ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

 

ভয়াবহ যানজট সমস্যার ক্ষতিকারক দিক গুলি, যেমন-মানুষের চরম ভোগান্তি,সময়ের অপচয়,মূল্যবান জ্বালানীর অপচয় ইত্যাদি নিয়ে প্রতিনিয়তই রেডিও, টেলিভিশন ও পত্রিকাগুলিতে নানারকম সংবাদ পরিবেশিত হচ্ছে, প্রদর্শিত হচ্ছে যানজটের ভয়াবহ চিত্র কিন্ত যানজট সমস্যার যে অনেক ভাল দিকও আছে তা কিন্ত ইলেকট্রোনিক বা প্রিন্ট মিডিয়াতে আসছে না মোটেও । আমাদের সাধারন নাগরিকদের কাছে যানজট সমস্যা যতটা না ভোগান্তির, তারচেয়ে অনেক বেশী প্রফুল্লচিত্তের তাদের কাছে, যাদের উপর এর সমাধানের দায়িত্ব ন্যাস্ত । তাদের কাছে “যানজট সমস্যা ” হচ্ছে সোনার ডিমপাড়া হাসঁ । কারন যানজট সমস্যা দেখিয়ে যত প্রকল্প নেওয়া যায় বা নেওয়া যাবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য যত বিদেশী অনুদান বা ধারদেনা পাওয়া যাবে তা অন্য কোন খাতে পাওয়া কল্পনাতীত ব্যাপার । এই খাতে কিভাবে এতো প্রকল্প নেওয়া যায় তা জানতে হলে প্রথমেই আমাদের জানতে হবে যে, যানজট সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারের কতকগুলি সংস্থা কাজ করে । যানজট সমস্যার সমাধান যে সরকারের কথিত সবচেয়ে অগ্রাধিকার খাত গুলির অন্যতম তা দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগ সমূহের নাম দেখলেই বুঝা যায়, যেমন-যোগাযোগ মন্ত্রনালয়, স্থানীয়সরকার মন্ত্রনালয়ের অধিনস্থ সিটিকর্পোরেশনসমূহ,সেনাবাহিনী, রাজউক, ডিএমপি, বিআরটিএ,বিআরটিসি,পরিবহন মালিকসমিতি এবং সবার মধ্যে সমন্বয়াধনের জন্য আছে ডিটিসিবি(সাবেক) নামক একটি প্রতিষ্ঠান । একটি মাত্র সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারের এতোগুলো বিভাগ জড়িত থাকার ঘটনা আর দ্বিতীয়টি আছে কি না সন্দেহ। তাহলে ভেবে দেখুন এতোগুলি সংস্থা যেখানে যানজট নিরসনের জন্য কাজ করে তারপরও কেন যানজট সমস্যার কোন সুরাহা হচ্ছে না । আসলে সমস্যাটা এইখানেই, একটা সমস্যা নিয়ে যখন এতোগুলি সংস্থা কাজ করে তখন তো সমস্যা সমাধানের চেয়ে সমস্যা আরো বেশী তৈরী হওয়ারই কথা। কারন আমাদের দেশে একটি প্রবাদবাক্য বা নীতিবাক্য প্রচলিত আছে যা হলো “অধিক সন্ন্যাসিতে গাজন নষ্ট”। যানজট নিরসনের ক্ষেত্রে এই প্রবাদবাক্যটি আরো একবার প্রমানিত। যদিও আমাদের দেশের বর্তমান নীতিনির্ধারকেরা আমাদের সেই সকল প্রবাদবাক্য বা নীতিবাক্য গুলির উল্টা প্রয়োগ করতেই বেশী ভাল বাসেন, যেমন- আমরা এতোকাল যাবৎ পড়ে আসছি যে, “আপনারে বড় বলে বড় সে নয়, লোকে যারে বড় বলে বড় সে হয়” কিন্ত বর্তমানে অনেক বড় বড় নেতাদেরকেই নিজের ঢোল নিজেকেই অহরহ পিটাতে দেখি। তারপর,” জন্ম হউক যথাতথা কর্ম হউক ভালো”, “অতিভক্তি চোরের লক্ষন”, “লোভে পাপ পাপে ম্রিত্যু”, “সদা সত্য কথা বলিবে”, “চোরের মার বড় গলা”, ইত্যাদি ধরনের নীতি বাক্যগুলি মনে হয় আমাদের নীতিনির্ধারকেরা শুধুমাত্র পরীক্ষাপাশের জন্য পড়েছিলেন অথবা নীতিবান হওয়ার ভয়ে হয়ত পড়েনই নাই, কে জানে? ঢাকা মহানগরীর যানজট নিরসনের লক্ষ্যে উপরোল্লিখিত সংস্থারগুলির নেওয়া কিছু পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করলে শিরোনামের