ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

ঢাকা মহানগরীসহ সারাদেশের যেকোন এলাকার যানজট সমস্যার সবচেয়ে সহজ সমাধান হইল বর্তমানের ট্রাফিক সিগনাল পদ্ধতি উঠাইয়া দিয়া রাস্তায় গাড়ির বাধাহীন চলাচলের সুযোগ সৃষ্টি করা । অর্থ্যাৎ রাস্তা দিয়া যখন গাড়িগুলি চলাচল করবে তখন কোন কারনেই গাড়ির স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত করা যাবে না । কিন্ত ঢাকা শহরে আমরা কি দেখি ? গুলিস্থান থেকে যাত্রা শুরু করে জিরোপয়েন্টে গিয়ে ট্রাফিক সিগনালে পড়ে ৫-১০মিনিট বসে থেকে পুনরায় যাত্রা শুরু করে আবার পল্টনমোড়ে গিয়ে ট্রাফিক সিগনালে ৫-১০মিনিট বসে থাকতে হয় । তারপর আবার যাত্রা শুরু করে যথাক্রমে প্রেসক্লাবের সামনের কদম ফোয়ারা, মৎস ভবন, শাহবাগমোড়, রুপসীবাংলা হোটেল, বাংলামোটর, সোনারগা হোটেলের সামনে সার্ক ফোয়ারা মোড়ে যথারীতি ট্রাফিক সিগনালে পড়ে প্রতিটি জায়গায়ই কমপক্ষে ৫-১৫মিনিট পর্যন্ত বসে বসে অবশেষে সুদীর্ঘ ৭কি;মি পথ পাড়ি দিয়ে কমপক্ষে ১ঘন্টা সময় ব্যয় করে ফার্মগেইট নামক স্থানে পৌছানো যায় ।

সারা ঢাকা শহরের প্রতিটি রাস্তারই ঠিক একই চিত্র আমরা দেখত পাই প্রায় প্রতিনিয়ত । ভালো করে খেয়াল করে দেখবেন যে ঢাকা শহরের শতকরা ৭৫টি যানজট লাগার স্থানই হলো কোন না কোন তিন রাস্তার মোড় অথবা চার রাস্তার মোড়ের সিগনাল পয়েন্ট । আরও ভালো করে খেয়াল করে দেখবেন যে, এক সিগনালপয়েন্ট থেকে আরেক সিগনালপয়েন্ট এর দূরত্ব যদি হয় এক কিলোমিটার তবে, গাড়ি সিগনাল ছাড়ার পর ঐ এই এক কিলোমিটার পথ যেতে লাগে মাত্র ১-২মিনিট অথচ ট্রাফিক সিগনালে পড়ে বসে থাকতে হয় ৫-১০মিনিট । এইভাবেই নগরীর প্রতিটি গন্তব্যে পৌছতে যদি গাড়ি চলে ২০মিনিট তবে ট্রাফিক সিগনালে বসে থাকতে হয় ১০০মিনিট । ফলে ঢাকা মহানগরীর রাস্তায় গাড়ির গড় গতিবেগ অত্যন্ত কম অর্থ্যাৎ ঢাকা মহানগরীতে গাড়ির গড় গতিবেগ মাত্র ১০কি;মি প্রতি ঘন্টায় অথচ দুই সিগনালের মাঝের দূরত্বটুকু অতিক্রম করা যায় প্রায় ৫০কিমি গতিবেগে । কিন্ত অধিকাংশ যোগ‍‍যোগ বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে সর্বসাধারনের শতকরা ৯৯জন লোকেরই ধারনা‍ যে, প্রয়োজনীয় সংখ্যক রাস্তার তুলনায় গাড়ির সংখ্যা বেশী হওয়াই যানজট সৃষ্টির প্রধান কারন । উদাহরন হিসাবে সবাই ঈদের সময়ে ঢাকার গাড়িশূন্য রাস্তার যানজটমুক্ত থাকার যুক্তি দেখান ।কিন্ত আমি এই ধারনার সাথে সম্পূর্ণ দ্বিমত পোষন করি । কারন আমার মতে ঢাকা মহানগরীর জনসংখ্যার তুলনায় গাড়ির সংখ্যা এখনও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম, যা আমাদের পাবলিক পরিবহনের বাদুরঝোলা অবস্থা দেখলে সহজেই অনুমান করা যায় । শুধু কি তাই ? জনসংখ্যা যত বাড়বে গাড়িও তত বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক নয় কি ? নয়তো বাড়ন্ত জনসংখ্যার পরিবহন ব্যবস্থা কি হবে ? দেখুন বিআরটিএ কি বলে ? বিআরটিএ এর সূত্র মতে ঢাকা মহানগরীতে প্রতি বৎসর ১০% হারে গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে । সুতরাং গাড়ির সংখ্যাই যদি যানজট সৃষ্টির কারন হয়ে থাকে তবে যানজট নিরসন করতে হলে শহরের লোক সংখ্যা কমাতে হবে যেমনটা ঈদের সময়ে হয়ে থাকে । কিন্ত এটা কি আদৌ সম্ভব ? উদাহরন স্বরপ ধরুন-কারো মাথা ব্যথার কারনে কি আমরা মাথা কেটে ফেলি নাকি মাথা ব্যথা সারানো ঔষধ সেবন করি ? নিশ্চয়ই ঔষধ সেবন করি । যানজটের বেলায়ও আমরা বলতে পারি যে, যানজট সমস্যার সমাধানের জন্য রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা কমিয়ে যানজট নিরসনের চিন্তা বাদ দিয়ে বর্তমানে যে রাস্তা আছে সেই রাস্তাতেই যানজট নিরসনের বিকল্প কি উপায় আছে তা আমাদেরকে খুজে বের করতে হবে ।

