ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

নামে কী-ই বা আসে যায়! গোলাপকে যে নামেই ডাকা হোক সে সৌরভ ছড়াবেই। তবু মানুষ তার সন্তান বা অতি নিকটজনের জন্য একটি সুন্দর ও অর্থবহ নামই রাখার চেষ্টা করেন। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে অবশ্য ধর্মীয় প্রভাব এখানে কাজ করে থাকে। ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, ধর্মগ্রন্থের কোন বিশেষিত শব্দকে এক্ষেত্রে প্রাধান্য দেয়া হয়ে থাকে। এটা প্রায় সব ধর্মের মানুষদের মধ্যে কম-বেশী দেখা যায়। কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখবো যে, অন্যান্য মহাদেশে যেমন ইউরোপে খ্রিস্টানদের নাম পুরোপুরি ইউরোপীয় শব্দেই রাখা হয় সাধারণত। যে কারণে কোন ইউরোপীয়ান- সে খ্রিস্টান হোক বা ইঁদুদি- কখনো আরবী নাম শোনা যায় না। আর ধর্মীয় যে সব নাম রাখা হয় তাও ইউরোপীয়ান উচ্চারণেই রাখা হয়। যেমন দাউদ হয়ে যায় ডেভিড। খুব মজা লাগে ভারতীয় উপমহাদেশের একজন খ্রিস্টানের নাম বেশীরভাগ ক্ষেত্রে কোন ইউরোপীয়ান নামই রাখা হয়ে থাকে। যিশু সিরিয়ার অধিবাসী ছিলেন বলে আমরা জানি। তিনি ইউরোপীয়ান ছিলেন না। তিনি একজন আরব। খ্রিস্টান ধর্মের উদ্ভব আরবদেশে। এর ব্যাপক প্রসার ঘটে ইইরোপে। ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজ শাসনকালিন খ্রিস্ট ধর্মে দিক্ষিত জনসাধারণ (অজানা কোন কারণে) নিজেকে সাহেব জাত বলে বিশ্বাস করতে থাকে। এটা পার্দিদের নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতির উপনিবেশ চিন্তা থেকেও হতে পারে। মূলত এজন্যই খ্রিস্টান ধর্ম বলতে আমরা অবচেতনে ইউরোপের একটা ধর্ম বলেই বিশ্বাস করতে থাকি। যে জন্য ইউরোপীয়ান সংস্কৃতি, পোশাক, খাদ্যকে না বুঝে আমরা খ্রিস্টান কালচার বলে ভুল করে বসি। যিশু কোনদিন কেক খাননি বা কোট টাইও পরেননি। তবু কারুর কারুর কাছে এগুলি খ্রিস্টানী কালচার!

ভারতীয় উপমহাদেশসহ পৃথিবীর সব জায়গায় মুসলমানদের নাম আরবীতে রাখাও একটা ধর্মীয় বিধানের মত যেন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক্ষেত্রেও ভারতীয় উপমহাদেশের খ্রিস্টানদের মত কারণই ঘটেছে বলে মনে হয়। যদিও ইসলামে বিশ্বাস স্থাপনের সঙ্গে নাম পরিবর্তনের কোন সম্পর্ক নেই। সেরকম কোন নির্দেশও দেয়া নেই। যদি থাকতো তবে ওমর, আবু বকর, উসমান, আলীসহ ইসলামের প্রথম সারির ব্যক্তিত্বদের নাম পরিবর্তন করতে হতো। উল্লেখিত চার খলিফা তাদের প্রাক-ইসলাম যুগেও এই নামেই পরিচিত ছিলেন। অর্থ্যাৎ,ইসলাম গ্রহণ করে তারা তাঁদের ধর্ম পরিবর্তন করেছেন কিন্তু নাম নয়। কারণ একজন আরবের আরবী নামই তো থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক। নাম পরিবর্তনের প্রশ্নটা আসবে কি করে? সমস্ত আরব ভূখন্ডে সমস্ত অধিবাসীর নাম আরবীতেই রাখা হয় এখনও। তাই একজন আরব মুসলিম ও একজন আরব খ্রিস্টানের নাম শুনে আপনি বলতে পারবেন না সে কোন ধর্মের অনুসারী। উদাহরণ দেই। এক্ষেত্রে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের উদাহরণ দিলে মনে হয় বুঝতে সহজ হবে। যেমন, `তারেক আজিজ’। ইনি ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের একজন বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ সহচর। কিন্তু ইনি ছিলেন ধর্মে একজন আরব খ্রিস্টান। বাংলাদেশে বহু মানুষের নাম তারেক আজিজ আছে এই বিশ্বাসে যে এটি একটি ইসলামী নাম!