মাহাত্ব্য খুজে পাওয়া সহজ হবে, যেমন-যাত্রাবাড়ি গুলিস্থান ফ্লাইওভার প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন(দক্ষিন)-উদ্দেশ্য যানজট নিরসন, কিন্ত কিছুদিন পূর্বে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রনের দায়িত্বপালনকারী সংস্থার প্রধান ডিএমপির যুগ্মকমিশনার (ট্রাফিক) ব্যারিষ্টার মাহাবুব সাহেব সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেছেন যে , যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভার ঢাকামহানগরীর ভিতরে যানজট আরো বাড়াবে অর্থ্যাৎ সরকারের দুই সংস্থার বিপরীতমুখী অবস্থান । অথচ এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে সরকারের ব্যয় হবে প্রায় ২০০০কোটি টাকা যার পুরুটাই আদায় করা হবে জনগনের কাছ থেকে টোল আদায়ের মাধ্যমে । তারপর আসি কুড়িল-বিশ্বরোড ফ্লাইওভার প্রকল্পে-এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে রাজউক । এইখানে দেখুন, ঢাকা মহানগরীতে যেখানে যানজটের কারনে মানুষের জীবন দুর্বীসহ হয়ে উঠছে সেইসকল তৈরী হওয়া যানজট নিরসনের জন্য কোন প্রকল্প না নিয়ে তারা যেই রাস্তা আগামী পাচঁ বছরেও চালু হবে কিনা সন্দেহ, সেই রাস্তায় ভবিষ্যতের যানজট নিরসনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে প্রায় ৩৫০কোটি টাকায় । কি নিদারুন উপহাস এই মহানগরীর নাগরিকদের সাথে ! তারপর দেখুন, বনানী রেল ক্রসিং এর উপর ওভারপাস ও কেন্টনমেন্টের ভিতর দিয়ে একটি ফ্লাইওভার নির্মান করছে সেনাবাহিনী। আমার প্রশ্ন ? কেন্টনমেন্টের ভিতরের ফ্লাইওভার কোন এলাকার যানজট নিরসন করবে ? তারপর আসি হাতিরঝিল প্রকল্পে, যার বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানটি হলো সেনাবাহিনী, প্রায় ২০০০কোটি টাকারও অধিক ব্যয়ে তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শুরু হওয়া এই প্রকল্পে অনেক দ্রিষ্টিনন্দন ব্রীজ নির্মান করা হচ্ছে যা দেখে হয়ত আমাদের নয়ন জুড়িয়ে যাবে কিন্ত আমার আশংকা এই প্রকল্প না আবার খাল কেটে কুমির আনার সামিল না হয়ে দাড়ায় । কারন এই প্রকল্পের ভিতরে না হয় গাড়ি গুলি যানজট মুক্ত ভাবে চলাচল করবে কিন্ত নির্মানাধীন এই রাস্তার গাড়িগুলি যখন মগবাজার-সাতরাস্তা সড়কে ও রামপুরা সড়কে উঠবে তখন পরিস্থিতি কি দাড়াবে তা কি সরকার সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহ ভেবে দেখেছে ? তারপর আসি মেট্রোরেল প্রকল্পে, প্রায় ৮০০০কোটি টাকার এই প্রকল্পটি মূলত যাত্রী পরিবহনই হবে তার মূখ্য ভূমিকা । নির্দিষ্ট রোড ধরে চলাচলকারী এই মেট্রোরেল ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার এই নগরীর যাত্রী পরিবহনে কতটা ভূমিকা রাখতে পারে তা সময়ই বলে দেবে কিন্ত যানজট নিরসনে এর প্রত্যক্ষ কোন ভূমিকা থাকবে না এটা নিশ্চিত করেই বলা যায় । তারপর বিআরটিসি চালু করতে‍ যাচ্ছে অধিক যাত্রী পরিবহনে সক্ষম জোড়ালাগানো বাস সার্ভিস‍(এমআরটি-১) যা দ্রুতগতিতে নির্দিষ্ট লেইন ধরে চলাচল করবে । কিন্ত ২০কিমি পথ যেতে অন্তত বিশবার ট্রাফিক সিগনালে পড়তে হয় যে নগরীতে সেই নগরীর কোন পথে চলবে ব্যয়বহুল প্রকল্পের