ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

 

মুক্তিযোদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি দাবিকারী (দেশের অধিকাংশ লোক যারা মুখে দাবী করে না তারা তাহলে কি?) লোকদের মুখে অহরহ যে কথাটি শুনা যায় তা হল-মুক্তিযুদ্ধে যাদের প্রাণ ও ইজ্জতের বিনিময়ে আমাদের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে তাদের ঋণ তারা শোধ করে দিবেন। কিভাবে তাদের ঋণ শোন করবেন ? রাজাকারদের বিচার করে এবং এই বিচার আগামী বিজয় দিবসের আগেই সম্পন্ন হবে। আমার প্রশ্ন হল -কয়জন রাজাকারের বিচার হলে ত্রিশ লক্ষ শহীদ আর দুই লক্ষ সম্ভ্রম হারা নারীর ঋণ শোধ হবে? দশ-পনেরজন রাজাকারের বিচার করলেই কি মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ শহীদদের ও সম্ভ্রম হারা দুই লক্ষ নারীর অবদানের প্রতিদান দেওয়া হয়ে যাবে? তাদের এতবড় আত্মত্যাগের মূল্য কি এতোই কম! এতটুকু পাওয়ার আশায়ই কি এতো গুলি লোক জীবন দিল ও সম্ভ্রম হারাল আমাদের লক্ষ লক্ষ মা-বোনেরা? তাদের কি আর কোন চাওয়া -পাওয়ার নেই? এতটুকুতেই কি আমরা যারা স্বাধীনতার সুফল ভোগ করছি তাদের দায়িত্ব শেষ মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি ও সম্ভ্রমহারা নারীদের প্রতি? আর কিছুই কি করার নেই ? যদি থাকে, তা কি দাওয়াত দিয়ে এনে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্বর্ধনা দেওয়ার কথা বলে অনুষ্ঠানস্থলে ঢুকতে না দেওয়া ? যারাও বা ঢুকতে পেরেছে তাদের বসতে না দিয়ে অমুক্তিযোদ্ধাদের বসতে দিয়ে চরমভাবে অপমান করা? এই হল আমাদের বেঁচে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিদানের নমুনা? আর মুক্তিযুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন তারা তো মরে গিয়ে বেঁচে গেছেন এই দৃশ্য দেখা থেকে ।

এইতো সেইদিন টিভি টকশোর কল্যাণে বীরউত্তম খেতাবপ্রাপ্ত দুইজন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা মে. জে(অব:) আমিন আহমেদ চৌধুরী ও মে. (অব:) হাফিজউদ্দীন আহমেদ এর নিকট থেকে জানতে পারলাম যে, ১৯৭২ সালে দেশে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা সরকারীভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছিল ৭০,০০০ (সত্তর হাজার)জন কিন্তু বর্তমানে নাকি সরকারী সুবিধাভোগী মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যাই প্রায ২,৫০,০০০ (দুই লক্ষ পঞ্চাশ হাজার) জনেরও বেশী। তারা উভয়েই সঞ্চালকের নিকট জানতে চান ৭২ সালের পরে কি কোন মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল কি না? তারা অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে বললেন যে, যারা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়ে গিয়েছেন তারা যদি এখনও বেঁচে থাকতেন, তাহলে হয়ত, এই সকল ঘটনা দেখে লজ্জায় নির্ঘাত আত্মহত্যা করতেন। এর চাইতে চরম লজ্জাজনক ঘটনা আর কি হতে পারে আমাদের জন্য ! যখন দেশে কোটি কোটি টাকা খরচ করে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখার জন্য বিদেশীদের সম্বর্ধনা দেওয়া হচ্ছে, তখন এদেশে বীর মুক্তিযোদ্ধারা কেউ ভিক্ষা করে, কেউ ঠেলাগাড়ি ঠেলে, কেউ রিক্সা চালায়, কেউ বা দিনমজুরী ও কুলিগিরি করে দিনাতিপাত। এমনি হাজারো মুক্তিযোদ্ধার করুন কাহিনীর খবর প্রায় প্রতিদিনই বেরিয়ে আসছে বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া গুলিতে ।এমন অনেক মুক্তিযোদ্ধারা আছেন, যারা নিজেদের পরিচয়টুকু দিতেও লজ্জাবোধ করেন আমাদের দেশের বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে যা হচ্ছে তা দেখে।