এই যে, ঢাকামহানগরীর রাস্তায় ঘন ঘন ক্রসিং পয়েন্ট থাকার কারনে ঘন ঘন ট্রাফিক সিগনালে পড়ে আমরা আমাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করছি এবং সেইসাথে অপচয় করছি জাতীয় মূল্যবান সম্পদ গ্যাসের । এর কি কোন সমাধান নাই ? অবশ্যই আছে । আমার দৃষ্টিতে ঢাকা মহানগরীর যানজট সমস্যা খুব সহজেই সমাধান যোগ্য । কিন্ত এই সহজ সমাধানটি নীতিনির্ধারকদের বোঝানোটা যানজট সমস্যা সমাধানের চেয়েও অনেক বেশী কঠিন।

এখন ফ্লাইওভার প্রকল্প দিয়ে আমি আমার যানজট সমস্যার সহজ সমাধানটি সহজে বুঝানোর চেষ্টা করব। আমরা সকলেই জানি যে, ফ্লাইওভারের উপর কোন যানজট লাগে না। কিন্ত কি কারনে ফ্লাইওভারের উপর যানজট লাগে না বা ফ্লাইওভারে যানজট লাগার সুযোগ নাই কেন তা একটু ভালভাবে ক্ষতিয়ে দেখি। ভালভাবে লক্ষ করলে দেখবেন য়ে, ফ্লাইওভারের উপর দিয়ে কোন রকম প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই গাড়িগুলি বাধাহীনভাবে চলাচল করতে পারে অর্থ্যাৎ ফ্লাইওভার নির্মানের সময় এমন কোন সুযোগই রাখা হয় না যাতে গাড়ির স্বাভাবিক চলাচলে কোন বাধার সৃষ্টি হতে পারে । এখন রাস্তায়ও যদি আমরা ফ্লাইওভারের মতো কোন রকম প্রতিবন্ধকতা ছাড়া গাড়ির বাধাহীন চলাচলের সুযোগ তৈরী করতে পারি তবে অবশ্যই রাস্তা গুলিকেও ফ্লাইওভারের মতো যানজট মুক্ত করা সম্ভব, যেমন-মহাখালী ফ্লাইওভার ও খিলগাও ফ্লাইওভারের উপর দিয়ে গাড়িগুলি সাধারনত যানজট মুক্তভাবেই চলাচল করে থাকে। এখন দেখি, কেন ফ্লাইওভারের উপর দিয়ে গাড়িগুলি বাধাহীনভাবে চলাচল করতে পারে । তার কারন, ফ্লাইওভারের উপর কোন ক্রসিং পয়েন্ট না থাকায় ট্রাফিক সিগনাল পদ্ধতিতে গাড়ি নিয়ন্ত্রনের কোন প্রয়োজন নাই বিধায় গাড়িগুলিকে সিগনালের কারনে ফ্লাইওভারের উপর কোথাও থামতে হয় না, তারপর ফ্লাইওভারের উপর যাত্রী উঠা-নামার সুযোগ না থাকায় যত্র-তত্র গাড়ি থামিয়ে রাস্তায় গাড়ি চলাচলে কোনরকম প্রতিবন্ধকতা তৈরী করতে পারে না, ফ্লাইওভারের উপর ডিভাইডারের মাঝে কোন ফাকা