ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

 

বিজ্ঞাপনের প্রধান শ্লোগানই হচ্ছে-প্রচারই প্রসার । অর্থ্যাৎ যে কোন কিছুকে সকলের কাছে পরিচিত করার একমাত্র উপায় হলো প্রচার করা । আর এই প্রচারনা যে কোন বিষয়েই হতে পারে যেমন-ধর্ম,কর্ম, পন্য, আইনকানুন, কোন ব্যক্তি, কোন কর্মসূচি, কোন বানী, কারোও ভাষন ইত্যাদি । আল্লাহ তায়ালা তার বানী বিশ্বব্যাপী প্রচারের জন্য যুগে যুগ বহু নবী-রাসূলদের প্রেরন করেছেন । নবী-রাসূলগন আবার সাহাবাদের সহযোগিতা নিয়েছেন তাদের উপর ন্যস্ত ধর্ম মানুষের কাছে প্রচারের জন্য ।
তারপর আমাদের দেশের সরকার গুলি জনগনের জন্য কি কি কাজ করেছে তা বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও রেডিও-টেলিভিশনের মাধ্যমে জনগনের কাছে তুলে ধরে ব্যাপক প্রচারের জন্য যাতে জনগন তাদের দলকে পুনরায় ক্ষমতায় বসায় সেই আশায় । অনুরুপভাবে আমরা যদি কোন অপরিচিত পন্যকে সকলের কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিত করে তুলতে চাই ব্যবসায়িক সুবিধা লাভের আশায় তবে পন্যটির ব্যাপক প্রচারর প্রয়োজন পড়ে । তখন আমরা বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও রেডিও-টেলিভিশনের মাধ্যমে পন্যটির ব্যাপক প্রচারের উদ্যোগ গ্রহন করে থাকি । প্রচারনার ব্যাপকতায় একসময় জনসাধারন পন্যটির ভালো-মন্দ যাচাই না করেই পন্যটির প্রতি প্রলুব্ধ হয়ে অবশেষে তা হস্তগত করে । তারপর দেখুন চোখ ধাঁধানো প্রচারনার ফাঁদে পড়ে আমরা কোরকম খোজ খবর না নিয়েই ফ্লাট, প্লট ও বিভিন্ন জায়গা জমি ক্রয় করে প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছি আর খোয়াচ্ছি কোটি কোটি টাকা । তারপর দেখুন শুধুমাত্র প্রচারনার ফাঁদে ফেলে বিভিন্ন এলএমএল কোম্পানিগুলি লক্ষ লক্ষ মানুষের হাজার হাজার কোটি টাকা প্রতারনা করে হাতিয়ে নিয়েছে নিরবে নি:শব্দে । তারপর দেখুন, নির্বাচনের বেলায় কোন প্রার্থীকে আমরা তার কর্ম দিয়ে বিচার বিশ্লেষন না করে যে প্রার্থী যত বেশী পোষ্টারিং করে ব্যাপক পরিচিত পায়, সেই প্রার্থীকেই আমরা বেছে নেই নির্বাচিত করার জন্য _ফলাফল=আমড়াকাঠের ঢেঁকি ।

অর্থ্যাৎ যে কোন কিছুরই_ তা হউক ভালো কিংবা মন্দ, যত বেশী প্রচার পাবে- তার প্রসার ঘটবেই অর্থ্যাৎ প্রসার ঘটতে বাধ্য । তা না হলে এত্তো এত্তো বিজ্ঞাপনী সংস্থা কিভাবে ব্যাঙের ছাতার মতো শুধু বেড়েই চলেছে । আর ভালো একটি বিজ্ঞাপন নির্মানের জন্য চাই ভালো নামকরা সব মডেলদের । যত নামকরা মডেলদের দিয়ে বিজ্ঞাপন করানো যাবে অর্থ্যাৎ প্রচারনা চালানো যাবে -পন্যের মান যা ই হোক, ব্যবসা হবে ফাটাফাটি -এটাই বিজ্ঞাপনের অর্থ্যাৎ প্রচারনার মূল ধর্ম ।

এখন আসা যাক মূল প্রসংগে অর্থ্যাৎ ‘ধর্ষনের’ ঘটনা বাড়ার আলোচনায় । এই শব্দটি দিয়ে চরম নির‍্যাতন ও সর্বোচ্চ অপমানকেই বুঝায় একজন নারীর ক্ষেত্রে এবং এটা একটি সর্বোচ্চ অপরাধমূলক কাজ । বর্তমানে দেশে এই নামের অপরাধটির ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে এবং প্রতিদিনই তার মাত্রা বেড়েই চলেছে । কিন্ত কি কারনে এই সর্বোচ্চ অপরাধমূলক কর্মটির বিস্তার দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা কি আমরা ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখেছি ? কোন সমস্যার সমাধান করতে চাইলে প্রথমেই সমস্যাটি তৈরীর সঠিক কারন খুজে বের করতে হবে এবং তারপরই সমাধানের চিন্তা করতে হবে । এই অপরাধমূলক কর্মটি দিনে দিনে বৃদ্ধি পাওয়ার আমি মূলত দুইটি প্রধান কারন চিহ্নিত করেছি ,যথা:-(১)ধর্ষনের ঘটনার ব্যাপক প্রচারনা (২) এই অপরাধের জন্য দ্রুত শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহন করতে না পারা ।