এই প্রসংগে আমি আমার অতি নিকটে বসবাসকারী দুইজন বীর মুক্তিযোদ্ধার বর্তমান অবস্থা আপনাদের জানানোর উদ্দেশ্যে বর্ণনা করলাম- আমাদের গাড়ির ড্রাইভার একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা -এই কথাটি আমি জানতে পারি আমাদের ড্রাইভার হিসাবে নিয়োগ পাওয়ার দুই বছর পরে, তাও আবার অন্য একজন মুক্তিযোদ্ধার নিকট থেকে । তাকে যখন এর কারন জিজ্ঞেস করি, তখন সে একজন টং ঘরে বসে বৃদ্ধ চা বিক্রেতাকে দেখিয়ে বলে যে, সেও একজন মুক্তিযোদ্ধা । আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম। কারন ঐ চা বিক্রেতার দোকানে বসে আমি প্রায়ই চা পান করে থাকি কিন্ত কোনদিনও তার আচরন ও কথাবার্তায় আমি বুঝতে পারিনি যে, সে একজন মুক্তিযোদ্ধা । আপনারা বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার এই করুণদশা দেখে তখন আমি আর স্বাভাবিক থাকতে পারি নাই, আমার চোখে জল এসে যায় । আমি তখন আর কোন কথা না বলেই দোকান থেকে চলে আসি, যাতে সে আর বুঝতে না পারে যে, আমার চোখে জল এসে পড়েছে । পরবর্তীতে যখন তাকে জিজ্ঞেস করি, চাচা মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করলেন, আর এখন এই বৃদ্ধ বয়সে চা বিক্রি করে সংসার চালান, আপনার কষ্ট লাগে না? চাচার সরল উত্তর -নিজের ব্যক্তিগত কোন লাভের আশায় যুদ্ধে যাই নাই ,দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে গেছি-দেশ স্বাধীন করেছি । তাই মনে কোন আপসোস নাই । তবে দু:খ একটা আছে বাবা -যে রকম রাজা চাইছিলাম, সেই রকম রাজা পাইলাম না । আশা করেছিলাম, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমাগো মন্ত্রী-এমপিরা অন্তত পাকিস্তানীদের মতো স্বার্থপর ও হারামি হইবে না। কিন্তু আমাদের সেই আশা শুধু আশাই রইয়া গেল।

এমনি হাজারো মুক্তিযোদ্ধার আক্ষেপ আমাদের চারপাশে একটু কান পাতলেই শোনা যায় । যেই সকল মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার সুফল হিসাবে আমরা যারা অর্থবিত্ত আর প্রভাব-প্রতিপত্তি ও অফুরন্ত ক্ষমতার মালিক বনে গেছি, তাদের মনেও কি এতটুকুন দয়া হয় না এই সকল বিপর্যস্ত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কোন কিছু করার? মাত্র কয়েকজন রাজাকারের বিচারের দাবীতে আমরা যেখানে এতো সোচ্চার, তখন হাজার হাজার জীবিত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ও লক্ষ লক্ষ শহীদ পরিবারের করুণ আর্তনাদের বেলায় কেন আমরা এতো নিষ্ঠুর? যাদের আত্মত্যাগে অর্জিত হয়েছে আমাদের অতিকাঙ্ক্ষিত এই স্বাধীনতা , আজ তারাই কেন এতো অবহেলিত? আমরা জাতি হিসাবে কি এতোই অকৃতজ্ঞ ও পাষান হৃদয়ের অধিকারী ? আমাদের ভিতরে কি নেই কোন মনুষ্যত্ব? নেই কি কোন দয়া মায়া ? কই ? এই সকল বিপর্যস্ত মুক্তিযোদ্ধাদের বেলায় ও শহীদ পরিবারগুলোর করুণ দশার লাঘবের জন্য তো আমরা কোন আন্দোলন করি না , করি না কোন মিটিং ও মিছিল পর্যন্ত । তাহলে রাজাকারদের বিচারের দাবী কি শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মায়াকান্না? রাজাকারদের বিচারের আয়োজন শেষ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি দায়িত্ব এড়ানোর কৌশল নয়তো? না কি রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে রাজাকার নিধনের এই আয়োজন? মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি যেখানে রাষ্ট্র ক্ষমতায়, তখন রাজাকারদের বিচারের জন্য কেন এতো হৈ চৈ? বিচারের আয়োজন দেখে মনে হচ্ছে, এ যেন মশা মারতে কামান দাগা আর কি! সবশেষে আমার প্রশ্ন? মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষুধা নিবারণ আগে, নাকি রাজাকারদের বিচার আগে? শহীদ পরিবার গুলির অন্ন, বস্ত্র, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান আগে জরুরী নাকি রাজাকার নিধন করা আগে জরুরী? ১৯৭১ সালের অর্জিত স্বাধীনতার স্বপ্ন পূরন আগে, নাকি আবারও একটি যুদ্ধ মানে গৃহযুদ্ধের প্রয়োজন আগে? আমার প্রশ্নগুলো রইল সকল সচেতন নাগরিকদের প্রতি।