ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

এ পৃথিবীতে আমার পরিচয় কি? আজকের পৃথিবীতে একজন মানুষের সত্যিকারের পরিচয় কি হতে পারে? এই পরিচয় সংঙ্কট আর অস্বীকৃতি পৃথিবীটাকে বারবার করেছে রক্তাত্ব। সভ্যতাকে করেছে প্রশ্নবিদ্ধ। হিটলার রক্তের বিশুদ্ধতার প্রশ্ন তুলে গ্যাসচ্যাম্বার বসিয়েছিলেন মানবতার বুকের হৃদপিন্ডের উপর। বাঙালি মুসলমান বাঙালি হিন্দুর চেয়ে নিজেকে পৃথক মনে করেছিল ১৯৪৭ সালে। পাকিস্তান সৃষ্টির পর পশ্চিম পাকিস্তানিরা বলল, বাঙালি মুসলমান `সাচ্চা মুসলমান’ নেহি হ্যায়। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান চাকমা-মারমা সকল পাহাড়িকে বাঙালি হয়ে যেতে বলল। জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করে তার এক বুটের লাফিতে বাঙালিত্ব হটিয়ে বাংলাদেশী করে ফেললেন। পৃথিবীর ইতিহাসে কালো মানুষদের কথা অনেকটা বড় পিরসর করে লেখা থাকবে আগামী দিনের ঐতিহাসিকের খাতায়। আফ্রিকার কালো মানুষের মানুষ পরিচয়টা অস্বীকার করে বেনিয়া গোষ্ঠি কয়েক শতাব্ধি ধরে হাটে-বাজারে মানুষ বেচাকেনা করে গেলো বিশ্ব মানবতার নিলিপ্ত দুচোখের সামনে। মানুষ তার গায়ের রঙে, বর্ণে, ধর্মে, ভাষায়,নিজেকে পৃথক করেছে, করেছে নিজের জন্য নির্দিষ্ট একটি পরিচয়। কখনো তা ভ্রান্ত, কখনো তা আংশিক সত্য, কখনো বা নিজেকেই অস্বীকার করে বসে আছে। এই আত্ম প্রতারণ তাই মানুষকে কখনো কখনো নিজের মনের কাছে একান্ত ভাবনায় নিজেকেই প্রশ্ন করেছে, কে তুমি? কিন্তু আয়নার সমনের প্রতিবিম্ব আপনাকে একই প্রশ্নই শুধু করে যাবে। হয়তো এক সময় ভ্যাংচানো মনে হবে আপনার ছায়াকে। উত্তর তাই আমাদেরকেই খুঁজে বের করতে হবে। আজকের দুনিয়ায় যা আরো বেশী করে প্রাসঙ্গিক। যখন জাতিতে জাতি, ধর্মে ধর্মে, ভাষায় ভাষায় আমরা আরো বেশী পৃথক হয়ে গিয়ে কলহ শুরু করে দিয়েছি। প্রথমত আমি জন্ম নিলাম আমার মায়ের গর্ভ হতে। আমার মা যিনি মানুষ্য জাতির দুটি শ্রেণীর (পুরুষ/ নারী) একটি। আমি জন্মালাম আসলে দুটি বংশের মাঝখানে। বাবা মার ২৩ টি করে বৈশিষ্ঠ ভাগ করে নিয়ে। (আমার বিঞ্জানের বন্ধুরা ভুল হলে সুধরিয়ে দিবেন।) আমি একই সঙ্গে পৃথিবী একটি নির্দিষ্ট ভূখন্ডে জন্মালাম। এবং অনেক চড়াইউৎড়াই পার করে আসা একটি সমাজবদ্ধ একই সংস্কৃতি দ্বারা লালিত গোষ্ঠি বা জাতির সন্তান বটে। আমি একই সঙ্গে একটি রাজনৈতিক ভূখন্ডে কাঁটাতারের বেড়া দ্বারা চিিহৃত সীমানার মধ্যে জন্ম নিলাম। এটি খুব আশ্চর্যের যে, আমার দাদু এক জীবনে তিনটি রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিচিত হয়েছেন। প্রথম জীবনে তিনি বৃটিশ শাসিত পরাধিন ভারতের একজন ভারতীয়। মধ্যখানে হলেন পাকিস্তানী। জীবনের শেষ ক’বছর বাংলাদেশী হয়ে কবরে গেলেন। অন্যদিকে আমার বাবা প্রথম জীবনে ছিলেন পাকিস্তানী এখন বাংলাদেশী। আর আমি জন্ম থেকে বাংলাদেশী। কিন্তু আমরা তিনজনই বাঙালি ছিলাম সব রাজনৈতিক পরিচয়ের সময়ই। যেমন ভবিষ্যতে আমার ছেলেমেয়েরা পৃথিবীর অন্য কোন রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিচিত হলেো তারা তাদের মুখে নিয়ে ঘুরবে বাঙালি বাবা মার িচহৃ বৈশিষ্ঠ। যা মুছে ফেলা প্রায় অসম্ভব। মানুষের পরিচয় তাহলে কি হবে? আমি কি মুসলিম? হিন্দু? ক্রিশ্চান? একজন আরবীয় মুসলিমের সঙ্গে আমার কোথায় মিল এক ধর্মীয় বিশ্বাস ছাড়া? তেমনি একজন বাঙালি হিন্দুর সঙ্গে আমার ততটাই মিল শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস ছাড়া। তাহলে, আমি কি শুধুই বাঙালি?

না। প্রকৃতি আমাদের আলাদা করেছে তার জলবায়ু দিয়ে, তার ভূপ্রকৃতির ভিন্নতা দিয়ে। বেসিক্যালি পৃথিবীর সমস্ত মানুষ অন্তর জগত এক। আমাদের দুঃখ কান্না হাসি একই উৎস থেকে। সাহিত্য তার সবচাইতে বড় প্রমাণ। কেন বিশ্ববাসী শ্রেক্্যপিয়ার পাঠ করে? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বকবি কিসের তরে? তাঁর গীতাঞ্জলি পড়ে কেন পাশ্চত্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধের খতে সান্ত্বনা পেয়েছিল? কেন কাফকাকে মেনে নিল বিশ্বসাহিত্য? আজকের অরহান পামুক তার বিখ্যাত `ইস্তাম্বুল’ গ্রন্থে তূর্কি, কৃর্দি, আরমেনিয়া, গ্রীসবাসীর মিলিত যে ইস্তাম্বুল দেখিয়েছেন তার শৈশবে তা জাতীয়তাবাদীর উগ্র উত্থানে ছাড়খার। পৃথিবীর সব মানুষ আসলে এক রকম। কেউ ঘৃণার পাত্র হতে পারে না। মানুষ আসলে শুধুই মানুষ। তাকে অন্য কোন পরিচয়ে বাধতে গেলে বিকৃতি এসে যায়। ছোট্র করে তাকে বাধতে গেলে সে দানব হয়ে উঠে। মানুষ তাই মানুষ হয়ে উঠুক। প্রতিটি শিশু হোক বিশ্ব নাগরীক। সত্যিকারের গ্রামে পরিণিত হোক বিশ্ব। হাতের তালুর মত ছোট্র। বাধাহীন মানুষের অবাধ বিচড়ণ। আগামী দিনের পৃথিথীর মানুষের পাসপোর্টে (যদি ততদিনে তার কোন প্রয়োজন থাকে। মানুষ একদিন দেয়াল খাঙ্গবে। কাঁটাতার সব উপরে ফলবে।) শুধু এই পরিচয় লেখা থাকুক- মেইল অথবা ফিমেল। স্রেফ ফরমালিটি অর্থে।