না থাকায় ‘ইউ’ টার্নের মাধ্যমে গাড়ির চলাচলে কোন প্রতিবন্ধকতা তৈরী হয় না এবং ফ্লাইওভারের উপর দিয়ে রিকসা,ভ্যান ও ঠেলাগাড়ি চলাচলের কোন সুযোগ না থাকায় গাড়ির স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় না । তাছাড়া ফ্লাইওভারের উপর গাড়ি পার্কিং এর কোন সুযোগ না থাকায় রাস্তা সংকুচিত হয়ে যান চলাচলে কোন সমস্যা তৈরী হয় না।

উপরোল্লিখিত যে সকল সুবিধাগুলি থাকার কারনে ফ্লাইওভারের উপর দিয়ে বাধাহীনভাবে গাড়িগুলি চলাচল করতে পারে, ঠিক একই রকম সুবিধাগুলি না থাকার কারনে রাস্তায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয় । এখন ফ্লাইওভারে থাকা ঐ সকল সুবিধাগুলি রাস্তায় বাস্তবায়ন করে আমরা সহজেই রাস্তাগুলি দিয়া বাধাহীনভাবে যান চলাচলের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারি এবং সেইসাথে দূর করতে পারি রাস্তার অসহনীয় যানজট ।

এখন আসি উপরোল্লিখিত সুবিধাগুলি আমরা কিভাবে রাস্তায় বাস্তবায়ন করতে পারি সেই আলোচনায় । যেহেতু ঢাকা মহানগরীর ৭৫ভাগ যানজটের মূল উৎস ক্রসিং পয়েন্টগুলির ট্রাফিক সিগনাল সিস্টেমে গাড়ির নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা, সেহেতু প্রথমেই আমরা দেখি কিভাবে এই সকল ক্রসিং পয়েন্টগুলি দিয়া ট্রাফিক সিগনাল পদ্ধতি উঠাইয়া দিয়া রাস্তায় গাড়ির বাধাহীন চলাচলের সুযোগ সৃষ্টি করা যায় । ট্রাফিক সিগনাল পদ্ধতি মূলত হালকা পরিমান গাড়ি চলাচল করে এমন রাস্তায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে ।

মূলত দুইটি পদ্ধতির সমন্বয়ে আমরা ঐ সকল ক্রসিং পয়েন্টগুলি দিয়া ট্রাফিক পুলিশের নিয়ন্ত্রন ছাড়াই বাধাহীনভাবে গাড়িগুলির চলাচল নিশ্চিত করতে পারি ।
পদ্ধতি দুইটি হলো : (১) ওয়ান ওয়ে পদ্ধতি (২) ওভারপাস পদ্ধতি যদিও পূর্বের পোষ্টে ওয়ান ওয়ে পদ্ধতি ও ওভারপাস পদ্ধতি সম্বন্ধে কিছুটা ধারনা দেওয়া হয়েছিল তথাপি আজকের লেখাটি সহজে বুঝানোর প্রয়োজনে আরো বিস্তারিত আলোচনা করা হইল।

