ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

এক:

ছেলেবেলায় সুমন আমার হাতের রেখা দেখে বলেছিল, আমার নাকি বিদেশ যাত্রার যোগ আছে। সেই থেকে অপেক্ষার পালা। বিদেশের স্বপ্নে বিভোর! চোখের পর্দায় ভেসে ওঠে জাপান, জার্মান, সুইডেন, দুবাই আর স্বপ্নের দেশ আমেরিকা। এই ভাবে কুড়িটা বছর পেরিয়ে গেল।

পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছে, যাদের ভালো কোনো কিছু সহজে হয় না। আমি মানুষটাও সেই শ্রেনীভুক্ত।   ধরা যাক সবাই মিলে প্ল্যান করলাম টেকনাফ যাব।  সবকিছু ঠিকঠাক। সকাল ৬টায় গাড়ি। ঠিক শেষ মুহুর্তে দেখা যাবে আমার জুতোর সোল্ ফেটে গ্যাছে। তারপর যা হবার তাই। সবাই চলে গেল, আমি নতুন জুতো কিনে পরদিন রওনা দিব।

সেই আমার কপাল বোধয় খুলতে যাচ্ছে,  হঠাত সুমনের ফোন ! অনেকটা টেলিগ্রামের মত। `আশরাফ তোমার CV আমার Gmail এ send কর, bye’।

সপ্তাহ খানেক পরে আমার মোবাইল বেজে ওঠে। Display তে তাকিয়ে বুকটা ধক করে উঠলো। দেখি বিদেশী নম্বর। আমার যে রকম কপাল! আমি তখন একটা পাবলিক বাসের রড ধরে দাঁড়িয়ে। এদিকে বাসের ভিতর তখন হাসিনা-খালেদা’র বংশ উদ্ধার হচ্ছে, আমেরিকার বিশ্ব মাতব্বরি নিয়ে কেউ কেউ গলা ফাটাচ্ছে, বেগুন এর বাজারদর নিয়ে আলোকপাত হচ্ছে।

বাম হাত দিয়ে বাম কান চেপে ধরে আর ডান হাতটা দিয়ে কোনরকমে ফোনটা ডান কানে চেপে কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম, `হ্যালো’।  অপর প্রান্ত থেকে কেউ একজন বললেন,  `Is it Syed there? I’m calling from AWCC. Is it good time to talk to you?  আমি কোনো রকমে শুধু বলতে পারলাম ২ ঘন্টা পরে কল দিতে।
হায়রে কপাল! জীবনের প্রথম বিদেশী চাকরির ইন্টারভিউ, সেটাও বুঝি ফসকে গেল! পাশ দিয়ে একটা মিশুক চলে গেল।  মিশুকের পিছনে লেখা – `নিরাশ হইওনা, যদি মুমিন হও – ফিটন” ।

সত্যি সত্যি আমাকে নিরাশ না করে ভদ্র্রলোক ঠিক ২ ঘন্টা পরে আবার ফোন দিলেন। ২০ মিনিটের ইন্টারভিউ এ আমার চাকরিটা হয়ে গেল।

বিদেশে চাকরি, ভালো বেতন, বছরে ২ বার ছুটি। এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে! কিন্তু এই প্রথম বোধয় কোনো বাঙালী নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার ভীষণ কষ্ট পেল এই খুশির খবরে।

বাসার কেউ রাজী না। মা, বউ, ভাই, আন্তীয়, স্বজন, বন্ধু, বান্ধব.. কেউ না।  আমার মায়ের চেহারা দেখে মনে হলো, আমি বোধয় one way ticket নিয়ে মঙ্গল গ্রহে যাচ্ছি। ভাই বলে, টাকার চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশী। নানা জনের নানা আপত্তি। ব্যতিক্রম শুধু আমার ছেলে মেয়ে আর আমার শ্বশুর। বাবা বিদেশ যাবে, ঋতুর বাবার মত অনেক চকলেট আনবে, খেলনা আনবে, এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে! আর আমার শ্বশুর, যিনি তাবলিগ জামাতের একনিষ্ঠ সাথী, উনার নিরেট সত্যি উচ্চারণ – `কপালে যেখানে মউত আছে সেখানেই হবে, চিন্তার কিছু নেই’। এই ধ্রুব সত্যি কথাটার উপর চরম আস্থা রেখে আমি বিদেশ যাত্রার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম।

সবাই আল্লাহ’র উপর ভরসা করে আমায় অনুমতি দিলেন।কিন্তু কেন এত আপত্তি?  যেখানে মানুষ বিদেশ গেলে সবাই খুশি হয়, আনন্দিত হয়, শুভেচ্ছা জানায় – আমার ক্ষেত্রে কেন তার ব্যতিক্রম? কারণ, আমি যাচ্ছি আফগানিস্তান!

মনে মনে সুমন কে বলি এই তোর্ বিদেশ!

দুই:

তবুও আবার স্বপ্ন দেখি। এইবার কল্পনার দৃশ্যপটের পরিবর্তন।  আলোকোজ্জল নিউয়র্ক শহরের বদলে কাবুলের অন্ধকার রাস্তায় মেশিনগান হাতে আততায়ী, মিনি স্কার্ট পরিহিত তরুণীর বদলে আপাদমস্তক বোরকায় ঢাকা আফগান নারী, নামী দামী গাড়ির বদলে ট্যাঙ্কের মহড়া। স্বপ্নের রূপান্তর দু:স্বপ্নে!

যাই হোক, নির্দিষ্ট দিনে আফগানিস্তানের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। ঢাকা থেকে মুম্বাই, দুবাই হয়ে কাবুল। অনেক লম্বা পথ। মাঝখানে দুবাই এয়ারপোর্ট এ ৭ ঘন্টার বিরতি। খাওয়া দাওয়া, হালকা কেনাকাটা, কানেক্টিং ফ্লাইট এর বোর্ডিং পাস সংগ্রহ আর লাগেজ ট্রান্সফার করতে ঘন্টা দুয়েক লেগে গেল। লাগেজ ট্রান্সফার করতে গিয়ে মহা ঝামেলা। ইনফরমেশন ডেস্ক এ যতই বলি আমি ঢাকা থেকে মুম্বাই হয়ে আসছি, ফাইনাল ডেস্টিনেশন কাবুল।  দয়া করে বলবেন আমার লাগেজটা কিভাবে ট্রান্সফার করব?  উত্তর এলো `মারহাবা’ যতবার জিজ্ঞেস করি, একই উত্তর `মারহাবা’। এ তো মহা ঝামেলা!  মনে মনে বলি `বেটা দুবাই তো আসি নাই, যাব কাবুল, এতে মারহাবার কি আছে’?  পরে বুঝলাম একটা সার্ভিস এজেন্ট আছে, যারা লাগেজ ট্রান্সফার এর কাজ করে। ওদের নাম `মারহাবা’। শেষ পর্যন্ত মারহাবার কাউন্টার খুঁজে পেয়ে সেই যাত্রা লাগেজ ট্রান্সফার এর ঝামেলা থেকে মুক্ত হলাম।

সুমনের কথা মত গরম কাপড়, হাত মোজা, টুপি সব হ্যান্ড ব্যাগে নেওয়া ছিল। তা না হলে কী যে বিপদে পরতাম তা আল্লাহই জানেন।

