ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

শিরোনামীয় তিন শ্রেনীর আসক্তের মধ্যে মৌলিক দিক দিয়ে আমি কোন পার্থক্য খুজে পাই না অর্থ্যাৎ তিন শ্রেনীর আসক্তের চূড়ান্ত ফলাফল ক্ষতিগ্রস্থ করা । তবে কেউ ক্ষতিগ্রস্থ করে একটি পরিবারকে,আরেকজন ক্ষতিগ্রস্থ করে একটি দেশকে তথা দেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীকে, আর তৃতীয়জন ক্ষতিগ্রস্থ করে একটি পুরা জাতিকে । ক্ষতির দিক বিবেচনা করলে দেখা যায় যে, মাদকাসক্ত একজন ব্যক্তির চেয়ে ক্ষমতাসক্ত একজন ব্যক্তির ক্ষতিসাধনের মাত্রা কোটি গুন বেশী, আর ধর্মাসক্ত ব্যক্তির ক্ষতিসাধনের মাত্রা ক্ষমতাসক্ত ব্যক্তির চেয়েও শতগুন বেশী ।

প্রথমেই আসা যাক মাদকাসক্ত ব্যক্তি প্রসংগে :মাদকাসক্তের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো-বুদ্ধি-বিবেক লোপ পাওয়া, ভাল-মন্দ বুঝতে না পারা, চরম হীনমন্যতায় ভোগা, স্বার্থপরতা, মানবতাবোধ হারিয়ে ফেলা,আত্মসম্মানবোধের মৃত্যু হওয়া,লজ্জা শরম কি জিনিস তা ভূলে যাওয়া, চরমভাবে মিথ্যাবাদী হয়ে পড়া, অলীক স্বপ্ন দেখা, চুরিচামারীতে অভ্যস্ত হয়ে পড়া, যারা মাদকাসক্তের ভালো চাইবে তাদেরকে চরম শত্রু মনে করা, চিকিৎসার প্রতি চরম অনীহা প্রকাশ ইত্যাদি । অর্থ্যাৎ মাদকাসক্ত একজন ব্যক্তির পক্ষে এমন কোন নীচু প্রকৃতির কাজ নাই যে, সে তা করতে পারে না । একটি পরিবারে যদি মাত্র একজন সদস্য মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে, তবে ঐ পরিবারটি আর্থিক, মানুষিক ও সামাজিকভাবে যে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তা একমাত্র ভূক্তভোগী পরিবার ছাড়া অন্য কারো পক্ষে অনুমান করা প্রায় অসম্ভব । মাদকাসক্তের জন্য অবধারিত পরিণতি হইল মৃত্যু, আর তার পরিবারটির জন্য অবধারিত পরিনতি হইল আর্থিক মেরুদণ্ড ভেংগে যাওয়া ।

