ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

ঘোষিত বাজেটে বিদ্যুত খাতকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। গেলো বছরের তুলনায় এ খাতে বরাদ্দও বেড়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানী খাতে উন্নয়ন-অনুন্নয়ন মিলে ৯ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। যা মোট বাজেটের ৫ শতাংশের সমান। গেল অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৮ হাজার ৩১১ কোটি টাকা। এ বছরে এ খাতে ১ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আগামি অর্থবছরে বিদ্যুতের কাঙ্খিত উৎপাদন ধরা হয়েছে ৮ হাজার ২৯ মেগাওয়াট। যা আগের বছরের তুলনায় ৩ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি। অর্থমন্ত্রী বাজেট আলোচনায় উল্লেখ করেন এ সরকার যখন ক্ষমতা গ্রহন করে তখন মাথা পিছু বিদ্যুতের ব্যবহার ছিল ২২০ কিলোওয়াট ঘন্টা। যা ৩ বছরে বৃদ্ধি পেয়ে ২৬৫ কিলোওয়াট ঘন্টায় উন্নত হয়েছে। ৩ বছরে সরকার ১ কোটি ৩০ লাখ গ্রাহককে নতুন করে বিদ্যুতের আওতায় আনতে পেরেছে। যার ফলে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৩ শতাংশ বিদ্যুত ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে। ২০০৯ সালে এ সংখ্যা ৪৭ শতাংশে সীমাবদ্ধ ছিল। তার মানে তিন বছরে ২ শতাংশ হারে বিদ্যুত ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশাল কর্মসাধনের পরও মানুষ লোডশেডিংয়ের কবল থেকে মুক্ত হতে পারেনি বলেও অর্থমন্ত্রীর আক্ষেপ ছিল বাজেট আলোচনায় । পুরো বাজেট আলোচনায় অর্থমন্ত্রী বার বার বিদ্যুৎ সেক্টরকে টেনে এনেছেন। রেন্টাল কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সাফাই গেয়েছেন। যারা এসবের সমালোচনা করে অর্থমন্ত্রীর ভাষায় তারা অজ্ঞতা বসতই করে। যদিও তিনি নিজেও বিভিন্ন সময়ে জ্বালানী তেলের দাম বৃদ্ধির পিছনে রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে দায়ী করে আসছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তো রেন্টাল কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর সমালোচনাকারীদের দেশবিরোধী বলতেও পিছপা হননি। তবে সত্যিকার অর্থেই ভাড়া ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোই এ সেক্টরকে অস্থির করে তুলেছে। আগামি বছরে বিদ্যুতের চাহিদার কথা বিবেচনা করে সরকার কিছু বিশেষ প্রকল্পের গ্রহনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সামনের বছরে আরো অত্যন্ত ৫ টি ভাড়া ভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্র যোগ হচ্ছে বলে বিদ্যুত বিভাগ নিশ্চিত করেছে। সরকারের বিদ্যুত নিয়ে আন্তরিকতার অভাব নেই। কিন্তু কাঙ্খিত উন্নতি না হওয়াতে বেশি বিদ্যুত উৎপন্ন করেও সরকারকে সমালোচনা সইতে হচ্ছে। বাজেটে বিদ্যুতখাত নিয়ে যথেষ্ট আশার কথা শুনানো হয়েছে কিন্তু জ্বালানী তেলে সরকার যে হারে ভর্তুকি দিচ্ছে তাতে এ সেক্টরে গৃহিত সব পদক্ষেপকেই ম্লান করে দিতে পারে। ১ লিটার ডিজেল বা ফার্নেস ওয়েলের ক্রয় মুল্য ও বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান ২০ থেকে ২৬ টাকা। অর্থাৎ সরকার বেশি দামে কিনে কমদামে জনগনের কাছে বিক্রি করছে। আর এই ভর্তুকি কিন্তু পরোক্ষভাবে জনগনকেই বহন করতে হচ্ছে। পিডিবি‘র সূত্রমতে, সরকারকে প্রতিমাসে জ্বালানী তেলে ১২০০ থেকে ১৪০০ কোটি টাকা ভর্তুকি গুনতে হয়। তার উপর ফুয়েলবেইজ ছোট ছোট বিদ্যুত কেন্দ্র নির্ভর হয়ে পড়ছে গোটা বিদ্যুত খাত। এ কথা সত্য যে, বিদ্যুত সংকটের দ্রুততম সমাধান হচ্ছে ভাড়া ভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপন। কিন্তু এ সিস্টেম সাময়িকের জন্য কার্যকর বলেই বিবেচিত। এ সরকার যখন ক্ষমতা গ্রহন করে তখন বিদ্যুতের নাকাল অব¯হা ছিল। বলতে দ্বিধা নেই, বিএনপির আমলে ন্যূনতম বিদ্যুতের উন্নয়ন পরিলক্ষিত হয়নি। তাই আওয়ামীলীগের উপর বিদ্যুতের খড়গ চেপে বসেছে। আর তখন জনসাধারনের অন্যতম দাবি ছিল বিদ্যুতের দ্রুততম সমাধান। সরকার দ্রুততম সময়ে বিদ্যুতের ক্যারিশমেটিক সমাধানে ভাড়া ভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্রের দিকে অধিক মনোযোগী হয়ে উঠে। তাতে সরকার যতোটা সাফল্য আশা করেছিল তার সিকিভাগও অর্জন করতে পারেনি। এর কারন ছিল বিশ্বব্যাপী জ¦ালানী তেলের মুল্য বৃদ্ধি। সরকারের শুরুর সময়টাতে ২৬ টাকা ডিজেলের দাম আজ ৬১ টাকায় পৌছেছে। তার মানে তিন বছরে আন্তর্জাতিক বাজারেই জ্বালানির মুল্য বেড়েছে তিনগুন। পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে জ্বালানী তেলের দাম বেশি হওয়ায় বাংলাদেশ থেকে জ্বালানী তেল চোরাকারবারি সিন্ডিকেটগুলো পাচার করছে। এতে বিপুল পরিমানে জ্বালানী তেল প্রতি বছর বর্ডার দিয়ে অবৈধ উপায়ে ঐ পারে চলে যাচ্ছে।