ভোর ৫টায় কাবুল এয়ারপোর্ট এ ল্যান্ড করলাম। প্লেন থেকে যখন নামলাম মনে হলো ঠান্ডায় জমে যাব! টার্মার্ক থেকে টার্মিনাল পর্যন্ত হেঁটে যেতে হাত পা প্রায় অবশ হয়ে গেল। ইমেগ্রেশন কাউন্টার এ আফগান পুলিশ এর মুখোমুখি। পাসপোর্ট এ নাম দেখে বললো ` You are muslim’?  You are syed?    আমি বললাম Yes.   যেখানে সবার লাগছে ৫ থেকে ১০ মিনিট, আমার লাগলো ২ মিনিট। একে তো মুসলমান তার উপর সৈয়দ।

টার্মিনাল এর বাইরে এসে দেখি আমার অফিসের একজন ফিলিপিনো অফিসার `রোলানো’ আমার নামের প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।  তার সাথে আমার জন্য অফিস থেকে বরাদ্দ করা গেস্ট হাউস এর উদ্দেশ্যে গাড়িতে উঠলাম।

সকালের কাবুলের রাস্তার দৃশ্য অসাধারণ। চারিদিকে বরফে ঢাকা পাহাড়, ঝকঝকে চওড়া রাস্তা, দামী দামী গাড়ি সবাই নিয়ম মেনে চলছে। মাঝে মাঝে মার্কিন আর্মির কনভয়। দুইপাশে বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড, মাথায় পাগড়ী বাঁধা পথচারী। মোড়ে মোড়ে রুটির দোকান। বড় রাস্তার পাশে বিশাল একটা মসজিদ। দেখার মত কারুকার্য। ইসলামিক ক্যালিগ্রাফি দিয়ে সাজানো মসজিদের গম্বুজ। চোখ ফেরানো যায় না। মসজিদ এর সাথেই লাগোয়া বিশ্ববিদ্যালয়। বিশাল ক্যাম্পাস, ছাত্রাবাস। পরে শুনেছি, এটা ইরান সরকার এর অর্থায়নে এবং তত্ত্বাবধানে নির্মিত।

আমাদের গেস্ট হাউসটা একটা সিকিউর্ড এরিয়াতে। `সড়ক এ শুরা’ বা পার্লামেন্ট রোড। আমাদের ডান পাশে আফগান পার্লামেন্ট, সামনে পার্লামেন্ট মেম্বার এর বাড়ি আর পিছনে আফগান ভাইস প্রেসিডেন্ট এর বাড়ি। আমার কাছে মনে হলো `নিরাপদ’ নাম নিয়ে সব থেকে `অনিরাপদ’ স্থান।

তিন:

গেস্ট হাউসে ঢুকতেই আফগান কেয়ারটেকার `মোক্তার’ এর মুখোমুখি। রোলানো আমাকে তার হাতে গছিয়ে দিয়ে চলে গেল । আমার জীবনের প্রথম আফগান। মোক্তার আমার ব্যাগ নিয়ে আমাকে দোতলায় পৌঁছে দিল। আমার রুম চিনিয়ে দিল। ঘরের চাবি দিতে দিতে বলল – ` I Mokter. I friend, you friend. All Friend.’

নিজেকে কোন রকমে সামলে নিয়ে বললাম, `তুমি উর্দু জানো? (এখানে অনেকেই উর্দু জানে) তার ধ্ব্নাত্ব্ক উত্তরে প্রাণে পানি এলো। মোক্তার কে ১০ ডলার এর একটা নোট্ দিয়ে বললাম, `মুঝে বহত ভূখ লাগা, কুচ খানা লেকে আও’। মোক্তার ১০ ডলার এর বিনিময়ে আমার জন্য ১টা নান রুটি আর দুম্বার কাবাব এনে দিল, যার প্রকৃত মূল্য ২ ডলার। (পৃথিবীর সব দেশেই এই শ্রেণীর লোকগুলো বোধ হয় একই রকম হয়)

এখানকার নান রুটি দেখবার মত! ক্রিকেটের উইকেট কীপার এর প্যাডের সাইজ। ইচ্ছা করলে ২ ভাঁজ করে বালিশও বানানো যাবে। যেমন বড়, তেমন মোটা। দুম্বার মাংশে উত্কট গন্ধ। মুখে তোলা যায় না। নিজেকে অসহায় মনে হলো।

এমন সময় সুমনের আগমন। ওরা সবাই সাপ্তাহিক বাজার করতে বাইরে গিয়েছিল। ফেরার সময় কাবুলের একটা দামী রেঁস্তরা থেকে আমার জন্য বার্গার নিয়ে এসেছে । যাক বাবা বাঁচা গেল, অন্তত ওই গন্ধওয়ালা দুম্বার মাংশ আর খেতে হবে না। একে একে সবার সাথে পরিচয়- সাজ্জাদ, আহসান, জীবন,শফিক ভাই (যদিও উনি নিজের নাম বলেন `সফিক’ শুদ্ধ রাহশাহী উচ্চারণে।)  এরা সবাই বাংলাদেশী। সবাই আমাকে সাদরে গ্রহণ করলো। ধীরে ধীরে জানলাম, এই গেস্ট হাউস এ আরো লোক থাকে। নানান দেশের। পাকিস্তানী, নেপালী, মালেশিয়ান, আমারিকান এবং আফগানিস্তান এর অন্য প্রদেশ থেকে আসা একজন ইঞ্জিনিয়ার।

আমাদের জন্য ২ জন বাবুর্চি, ২ জন ক্লিনার, ১ জন মালি, ১ জন ধোপা আর বেশ কিছু নিরাপত্তা প্রহরী বরাদ্দ। এরাও বেশ আন্তরিক, পরিশ্রমী আবার কেউ কেউ একটু ফাঁকিবাজও আছে। এদের অনেকের পারিবারিক অবস্থা ভালো, নিজেদের যথেষ্ঠ স্থাবর সম্পত্তি আছে। আমাদের বাবুর্চি আছে যে তার নিজের গাড়ি চালিয়ে কাজে আসে। শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতার অভাবে ভালো কাজ পায় না। তাছাড়া কাজের স্কোপও  তেমন নায়। বছরের পর বছর যুদ্ধ এদের উন্নতির প্রধান বাধা। বিদেশী বিনিয়োগ নায়, কল কারখানা নায়। বেকারত্বের অভিশাপে এর জর্জরিত। তালেবান শাসনামলের পরে এখন অবশ্য কিছু কিছু বিনিয়োগ হচ্ছে। বিদেশীরা আসছে, নতুন নতুন ব্যবসায় চালু হচ্ছে। কর্মসংস্থানের পথ উন্মুক্ত হচ্ছে।

নিরাপত্তার খাতিরে আমাদের অনেক নিয়ম কানুনের মধ্যে থাকতে হয়। অফিস আর গেস্ট হাউস ছাড়া অন্য কোথাও বের হওয়া বারণ।  কোথাও যেতে হলে অফিস এর সিকিউরিটি বিভাগ থেকে পূর্ব অনুমতি নিতে হয়।  তারা শহরের পরিস্থিতির উপর আমাদের অনুমতি প্রদান করে।  বন্দী জীবন।  ছকে বাঁধা।  শুধু মাসে ২ বার শপিং এ বের হতে পারি। অফিসের গাড়ি আসে।  কখনো কখনো সব বন্ধ।  অফিস ছুটি, কারণ সিকিউরিটি এলার্ট আছে।  নিরাপত্তা বিভাগের কাছে তথ্য আছে যে, কাবুল এ এটাক হতে পারে।  সুইসাইড বম্বার নাকি কাবুলে প্রবেশ করেছে।