(১) ওয়ানওয়ে পদ্ধতি: বর্তমানে ঢাকা মহানগরীর সকল রাস্তাই টু ওয়ে পদ্ধতির, অর্থাৎ রাস্তার মাঝখানে ডিভাইডার দিয়ে ভাগ করে একভাগ দিয়ে গাড়ি যায় আর অন্যভাগ দিয়ে গাড়ি আসে। আর ওয়ানওয়ে পদ্ধতি হলো, রাস্তার মাঝখানে কোন ডিভাইডার থাকবে না, গাড়ি যাবে এক রাস্তা দিয়ে আর আসবে আরেক রাস্তা দিয়ে । কাছাকাছি দুইটি রাস্তা (আনুমানিক দুই-তিনশ মিটার দুরত্বে) থাকলে সহজে এই পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা যাবে। এই পদ্ধতিটি বাস্তবায়িত করতে হলে গাড়ি কোন পথে যাবে আর কোন পথে আসবে তা নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। এই ওয়ানওয়ে পদ্ধতি বাস্তবায়িত হলে আপনার গন্তব্যে যাইতে কোন সমস্যা হবে না, আপনাকে হয়ত কিছুটা পথ ঘুরতে হতে পারে কিন্তু আপনি কোনো ট্রাফিক সিগন্যালে পড়বেন না এটা নিশ্চিত। এই ওয়ানওয়ে পদ্ধতিটি বাস্তবায়ন করা খুবই সহজ এবং অল্প সময়েই বাস্তবায়ন করা যাবে। এই পদ্ধতিটি বাস্তবায়ন করতে বড় কোনো অবকাঠামো নির্মাণের দরকার নাই, শুধুমাত্র রাস্তার মাঝখানের ডিভাইডারগুলি অপসারণ করতে হবে এবং লাইটপোস্টগুলি সরাতে হবে। এই ওয়ানওয়ে পদ্ধতির রাস্তাগুলিতে আসা শাখা রাস্তাগুলির প্রবেশমুখে ইংরেজি ‘টি’ আকৃতির ডিভাইডার স্থাপন করতে হবে যাতে কোন গাড়ি আড়াআড়ি রাস্তা ক্রস করতে না পারে। এই ওয়ানওয়ে পদ্ধতি বাস্তবায়ন করে মাত্র ১০০ কোটি টাকারও কম খরচ করে ঢাকা মহানগরীর প্রায় ৫০ভাগ এলাকার যানজট মাত্র ২-৩ মাসেই নিরসন করা সম্ভব । এই ওয়ানওয়ে পদ্ধতি বাস্তবায়ন করে যে সকল এলাকার যানজট নিরসন করা সম্ভব তা হলো- গুলিস্তান, মতিঝিল, দৈনিকবাংলার মোড়,পলটন মোড়, জাতীয় ঈদগাহ মাঠের সামনের কদমফোয়ারা চত্বর,মৎস ভবন সংলগ্ন চৌরাস্তা, কাকরাইল মসজিদ সংলগ্ন,ফকিরাপুল চৌরাস্তা, আরামবাগ পুলিশবক্স সংলগ্গ তিন রাস্তার মোড়, কমলাপুর রেলষ্টেশন সংলগ্ন তিন রাস্তার মোড়,রাজারবাগ পুলিশ লাইন সংলগ্ন শাহজাহানপুর চৌরাস্তা, মালিবাগ চৌরাস্তা, শান্তিনগর চৌরাস্তা,মৌচাক মার্কেটের সামনের তিনরাস্তার মোড়, মালিবাগ রেলক্রসিং সংলগ্ন তিনরাস্তার মোড়, চৌধুরীপাড়া তিনরাস্তার মোড়, মগবাজার চৌরাস্তা, এফডিসির সামনের চৌরাস্তা,শাহবাগ চৌরাস্তা, রূপসীবাংলা হোটেল সংলগ্ন তিন রাস্তার মোড়,বাংলামোটর চৌরাস্তা ,হোটেল সোনারগাঁ সংলগ্ন সার্কফোয়ারার মোড়,ফার্মগেইট, খামারবাড়ি, বিজয়সরনীর বিমান চত্ত্বর,চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র সংলগ্ন তিনরাস্তার মোড়,প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সংলগ্ন তিনরাস্তার মোড়,র‍েংগসভবন সংলগ্ন চৌরাস্তা, পান্থপথ -গ্রীণরোড চৌরাস্তা, ধানমনডি-৩২ সংলগ্ন তিনরাস্তার মোড়,সায়েন্সল্যাবরেটরী মোড়, নীলক্ষেত মোড়, কাটাবন মোড়,যাত্রাবাড়ি চৌরাস্তা, ধোলাইরপাড় তিন রাস্তার মোড়, সায়েদাবাদ তিনরাস্তার মোড়, গোলাপবাগ মাঠ সংলগ্গ জনপথ মোড় পরর্যন্ত।