আন্তরিকতা প্রশ্নে সরকারের স্বচ্ছতা রয়েছে কিন্তু জবাবদিহিতার ঘাটতি থাকায় বিদ্যুতের আকাশ ছোঁয়া উন্নয়ন সম্ভব হয়নি। বিদ্যুত সেক্টরের বিনিয়োগ সহজলভ্য করার জন্য দীর্ঘদিনের জমাটবদ্ধ জঞ্জাল পরিষ্কার করে এ সেক্টরে বিনিয়োগকে সহজ করা হয়েছে। ছোট ছোট বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মানে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহন সহজিকরন করার লক্ষে প্লান্ট নির্মান উম্মুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ আগে আসলে আগে পাবেন ভিত্তিতে বিদ্যুতের আশু সমাধানে সরকার আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠে। তাতে দেশীয় মাঝারি ও বড়মাপের বিদ্যুত ব্যবসায়ীরা এ খাতে তাদের বিনিয়োগ লাভজনক উপায়েই তুলে নেয়। একদিকে প্লান্ট সচল রাখার নিমিত্তে সরকার কম মুল্যে জ্বালানি সরবরাহ করছে। আর বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন কলা কৌশলে জ্বালানি তেলের মুল্যের নগদ লাভে বিদ্যুত উৎপাদনে খরচ না করে বাহিরে বিক্রি করে মুনাফা পকেটস্থ করেছে। ফলে জ্বালানি তেল সরবরাহ করেও আশানুরুপ বিদ্যুত জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়নি। কিন্তু সাফল্য না আসাতে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের শিকার মানুষ সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠে। যা সরকারকে সত্যিকার অর্থেই অস্বস্তিকর অব¯হায় রেখেছে। বিদ্যুত খাতে গত তিন বছরে বৈদেশিক বিনিয়োগ না আসাতে বড় বড় প্লান্ট স্থাপন সম্ভব হয়নি। কিন্তু কেন এখাতে বিদেশি বিনিয়োগ আসেনি বা সরকার কি অভ্যন্তরীন খাত থেকেই বিদ্যুতে সমাধানে সচেষ্ট ছিল? এমন প্রশ্নে সরকার তাৎক্ষনিক সমাধানে ধাবিত হয়ে নির্বাচনী অঙ্গীকারের দিকেই বেশি মনোযোগী ছিল। কিন্তু এর পাশাপাশি যদি দুই চারটা ৫০০/৭০০ মেগাওয়াটের প্লান্ট করে যেতে পারতো তাহলে ভবিষ্যত বিদ্যুতের চেহারাটায় আশাপ্রদ হওয়ার মতোই ব্যাপার খুজে পাওয়া যেত। বিদ্যুতের উৎপাদনের বিপরীতে প্রকৃতপক্ষে ব্যবহার কতটুকু তারও হিসেব করা জরুরি। কারন বিদ্যুতে যে পরিমানে সিস্টেম লস ও চুরি হয় তা যদি নিয়ন্ত্রন করা যায় তাহলে সমপরিমান বিদ্যুত থেকেও ভালো আউটপুট পাওয়া যাবে।

সরকার মেয়াদের তিন বছরের বেশি সময় অতিক্রম করতে চললো। কিন্তু অদ্যাবধি রুপপুর পাওয়ার প্লান্ট নিয়ে কাঙ্খিত অগ্রগতি দেখা যায়নি। যদি এই তিন বছরে রুপপুর আনবিক কেন্দ্রটি আনুষ্ঠানিক উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু করা যেত তাহলেও আওয়ামীলীগের ঝুড়িতে একটা বড় ধরনের সাফল্য যোগ হতো। বাগেরহাটে ১৩৫০ মেগাওয়াটের বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মানের অগ্রগতি ও আনোয়ারায় আরেকটি ১৩৫০ মেগাওয়াট পাওয়ার প্লান্ট নির্মানে আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকায় দুইটি বড়ো প্রজেক্ট আটকে গেছে। এ দুটি প্রজেক্ট এ আমলে বাস্তবায়িত হলে বিদ্যুতের ব্যাপক উন্নতি হত। সব মিলিয়ে সরকার বিদ্যুত খাতে কতটুকু সাফল্য অর্জন করতে পারবে তা সরকারকে প্রশ্নের মুখোমুখি চ্যালেঞ্জে রেখেছে।

বিদ্যুতের স্থায়ী সমাধানে দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প দরকার। কয়লাভিত্তিক বা গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্র গড়ে তুলতে পারলেই কাঙ্খিত উন্নতি করা সম্ভব। আর বিদ্যুত সেক্টরে মধ্যস্বত্ত্বভোগী মুনাফাকারবারীদের আটকাতে হবে। এরা সরকারকে যেমন বিপদে ফেলছে তেমনি বিদ্যুতের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে মুনাফা সঞ্চয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠছে। চলতি অর্থবছরে বিদ্যুতের হচপচ অব¯হা আগামি অর্থ বছরে কাটিয়ে উঠতে পারলেই সরকার সফল।তাই বাজেটে ঘোষিত ৮০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন করতে পারলে এ সেক্টরের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হবে। যা আওয়ামীলীগকে আগামি নির্বাচনে নির্বাচনী বৈতরনী পার করতে অনেকটা সহায়তা করবে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

হাসান কামরুল: ভূতত্ত্ববিদ ।