মাঝে মধ্যে তথ্য সঠিক হয়। এইরকম এক এল্যার্ট এ একবার কাবুল চিড়িয়াখানায় আক্রমন হলো। প্রায় দশ বারো জন নিরীহ আফগানি প্রাণ হারালো।  হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল এ আক্রমন হলো, সরকারী হিসাবে ১০০ জনের মত মৃত্যু, তার মধ্যে ৫ জন বিদেশী। ফায়েনেস্ট বলে ১টা সুপার স্টোর আছে, বেশির ভাগ ক্রেতাই বিদেশী। সেখানে আমেরিকান আর্মির এক অফিসার কে লক্ষ্য করে সুইসাইড এটাক, ফলাফল – ১ আমারিকান সহ মোট ৭ জনের প্রাণহানি। বেশির ভাগ আক্রমনেই দেখা যায় শতকরা ৯৫ ভাগ আফগানি মারা যায়।  তবুও কী কারণে এরা এইসব আক্রমন করে, আমার মাথায় ঢোকে না।

মৃত্যু এখানে খুব সাধারণ ব্যাপার। প্রতিদিন লোক মারা যাচ্ছে, পঙ্গু হচ্ছে – তারপরও জীবনযাত্রার কোনো ব্যাঘাত নায়। মানুষের মধ্যে শোকের মাত্রা কমে গ্যাছে। আমি দেখেছি, মাঝে মধ্যে আমার অফিসের স্থানীয় সহকর্মীরা ১০ মিনিটের ছুটি নিয়ে প্রার্থনা সভায় যায়, বুকের বাম পাশে হাত রেখে পবিত্র কুরআনের কিছু আয়াত পাঠ করে ফিরে আসে। কারো পরিবারের কেউ গতকালের আক্রমনে মারা গ্যাছে।

চার:

যেহেতু আমরা সবাই নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা, আফগানিস্তানের অন্যান্য অঞ্চল আমাদের অজানা। আমাদের জ্ঞানের পরিধি কেবল কাবুলেই সীমাবদ্ধ। বিশাল দেশ। এতবড় দেশ, যার সীমান্ত ৬টা দেশের সাথে সংযুক্ত। ২ দিকে পাকিস্তান, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কিমিনিস্তান, ইরান এবং চীন। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা করা কষ্টসাধ্য। আমাদের দেশে মাত্র ভারত এর সাথে সীমান্ত, তাতেই আমরা আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারি না। প্রায় প্রতিদিনই BSF এর হাতে নিরীহ বাংলাদেশীর মৃত্যুর খবর থাকে। সে তুলনায় আফগানিস্তান এর প্রতিবেশী দেশ  গুলো বেশ সহনশীল বলে মনে হয়। শুধু পাকিস্তান বর্ডার এ একটু বেশি নজর দিতে হয়, কারণ এই বর্ডার দিয়ে নাকি পাকিস্তান থেকে তালিবানরা প্রবেশ করে, অস্ত্র আসে।

কান্দাহার বলে আফগানিস্তানের একটা প্রদেশ আছে যেখানে এখনো তালিবানদের আধিপত্য। ISAF বা NATO বাহিনীর বিশাল ঘাঁটি এইখানে, তবুও তালিবানদের সাথে ওরা পেরে উঠছে না।  রাস্তার পাশে পুঁতে রাখা বোমার বিস্ফোরণে প্রায় আমেরিকান সেনার লোক হতাহত হয়। কান্দাহারে সবাইকে স্থানীয় পোশাক পরে বেরোতে হয়, নইলে অপহরণ হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

আমার রুমমেট জীবনকে প্রায় কান্দাহার যেতে হয়। ও একজন RF ইঞ্জিনিয়ার। যাবার আগে সবার কাছ থেকে মোটামুটি শেষ বিদায় নিয়ে যায়। আমরা ওর ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকি।  আল্লাহর রহমতে ও ফিরে আসে। এখানে মুসলমান বিদেশী হলে ভয় কম।  তাই জীবনকে যখন কোনো স্থানীয় লোক ওর নাম জিজ্ঞেস করে ` চি নম আস্ত?’ জীবন বেশ মজা করে ওর নাম বলে – ` মা জিন্দেগী আস্তুম’। জীবন এর মুসলমান সংস্করণ। আর আমি তো মোটামুটি সম্মানিত ব্যক্তি। একে মুসলমান তার উপর সৈয়দ। একবার এক দোকানে আমার আর জীবনের এর সাথে এক আফগান পুলিশের পরিচয়। কথা প্রসঙ্গে পুলিশ জানতে পারে আমরা মুসলমান এবং বাংলাদেশী। (বাংলাদেশীদের আফগানিরা বেশ পছন্দ করে) ভদ্রলোক তখন আমাদের তাঁর সাথে না নিয়ে যাবেনই না। তাঁর সাথে ক্যাম্পে যেতে হবে, ডিনার করতে হবে।

কাবুল শহরটা বেশ সাজানো গোছানো। বড় বড় রাস্তা। একই ধরনের বাড়ি ঘর।  চারপাশে উঁচু উঁচু পাহাড়।  পাহাড়ের উপর সারি সারি বাড়ি।  সমতল ভূমি থেকে সুন্দর সুন্দর রাস্তা উঠে গ্যাছে পাহাড়ে। শুনেছি এই শহরের পুরো প্ল্যান নাকি রাশিয়ানদের করা। রাশিয়া যখন এইদেশ শাসন করত, তখন শহরের অনেক structural design নাকি তারাই করে গ্যাছে। অনেক জ্যায়্গা আছে যা আমাদের পুরনো ঢাকার সাথে মিলে যায়।  আমি অনেক এলাকা দেখেছি যা আমাদের ঢাকার গুলিস্তান, চকবাজার, কারওয়ানবাজার এর মত।  পুরনো ঢাকার ঘর বাড়ির মত জমকালো বাড়ি।  মেয়েদের সাজসজ্জাও পুরনো ঢাকার মেয়েদের মত চকচকে।

এখানে পানির বেশ অভাব। নদী নালা চোখে পরে না।  কাবুল নদী বলে একটা নদী আছে যা আমাদের গুলশান লেকের মত।  তাতে আবার পানি থাকে না, শুষ্ক।  গভীর নলকূপ দিয়ে মাটির অনেক গভীর থেকে পানি তোলা হয়। শীতের সময় যে বরফ পরে তা মাটির গভীরে গিয়ে সঞ্চিত হয়, সেটাই পানির মূল আধার।

শহরের মধ্যে গোসলখানা আছে, স্থানীয় ভাষায় `হামাম খানা’।  পাহাড়ের লোকেরা সেইখানে এসে গোসল করে। এই হামাম খানায় সাবান থেকে শুরু করে তেল, শ্যাম্পু, পেস্ট, ব্রাশ সবকিছু কিনতে পাওয়া যায়।