(২)ওভারপাস পদ্ধতি: যে সকল এলাকার যানজট ওয়ানওয়ে পদ্ধতির সাহায্যে নিরসন করা সম্ভব নয়, ঐ সকল এলাকায় ওভারপাস পদ্ধতির বাস্তবায়ন করে অবশিষ্ট ৫০ভাগ এলাকার যানজট নিরসন করা সম্ভব। এই ওভারপাস পদ্ধতি বাস্তবায়নে জন্য রাস্তাগুলি অবশ্যই সুপ্রশস্ত হতে হবে। যে সকল এলাকায় ওভারপাস পদ্ধতি বাস্তবায়ন করে যানজট নিরসন করা যাবে সেই এলাকাগুলি হলো-ধানমন্ডি ৩২ হইতে আসাদ গেইট,শ্যামলী, টেকনিকেলমোড় হইয়া মিরপুর-১ পর‍্যন্ত রাস্তা, তারপর মিরপুর -১৪ হইতে,মিরপুর-১০ ও কাজিপাড়া হয়ে আগারগাঁও পর্যন্ত, তারপর সাতরাস্তা হইতে মহাখালি, বনানী হয়ে উত্তরা পর্যন্ত, তারপর যমুনা ফিউচার পার্ক হইতে মালিবাগ চৌধুরীপাড়া এবং গুলশান-১ ও গুলশান-২ পর্যন্ত। ধানমন্ডি এলাকার যানজট ও ওভারপাস পদ্ধতিতে নিরসন করা যাবে। এই ওভারপাস পদ্ধতিটি হলো এক ধরনের ওভারপাস যা ইংরেজি ‘ইউ’ বা বড় হাতের ‘এল’ আকৃতির অথবা সোজাও হতে পারে যা তিন রাস্তার মোড় বা চার রাস্তার মোড়ের আগে ও পরে স্থাপন করতে হবে। এই ওভার পাসগুলির সাহায্যে তিন রাস্তার মোড় বা চার রাস্তার মোড়ের ক্রসিং পয়েন্ট গুলিতে ট্রাফিক সিগন্যালের সমুখীন না হয়ে বাধাহীন ভাবে গাড়ি গুলি চলাচল করতে পারবে। ফলে এ সকল ক্রসিং পয়েন্টে ট্রাফিক সিগন্যালের কারণে গাড়ি জমে যানজট লাগার আর সুযোগ থাকবে না। এই ওভারপাসগুলি সাধারনত দুই লেইন বিশিষ্ট এবং ৩৫০মিটারের মত লম্বা হবে। এই ওভারপাসগুলির গড় নির্মাণ খরচ আনুমানিক পচিশ কোটি টাকার মত। এই ধরনের এক একটি ওভারপাস নির্মাণ করতে অনধিক ছয় মাস সময় লাগতে পারে। এই রকম আনুমানিক ৬০ বা ৭০টির মত ওভারপাস লাগতে পারে অবশিষ্ট ৫০ভাগ এলাকার যানজট নিরসনের জন্য যা দুই বছর সময়ের মধ্যেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব বলে আমি মনে করি। আমার এই ধারনা বাস্তবায়নের জন্য নুতন কোন রাস্তা নির্মাণের দরকার নাই। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে ঢাকার রাস্তায় বর্তমানে যে পরিমান গাড়ি চলাচল করে তার চাইতে কয়েকগুন বেশি গাড়ি যানজট মুক্তভাবে চলাচল করতে পারবে।

