ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন মুলত বিদ্যুত ও গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করার জন্য গণশুনানির আয়োজন করে। পেট্রোবাংলা থেকে প্রস্তাবনাসমূহ কমিশনে পাঠানো হয়। কমিশন প্রস্তাবগুলোর উপর গণশুনানি করার জন্য পত্র পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সাধারন জনগনকে অংশগ্রহনের জন্য আহবান জানায়। কিন্তু গণশুনানিতে কারা যায় তা বোধগম্য নয়। এই কমিশনের বাংলা রুপ হচ্ছে নিয়ন্ত্রণ কমিশন কিন্তু যেভাবে অনিয়ন্ত্রিত উপায়ে প্রত্যেক বছরই দুই চারবার বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করা হচ্ছে তাতে এ কমিশনের ভূমিকা কতোটা সঠিক তা প্রশ্নাতীত নয়। পেট্রোবাংলার প্রস্তাবের হ্যাঁ না ভোট নেয়াই কমিশনের কাজ। সরকারের অযাচিত মূল্যবৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে বৈধ্যতা দেওয়াই কমিশনের অন্যতম লক্ষ্য বলে বিবেচিত হচ্ছে। যাই হোক কমিশনের বদনাম করার জন্য এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। যা বলতে চাচ্ছি তা হলো সরকার শিল্পমালিকদের জন্য নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ব্যব¯হা করেছে। বিষয়টি শুনতে ভালোই লাগছে যেখানে বিদ্যুতের লোডশোডিংয়ে নাভিশ্বাস দেশের মানুষের সেখানে এধরনের স্কিম মন্দ নয়।

নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুত পেতে হলে শিল্প মালিকদেরকে গুনতে হবে ইউনিট প্রতি ১৪ থেকে ১৫ টাকা। যেখানে এখন উনারা পাচ্ছেন পিক আওয়ারে ৮ টাকা ৮ পয়সা প্রতি ইউনিট। রপ্তানিমুখী শিল্পকে টিকিয়ে রাখার লক্ষেই এমন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানায় বিদ্যুত জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রনালয়ের কর্তাব্যক্তিরা। তবে এধরনের উদ্যোগ সাধারন মানুষের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করবে তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। বেশি দামে বিদ্যুত থেকে উৎপাদিত প্রডাক্টের প্রডাক্ট কষ্ট বেড়ে গেলে তা প্রতিযোগতার মার্কেটে টিকে থাকবে কিনা তাও বিবেচনায় আনতে হবে।

শিল্পগ্রাহক যদি ১৩২ হাজার ভোল্ট থেকে সরাসরি বিদ্যুত নেয় সেক্ষেত্রে তাকে গুনতে হবে ১৩ টাকা ৮৮ পয়সা প্রতি ইউনিট। ৩৩ হাজার ভোল্টের লাইন থেকে বিদ্যুত সংযোগ নিলে প্রতি ইউনিটের দাম পড়বে ১৪ টাকা ৪৫ পয়সা । ১১ হাজার ভোল্ট থেকে সংযোগ পেতে হলে ইউনিট প্রতি দাম দাড়াবে ১৪ টাকা ৯৯ পয়সা। ২৪ ঘন্টা নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুতের সংযোগ পেতে হলে শিল্প মালিকদেরকে নিজ উদ্যোগে পকেটের পয়সা খরচ করে উপকেন্দ্র, ফিডার ও লাইন বসাতে হবে।

বিদ্যুতের হচপচ অবস্থা নিয়ে রপ্তানিমুখি শিল্পমালিকরা বেশ বেকায়দায়ই রয়েছে একথা বলতে দ্বিধা নেই। বিদ্যুতের মিসকলের যাতাকলে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে প্রডাক্শন বেইজ শিল্প প্রতিষ্ঠান। বিদেশি ক্রেতাকে চাহিদামতো সময়ে শিপমেন্ট বুঝিয়ে দিতে না পারায় অনেক ক্রেতা এ দেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। তাই শিল্পমালিকরা বিদেশে নিজেদের মার্কেট ধরে রাখার নিমিত্তে জেনারেটর দিয়ে প্রডাকশন সচল রাখতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু দৈনিক ১২/১৪ ঘন্টা জেনারেটর চালিয়েও যেখানে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ হচ্ছে ১১/১২ টাকা। সেখানে কেন উনারা সরকার থেকে ১৪ টাকায় বিদ্যুত কেনবে? এমন প্রশ্নে ঘুরপাক খাচ্ছে এখন শিল্পমালিকেরা। এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশন সভাপতির মতে চড়া দামে বিদ্যুত ব্যবহার করে শিল্প প্রতিষ্ঠানকে প্রতিযোগীতায় টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবেনা। শিল্পোদ্যোক্তদের চড়া দামে বিদ্যুত বিতরনের কৌশলে পিছিয়ে পড়বে ক্ষুদ্র ও মাঝারিমানের শিল্প মালিকরা যাদের নিজস্ব জেনারেটর নেই। তারা এতো দাম দিয়ে বিদ্যুত সংযোগ নিতে না পারার কারনে প্রতিযোগী মার্কেটে পিছিয়ে পড়বে। যা পুরো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে অ¯িহরতার যোগান দিবে।