প্রথম প্রথম মনে হতো এদেশের মানুষ বোধ হয় খুব নোংরা।  গা দিয়ে বিকট গন্ধ।  গোসল করে না।  এতোই গন্ধ যে পাশে বসা যায় না।  আমার এক ভারতীয় সহকর্মী এদের গায়ের গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে বলেছিল – ` ই লোগ জিন্দিগিমে সির্ফ দোবার নাহাতে হ্যায়, প্যায়দা হোনে কে বাদ আউর ম্যরনে কে বাদ’। পরে বুঝেছি পানির অভাবে এদের এই অবস্থা।

পাঁচ:

আফগান জাতি খুবই সৌজন্য পরায়ন। যতবারই দেখা হোক কুশলাদি জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে একটি অন্যতম ভদ্রতা।  এখন যার সাথে দেখা হলো ২ মিনিট পরে আবার তার সাথে দেখা হলে, সেই একই কুশলাদী।  এই কুশল জিজ্ঞাসা আবার একটা বিশাল কবিতা।  চতুর্দশপদী।  যেমন কারো সাথে দেখা হলো, আপনি বলে উঠবেন … `সালামালেকুম, শুমা চতুরাস্তি? খুবাস্তি? জানে জুরাস্ত, খনা খায়রাতি?  বিবি বাছা খুবাস্ত? সেহেত মান খুবাস্ত? জিন্দা বশী’। মানে হলো ` স্লামালেকুম, আপনি কেমন আছেন? ভালো তো? শরীর এবং মন ভালো? বাসার  সবাই ভালো আছেন তো? স্ত্রী, সন্তান ভালো?  বেঁচে থাকুন’। মজার ব্যাপার হলো অপরজন কিন্তু এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর দিবে না, প্রতিউত্তরে সেও একই প্রশ্ন অপরজনকে করে যাবে।  টানা ৩০ সেকেন্ড।  একটা ঘটনা এখানে প্রচলিত আছে, `কে হতে চায় কোটিপতি’ এই রিয়েলিটি শোটি এখানকার টেলেভিশনেও হয়েছিল। ৩টি লাইফ লাইনের যেটি `ফোন আ ফ্রেন্ড’ সেটি নাকি কেও ব্যবহার করতে পারে নায়, কারণ ৩০ সেকেন্ড এর পুরোটায় চলে যায় এই কুশলাদি জিজ্ঞাসাতে, প্রশ্নটা করার আর সময় থাকে না।

আমার জানামতে আফগানিস্তান সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র রাষ্ট্র, যার পতাকা সরকার বদলের সাথে সাথে বদলায়। এখন চলছে কারজাই শাসনামলের পতাকা, এর আগে ছিল তালিবান পতাকা।  তার আগে যতগুলো সরকার ছিল, সবার আমলেই আলাদা আলাদা পতাকা ছিল।  রাজনীতির ব্যাপারে এই জাতি বেশ উদাসীন বলে মনে হয়।  বাংলাদেশে যেমন কথায় কথায় মিছিল, মিটিং, রাস্তা অবরোধ, হরতাল এখানে সেসব কিছু নায়। আমি যতদিন আফগানিস্তানে ছিলাম, এইসবের কিছুই দেখি নাই।  এমনকি নির্বাচনের সময়ও আমরা কিছু বুঝতে পারি না যে, দেশে নির্বাচন হচ্ছে।  কারো কোনো মাথা ব্যথা নায়।  শুধু কিছু পোস্টার দেখেছি, বিলবোর্ড দেখেছি, তাও নির্দির্ষ্ট স্থানে।  রাস্তায়, বাজারে, অফিসে কিম্বা আড্ডায় কেউ রাজনীতি নিয়ে কোনো আলোচনা করে না।  এখানে রাজনীতি শুধুই পার্লামেন্টে।  সাধারণ নাগরিকের অসুবিধা হয় এমন কিছু এরা করে না।  আর আমাদের দেশের মহান রাজনীতিবিদরা জাতি  জাতি করে, প্রতিদিন জাতিকে ধর্ষণ করে নিজেদের আখের গোছান। জাতি পরে থাকে অন্ধকার গর্তে।

আফগানিস্তান ৩০ বছর ধরে বিভিন্ন বিদেশী শত্রুর সাথে যুদ্ধ করেছে।  নিজের দেশের কৃষি উত্পাদন বলতে যা বোঝায় তা নায়, কলকারখানা নায়, আমদানির উপর নির্ভর করে পুরো দেশের অর্থনীতির চাকা।  অথচ সেই দেশের মার্কিন ডলার এর মান ৪৮ টাকা আর আমার দেশে ৮০ টাকা।

দুর্নীতি এই দেশেও আছে, তবে নির্দির্ষ্ট একটা গন্ডির মধ্যে। ক্ষমতার উঁচুতে যাঁরা আছেন তাঁরা দুর্নীতির সাথে জড়িত, প্রভাবশালী ব্যবসায়ীমহল জড়িত। তাঁরাও তাঁদের অর্থ বিত্ত বাইরে পাচার করেন, দুবাই এ  আবাস গড়েন, কিন্তু আমাদের দেশের তুলনায় তা নস্যি। এখানে ট্যাক্সি ড্রাইভার বাড়তি ভাড়া চাইবে না, কোনো অজুহাতে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়বে না, স্কুলে ভর্তি হতে অতিরিক্ত টাকা গুনতে হবে না, খাদ্যে ভেজাল দিবে না, একে অন্যকে ঠকাবে না।

আবার নিজেদের কথায় আসি, গেস্ট হাউসে আমাদের আনন্দের বা রিক্রিয়েশন এর মাধ্যম হলো মাঝে মধ্যে পার্টি দেওয়া। দেশী খাবার রান্না করা, শীতের রাতে বারবিকিউ করা আর ইন্টারনেটে পরিজনদের সাথে কথা বলা।  বৃহস্পতিবার রাতে কার্ড খেলেও ভালো সময় কাটে।  এদেশে এসে নিজেকে অনেকটা নিয়মের মধ্যে বেঁধে ফেলেছি।  ছকে বাঁধা জীবন। চরিত্রের মধ্যে ভালো কিছু জিনিস সংযোজন হয়েছে।  তার একটা হলো জামাতে নামাজ আদায় করা।  শফিক ভাই মুয়াজ্জিন।  উনি `হায়্য়া লাস সালাহ’ উচ্চারণ করেন ‘হায়্য়া লাশ শালাহ’। উনার এই উচ্চারণে প্রথমদিকে আফগানিরা কিছুটা confused ছিল।

শফিক ভাইয়ের একটা গুনের কথা না বললেই নয়।  অসাধারণ রান্না করেন।  অসাধারণ শব্দটাও উনার জন্য কম হয়ে যায়।  আজকে, আমি যে নিজের হাতে রান্না করে খাচ্ছি, তার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব শফিক ভাইয়ের।  উনিই শিখিয়েছেন কিভাবে অল্প তেল মশলা দিয়েও ভালো রান্না করা যায়।  আজও শফিক ভাইয়ের রান্না’র স্বাদ মুখে লেগে আছে।

সৈয়দ মুজতবা আলীর গল্পে আফগানদের সরলতার অনেক উদাহরণ পাওয়া যায়, তার মধ্যে একটা গল্প ছিল কোনো এক আফগান নাকি চোর ধরে তার পা বেঁধে পুলিশে খবর দিতে গিয়েছিল, পরে পুলিশ এসে দেখে যে চোর বেটা ঐভাবে পা বাঁধা অবস্থায় বসে আছে, হাত দিয়ে পায়ের দড়ি খুলে পালায়নি।

এই রকম আরেক দৃশ্য দেখে মুজতবা আলীর সেই গল্পের কথা মনে পরে গেল।  সেদিন বেশ ঠান্ডা পড়েছে, ভালই বৃষ্টি পড়ছে। অফিস থেকে গেস্ট হাউসে ফিরে দেখি আমাদের বাগানের মালি গাছে পানি দিচ্ছে। মালিকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম – `কেয়া ভাই, আভি তো বারিশ হো রাহা হ্যায়, তুম পানি কিউ ডাল রাহা? মালির সরল উত্তর – ` নেহি সাব ই মেরা ডিউটি হ্যায়’। বুঝুন ঠ্যালা!