(১)ইন্টারনেট যুগে পুরুষদের যৌনাকাংখা তৈরীর ক্ষেত্র এমনিতেই তৈরী হয়ে আছে সর্বত্র যা হাত বাড়ালেই পাওয়া‌ যায় নিমিষের মধ্যেই , তার উপর যদি আবার উত্তেজনা সৃষ্টিকারী প্রচারনা চালানো হয় দেশের সর্বোচ্চ কর্তা-ব্যক্তিদের মাধ্যমেই, তখন এর বিস্তার লাভ করাটাই কি স্বাভাবিক নয় ? বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে স্বাধীনতা বিরোধী জামাত-শিবিরের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে ১৪দলীয় জোটসহ দেশের অধিকাংশ বুদ্ধিজীবিগন ভবিষ্যত পরিনতির কথা কোনরকম না ভেবেই ব্যাপক ভাবে জামাতীদের বিরুদ্ধ‍ে যুদ্ধকালীন সময়ে ধর্ষনের ঘটনা ঘটানোর দাবী করে আসছে প্রায় প্রতিনিয়ত বিভিন্ন প্রিন্টমিডিয়া ও এলেকট্টোনিক মিডিয়াগুলিতে । এমনকি আমাদের মাননীয়া প্রধানমন্ত্রীকেও প্রায় প্রতিনিয়তই জামাত প্রসংগ আসলেই টিভির খবরে বলতে শুনি,”আমার মা-বোনদের যারা ধর্ষন করেছে‍ তাদের কোন রেহাই নেই ।” খুবই সত্য কথা । কিন্ত আপনার দাবী করা মা-বোনরা যে আপনার নিজের আপন মা-বোন না এই কথাটি এই দেশের অশিক্ষিত জনগোষ্ঠির কতজন লোক বুঝতে পারছে ? আপনার নিজের মা-বোন যদি অনুরুপ ঘটনার শিকার হতো তাহলে কি আপনি এখন যেভাবে প্রিন্ট ও এলেকট্রোনিক মিডিয়ার সামনে অত্যন্ত জোরালো কন্ঠে বলে বেড়ান, তা বলতে পারতেন ? এমন একটি ধর্ষিতার উদাহরনও কি আপনি দিতে পারবেন‍, ‍যে আপনার মতো করে মিডিয়ের সামনে নিজেকে ধর্ষিত হিসাবে প্রকাশ করতে ? পারবেন কি দেখাতে ধর্ষিতার কোন মা-বাবা বা ভাই-বোনকে, নিজের কন্যার বা বোনের ধর্ষিত হবার কথা মিডিয়ায় আপনার মতো করে বলে বেড়াতে ? আপনি প্রধানমন্ত্রী হয়ে যখন কোন কথা সাংবাদিকদের সামনে বলেন, তখন ঐ কথাটি বিদ্যুতের গতিতে দেশ-বিদেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে মুহুর্তের মধ্যেই, এই কথাটি কি মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী আপনার নলেজে নাই ? মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দাবীকৃত মা-বোনদের ধর্ষিত হওয়ার ৪২ বছর পর‍ যদি বিচার কাজ সবে মাত্র শুরু হয়, তবে বর্তমান সময়ে সংঘঠিত অপরাধ সমূহের বিচার কোনদিনও হওয়ার কি কোন সম্ভাবনা থাকে ? অনুরুপ অসচেতনভাবে শীর্ষ রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সকল শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবিগন প্রায় প্রতিনিয়ত স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে সংঘঠিত ধর্ষন ঘটনাগুলির বার বার জনসম্মুখে, পত্রপত্রিকা ও বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে তুলে ধরে প্রকান্তরে ধর্ষন শব্দটিকে সকলের কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিত বা জনপ্রিয় করে তুলছেন যা বর্তমানের ধর্ষন ঘটনার মহামারীর আকার ধারন করার পিছনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখছে বলেই আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি । তাছাড়া যিনি ধর্ষিত হন, তিনি আমাদের সমাজে কলংকিত হিসাবেই সকলের কাছে মূল্যায়ীত হয়ে থাকেন । আর দশটা নারীর মতো স্বাভাবিক জীবন তাদের কাছে অধরা । তাইতো অনেক নারী ধর্ষিত হওয়ার পরে ভবিষ্যতের যন্ত্রনাময় জীবন বয়ে বেড়ানোর ভয়ে আত্নহত্যার পথ বেছে নেয় । কতটা কষ্টে, কতটা অপমানিত হলে এবং কতটা অসহায় হলে পড়ে একজন নারীকে আত্নহত্যার পথ বেছে নিতে হয়, তা কি আমাদের মহান রাজনীতিবিদেরা ও বুদ্ধিজীবিগন উপলদ্ধি করতে পারেন ? আপনারা যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত, আপনারা কেন বার বার ধর্ষন করেছে, ধর্ষন করেছে বলে চিৎকার চেচামেচি