এই দীর্ঘাকায় দ্রুতগতির গাড়িগুলি তা আমার কাছে বোধগম্য নয় । তারপর আসি উত্তরা থেকে যাত্রাবাড়ির কুতুবখালী পরযন্ত উড়াল সড়ক নির্মান প্রকল্পের আলোচনায়‍ যা নির্মান হবে‍ যোগাযোগ মন্ত্রনালয়ের অধীনে । এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ইথাল-থাই নামক একটি বিদেশী কোম্পানীর সাথে যোগাযোগ মন্ত্রনালয়ের চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল সৈয়দ আবুল হোসেন মন্ত্রী থাকা কালীন সময়ে এবং তখন ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১২০০০কোটি টাকা কিন্ত এই প্রকল্পটি কবে আলোর মুখ দেখবে তা কেউই বলতে পারছে না । যদিও বা কোনদিন আলোর মুখ দেখে তখন এর ব্যয়ভার কোথায় গিয়ে দাড়াবে তা অনুমান করাও বেশ কঠিন । তারপর সরকারের পরিকল্পনায় আছে এমন কয়েকটি প্রকল্প যেমন-গাবতলী থেকে আজিমপুর পর‍্যন্ত ফ্লাইওভার , মিরপুর-১২ থেকে মিরপুর-১ হইয়া টেকনিক্যাল মোড় পর‍্যন্ত ফ্লাইওভার, গুলিস্থান থেকে বাবুবাজার বুড়িগংগা সেতু পর‍্যন্ত ফ্লাইওভার, বর্তমান মহাখালী ফ্লাইওভার ভেংগে তার স্থলে নূতন আরেকটি ফ্লাইওভার প্রকল্প যার কোনটিরই নির্মান ব্যয় হাজার কোটি টাকার নীচে হবে না । তারপর এমআরটি-২ নামে আছে আরো একটি ভবিষ্যত প্রকল্প । এই যে, এতো বড় বড় প্রকল্প গ্রহন করছে সরকার যানজট নিরসনের জন্য, তারপরও কি সরকার জোর গলায় বলতে পারছে কত দিনে যানজট মুক্ত হবে আমাদের এই নগরী ? উপরোক্ত প্রকল্পগুলি দেখে কি নির্ধিদায় বলা‍ যায় না‍ যে, সরকার‍ যানজট নিরসনের জন্য শুধুমাত্র বড় বড় প্রকল্প গ্রহন করতেই বেশী আগ্রহী যা কয়েকদিন পূর্বে প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বুয়েটের প্রফেসর জনাব শামসুক হক সাহেবের মন্তব্যে বেরিয়ে এসেছে । সরকারের পরামর্শদাতারা কেন সরকারকে বড় বড় প্রকল্প গ্রহন করতে আগ্রহী করে তোলে তা মুখে না বললেও কারো বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় । তা ছাড়া মুখে বলাটা নিরাপদও নয় ,কারন আমাদের দেশে অপরাধ করাটা যত সহজ, অপরাধের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া তো দুরের কথা, অপরাধের বিরুদ্ধে কথা বলাটাও অত্যন্ত কঠিন । কারন, অপরাধ করে সাজা পাওয়ার সম্ভাবনা না থাকলেও অপরাধ ধরিয়ে দিয়ে সাজা পাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল, যেমন-মাননীয় মন্ত্রী বাবু সুরন্জিত সেন গুপ্ত ও ড্রাইভার আজম খানের ঘটনা এবং সদ্য প্রকাশিত টিআইবির রিপোর্ট তার জ্বলন্ত প্রমান ।যানজট সমস্যার সমাধান নিয়ে সরকারের ভূমিকা আমার কাছে অনেকটা শিশুদের সাথে লুকুচুরি খেলার মতো মনে হয় । শিশুরা যখন দরজার আড়ালে লুকায়, আমার বড়রা তখন তাদেরকে খুজতে গিয়ে যেমন দেখেও না দেখার ভান করে শিশুদের বুঝাই যে তাকে খুজে পাচ্ছি না ‍। যানজট নিরসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারের সংস্থাসমূহের কার‍্যকলাপ দেখেও আমার কাছে অনেকটা এমনই মনে হয়‍‍ যে, সহজ সমাধান খুজে পেয়ে যাওয়ার ভয়ে আসলে তারা সহজ সমাধানের পথই সন্ধান করে না । যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভার প্রকল্প তার জ্বলন্ত উদাহরন ।