এই শ্রেণীর লোকগুলো কাজের প্রতি ভীষণ সিরিয়াস।  আমাদের যে ধোপা, যাকে আমরা লন্ড্রি কাকা বলি (কাকা কিন্তু মূলত ফার্সি শব্দ, বাংলা না ) উনাকে দেখলেই রবীন্দ্রনাথের কাবুলিওয়ালা গল্পের রহমতের কথা মনে পরে যায়।  ৬ ফুট লম্বা, রেসলিং এর বিগ শো এর মত সাস্থ্য, লম্বা দাড়ি, মাথায় আফগান পাগড়ি, কাবুলি কুর্তা-সেলওয়ার আর ঘাড়ে ঝুলানো রুমাল।  প্রকৃত আফগানি।  উনি উনার কাজের প্রতি এতটাই সৎ যে তা মাঝে মধ্যে আমাদের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।  উনার কাজ হচ্ছে আমাদের কাপড় ধোয়া, শুকানো আর ইস্তিরি করা।  এই ইস্তিরি করা নিয়েই বিপদ। উনাকে চাকরি দেবার সময় অফিস থেকে বলে দিয়েছে আমাদের কাপড় ধুয়ে ইস্তিরি করে আমাদের ঘরে রেখে দিতে হবে, কিন্তু কোন কোন কাপড় ইস্তিরি করতে হবে তার ব্যাপারে কিছু বলা ছিল না।  আর এই কারণেই লন্ড্রি কাকাকে বার বার বলা সত্তেও উনি আমাদের অন্তর্বাস ইস্তিরি করা বন্ধ করছেন না।  তাতে যা হবার তাই হচ্ছে – আমার অন্তর্বাসের সাইজ পরিবর্তিত হয়ে সাজ্জাদ ভাইয়ের মাপে হয়ে যাচ্ছে, আহসানের গেঞ্জি মাইক হোবান এর মাপে হয়ে যাচ্ছে। (মাইক হোবান আমাদের চীফ টেকনিকাল অফিসার যার নাকি প্লেন এ বিজনেস ক্লাস এর সিটেও স্থান সংকুলান হয় না )

এখানের মানুষগুলো এখনো বেশ conservative.  কিন্তু সেটা সম্ভবত শুধুই গ্রামের লোকজন কিম্বা তথাকথিত সভ্য সমাজের লোকেরা যাদেরকে নিচু শ্রেণীর মানুষ বলে আখ্যা দিয়ে থাকেন তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। শহরের লোকদের মধ্যে এক ধরনের ভন্ডামি লক্ষ্য করেছি।  গ্রামের মানুষগুলো ধর্মীয় ভাবেই গোঁড়া।  কিন্তু শহরের লোকেরা বাধ্য হয়ে এইসব নিয়ম মেনে চলে।  আমি দেখেছি, প্লেনে আমার আফগান সহযাত্রী যারা অন্য দেশ থেকে আসছে তারা প্লেনের ভিতরে জিন্স-টি-শার্ট পরে বসে আছে আর প্লেন থেকে নামার আগে বোরকা পরে নিচ্ছে। অফিসে কোনো মেয়ে সহকর্মীর সাথে করমর্দন করা নিষিদ্ধ, কোনো মেয়ে সহকর্মীর বাসায় যাওয়া নিষিদ্ধ, আবার অফিসের স্থানীয় বড় কর্তারা তাদের জুনিয়রদেরকে নিয়ে অফিসের কাজের নামে দুবাই ঘুরে আসে।  এইরকম অনেক বড় কর্তাকে দেখেছি সুযোগের নামে তারা কিভাবে তাদের জুনিয়রদের ব্যবহার করেছে।

তালিবান শাসনামল শেষ হয়েছে সেই কবে কিন্তু এখনো নারী স্বাধীনতা সেখানে দিল্লি দুরস্ত। পুরুষরা এখনো নারীদের ডমিনেট করে সামন্ততান্ত্রিক প্রথায়।  নারীর কোনো কথা গ্রহনযোগ্য নয়, পুরুষরা ইচ্ছা করলেই একাধিক বিয়ে করতে পারে। যার যত সন্তান সে তত বড় পুরুষ।  আমি নিজের চোখে দেখেছি,  কোনো ফ্যামিলি বেড়াতে বের হয়েছে, স্টেশন ওয়াগন গাড়িতে পুরুষরা বসে আছে গাড়ির সীটে আর মেয়েদেরকে বসিয়েছে গাড়ির পিছনে যেখানে মালপত্র রাখা হয়।

ছয়:

একবার কাবুল আক্রমন হলো।  সে এক কঠিন আক্রমন ! পার্লামেন্ট হাউসে, যা কিনা আমাদের গেস্ট হাউসের পাশেই। তখন পার্লামেন্টে সেশন চলছে। পাশের একটা বহুতল ভবনে ৪ জন তালিবান অবস্থান নিয়ে বৃষ্টির মত গুলি চালিয়ে যাচ্ছে আফগান সেনা বাহিনীর বিরুদ্ধে।  বিকাল থেকে শুরু করে ভোর ৪ টা পর্যন্ত যুদ্ধ।  অবশেষে রাত ৪টায় ISAF এর সেনা এসে হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে যুদ্ধ থামালো।  সে কী বিভীষিকাময় রাত! সারা রাত আমরা নির্ঘুম।  গুলির শব্দে আমাদের ঘরের জানালার কাঁচ ভেঙ্গে গেল। একটা রকেট এসে পড়ল আমাদের বাড়ির সামনে ডাস্টবিনে।  মাত্র ৪ জন তালিবান এতগুলো সেনার সঙ্গে টানা ১২ ঘন্টা যুদ্ধ চালিয়ে গেল যদিও তারা জানত যে তারা সবাই মারা যাবে।  পরে শুনেছি যে, তালিবানরা নাকি এই আক্রমনটা করেছে একটা অংক করার জন্য।  ওরা হিসাব করেছে ৪ জন তালিবান ২৫০ জন সেনার সাথে ১২ ঘন্টা যুদ্ধ করে টিকে ছিল, তাহলে পরবর্তিতে কতজন পাঠালে সম্পূর্ণ ২৫০ জন সেনাকে হত্যা করা যাবে।

