর্ম।

সিলেটের নাট্যধারার এহেন ঐশ্বর্যময় ঐতিহ্য রয়েছে বলেই এই বিজ্ঞানভিত্তিক প্রযুক্তির উৎকর্ষের দিনেও সিলেটের নাট্যকর্মীরা দেশে-বিদেশে নিজেদের শিল্পীসত্বা বিকাশের সহায়ক উদ্যোগ নিতে দ্বিধা করছে না। সৃজন মনন ও গঠনশীল নাট্যচর্চার মাধ্যমে জীবনের প্রতিচ্ছবিটুকুর সিলেটের বিভিন্ন বয়স, মান ও গুণের নাট্যকর্মীরা একটি সুস্থ, সুন্দর জীবনাদর্শের প্রতিবাদী সুর ও স্বরে উচ্চারণ করছে। সিলেটের নাট্যকর্মীরা নিরুদ্বেগেই বলতে পারছেঃ সিলেটে মধ্যমানাস্থি। আজ তাই সচকিত হয়ে উচ্চারণ করতে হয়- “হে অতীত তুমি ভুবনে ভুবনে/কাজ করে যাও গোপনে গোপনে।”

 

তথ্যসূত্রঃ সুনির্মল কুমার দেব মীন এর লেখা বর্ণালী নাট্যদলের ম্যাগাজিন, প্রকাশ কাল ১৯৮০ সাল; এবং প্রাবন্ধিক ও রম্য লেখক নাট্যকার, অধ্যাপক সুনির্মল কুমার দেব মীন।