ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

বাংলাদেশ সৃষ্টির নেপথ্যে ঘটা প্রতিটি ঘটনায় পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরও ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য।এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধে নারীদের অংশগ্রহণ ও ত্যাগের ইতিহাস ছিল উজ্জ্বল। নারীরা নিজেদের সম্ভ্রমের বিনিময়ে ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য। স্বাধীনতার জন্য যে মূল্যবান জিনিসটি এদেশের নারীরা বিসর্জন দিয়েছেন তাহলো “সম্ভ্রম”। সম্ভ্রম বিসর্জন দেয়া এই সকল নারীদের রাষ্ট্রীয় ভাবে বীরঙ্গনা খেতাবে ভূষিত করা হয়েছে। তেমনি একজন বীরাঙ্গনা প্রভা রাণী মালাকার।

FB_IMG_1455974062730
সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার কমলগন্জ উপজেলার মুন্সিবাজারের ভিতরের এক গ্রাম মীর্জানগরে প্রভা রাণীর বসবাস। মুক্তিযোদ্ধের কয়েক মাস আগে প্রভা রাণীর বিয়ে হয় কামিনী রাম মালকারের সাথে। বিয়ের কয়েক মাস পরেই যোদ্ধ শুরু হয়। স্বামী কামিনী রাম মালকার দেশ ছেড়ে ভারত পালিয়ে গেলেও প্রভা রাণী মা ও মাটির টানে এখানেই তার বাবার বাড়ি বিক্রমকলসে থেকে যান। বাবার বাড়ি যাওয়ার দিন পনেরো পরেই প্রভা রাণীকে স্থানীয় রাজাকাররা জোর করে পাশের বাদল মাস্টার নামের এক রাজাকারের বাড়ি নিয়ে যায়। ওখানে পাকিস্তানিরা তার উপর পাশবিক নির্যাতন করে পরের দিন ছেড়ে দেয়। তিনি তখন বোনের বাড়ি জঙলহাটিতে চলে আসেন। ২০/২৫ দিন পর আবারোও তিনি রাজাকারদের নজরে পড়েন এবং তারা তাকে ধরে শমেশর নগর পাকিস্তানি আর্মি ক্যম্পে নিয়ে যায়। সেখানে রাতভর তার উপর চলে পাশবিক নির্যাতন। অজ্ঞান অবস্থায় তাকে ফেলে গেলে তিনি পর দিন আবারোও বোনের বাড়ি পালিয়ে আসেন।
এরপর যোদ্ধ শেষ হলে দেশ স্বাধীন হলে তার স্বামী দেশে ফিরে আসেন। সবকিছু শুনে তার স্বামী তাকে আবারোও গ্রহণ করেন। স্বাধীনতার এক বছর পর জন্ম হয় প্রভা রাণীর ছেলে কাজল মালকারের। তারপর আরেক মেয়ের জন্ম হয়।

কিন্তু প্রভা রাণীকে পাকিস্তানির বউ ও ছেলে কাজল মালকার কে সবাই যারজ, পাকিস্তানির ছেলে এসব বলে। এতে কাজল মালকার ক্ষেপে যান তখন তাকে মারধর করে বলে জানান প্রভা রাণী মালকার। কে বা কারা মারে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন স্বামীর ভাই, ভাইয়ের ছেলে ও গ্রামের মেম্বার-চেয়ারম্যানরা। কেন মারে জানতে চাইলে তিনি জানান তার স্বামীর মৃত্যুর পর স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তির লোভে তারা এমন করে। স্বামীর সম্পত্তিতে বেদখল করে তাদের সরিয়ে দেয় তার স্বামীর ভাই ও ভাইয়ের ছেলেরা। মেম্বার-চেয়ারম্যানকে হাত করে এমনটি করছে বলে তিনি জানান।
এনিয়ে মামলা করেছেন তার ছেলে। কোর্ট থেকে নোটিশ দিয়েছে কাজল মালকারকে তার পৈতৃক সম্পত্তির দলিল ফেরত দেয়ার। এর ফলে কিছু দলিল দিলেও তাতে কোন লাভ হয়নি। কারণ তারা ঐ সব সম্পত্তির ভোগ দখল করতে গেলে কাজল মালকারকে পাগল বলে মারধর করে ওরা। এভাবেই অসহনীয় কষ্টে দিন কাটছে প্রভা রাণীর।

সম্প্রতিকালে প্রভা রাণী মালকারকে বীরাঙ্গনাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হলেও তিনি পাননি কোন সরকারি অনুদান। এমনকি তেমন কোন মানবাধীকার সংস্থাও এগিয়ে আসেনি সাহায্যের জন্য। একবার কোন এক সংস্থা থেকে ১০ হাজার টাকা পেয়েছিলেন বলে তিনি জানান। আর কোন সাহায্য তিনি পাননি। ১০ টাকা দিয়ে বড় নাতনিকে বিয়ে দেন বলে প্রভা রাণী।

প্রভা রাণীর বর্তমান জীবন-যাপন খুবই মানবেতর।বৃষ্টি হলে ছনের ছাউনি বেয়ে গড়িয়ে পড়ে পানি। ভেড়ার ঘর যেন হালকা বাতাশেই হেলে পড়বে। তেমন কোন আয়ের উৎস না থাকায় মোট ১০ জনের সংসার যেন কষ্টের সাগরে নিমজ্জিত।

জাতির কাছে প্রভা রাণীর কিছু প্রশ্ন প্রভা রাণী কেন পাকিস্তানির বউ? প্রভা রাণীর ছেলে কেন বাবার পরিচয় দিতে পারে না? কেন তার ছেলেকে যারজ বলা হয়? কেন ছেলে তার পিতার সম্পত্তি ভোগ করতে পারছে না? কেন প্রভা রাণী আজো নির্যাতনের স্বীকার? সরকারের কি তার জন্য কিছুই করার নেই।

হ্যাঁ, আমাদেরও প্রশ্ন যে মানুষটি দেশের জন্য এত কিছু হারালো দেশের কি তাকে কিছু দেবার নেই? যদি কাজল মালকার জারজ হয় তবে আমি বলবো বাংলার প্রতিটি সন্তান জারজ। প্রভা রাণী যদি পাকিস্তানির বউ হয় তবে প্রতিটি বীরাঙ্গনা পাকিস্তানির বউ। বীরাঙ্গনার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেই কি বীরাঙ্গনাদের প্রতি আমাদের সকল দায়িত্ব শেষ? যদি তাই হয় তবে আমি বলবো এদের বীরাঙ্গনা হওয়ার জন্য আমরাই দায়ী। কেন সেদিন আমরা রক্ষা করতে পারলাম না আমাদের মা-বোনের সম্ভ্রভ। ওরা তো নিজের ইচ্ছায় নয় বরং আমাদের মুক্তির জন্য অনিচ্ছা সত্তেও দিতে হয়েছিল সম্ভ্রভ বিসর্জন। যে দেশটাকে স্বাধীন করার জন্য আমাদের মা-বোন তাদের মূল্যবান সম্পদটি বিসর্জন দিয়েছেন সেই স্বাধীন দেশের সরকার হয়ে, সেই স্বাধীন দেশের নাগরিকের কি কোন দায়িত্ব নেই তাদের জন্য কিছু করার।

সবশেষে একটিই প্রত্যাশা যে, জাতিকে কলংক মুক্ত করতে বীরঙ্গনাদের দেয়া হবে প্রাপ্য মর্যাদা এবং তাদের সাহায্যের হাতটি বাড়িয়ে দেয়া হবে স্বতঃস্বফুর্ত ভাবে।