করেন ? কাকে শুনান আমাদের নির‍্যাতিত নারীদের অপনানিত হওয়ার কথা ? বিয়াল্লিশ বছরে একজন ধর্ষনকারীর বিচারও তো করতে পারেন নাই কিন্ত ভূক্তভোগীদের ঠিকই প্রতিনিয়ত অপমান করে চলেছেন । স্বাধীনতা যুদ্ধে সম্ভ্রমহারা নারীরা যতটানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তারচেয়ে অনেক বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে স্বাধীনতার পরে এই ৪১ বছরে ধর্ষন ঘটনাকে নিয়ে রাজনীতি করার কারনে । এমন একজন রাজনীতিবিদও কি আছেন‍, ‍‍ যার মা-বোন ধর্ষিত হয়েছে আর তিনি তা বার বার টিভি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সকলের উদ্দেশ্যে তুলে ধরেছেন ? তাছাড়া আল কোরআনে বর্নিত আছে,‍ যে অন্যের দোষ ত্রুটি গোপন রাখবে, রোজ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তার দোষত্রুটি গোপন রাখবেন । অথচ আমরা কি করি ? কোন ধর্ষনের ঘটনার খবর পেলে সবাই যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ি ঐ ঘটনার আদ্যোপান্ত জানার জন্য ও সকলকে তা জানানোর জন্য । একবারও ভাবি না এই ঘটনাটি ব্যাপকভাবে জানাজানি হয়ে পড়লে ভূক্তভোগীর কি হবে ? এই ক্ষেত্রে সবাইকে নিজেদের পরিবারের সদস্যদের বেলায় অনুরুপ ঘটনা ঘটলে কি করতেন বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সকলের প্রতি অনুরোধ করছি ।
(২) সকলে খুব খেয়াল করে দেখবেন যে প্রতিদিন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও টিভি মাধ্যমে আমরা কতগুলি ধর্ষনের ঘটনার খবর পাই, পক্ষান্তরে কতগুলি ধর্ষনের ঘটনার বিচারে সাজা হওয়ার খবর পাই । তাহলেই আমরা খুব সহজে বুঝতে পারব ধর্ষনকারীর শাস্তী হওয়ার প্রকৃত চিত্র । আমাদের দেশের সরকারী ব্যবস্থাপনায় অর্থ্যাৎ পুলিশ ও আইন-আদালতের মাধ্যমে ধর্ষনকারীকে সাজা দেওয়া আসমানের চাঁদ হাতে পাওয়ার চেয়েও কঠিন কাজ । আর সামাজিক বিচারের অবস্থা তো আরও করুন । ধর্ষনকারীর সামাজিক বিচার তো তৃনমূল রাজনৈতিক নেতাদের অর্থ উপার্জনের একটা ভালো উপলক্ষ মাত্র । আমি যে এলাকায় বসবাস করি সেই এলাকায় সংঘঠিত ও প্রকাশিত তিনটি ধর্ষন ঘটনার বিচারের নমুনা শুনলে সামাজিক বিচারের আসল চিত্র সকলের কাছে পরিস্কার হয়ে যাবে । একটি পাঁচ বছরের শিশু ধর্ষনের ঘটনার সামাজিক ও রাজনৈতিক বিচারে ধর্ষনকারীর জরিমানা হয় পনের হাজার টাকা মাত্র যাও আবার যায় সংশ্লিষ্ট থানার তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তার পকেটে । দ্বিতীয় ঘটনায় কারাখানার মালিক কর্তৃক নারী শ্রমিক ধর্ষনের ঘটনায় ধর্ষনকারীর সামাজিক ও রাজনৈতিক বিচারে জরিমানা হয় ৫০হাজার টাকা‍, যার অর্ধেক‍ যায় ধর্ষিতার কাছে, বাকী অর্ধেক‍ যায় বিচারপতি ও পুলিশ কর্মকর্তাদের পকেটে । তৃতীয় ঘটনায় বাড়িওয়ালার ছেলে ও ছেলের বন্ধু কর্তৃক স্কুল শিক্ষিকা বাড়াটিয়ার ধর্ষিত হওয়ার ঘটনায় ধর্ষকদের জরিমানা ৫০হাজার টাকা‍, যার পুরুটাই আবার‍ যায় রাজনৈতিক বিচারকের পকেটে ও প্রশাসনকে ম্যানেজ করতে এবং সেই সাথে স্কুলের চাকরিটাও খুয়াতে হয় সেই নির‍্যাতিতের, কারন বিচারকের স্কুলেরই শিক্ষিকা ছিলেন তিনি । এই হলো আমাদের দেশের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বিচার ব্যবস্থার নমুনা । বলেন তো কার ভরসা আছে এই বিচার ব্যবস্থার উপর ?

সুতারাং আমার পরামর্শ হলো‍: যার‍ যার পরিবারের নারী সদস্যদের নিজ উদ্যোগেই এবং নিজ দায়িত্বে সম্ভ্রম রক্ষার ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে । কারন রাষ্ট্র ও সমাজ শুধু পারবে সম্ভ্রম হারাদের অপমানের মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দিতে ।