এতো গেল শিল্পমালিকদের কথা। সাধারন মানুষদের মধ্যেও এ নিয়ে কানাঘুষা হচ্ছে। কেউ কেউ বলছে বিদ্যুতও নাকি টাকাওয়ালাদের কব্জায় চলে গেছে। যার টাকা আছে তার বিদ্যুত আছে। আর যার টাকা নেই তাকেওতো লোডশেডিংয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হতেই হবে।

সত্যিকার অর্থেই বিদ্যুত নিয়ে সরকার বেশ বেকায়দায়ই রয়েছে। সরকার শুরুর সময়টাতেই রেন্টাল কুইক রেন্টাল বিদ্যুতের দিকে ধাবিত হয়ে বিদ্যুত সেক্টরে একটা অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। যা থেকে সরকার এখন পর্যন্ত বের হয়ে আসতে পারেনি। এখন প্রশ্ন হলো শিল্পখাতে চড়া দামে বিদ্যুত দেয়ার নামে ধনীক শ্রেনীর কব্জায় যদি বিদ্যুত চলে যায় তাহলে তা সরকারের জন্য বৈরিতার জন্ম দিবে। কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানী উপদেষ্টা ও স্বীকার করেছেন যে রেন্টাল কুইক রেন্টাল বিদ্যুত কেন্দ্রের কারনেই জ্বালানী তেলে ভর্তুকির পরিমান বেড়ে গেছে। যা পরিশোধে বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ডকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
সরকারি হিসেব মতে, সরকার এক লিটার ডিজেল ক্রয় করে ৮৫ থেকে ৮৭ টাকায়। বিক্রি করে ৬১ টাকায়। ভর্তুকি দিতে হচ্ছে ২৪ থেকে ২৬ টাকা। এক লিটার অকটেন ক্রয় করে ৯৬ থেকে ৯৮ টাকায় আর বিক্রি করে ৯৪ টাকা। ভর্তুকি দিচ্ছে লিটার প্রতি দুই থেকে চার টাকা। ফার্ণেস ওয়েলের বেলায় সরকারের ক্রয় মুল্য লিটার প্রতি ৭১ থেকে ৭৩ টাকা। আর বিক্রি করছে ৬০ টাকা। তার মানে লিটার প্রতি সরকারের গচ্ছা যাচ্ছে ১১ থেকে ১৩ টাকা। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের তথ্য মতে, বিভিন্ন গ্রেডের জ্বালানী তেল ক্রয়ে সরকারকে প্রতি মাসে ১১০০ থেকে ১২০০ কোটি টাকা ভর্তুকি গুনতে হচ্ছে। তারমানে এ খাতে বছরে ১৪০০০ থেকে ১৫০০০ কোটি টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে। এই যদি হয় জ্বালানী তেলের ক্রয় চিত্র। তাহলে তা আশংকার কারন হতেই পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে বিদ্যুত খাতে সরকারের পলিসি গত ভুল রয়েছে। ফকরুদ্দিন-মইনের আমলে নেয়া রেন্টাল পাওয়ার প্লান্টের দিকে ধাবিত হওয়া সরকারের উচিত হয়নি। যদি সরকার রেন্টাল কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্রজেক্টে ধাবিত না হয়ে দেশের কয়লা ও গ্যাস সম্পদের দিকে নজর দিতো তাহলে এতদিনে হয়তো ভালো রেজাল্ট পাওয়া যেত বলেই বিশ্বাস। এখনো সরকার যদি ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সংকট নিরসনে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহন করে তাহলে ভবিষ্যত বাংলাদেশের চিত্র ভিন্নতর হবে। বিদ্যুত সেক্টরের ¯হায়ী সমাধানের জন্য সরকারকে দ্রুত কয়লা খনিগুলোর উন্নয়নে মনোযোগী হতে হবে। পুরাতন বিদ্যুত কেন্দ্রগুলোর সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে। এসব বড় বড় কেন্দ্রগুলো সংস্কার করে পুনরায় উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে হবে। বিদ্যুতের সিস্টেম লস, অপচয় ও চুরি রোধ করাও জরুরি। বস্তুত বিদ্যুত খাতে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহন করে সুনির্দিষ্টভাবেই অগ্রসর হওয়ার প্রয়োজন। দেরিতে হলেও ভুল সংশোধন করে নতুন দীর্ঘমেয়াদী কর্ম পরিকল্পনা গ্রহন করতে হবে। তবে সিদ্ধান্তগত ভুলের দায়ভার শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উপর চাপিয়ে দেয়া সমীচীন হবেনা। তাহলে বিদ্যুতের কারনে শিল্প প্রতিষ্ঠানেও ধ্বস নেমে আসবে। যা সামগ্রিকভাবেই দেশের অর্থনীতিতে বিরুপ প্রভাব ফেলবে।