তারপর আসা যাক ক্ষমতাসক্ত ব্যক্তি প্রসংগে:রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার পূর্বে একজন রাজনীতিবিদের কথা-বার্তা, চাল-চলন,ভাব-সাব দেখে বিন্দুমাত্র অনুমান করা যায় না যে এই লোকটিই ক্ষমতায় গেলে যে কত ভয়ংকর রুপ ধারন করতে পারে । সদালাপী, মিষ্টভাষী, শ্রদ্ধা ভক্তিতে নুয়ে পড়া ব্যক্তিটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার স্পর্শ পাওয়া মাত্রই সম্পূর্ণ অন্য জগতের মানুষে রুপান্তরিত হয়ে যায় । অনেকটা যাদুমন্ত্রের মত ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়,যেমন- যাদুর কাঠির স্পর্শে যেমন কাগজের ফুল মুহুর্তে বাস্তবের ফুলে পরিনত হয় তেমনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার স্পর্শে অতি সাধারণমানের একজন মানুষের মাঝে অবিশ্বাস্য রকমের পরিবর্তন চলে আসে । তখন ক্ষমতার মোহে ঐ ব্যক্তিটির একে একে বন্ধ হতে থাকে সব বিবেকের দরজাগুলো , ক্ষমতার দাপটে হারিয়ে যায় সব মানবিক গুনাবলী গুলি । যেই লোক এতকাল যাবৎ একজন সৎ,পরোপকারী ও গরীবের বন্ধু হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছিল, সেই কিনা হয়ে যায় মহাদুর্নীতিবাজ,পরের সম্পদ লুণ্ঠনকারী ও গরীবের রক্তচোষা । রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পেয়ে যারা নিজের বিবেককে বিসর্জন দিয়ে দুর্নীতির মাধ্যমে একটি টাকাও অর্জন করে, ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে যে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন করে, ক্ষমতার মোহে যে তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের কথা ভূলে যায়, জনসমর্থন হারিয়েও‍ যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আকড়ে থাকতে চায়, ক্ষমতা পাকাপোক্ত করনের উদ্দেশ্যে যে নীতি-আদর্শ ত্যাগ করে, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে যে জনগনকে জিম্মি করে,জনগনকে যারা ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসাবে ব্যবহার করে তারপর ক্ষমতায় যেয়ে সেই জনগনের কথা ভূলে গিয়ে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, জনগনের অধিকার আদায়ের আন্দোলন বাদ দিয়ে যারা শুধুমাত্র ক্ষমতায় যাওয়ার আন্দোলন নিয়ে ব্যস্ত থাকে, ক্ষমতার লিপসায় যারা জনগনকে আকাশকুসুম স্বপ্ন দেখায় কিন্ত ক্ষমতায় যাওয়ার পর করে চরম বেঈমানী, যারা সরকারে থাকলে যাকে হারাম বলে, আর বিরোধীদলে গেলে তাকেই আবার হালাল বলে ইত্যাদি প্রকৃতির রাজনীতিবিদের আমি বলি ক্ষমতাসক্ত । ক্ষমতাসক্ত রাজনৈতিকেরা মাদকাসক্তদের চেয়ে অনেক অনেক গুন বেশী জঘন্য চরিত্রের হয়ে থাকে । চুরি-চামারী থেকে শুরু করে ঘুষ,দুর্নীতি, প্রতারনা, স্বজনপ্রীতি, দলীয়করন,প্রতিহিংসাবশত প্রতিপক্ষকে বিনা কারনে হয়রানি, চাঁদাবাজি, রাহাজানী, গুম ও খুন ইত্যাদি পর‍্যন্ত এহেন কোন অপরাধমূলক কর্ম নাই‍, যা ক্ষমতাসক্ত লোকদের দ্বারা করা সম্ভব নয় । তদুপরি নিজ দলের নেতাকর্মীদের অপরাধমূলক কর্মকান্ডের জন্য করা সব মামলা রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার করে নেয়, যেন সব ফেরেসতা কুলের সদস্য । শুধু এখানেই ক্ষান্ত থাকে না এই সকল ক্ষমতাসক্ত রাজনীতিবিদেরা, কোন নেতাকর্মী‍ যদি কোন মামলায় সাজাপ্রাপ্তও হয়, যা এমনকি মৃত্যু দন্ড পর‍্যন্ত, তখন সেই সাজাও প্রেসিডেন্টের দ্বারা মাফ করিয়ে নেয় । অর্থ্যাৎ রাজনীতিবিদেরা কোন অন্যায় করতে পারে না, অথবা বলা যায় রাজনীতিবিদেরা যাহাই করুক সবই জায়েজ । বলুন তবে এরা ক্ষমতাসক্ত নয় তো কি ?