আগেই বলেছি আমাদের বাইরে বেরোনো নিষেধ।  তাই বলে কি নিয়ম সব সময় মানতে হবে? নিয়ম ভাঙ্গার নিয়ম তো সবার জন্যই প্রযোজ্য।  আমরাও ব্যতিক্রম নই।  একবার খুব গোপনে আমরা কার্গায় লেক বলে একটা জায়গায় বেড়াতে গেলাম।  খুব সুন্দর জায়গা।  পাহাড়ের উপরে একটা লেক, রেস্তোরা। লেক থেকে জ্যান্ত  মাছ ধরে সেটা ফ্রাই করে দিচ্ছে।  ময়ুর ঘুরে বেড়াচ্ছে আমাদের পাশে পাশে।  এই প্রথম দেখলাম কোনো আফগান প্রেমিক প্রেমিকা হাত ধরে বসে আছে গাছের আড়ালে।  লেকের দুইপাশে নানা রকম দোকান। দুপুরে বেশ ভালো একটা লাঞ্চ হলো।  মুরগি আর দুম্বার কাবাব, কাবিলে পোলাও (যাকে আমরা কাবলি পোলাও বলে থাকি), মাছ ভাজা, নানা রকম ফল, সালাদ আর দই। অনেক ছবি তুললাম, কিন্তু facebooke এ কোনো ছবি পোস্ট করতে পারব না, ধরা পরে যাওয়ার ভয়ে।  সন্ধ্যার আগেই ফিরতে হবে, আমাদের বাসার নিরাপত্তা রক্ষীদের বলা আছে আমরা সন্ধার আগেই ফিরে আসব কারণ পরের শিফট এর নিরাপত্তা রক্ষী সন্ধ্যার সময় চলে আসবে আর আমরা ঘুষ দিয়েছিলাম এই শিফট এর রক্ষীদের।

দেখতে দেখতে শীত চলে এলো।  শীত কাকে বলে হাড়ে হাড়ে টের পেলাম কাবুলে এসে।  লোকজনের মন খুব খারাপ, এখনো snowfall হচ্ছে না কেন? বরফ সময়মত না পড়লে তো পানির সমস্যা হবে। Snowfall এর কথা শুনে আমার মনটাও যেন নেচে উঠলো।  ছবিতে দেখেছি, মুভিতে দেখেছি, এই প্রথম নিজের চোখে দেখব! হঠাত এক রাতে সুমন আমার দরজায় টোকা দিয়ে আমাকে ডেকে নিয়ে গেল, snowfall শুরু হয়েছে।  বাইরে ফ্লাড লাইটের আলোতে কী অপরূপ দেখাচ্ছে, তুলোর মত সাদা সাদা বরফ ঝরে পড়ছে।   ধীরে ধীরে সব গাছপালা, ঘরের ছাদ, রাস্তা –  শুভ্র বসন ধারণ করলো। যতদুর চোখ যায় শুধুই সাদা, দুরে পাহাড় গুলোর উপর মনে হয় কেউ যেন চুন বিছিয়ে রেখেছে।  টানা ২ মাস এই snowfall চলতে থাকলো।  এদিকে দিন যত যায় শীত এর কামড়ও তত বাড়ে। একসময় মইনাস ২০ ডিগ্রী পর্যন্ত নেমে গেল।  বাড়িতে, গাড়িতে, অফিসে সব জায়গায় বুখারী চালিয়ে রাখি (হিটার) । বাইরে বের হলে ২ টা করে প্যান্ট পরে নেই, হাত মোজা, পায়ে ডবল মোজা, মাথায় টুপি, গায়ে জ্যাকেট তার উপর ওভার কোট।  কাপড় এর ওজনেই নড়তে পারি না।  সবচেয়ে কষ্ট হয় যখন শীত চলে যায়, বরফ গলতে থাকে, বাতাস আসে।  হাড় কাঁপানো বাতাস। বরফ গলে কাবুল নদী পানিতে ভরে উঠে।

এই সময়টায় নেশাখোরদের একটা উত্পাত শুরু হয়।  একদিন গাড়িতে করে যাচ্ছি, হঠাত গাড়ির জানালায় একটা উস্কখুস্ক লোক এসে সাহায্য চাইল, আমি পকেটে হাত দিতেই আমাদের ড্রাইভার বলে উঠল ‘নেস্ত নেস্ত, ই নফর পোদারি আস্ত’। মানে হলো দিও না দিও না এই লোকটা হেরোইনখোর। (ইংরেজি শব্দ powder থেকে পাউডারী-পোদারি। হেরোইন এর গুড়ো ফর্ম)।  শীতের সময় এরা একধরনের মদ তৈরী করে, কিশমিশ দিয়ে।  নাম হলো `কিশমিষাও’। শরীর গরম রাখার জন্য ভালই। একদিন খেলাম, খারাপ না কিন্তু কেমন যেন একটা গন্ধ।  তবে শীত কমে, এটা সত্যি।

সাত:

আফগানিস্তানে উত্সবের আনন্দ তেমন একটা দেখা যায় না।  আমরা যেমন ঈদ, কুরবানীতে আনন্দে মেতে উঠি, এখানে তেমন কিছু চোখে পরে না।  তবে নববর্ষ আর মহররম এই দুইটা অনুষ্ঠান বেশ জমকালো ভাবেই উদযাপন করে।  রোজা চলে এলো।  আমাদের অফিস টাইমের পরিবর্তন হলো, সকাল ৭টা থেকে দুপর ১টা পর্যন্ত। দিনের বেলা খাওয়া দাওয়া একেবারে নিষিদ্ধ।  তবে অমুসলিম খারিজীদের (বিদেশীদের) জন্য এই নিয়ম শিথিল যোগ্য।  তারা বন্ধ ঘরে লুকিয়ে খেতে পারবে।  রেস্তোরা গুলো দিনের বেলা বন্ধ থাকে।  ইফতারের আগে নানা রকমের শরবতের দোকান বসে রাস্তার ধারে। এখানে রোজার মাসে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়ে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে কিছু কিছু জিনিসের দাম কমে যায়।

এদের ইফতারির ধরন আমাদের মত নয়।  যারা মোটামুটি সচ্ছল তারা নান রুটি, পোলাও, মুরগি কিম্বা দুম্বার কাবাব, সবজি, আর নানা রকমের ফল দিয়ে ইফতার শুরু করে।  আর যারা অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল তাদের মেনু হচ্ছে শুকনো রুটি আর টমেটোর জুস। আমরা অফিস থেকে ফিরে নামাজ পরে কিছুটা বিশ্রাম নেই তারপর সবাই মিলে ইফতার বানানোর কাজে লেগে পড়ি, বাংলা ইফতার।  ব্লেন্ডারে ডাল পিষে পিঁয়াজু, মাঝে মাঝে বেগুনী। এখানে আমাদের বুটের ডাল পাওয়া যায় না, এর বদলে `দালে নাখোদ’ বলে এক ধরনের ডাল পাওয়া যায়।  আর আছে নানা রকমের ফল। আম্রুত বলে এক ধরনের ফল আছে, বাংলা `অমৃত’ এর আফগান ভার্সন।  দেখতে অনেকটা টমেটোর মত।  যেমন মিষ্টি তেমনি রসালো।  খরবুজা বলে আরেকটা ফল পাওয়া যায়, আমাদের দেশের বাঙ্গির মত, খোসাটা অনেক পুরু, যেটা না হলে ইফতার অপূর্ণ থেকে যায়।  ফলের অভাব নেই, ইফতারের আগে আগে আমাদের বাগান থেকে আঙ্গুর আর আপেল পেড়ে আনি।  আর শরবত তো আছেই।

