ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

কোন জাতিকে ধ্বংস করে দিতে চাইলে প্রথমেই ধ্বংস করে দিতে হবে তার মুখের ভাষাকে। এ কথাটির সত্যতা অনুদাবন করতে পেরেই ইংরেজরা এদেশে ইংরেজি ভাষা চালু করেছিল।ফলে ২’শ বছর এদেশবাসীকে শাসন-শোষনের মাধ্যমে বাঙালিদের মাতৃভাষার গুরুত্ব বুঝিয়ে দিয়ে গেছে। এর ফলে ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর যখন পাকিস্তানিরাও ইংরেজদের অনুসরণ করে বাঙালি জাতিকে ধ্বংসের লক্ষ্যে একমাত্র উর্দূকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষনা দেয় তখন বাঙালিরা তাদের ধ্রুততা ধরে ফেলে ও তীব্র প্রতিবাদ জানায়। তাদের এই প্রতিবাদের চূড়ান্ত রূপ ছিল ১৯৫২ সালের ২১-শে ফেব্রুয়ারি। এদিন বাঙালিরা রক্ত ঝরিয়েছে, অকাতরে দিয়েছে উৎসর্গ করে নিজের প্রাণ বিনিময়ে প্রতিষ্ঠা করেছে বাংলা ভাষার মর্যাদা। এই দিন বাংলার বীর ছাত্র-জনতার রক্তে লালে লাল হয়েছে ঢাকার পীচ ঢালা পথ।

একুশ বাঙালির জাতীয় জীবনের এক আপোষহীন সংগ্রাম ও ঐক্যের প্রতীক। একুশ আমাদের জাতীয় স্বাধীনতার রক্ত শপথ। একুশের হাত ধরেই বাঙালি জাতির জীবনে এসেছিল ৫৪-এর নির্বাচন, ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬-এর ছয় দফা, ৬৯-এর গন অভ্যুত্থান, ৭০-এর নির্বাচন এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের ৭১-এর মহান স্বাধীনতা। এসকল ঐতিহাসিক আন্দোলন সমূহের মূলে ছিল একুশের জাতীয়তাবাদী চেতনা। সুতরাং বলা যায় একুশের তাৎপর্য বা চেতনা কেবল ৫২-এর রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মধ্যেই সীমিত নয় বরং এর ফল সুদূরপ্রসারী। একুশে ফেব্রুয়ারির শহীদের রক্তের বীজেই জন্ম নিয়েছিল জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, আর তারই শেষ ফল হচ্ছে আমাদের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। ভাষা তথা জাতির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য বাঙালিরা যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল তা বিশ্ব ইতিহাসে চির অম্লান। শুধু ভাষার জন্য প্রাণ উৎসর্গের ইতিহাস আর কোন জাতির নেই।

দুঃখজনক হলেও একথা সত্য যে এত কষ্টে অর্জিত আমাদের মাতৃভাষা আজো সর্বস্তরে এ ভাষার ব্যবহার বা প্রচলন হয়নি। ইংরেজি না হলে সবকিছু অচল হয়ে পড়বে, এই অতি উৎসাহের কারণে আজো বাংলা ভাষা অবহেলিত। পরের ভাষা শিখতে গিয়ে করুণ অবস্থা হয়েছে আমাদের। ফলে না হয়েছে পরের ভাষা আয়ত্ত, না হয়েছে মাতৃভাষার উন্নতি। বিদেশি ভাষায় কৃতিমতা বেশি যার প্রাণের সাথে যোগ কম। তাছাড়া বিদেশি ভাষায় সকলের পক্ষে শিক্ষা লাভ সম্ভব নয়। যার কারণে জনসংখ্যার বিরাট অংশই অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকছে।
কাজেই শিক্ষার বাহন কি হবে এমন প্রশ্ন এখন অপ্রয়োজনীয়। মাতৃভাষা এখন রাষ্ট্রভাষা। মাতৃভাষার মাধ্যমেই জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে হবে। জগতের যে কোন উন্নতিশীল রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যাবে মাতৃভাষাই শিক্ষার মাধ্যম। কাজেই আমাদেরও জাতীয় শিক্ষা কার্যক্রম সহ সকল স্তরে মাতৃভাষার প্রচলন শুরু হউক। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার মাধ্যম হউক মাতৃভাষা বাংলা। আমারা জানি, বাংলা পৃথিবীর সপ্তম ভাষাভাষা, আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত। এর গঠনপ্রণালী সম্পূর্ণ বিজ্ঞানভিত্তিক। মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাসহ জীবনের সমস্ত কর্মকান্ড পরিচালনা যে সম্ভব তার বাস্তব প্রমাণ আধুনিক বিশ্বে চীন, জাপান, ফ্রান্স ইত্যাদি দেশ সমূহ। কাজেই আমাদেরও উচিত বিদেশি ভাষার প্রতি আনুগত্য ত্যাগ করে মাতৃভাষায় জ্ঞানচর্চা করা। মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষার ব্যবস্থা প্রচলিত হলে দেশের শিক্ষা সমস্যা কমে যাবে। এতে শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটবে। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন সার্থক করতে হলে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে জাতিকে বড় করতে হলে, মাতৃভাষার উন্নতি প্রয়োজন এবং মাতৃভাষার মাধ্যমেই শিক্ষা দান অপরিহার্য।
বাংলা মায়ের সন্তানেরা বিশ্ব বুকে নতুন শতকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার জন্য আজ দৃঢ়প্রত্যয়ী। আর সেজন্যেই আমাদেরকে বিদেশি ভাষার প্রতি আনুগত্য ত্যাগ করে জাতীয় শিক্ষা কার্যক্রমকার্যক্রমসহ সকল ক্ষেত্রে বাংলা ভাষাকে প্রচলন করতে হবে।