ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

`হিন্দু রাষ্ট্র’ `খ্রিস্টান রাষ্ট্র’ বা `ইসলামী রাষ্ট্র’ বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব বর্তমান বিশ্বে সত্যি আছে কি? অতিতের কথা বাদ দিলাম, ভবিষ্যতেও হবে কি?

সাধারনত একটি রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগনের যে ধর্ম তার নাম অনুসারে রাষ্ট্রটির পরিচয় দেয়া আমাদের স্বভাব। আদৌ সে ধর্ম দ্বারা দেশটি পরিচালিত না হলেও। যেমন ইউরোপের সমস্ত রাষ্ট্রই আমাদের কাছে `খ্রিস্টান রাষ্ট্র’। অথচ ইউরোপের প্রায় কোন রাষ্ট্রই খ্রিস্টিয় আইন-কানুনে পারিচালিত হয় না। তাহলে সে দেশগুলি কেমন করে খ্রিস্টান রাষ্ট্র হয়? এবার আসা যাক মধ্যপ্রাচ্যের দিকে। মধ্যপ্রাচ্যে হয় রাজতন্ত্র নতুবা একনায়কতন্ত্র শাসনে বরাবর শাসিত হয়ে আসছে। তবু তাদেরকে বলতে হবে ইসলামী রাষ্ট্র? তেমনি ভারতীয় উপমহাদেশে ভারতে সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ব্যবস্থা হলেও তাকে `হিন্দু রাষ্ট্র’ বলে অভিহত করা হয়। প্রকৃত পক্ষে ভারত বিশ্বের অন্যতম সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের বাস। এছাড়া নানা জাতি-বর্ণ-ধর্মের দেশ ভারত। যার ভূখন্ডে চারশোটির মত ভাষা প্রচলিত আছে। সে হিসেবে ভারত বিশ্বের কসমোপলিটানের এক আর্দশ উদাহরণ। মূলত নেপাল একশো ভাগ হিন্দুর বসবাসকারী দেশ। কিন্তো তবু নেপালকে কিছুতে হিন্দু রাষ্ট্র বলা যাবে না। কয়েক হাজার বছর আগের শাস্ত্রীয় বিধি-বিধান দিয়ে তো আর নেপাল পরিচালিত হয় না। নেপালে ধর্মনিরপেক্ষ আইন-কানুন দ্বারাই পরিচালিত হয়ে থাকে। তবু কিছু মানুষ নেপালকে হিন্দু রাষ্ট্র বলবেই!

কিন্তু ধর্ম ভিত্তিক রাষ্ট্র সত্যি কি গঠন করা সম্ভব? উত্তর হচ্ছে- না! কেননা এটি অবাস্তব নিছক কল্পনা। অলীক বস্তু মাত্র। ধর্ম ভিত্তিক রাষ্ট্র ( যে কোন ধর্ম রাষ্ট্রের কথা বলা হচ্ছে-দয়া করে শুধু ইমলামী রাষ্ট্রের কথা বলা হচ্ছে এটা ভেবে নেবেন না।) সম্ভব কেন নয় তার প্রধান কারণ হচ্ছে, মানুষ নানা ভাষায়, জাতিতে, ধর্মে ও নানা সংস্কৃতিতে বিভক্ত হয়ে আছে। এটি একটি বাস্তবতা। পৃথিবীতে তাই বহুবার তথাকথিত ধর্ম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে যা অল্প কিছুদিনেই ভেঙ্গে গেছে। আরব দেশের কথাই ধরা যাক। তারা আজ নানা জাতি রাষ্ট্রে বিভক্ত। অথচ তারা সবাই ধর্মে মুসলিম। তবু কেন বৃহত ইসলামী আরব রাষ্ট্র গঠন সম্ভব হলো না? সম্ভব হয়নি কারণ আরবরা ধর্মে সবাই এক হলেও নানা বংশ ও গোত্রে ভাগ হয়ে আছে। আছে মুসলিমদের মধ্যে ধর্মিয় বিভেদ। শিয়া-সুন্নিসহ আরো অনেক বিভাজন। ইসলামের প্রোফেট এই বিভক্ত আরব জাতিকে একভুক্ত করতে পেরেছিলেন কিন্তু তিনি ইন্তিকালের পর পর আবার সব মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। ইসলামের ইতিহাসে আমরা দেখতে পাই চার খলিফার তিনজনই অস্বাভাবিক মৃত্যুর সম্মুখিন হন মূলত এই সমস্ত গোত্র ও গোষ্ঠির স্বার্থের রেষারেষিতে।