এর পর আসা যাক ধর্মাসক্তদের আলোচনায় : ধর্মীয় শিক্ষাকে সঠিকভাবে বুঝে-শুনে অনুধাবন না করে ও নিজের মধ্যে তার প্রতিফলন না ঘটিয়ে যারা শুধু ধর্মকে উম্মত্ততার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে তারাই হলো ধর্মাসক্ত । এরা প্রকৃতপক্ষে নিজেরা সঠিকভাবে ধর্মকর্ম করে না কিন্ত অন্যকে জোর পূর্বক ধর্মেকর্মে বাধ্য করতে চায় । এরা নিজেরা ধর্মীয় নির্দেশ ঠিকমত পালন করে না কিন্ত অপরকে ধর্মীয় নির্দেশ মেনে চলতে উপদেশ দেয় ।‍ পৃথিবীর সব ধর্মের লোকই জানে যে, ইসলাম হচ্ছে শান্তির ধর্ম কিন্ত ধর্মাসক্ত কিছু লোক ইসলামকে চরম অশান্তির ধর্ম হিসাবে পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে । ধর্মাসক্তের প্রভাবে তারা নিজেদেরকে সীমারের মতো পাষান হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচয় করিয়েছে ইতিমধ্যে । এইতো সেইদিন ঐ সকল ধর্মাসক্ত সীমারের দল মালাইলা নামক এক কিশোরীর মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করতেও এতোটুকু কুন্ঠা বোধ করেনি তাদের ভূল ধারনার ধর্মীয় বিশ্বাসের উন্মত্ততার সমালোচনা করায় । এমন নির্মম আর হ্রদয় বিদারক ঘটনার যারা জন্ম দিতে পারে তাদের অন্তত শান্তির ধর্ম ইসলামের অনুসারী বলা‍ যায় না । কারন ইসলাম এমন একটি ধর্ম‍‍, যেখানে বিনা কারনে একটি পিঁপড়াকেও হত্যা করতে নিষেধ করেছে । এরা যদি ধর্মাসক্তই না হবে তবে কি করে তারা মসজিদে নামাজরতদের উপর গুলি চালিয়ে নিরীহ লোকদের হত্যা করে , কি করে তারা জানাজার নামাজে গুলি করে মানুষ হত্যা করে অথচ শান্তির ধর্ম ইসলামে মানুষ হত্যা মহা পাপ । হাদীস শরীফে বর্নিত আছে যে,‍’ যে একজন নরকে হত্যা করল, সে গোটা মানবজাতিকে হত্যা করল’। মহানবীর আমলে কোন একজন সাহাবী যুদ্ধের ময়দানে বীর বিক্রমে লড়ে যাওয়ার এক পর‍্যায়ে কাফেরদের দলনেতাকে সম্মুখযুদ্ধে পরাস্ত করে ঐ কাফেরের বুকের উপর বসে যেই না তরবারি চালাতে উদ্ধত হন, ঠিক তখনি ঐ কাফের চালাকি করে সাহাবির মুখে থুথু নিক্ষেপ করে, আর তখনি সাহাবীর মধ্যে ভীষন ক্রোধের সৃষ্টি হয় এবং সাহাবী খুবই রাগান্বিত হয়ে তাকে যখন হত্যা করতে যাবেন, সেই মূহুর্তে তার নবীজির নির্দেশের কথা মনে পড়ে যে, প্রতিহিংসাবশত কাউকে হত্যা করো না । কাফেরদের দলনেতা এই কথাটি আগে থেকেই জানতেন বিধায়, সেই যাত্রায় মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যায় । এই ঘটনা থেকে আমরা কি খুব সহজেই বুঝতে পারি না যে, একজন খাঁটি মুসলমানের পক্ষে একজন মানুষকে হত্যা করা কত কঠিন কাজ । কিন্ত ধর্মাসক্তরা ইসলাম ধর্মের ভূল ব্যাখ্যা দিয়ে বিনা অজুহাতেই শত শত নিরাপরাধ লোকদের হত্যা করে ইসলাম ধর্মকে একটি সন্ত্রাসবাদী ও আতংক সৃষ্টিকারী ধর্মহিসাবে পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠিত করার অপপ্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে অব্যাহত ভাবে । তাদের এই ধর্মাসক্ততার বলী হচ্ছে পুরো মুসলমান জাতি । তাদের এহেন ধর্মবিরোধী চরমঘৃন্য কাজের জন্য অন্যান্য ধর্মের অনুসারীরা বর্তমানে চরম মুসলমান বিদ্বেষী হয়ে উঠছে যার প্রতিফলন আমরা ইতিমধ্যে দেখতে শুরু করেছি ।

পরিশেষে বলব, মাদকের নেশায় আসক্তরা ক্ষতিগ্রস্থ করে একটি পরিবারকে, ক্ষমতার নেশায় আসক্তরা ক্ষতিগ্রস্ত করে একটি দেশকে তথা দেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীকে, আর ধর্মের নেশায় আসক্তরা ক্ষতিগ্রস্ত করে একটি পুরো জাতিকে । তাই সকল মনোচিকিৎসকদের প্রতি আমার আহবান, মাদকাসক্তদের চিকিৎসার চেয়েও বেশী জরুরী ক্ষমতাসক্তদের ও ধর্মাসক্তদের চিকিৎসা করা । তাই জরুরী ভিত্তিতে মাদকাসক্তদের চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি ক্ষমতাসক্ত ও ধর্মাসক্তদের চিকিৎসা পদ্ধতি বের করে দ্রুততম সময়ে তাদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করে আমাদের প্রিয় দেশটাকে ও মুসলমান জাতিকে অপূরণীয় ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করুন ।