এবার তাহলে দেখি ইসলামী নাম বলতে আসলেই কিছু আছে কিনা। উত্তর হচ্ছে- না। ইসলামী নাম, পোশাক, খাদ্য (হারাম হালাল বিশ্বাস বাদে), ব্যাংক-বীমা, সংম্কৃতি বলে সত্যি কিছু নেই। থাকলে তো আরবীই হতো একমাত্র ইসলামী ভাষা। তখন সব মুসলমানের বাধ্যতামূলক আরবী ভাষায় কথা বলতে হতো। যা কখনই সম্ভব নয়। যেমন খাদ্যাভাস, পোশাক এগুলো নির্দিষ্ট ভূখন্ডের স্থানীয় জলবায়ু, উপযোগীতার উপর নির্ভর করে। তাই কোন ধর্ম বলে না ঐ পোশাকটা একান্তই পরতে হবে।

যে কারণে প্রশ্ন হচ্ছে, মুসলমান মাত্রই আরবী নাম যৌক্তিক কতটুকু? এখানে আরবী নাম রাখাটা খারাপ সেটা বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। যদি একজন চাইনিজের নাম শুনেই বলে দেয়া যায় সে চাইনিজ, হোক সে বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান, তাহলে কেন একজন বাঙ্গালি মুসলিম কি ইউরোপীয়ান মুসলিম আরবী নাম ধারণ করে এ্যারাবিয়ান সাজবে? যেহেতু ইসলামে এরকম কোন নির্দেশ নেই, নেই খ্রিস্টান ধর্মে, নেই কোন ধর্মেই। একজন বাঙ্গালি মুসলমানের নাম তাই বাংলাতেই হওয়া উচিত। তাতে ইসলামের কোন নিষেধ নেই। ইসলাম বলেছে ভালো নাম রাখতে। বলেছে, ভালো একটা নামের দোহাইতেও কেউ কেউ বেহেস্তে চলে যাবে। তাহলে `শিউলি’ নামটি তো মন্দ নয়? এটি একটি বাংলা ফুলের নাম। হিন্দু-মুসলিম উভয়েই এই নামটি রেখে থাকে। একটা ফুলের নাম কি খারাপ হতে পারে?

আশার কথা, অধুনা বাঙ্গালি ছেলেমেয়েদের নাম বাংলাতে রাখা শুরু হয়েছে। যেমন, কল্লোল, সৌরভ, অর্পনা, অর্ক ইত্যাদি বাংলা নাম ছোট ছোট ফুটফুটে শিশুদের সঙ্গে যায়ও বেশ। কিন্তু এক শ্রেণীর নিকৃষ্ট ধর্মান্ধ না জেনে, না বুঝে তথাকথিত হিন্দু নাম বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। একটি মুসলমান বালকের নাম সূর্য রাখলে কি করে হিন্দু হয়ে যায়? যদি একজন মুসলমান বালকের নাম খুরশেদ রাখা যায়- যার অর্থ সূর্য! কোন ধর্মীয় নেতা বা ধর্মরক্ষক (!) কি প্রমাণ করতে পারবেন শুধু মাত্র বাংলা নাম হওয়াতেই নামটা হিন্দু হয়ে গেছে কেন?
আমরা বলি, খুরশেদও থাক, সূর্যও থাক। যার যেমন ইচ্ছে। শুধু মিথ্যা ধর্মের দোহাই না দিলেই হয়।