তারপরও ধরা যাক, পৃথিবীতে সমস্ত খ্রিস্টানরা মিলে একটি বৃহত খ্রিস্টান রাষ্ট্র গঠন করলো। তখন আমরা আসলে কি দেখতে পাবো? প্রথমে দেখবো মহাদেশীয় কোন্দল। জাতি কোন্দল। চলে আসবে ইউরোপীয় এশিয়া আর আফ্রিকা বিতর্ক। আসবে সাদা কালো নানা বর্ণ আর ভাষার প্রশ্ন। অথচ তারা সবাই খ্রিস্টান! তবু তথাকথিত খ্রিস্টান রাষ্ট্রটি কি টিকবে? আমাদের হাতের খুব কাছের যে ইতিহাসটি রয়েছে সেটি এই ভারতীয় উপমহাদেশের। ইতিহাসের সেই উপহাসের সঙ্গে মূলত আমরা জড়িত। পাকিস্তান সৃষ্টি মূলত আমরাই করে ছিলাম। মুসলমানের জন্য আলাদা রাষ্ট্র। যেখানে মুসলমানের কিছুতে অন্য কেউ ভাগ বসাতে আসবে না। কিন্তু দেখা গেলো পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি শুধুমাত্র পাঞ্জাবীদের স্বার্থই দেখতে রাজি, অন্য কারুর নয়। বাঙালিরা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু তবু তারা সমস্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত। সমস্ত ক্ষমতা পাঞ্জাবীদের হাতে। বাঙালি ফসল ফলায় আর পকেট ভরে পাঞ্জাবী-পাঠান অর্থ্যাৎ পশ্চিম পাকিস্তানীরা। দেখুন, এখন আর মুসলিম শব্দটি আসছে না। তার বদলে বাঙালি, পাঞ্জাবী, পাঠান ইত্যাদি নানা জাতির নাম। এরা সবাই মুসলিশ। এদের সবার ধর্ম ইসলাম। তবু আজ কত ব্যবধান! বাঙালি মুসলমানের অন্তরে জাগলো বাঙালি জাতীয়তাবাদ। বুঝতে পারলো এটাই মুক্তির পথ। কী আশ্চর্য, এরাই একিদন ধর্মরাষ্ট্র গঠন করেছিল! ইতিহাস এখন এইভাবে শোধ নিবে? সত্যিই তাই হলো। বর্বর পাকিস্কতানী বাহিনী হিটলারের ন্যাৎসি বাহিনীকে হার মানিয়ে দিল বাঙালি নিধনে। স্বাধের পাকিস্তান ভেঙ্গে গেলো। শক্রর মুখে ছাই দিয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নিল এক স্বাধীন, গণতান্ধত্রিক র্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের। আরো একবার প্রমাণ হলো ধর্ম ভিত্তিক রাষ্ট্রের ধারণা অবাস্তব কল্পনা মাত্র। মাত্র তেইশ বছরে পাকিস্তান ভেঙ্গে খান খান হয়ে গেলো। পাকিস্তান মিথ্যা প্রমাণ হলো।

এটা ঠিক পৃথিবীর ইতিহাসে কোথাও এই ধর্ম ভিত্তিক রাষ্ট্র ধারণা টেকেনি। এটা মূলত রাজনৈতিক মূলো। যা কখনো ব্যক্তির স্বার্থ হাসিলের উদ্দশ্যে জাতির মুখের সামনে ঝুলিয়ে দেয়া হয়। বাঙালি একবার সে মূলো দেখে নেচে বুঝেছে কত বড় মিথ্যার ফাঁদ।

সুবিধাবাদী রাজনীতি, ধর্মের লেবাসধারী ক্ষমতাকে দখল করার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করে বাজি মাত করেত চায়। আমাদের মত পশ্টাতপদ সমাজে এইসব অনেক সময় খুব কাজ দেয়। মূলত ধর্ম সম্বন্ধে জনগণ অতটা সচেতন নয় বলে। বাংলাদেশে বর্তমানে একদল উগ্রপন্থির আগমন ঘটেছে যা কিছুটা দুশ্চিন্তার বৈকি। দুশ্চিন্তার এজন্য যে মূলত শিক্ষিত তরুণ সমাজকে এরা টার্গেট করে মাঠে নেমেছে। হিজবুর তাহরীর্‌সহ আরো নানা নামের নিষিদ্ধ গোষ্ঠি নানাভাবে প্রচারণা চালিয়ে যুবক-তরুণকে ব্রেণ-ওয়াশ করে মাঠে নামাচ্ছে। যারা এই সব প্রচারণার শিকার এরিমধ্যে হয়েছেন বা ভবিষ্যতে হবেন, তাদের শুধুমাত্র ইতিহাস ও বাস্তবতাকে পরখ করে দেখতে বলবো। কেন অন্যের ক্ষমতায় যাবার রাস্তায় প্রতারণার শিকার হবেন? যতদিন পর্যন্ত গণতন্ত্রের চেয়ে ভালো অন্য কোন পন্থা আসছে না ততদিন পর্যন্ত গণতন্ত্রই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ পন্থা।