আমার জানা মতে সরকারের হাতে ফ্লাইওভার প্রকল্প ছাড়া যানজট নিরসনের আর কোন ধারনা নাই । এমনকি ফ্লাইওভার প্রকল্প দিয়া যানজট কতটুকু নিরসন হবে তারও কোন স্বচ্ছ ধারনা নাই । আর মেট্রোরেল প্রকল্প ও আর্টিকুলেটেড বাস সার্ভিস প্রকল্প সম্বন্ধে আমি যতটুকু জানতে পেরেছি তা থেকে নির্দিধায় বলা যায় এগুলো মূলত যাত্রী পরিবহনেই মূখ্য ভূমিকা পালন করবে অর্থ্যাৎ যানজট নিরসনে তাদের সরাসরি কোন প্রত্যক্ষ ভূমিকা থাকবে না। উপরোন্ত এই প্রকল্পগুলির বাস্তবায়ন খুবই সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তাই আমার ধারনার পদ্ধতি দুটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ফ্লাইওভারের তুলনায় কত সহজে,কত অল্প টাকা খরচ করে ও কত অল্প সময়ে যানজট সমস্যার সমাধান করা যাবে তার একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করব। প্রথমেই দেখি ওয়ানওয়ে পদ্ধতি ও ফ্লাইওভার প্রকল্প এর তুলনামূলক চিত্র। যেহেতু ওয়ানওয়ে পদ্ধতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঢাকা মহানগরীর প্রায় অর্ধেক এলাকার যানজট মাত্র ১০০কোটি টাকারও কমে এবং ২ থেকে ৩ মাসের মধ্যে নিরসন করা সম্ভব সেহেতু দেখি ঐ অর্ধেক এলাকার যানজট ফ্লাইওভার প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে কত টাকা বিনিয়োগে কত সময়ের মধ্যে নিরসন সম্ভব ।