এইবার ঈদে এক আফগানির বাসায় আমাদের নিমন্ত্রণ ছিল।  আবার লুকিয়ে, গার্ডকে ম্যানেজ করে বের হলাম।  ঘরে ঢুকতেই ওয়েলকাম ড্রিংক – শরবত, তারপর একটা বড় প্লেটে (খোপ খোপ করা সিরামিক প্লেট) নানা রকম বাদাম, কিশমিশ, পেস্তা আর চকোলেট, সাথে সবুজ চা।  সবুজ চা এদের জীবনের সাথে মিশে আছে, যতক্ষণ জেগে থাকে এই চা পান করেই যায়।  দুপুরে সবাই মিলে খেতে বসলাম। আমাদের মত টেবিল চেয়ারে নয়, কার্পেট এর উপর দস্তরখান বিছানো, পাশে বড় বড় কোল বালিশ।  যেন কোনো রাজ দরবারে খেতে বসেছি।

কাবিলে পোলাও,  রুটি, ৪/৫ রকমের কাবাব, সবজি, ফলমূল, সালাদ আর টক দই এবং সবুজ চা।  গোপনে বিয়ারের বোতলও ছিল।  বিকালে সবাই মিলে একটা পার্কে বেড়াতে গেলাম।  আমাদের দেশে যেমন ঈদের দিনে শিশু পার্ক বা চিড়িয়াখানায় ভিড় দেখা যায়, এইখানেও সেইরকম।  সবাই পরিবার নিয়ে বেড়াতে এসেছে, বাচ্চারা ছুটোছুটি করছে, গাছের ফাঁকে ফাঁকে দুই একটা যুগলও চোখে পড়ল।  একটা জুসের দোকানে ঢুকলাম।  জুস, মানে প্রকৃত জুস।  আমের, কলার, আম্রুতের।  প্রথমে ফলটাকে ব্লেন্ড করে (কোনো রকম পানি ছাড়া) তারপর একটা বড় গ্লাসে ঢেলে দেয় সাথে ক্রিম আর বাদামের গুড়ো।  এত ঘন জুস কখনো খাই নি।

সন্ধ্যে হয়ে এলো, এবার ফিরতে হবে, নাহলে আবার সিকিউরিটির ঝামেলায় পড়তে হবে। ঈদের দিনটা খারাপ কাটল না !

আট:

আজ আমাদের অফিসের বর্ষপূর্তি। বিরাট আয়োজন।  হল ভাড়া করা হয়েছে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে, সাথে `এমপ্লয়ী অব দি ইয়ার’ পুরস্কার দেওয়া হবে। ২/৩ জন ছাড়া বেশিরভাগ তেলবাজরা এই পুরস্কারে ভুষিত হবে।  ডিপার্টমেন্ট থেকে যে লিস্ট দেওয়া হয় তাতে ২/১ জনের নাম ছাড়া বাকিদের নাম কাটা পরে স্থানীয় বড় কর্তাদের সিদ্ধান্তে।  আর হ্যা, যে কন্যারা বড় বাবুদের সাথে দুবাই ঘুরে এসেছে (অফিসের কাজে!!) তাদের নাম তো থাকতেই হবে।  যারা সত্যিকারের এই পুরস্কারের যোগ্য, তাদের মধ্যে কেউ কেউ যদি পেয়ে যায়, তারা তা  গ্রহণ করতে বেশ কুন্ঠা বোধ করে। পাছে তাদের নামের সাথেও তেলবাজ বিশেষণ জুড়ে যায় !  তো দুর্ঘটনাক্রমে এইবার এই তালিকায় সুমনের নাম চলে এলো।  সুমন কিভাবে যেন আগেই সেটা জেনে ফেলেছিল কিন্তু কাউকে বলে নি। অনুষ্ঠানের দিন সুমনের নাকি `স্টমাক আপসেট’ ফলে উনি অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত এবং উনার অবর্তমানে একই  ডিপার্টমেন্ট এর লোক হওয়ায় আমাকে উনার পুরস্কার গ্রহণ করতে হলো।  শুনেছি মানুষের কাছে সবচেয়ে ভারী বস্তু হলো পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ, এই ট্রফির ভারও কম না! অনেক যত্ন করে, যতটা সম্ভব লুকিয়ে, সুমনের সম্পদ সুমনকে হস্তান্তর করলাম। সুমন বুলেটের গতিতে সেটা আলমারিতে ঢুকিয়ে ফেলল।

রাতে সবাই খুব ক্লান্ত। যেহেতু ডিনার করে এসেছি, কোনরকমে ফ্রেশ হয়ে নামাজটা পরে সবাই ঘুমিয়ে পরলাম, শুধু আহসান বাদে।  আমেরিকাতে এখন সকাল, তাই আহসান ব্যস্ত হয়ে পড়বে চ্যাটিং এ!

হঠাত মাঝ রাতে আমার দরজায় আহসানের ধাক্কা।  `আশরাফ ভাই উঠেন উঠেন, আগুন লেগেছে’। তাড়াতাড়ি বের হয়ে দেখি বাইরেটা লাল আলোয় ভরে গাছে, আগুনের শিখা সাপের জিভের মত লক লক করছে।  এরমধ্যে অন্যরাও বের হয়ে এসছে, শুধু জীবন আর আমাদের আফগানি ইঞ্জিনিয়ার নাসির জান ছাড়া।  জীবনের ঘুম আর কুম্ভকর্ণের ঘুমের মধ্যে তেমন একটা ফারাক নায়। `জীবন উঠেন বাড়িতে আগুন লেগেছে’,  জীবন উঠে বসলো ` কি? আগুন? আচ্ছা’, বলে উল্টো দিকে ঘুরে আবার শুয়ে পড়ল। গা থেকে কম্বল টেনে নিয়ে ওকে উঠালাম। এইবার নাসির জান, উনি আরেক ডিগ্রী উপরে।  `নাসির জান বাহার আইয়ে, ঘর পে আগ লাগ গ্যায়া’। নাসির জান কচ্ছপের গতিতে উঠে দরজা খুললেন, আমার দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করলেন। .. ` কিয়া হুয়া? কাঁহা আগ’? বলে দরজা লাগিয়ে আবার ঘুমিয়ে গেলেন। শত চেষ্টাতেও উনাকে তোলা গেল না।

সবাই মিলে নিচে নেমে এলাম।  পরিস্থিতির উপর তীক্ষ্ণ নজর আর গভীর পর্যবেক্ষণের পর সবাই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম যে। .. ১. কোনো ভাবেই বাসা থেকে বের হওয়া যাবে না (যেহেতু মূল ফটকে আগুন এবং বাড়ির দেওয়াল অনেক উঁচু) ২. যেহেতু জেনারেটার রুম থেকে আগুনের সূত্রপাত এবং পুরো জেনারেটার রুমে আগুন ধরে গ্যাছে সুতরাং এর আশেপাশে যত তেলের ট্যান্ক এবং গ্যাস সিলিন্ডার আছে তা দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে।  ৩. যার যার গুরুত্বপূর্ণ জিনিস যেমন পাসপোর্ট, ডলার, ফোন, ল্যাপটপ ইত্যাদি একটা ব্যাগে নিয়ে বাড়ির শেষ প্রান্তে গিয়ে অপেক্ষা করতে হবে যতক্ষণ না রেসকিউ টিম এসে পৌঁছে।

