ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

সৌভাগ্যের বরপূত্র তিনি। শুধু তার মরমান্তিক মৃত্যুটিকে বাদ দিলে ইতিহাস তাকে দুহাত মেলে দিয়েছেন সৌভাগ্য। ইতিহাসে তিনি এমন একজন, যিনি গাছতলায় শুয়ে আছেন অজ্ঞাতকূলশীল পথচারি- হাতি এসে গলায় মালা জড়ালো- তিনি ঘুম ভেঙ্গে দেখেন তিনি রাজা! এমন কি জনগণের একটা বড় অংশ তাকে আজো অসময়ের তাত্রা ও নিষ্কুলুষ চরিত্র বলে জানে। ইতিহাস এইখানেও তাকে তার সমসাময়িকদের থেকে অন্যায়ভাবে বেশী দিয়েছেন। বস্তুত তিনি ছিলেন একজন প্রথম শ্রেণীর সুযোগ সন্ধানী। চরম নিষ্ঠুর ও অবিবেচক। গণতন্ত্রকে যিনি উপহাস করতেন কিন্তু গণতান্ত্রীক বলে যার নাম জুটেছিল। যিনি রাজনীতিকে রাজনীতিবিদদের কাছে কঠিন করে তুলবেন বলে ঘোষনা দিয়ে মূলত রাজনীতিকে তার ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছায় এনে ফেলেছিলেন। হ্যাঁ, তিনি জিয়াউর রহমান।

তিনি আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার। বীরউত্তম। `জেড ফোর্সের’ প্রধান। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ রেিডওতে স্বাধীনতার ঘোষণা (পাঠ) করে তিনি ইতিহাসে প্রথম অন্তর্ভূক্ত হলেন। তারপর এর ঠিক সাত বছর পর কিছু সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এবং ভাগ্যের সহয়তায় অজ্ঞাত এক মেজর থেকে লেঃ জেনারেল এবং বাংলাদেশের সপ্তম প্রেসিডেন্ট হন মাত্র ৪৩ বছর বয়েসে।

জিয়া ছিলেন অতান্ত সুযোগ সন্ধানী ও চতুর প্রকৃতির। অন্যের তৈরি করা সুযোগকে কি করে নিজের পথ তৈরিতে কাজে লাগানো যায় এটা তিনি ভালো মতন জানতেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ফারুক যখন তাকে জানালেন `মুজিব উৎখাত’ করতে সে যাচ্ছে তখন ফারুককে তিনি থামাননি। কিন্দুমাত্র চেষ্টা করেননি এই নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞকে থামানোর। কিন্তু সেই নির্মম হত্যাকান্ডের সুবিধা গ্রহণে তিনি পিছ পা হননি। ঠিকই চীফ অব আর্মী স্টাফের পদটি বাগিয়ে নিয়েছেন নিজের জন্য। আবার খালেদ মোশাররফ ও শাফাত জামিল যখন ফারুক-রশিদ-ডালিমদের উৎখাত পরিকল্পনা গ্রহণ করে তখন তিনি নিরব ভূমিকা পালন করেন! সিপাহী বিপ্লবের পর তাকে চীফ অব আর্মী স্টাফের পদটি দেয়ার জন্য জওয়ানদের ধন্যবাদ জানান কিন্তু তাদেরই নেতা কর্ণেল আবু তাহেরকে ফাঁসিতে ঝুলান। জানা যায় জিয়া তার বিরুদ্ধে ষড়সন্ত্র ও ক্যু করার অভিযোগে অন্তত ১১৪৩ জনকে ফাঁসিতে ঝুলান যাদের বেশীর ভাগই ছিল নির্দোষ। পঙ্গু তাহেরকে তিনি ফাঁসি দিয়ে চরম নিষ্ঠুরতার নিদশর্ন স্থাপন করেন। তিনি প্রায় কাউকেই বিশ্বাস করতেন না। যে কারণে যে কাউকে সামান্য সন্দেহ হলে তিনি তাকে আজীবনের জন্য সরিয়ে দিতেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের তিনি বারবার ক্ষমা করে দেন তার বিরুদ্ধে বারবার ক্যু করার চেষ্টার প্রমাণ পেয়েও রহস্যজনক ভাবে।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পর বাংলাদেশ মূলত রক্তের হলি খেলায় পরিণত হয় মহান মুক্তিযুদ্ধের সূর্যসন্তানদের দ্বারা। যারা মাত্র চার-পাঁচ বছর আগে জনগণের কাছে বীরের মর্যাদা পেয়েছে তারাই শুরু করলো এমন এক খেলা যার নাম ক্ষমতার লড়াই। বঙ্গবন্ধুর শূন্যতায় দেশটি পরিণত হলো মগের মুল্লুকে। আর একে একে হারাতে হলো দেশের বীর সন্তানদের। যার শেষ পরিণতি হলেন জেনারেল জিয়াউপর রহমান। তার মৃত্যুটি ছিল ততধিক করুণ আর নৃশংস। ইতিহাস তার এই পূত্রটিকে যত দিয়েছেন শেষবার দিলেন তার চেয়ে অনেক বেশী নিষ্ঠুরতা। কারণ আমরা জানি না আদৌ জিয়া হত্যার বিচার আমরা দেখতে পাবো কিনা। এটা ইতিহাসের একটি নিষ্ঠুর রসিকতা!