উপরোল্লিখিত যেসকল এলাকার যানজট ওয়ানওয়ে পদ্ধতিতে নিরসনের কথা উল্লেখ করা হইয়াছে, সেই সকল এলাকার যানজট পরিস্থিতির উন্নতি করতে হলে কম করে হলেও ৫০থেকে ৬০কিমি ফ্লাইওভার নির্মান করতে হবে, যে গুলি নির্মান করতে অর্থের যোগান থাকার পরেও অন্তত পক্ষে সময় লাগবে ১৫থেকে ২০ বছর, আর টাকার প্রয়োজন হবে প্রায় ১৫থেকে ২০হাজার কোটি টকার মতো । আর দূর্ভোগ ! তার তো কোন সীমা রেখাই থাকবে না । আর যে সকল রাস্তায় ওয়ানওয়ে পদ্ধতি বাস্তবায়িত হবে সেই সকল রাস্তায় যানজট সম্পূর্ন রুপে নিরসন হবে কিন্ত ফ্লাইওভার প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শুধুমাত্র ফ্লাইওভারের উপর দিয়া যারা যাতায়াত করবে শুধুমাত্র তারাই যানজট মুক্তভাবে চলাচল করতে পারবে কিন্ত রাস্তাদিয়া যারা যাতায়াত করবে তারা অবশ্যই যানজটের কবলে পরবে, তবে হয়ত তা সহনীয় মাত্রার হবে, যেমন-মহাখালী ফ্লাইওভার ও খিলগাও ফ্লাইওভার তার বাস্তব প্রমান।ওয়ানওয়ে পদ্ধতির মাধ্যমে রাস্তাগুলি যানজট মুক্ত করা গেলে এই সকল রাস্তাদিয়া যে পরিমান গাড়ি যাতায়াত করতে পারবে তার সমপরিমান গাড়ি চলাচল উপযোগী ফ্লাইওভার নির্মান করা আমাদের পক্ষে কোনদিনও সম্ভব হবেনা, কারন ঢাকা শহরের রাস্তাগুলি যতটুকু প্রশস্ত ততটুকু প্রশস্ত ফ্লাইওভার নির্মান করা সম্ভবপর না । ওয়ানওয়ে পদ্ধতি বাস্তবায়িত রাস্তায় যে কোন শাখা রাস্তা থেকে গাড়ি যেমন আসতে পারবে তেমনি গাড়ি শাখা রাস্তায় যেতেও পারবে কিন্ত ফ্লাইওভার থেকে সকল শাখা রাস্তায় গাড়ি যেমন নামতে পারবে না তেমনি সকল শাখা রাস্তা থেকে গাড়ি ফ্লাইওভারে উঠতেও পারবে না । কারন সকল শাখা রাস্তায় ফ্লাইওভারে উঠা-নামার রেম্প নির্মান সম্ভবপর না । ওয়ানওয়ে পদ্ধতি বাস্তবায়িত রাস্তায় ইচ্ছা করলে সকল প্রকার যানবাহন চলার সুযোগ আছে কিন্ত ফ্লাইওভারে তা নাই ।

তারপর দেখি ওভারপাস পদ্ধতি ও ফ্লাইওভার প্রকল্পের মধ্যে তুলনামূলক চিত্র :
যেহেতু উপরোল্লিখিত ওভারপাস পদ্ধতির বর্ননায় অবশিষ্ট এলাকার যানজট নিরসনের জন্য কয়টি ওভার পাস লাগবে ,কত টাকা খরচ হবে ও কত সময় লাগবে বাস্তবায়নের জন্য তার বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে তাই এখানে শুধুমাত্র ফ্লাইওভারের পরিমান,নির্মান ব্যয় ও নির্মানকাল বর্ননা করলাম । অবশিষ্ট প্রায় অর্ধেক এলাকায় ফ্লাইওভার নির্মান করার প্রয়োজন হতে পারে প্রায় ১০০কিমি এর মতো যার নির্মান খরচ লাগতে পারে প্রায় ৫০হাজার কোটি টাকার মতো এবং সময় লাগতে পারে আনুমানিক ২০থেকে ৩০বছর পর্যন্ত। ওভারপাস গুলি যেহেতু ফুটপাত ও ডিভাইডারের উপর নির্মিত হবে সেহেতু নির্মানকালে যান চলাচলে তেমন একটা সমস্যা তৈরী হবে না কিন্ত ফ্লাইওভার নির্মানকালে যে কতটা সমস্যা তৈরী হয় তা যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভার প্রকল্প নিজচোখে না দেখলে বর্ননা করা বেশ কঠিন। ওভার পাস পদ্ধতি বাস্তবায়নের মাধ্যমেও রাস্তাগুলিকে সম্পূর্নরুপে যানজট মুক্ত করা সম্ভব কিন্ত ফ্লাইওভার প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে তা অসম্ভব । ওভারপাস গুলি যেহেতু আকারে ফ্লাইওভারের তুলনায় বেশ ছোট তাই ফ্লাইওভারের তুলনায় অনেক কম সময়ের মধ্যেই তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে যানজট নিরসন সম্ভব ।