সবাই যার যার জিনিস নিয়ে নিচে চলে এলাম।  একি? শফিক ভাই কোথায় ? শফিক ভাই এখনো নিচে নামে নি।  জীবন দৌড়ে উপরে গেল, শফিক ভাই তখন উনার গুরুত্বপূর্ণ জিনিস একটা বড় স্যুটকেসে ভরে নামছেন। ` কি ব্যাপার, কি করছিলেন’?  `জিনিসগুলা গুছাতে সময় লাগলো’। শফিক ভাই এর গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হলো – ১০ প্যাকেট ম্যাগি নুডলস, দুধের টীন, ফ্রিজে রাখা অন্যান্য খাবার আর কিছু গরম কাপড়। ঘটনাক্রমে শফিক ভাই যদি এই লেখা পড়ে ফেলেন, আমি নিশ্চিত যে উনি আমাকে `সালা বাটপার’ (শালা বাটপার) বলে একগাল হেসে একটা গালি দিয়ে ফেলেছেন। উনি যাকে ভালোবেসে ফেলেন তাকে উনার এই প্রিয় গালি উপহার হিসেবে নিতেই হবে।

এর মধ্যে আবিষ্কার হলো আমাদের বাবুর্চি আব্দুল্লাহকে দেখা যাচ্ছেনা।  মিনিট দুয়েক পরে ফায়ার ব্রিগেড এর গাড়ি, সাথে আব্দুল্লাহ।  আব্দুল্লাহ কিভাবে যেন গায়ে কম্বল জড়িয়ে মেইন গেট দিয়ে বেরিয়ে ফায়ার ব্রিগেড অফিসে গিয়ে ওদের ডেকে নিয়ে এসেছে।  আমাদের অফিসে ফোন করা হয়েছিল, সেখান থেকে ৪/৫ টা গাড়ি পাঠিয়ে আমাদের উদ্ধার করতে বলা হলো।  ৪ ঘন্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলো।  আমরা আবার পর্যবেক্ষণে নামলাম, সব পুড়ে ছাই। জেনারেটার রুম, রান্না ঘর, বাড়ির দেয়াল।  জেনারেটার রুমে রাখা Fire Extinguisher এর অবস্থা দেখে চোখে পানি চলে এলো।  আহারে বেচারা !

01 00059 DSC03406 Mosque DSC03358 DSC03352 AFG01

নয়:

দেখতে দেখতে প্রায় তিনটা বছর পার করে দিলাম।  এই তিন বছরে এইবার প্রথম কান্দাহার যাওয়ার সুযোগ এলো।  নতুন একটা সার্ভিস টেস্ট এবং লোকাল সহকর্মিদেরকে ট্রেনিং দিতে হবে।  আমার সাথে বেহরোজ।  সকালের ফ্লাইট এ রওয়ানা দিলাম। ১ ঘন্টার ফ্লাইট।  কান্দাহার এয়ারপোর্ট নিয়ন্ত্রণ করে ISAF এর লোকেরা।  মারাত্মক চেকিং।  ২টা কুকুর আছে, দেখে মনে হলো Brigadier Rank এর কোনো অফিসার।  একজন অস্ত্র বিশেসজ্ঞ, অন্যজন ড্রাগ।  আমি নির্বিঘ্নে বেরিয়ে গেলাম, সমস্যা হলো বেহরোজ এর ল্যাপটপ ব্যাগ নিয়ে। ড্রাগ বিশেসজ্ঞ ওর ব্যাগটাকে মার্ক করেছে।  বেহরোজকে ব্যাগ সহ আলাদা করা হলো, তন্ন তন্ন করে খোঁজা হলো, কিছুই পাওয়া গেল না।  ১ ঘন্টার চেষ্টার পর বোঝা গেল, গতকাল বেহরোজ আফিম খেয়েছিল এবং হাত না ধুয়ে ব্যাগ ধরেছিল, সেই গন্ধ এখনো ব্যাগের হাতলে রয়ে গেছে।

৩ দিন ছিলাম কান্দাহারে।  সারাদিন কাজ শেষ করে সন্ধায় আমি, বেহরোজ আর হাসিব যেতাম কাছের রেস্তোরাতে।  কাবাব, নান আর সাথে শিশা।  শিশাটা এইখানে খুব চলে।  নানা রকম ফ্লেভার- আপেল, পেস্তা, মিক্সড ফ্রুট।  বেয়ারা বানিয়ে নিয়ে আসে, তারপর মহারাজার মত মখমলের বালিশে হেলান দিয়ে ফুঁক ফুঁক করে টানো!

কান্দাহারের লোকেরা বেশ পয়সা ওয়ালা।  বাড়িঘর আর গাড়ির মডেল দেখলেই বোঝা যায়।  রাস্তায় যত মানুষ দেখলাম সবাই স্থানীয় পোশাক পরা, মাথায় পাগড়ী।  মেয়ে মানুষ চোখে পরে না।  শুনেছি তালিবান আমলে নাকি এইখানে হেরোইন এর ব্যাপক চাষ হত।  আফগানিস্তানের ৯০ ভাগ  হেরোইন এইখানে উত্পাদন হত।  এখনো গোপনে কিছু কিছু চাষাবাদ হয়।  আমাদের গেস্ট হাউসের সামনে একটা গাছ দেখিয়ে বেহরোজ আমাকে চিনিয়ে দিল এইটা পপি গাছ, এই গাছের ফুল থেকেই হেরোইন তৈরী হয়।

কাজ শেষ, এইবার যাবার পালা।  পরদিন সকালে বের হলাম।  প্লেনে উঠে মোবাইল সুইচ্ড অফ করে দিলাম। কাবুলে নেমে ফোন অন করতেই দেখি ইনবক্সে অনেকগুলো মেসেজ, তুমি কোথায়? ফোন বন্ধ কেন? তোমার কি অবস্থা? সবাই টেনশন করছে ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার HR থেকে কল দিল, বলল গাড়ি না যাওয়া পর্যন্ত যেন এয়ারপোর্ট থেকে বের না হই।  কিছুই বুঝতে পারছি না।  সুমন কল দিয়ে বলল, আমরা প্লেন উঠার ৫ মিনিট আগে কান্দাহার এয়ারপোর্ট রোডে suicide attack হয়েছে।  ২৩ জন স্পট ডেড।  আমি প্লেনে ছিলাম বলে কিছুই জানি না।  ঢাকাতে আমার ভাইকে ফোন দিতে বলল, মিডিয়ার কল্যানে ওরাও জেনে গ্যাছে। আমার বাসায় জানত আমি আজকে কান্দাহার থেকে ব্যাক করব এবং আক্রমনের পর ওরা আমার ফোন বন্ধ দেখে দুশ্চিন্তায় পরে গিয়েছিল। বাসা থেকে জানানো হলো, আমি যেন কালকেই চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে দেশে ফিরে আসি।

কাবুলে ফিরে আবার ব্যস্ত হয়ে গেলাম।  পরবর্তী ছুটির এখনো ২ মাস বাকি।  বাড়ি থেকে অব্যাহত চাপ দেশে ফিরে যাওয়ার।  কোনো রকমে ২টা মাস পার করলাম।  কে জানত এই ছুটিই আমার শেষ ছুটি, আর কখনো আফগানিস্তানে ফিরতে পারব না।  দেশে পৌঁছলে আমার ভাইয়ের প্রথম কাজ ছিল আমার পাসপোর্ট সিজ করা। তারপর আর কী করা, Resignation Letter মেইল করে দিলাম।  আমার আফগানিস্তানের পাট চুকে গেল।