ওভার পাস যেহেতু ফুটপাত ও ডিভাইডারের উপর নির্মিত হবে সেহেতু ওভার পাস নির্মাণের কারনে মূল সড়ক সংকুচিত হবে না কিন্ত ফ্লাইওভারে উঠানামার রেম্প নির্মান করার প্রয়োজন হলে রাস্তাগুলি ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়ে যায়, যেমন-যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভার প্রকল্প । ওভারপাস গুলির ফ্লাই করার অংশ অত্যন্ত কম বিধায় ভূমিকম্পে কম ঝুঁকিপূর্ণ কিন্ত ফ্লাইওভারে ফ্লাই করার অংশের পরিমান বেশী হওয়ায় ভূমিকম্পে ওভারপাসের তুলনায় বেশী ঝুঁকিপূর্ণ । সুতরাং উপরোক্ত বিশ্লেষণ থেকে আমরা খুব সহজেই ধারনা করতে পারি ওয়ানওয়ে পদ্ধতি ও ওভারওপাস পদ্ধতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে কতটা সহজে ,কত অল্প খরচে ও কতটা অল্প সময়ের মধ্যে যানজট নিরসন করা সম্ভব ।

রাস্তার মাঝখানে যাতে যাত্রী উঠাতে-নামাতে না পারে সেইজন্য বাসের সিড়ি গুলি বাদ দিয়ে বাসের ভিতরের ফ্লোর লেবেল থেকে সরাসরি ফুটপাতে নামার ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যবস্থাটি পুরাপুরি কার্যকরি করার জন্য বাসস্ট্যান্ডের ফুটপাতের উচ্চতাও বাড়িয়ে বাসের ভিতরের ফ্লোর লেবেল এর সমান করে দিতে হবে ।

যে সকল রাস্তায় বাস, ট্রাক ও প্রাইভেট কার চলাচল করবে সেই সকল রাস্তায় অবশ্যই রিকসা, ভ্যান চলাচল বন্ধ করে দিতে হবে যেমন- রামপুরা-বাড্ডা সড়ক ।
অফিসপাড়া বা বহুতল বিশিষ্ট বিপণীবিতান গুলিতে বিল্ডিংয়ের নীচতলা ও আন্ডার গ্রাউন্ড বাধ্যতামূলকভাবে কার পার্কিংয়ের জন্য বরাদ্দ রাখতে হবে এবং সেই সাথে আইন করে রাস্তায় গাড়ি পার্কিং বন্ধ করতে হবে ।

সুতরাং রাস্তায় ফ্লাইওভারের সুবিধাগুলি বাস্তবায়ন করে আমরা খুব সহজেই রাস্তাগুলিকে তুলনামূলক অনেক কম খরচে ও কম সময়ের মধ্যে যানজট মুক্ত করতে পারি ।

আমার ধারনার ওয়ানওয়ে ও ওভারপাস পদ্ধতি দুইটির পরিস্কার ধারনা দেওয়ার উদ্দেশ্যে দুই পদ্ধতির সমন্বয়ে কিভাবে রাস্তাগুলিকে যানজটমুক্ত করা যায় তার একটি নকশা পোষ্টটির সাথে সংযুক্ত করে দিলাম । নকশাটিতে তীর চিহ্নের সাহায্যে গাড়ির গতিপথ নির্দেশ করছে । যানজট নিরসনের আমার এই প্রস্তাবটি গত১৫।০১।১২ তারিখে প্রকাশিত অর্থদিগন্তের জাতীয় সাপ্তাহিক অর্থধারায়, ১৭।০৬।১২তারিখের দৈনিক সকালের খবর পত্রিকার নানামত বিভাগে, ২২।১১।১২ তারিখের প্রথম আলো পত্রিকার ১২ নং পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হইয়াছে এবং গত ২৪।১১।১২ ও ০১।১২।১২ তারিখে চ্যানেল আইয়ের ‘ট্রাফিক সিগনাল’ নামক অনুষ্ঠানে প্রচারিত হইয়াছে। তাই আমি আমার যানজট নিরসনের এই প্রস্তাবটির প্রতি সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকদের সুদৃষ্টি কামনা করছি।