ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, মানবাধিকার

101_Mianmar_Arrest_Back_ctg_080615_15

ইদানিং মানব পাচার বা Human Trafficking নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কিছু incident এর কারণে দেশ বিদেশে মানব পাচার রোধের উপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আমার ব্যক্তিগত ধারণা, যতই সভা সেমিনার করেন, মানব পাচার সহজে বন্ধ হবে না, বিশেষত বাংলাদেশ এর মত উন্নয়নশীল তৃতীয় বিশ্বে।  প্রথম কথা হচ্ছে সভা সেমিনার কাদের জন্য? নিশ্চয় যারা মানব পাচারের শিকার, ভুক্তভোগী তাদের জন্য।  কিন্তু এই সভা সেমিনারে উপস্থিত থাকেন সমাজের এমন কিছু লোক যাঁরা কেতাবি ভাষায় অভ্যস্ত।  তাঁদের বক্তব্য দুরূহ, সাধারণের বোধগম্য নয়, যেহেতু বেশির ভাগ ভুক্তভোগী হচ্ছেন গ্রামের অশিক্ষিত মানুষ, তাঁরা এর কিছুই বুঝেন না।  এই সব সভা সেমিনারে মূলত সমস্যার আলোচনা বেশি হয় সমাধানের থেকে।  কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যা শেষ পর্যন্ত কাগজে কলমেই থেকে যায়। আমার ব্যক্তিগত কিছু অভিজ্ঞতা এখানে শেয়ার করি যা থেকে আমরা বুঝতে পারবো সমস্যার ধরন সম্পর্কে।

আমি ইরাকের কুর্দিস্তানে একটি টেলিকম কোম্পানিতে কাজ করি।  নিজের চেষ্টাই চাকরি যোগাড় করে তাদের খরচে এখানে এসেছি, কোনো দালাল বা দেশীয় কোনো ম্যানপাওয়ার এজেন্ট এর খপ্পরে না গিয়ে। আমার একটি সিকি পয়সাও খরচ করতে হয় নাই এখানে আসার জন্য। এটাই নিয়ম, নিয়োগকর্তা সমস্ত খরচ বহন করে তা ভিসা থেকে শুরু করে প্লেন ফেয়ার পর্যন্ত।  বাসস্থানের ব্যবস্থাও নিয়োগ কর্তা করে দেয়, শুধু খাওয়া খরচ নিজেকে দিতে হয়।  এই নিয়ম যে কোনো চাকরীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য তা কর্পোরেট কর্মকর্তা কিম্বা সাধারণ শ্রমিক যেই হোক।  কিন্তু এখানে যত বাংলাদশী থাকে তার ৯০ ভাগই এসেছে কোনো না কোনো দালালের মাধ্যমে অবৈধ ভাবে।  এদের মুখ থেকেই শোনা যায় এদের করুন পরিণতির কথা।  দালাল নামের পশুগুলো কিভাবে এদের সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে এবং এদেরকে কি ভয়াবহ মানবেতর জীবনের মধ্যে ফেলে দিয়েছে, তা নিজের চোখে না দেখলে বুঝতাম না।

তমাল মিয়া (ছদ্ম নাম) বছর ১৯/২০ বয়সের তরুণ। সে নিজেই বলতে পারে না তার বয়স কত।  পড়তে বা লিখতে পারে না। মাদারীপুর জিলা থেকে এসেছে বছর তিনেক হলো।  তার কোনো রেসিডেন্ট কার্ড নায়, অবৈধ ভাবে থাকে, পুলিশ দেখলে পালিয়ে বেড়াতে হয়। একদিন তমালকে বললাম, তোমার পাসপোর্টটা দেখাও, দেখি কাউকে বলে তোমার একটা রেসিডেন্ট কার্ড বানানো যায় কি না।  পাসপোর্ট দেখে আমার চোখ কপালে, পাসপোর্ট এ নাম হচ্ছে জনৈক আব্দুর রশিদ যা তিন বছর আগে মেয়াদ শেষ করেছে এবং টেম্পারিং করে তার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।  কাটাছেঁড়ার পর যা দাঁড়ালো তাতে দেখি এই পাসপোর্ট এর মেয়াদ আট বছর অথচ আমাদের দেশের পাসপোর্ট এর মেয়াদ হচ্ছে পাঁচ বছরের। পাতা উল্টাতে দেখি আরও ভয়াবহ অবস্থা – একটি ইরাকি ভিসা (যা কুর্দিস্তানে প্রযোজ্য নয়, কুর্দিস্তানের জন্য আলাদা ভিসা লাগে) এবং সেই ভিসা জনৈক সুলায়মান সাহেবের নামে এবং ভিসাতে যে পাসপোর্ট নম্বর লিখা তার সাথে মূল পাসপোর্ট নম্বর এর কোনো মিল নায়।

তমাল মিয়ার মুখ থেকেই শোনা যাক তার বৃত্তান্ত – `এক দালাল আমারে কইসিলো ইরাকে ভালো চাকরি আছে, অনেক ট্যাকা বেতন। আমি চাইলে যাইতে পারি।  একদম এক নম্বুর কোনো ভেজাল নায়।  হ্যাসে আমি মহাজনের থন পাঁচ লাক ট্যাকা সুদে কর্জ কইরা দালালরে দেই। এক মাস পরে দালাল আমারে জিয়ারত ভিসায় (টুরিস্ট ভিসা) ইরাকে আইনা ফেলায় রাহে।  কামের কতা জিগাইলে কয় হইব, ব্যস্ত না হইতে।  দালাল আমার পাসপোর্ট নিয়া রাখসে, পাসপোর্ট চাইতে গেলে ঝাড়ি দেয়। এর মধ্যে আমার মত আরও অনেক বাংলাদেশীরে একটা ঘরের মধ্যে রাখসে, ঠিকমতন খাওন দেয় না, অনেক কষ্ট ভাই! হ্যাসে একদিন আমারে এই পাসপোর্ট দিয়া কয় তোমাগো কুর্দিস্তান লইয়া যাইতেসি, ঐখানে তোমাগো কাম ঠিক হইসে।  রাইতের বেলা আমাগো বর্ডার করস কইরা এইহানে আননের পর একটা দোকানে কাম দিসে, অনেক কম বেতনে। ‘ আমার কর্জের থন অনেক কষ্ট কইরা ৩ লাক শোধ করসি এহন মহাজন কয় আরও ৭ লাক দেওন লাগবো সুদ হুদ্দা’।

এই কাহিনী শুধু তমাল মিয়ার না, এরকম অনেক বাংলাদেশীর।  আমি চিন্তা করছি, তমাল মিয়াদের কি হবে? কুর্দিস্তানে কোনো বাংলাদেশী এমব্যাসি নেই যে সাহায্য নিবে।  (উল্লেখ্য কুর্দিস্তান সরকার ২০১৩ সালের দিকে বাংলাদেশ সরকারের সাথে একটা প্রাথমিক চুক্তি সই করেছিল জনশক্তি আমদানির জন্য, কিন্তু কুর্দি সরকার পরে আর আগ্রহ দেখায়নি – কারণ এখানে এত বেশি অবৈধ বাংলাদেশী আছে এবং তাদের আচরণ এতই বিরক্তিকর এবং অশোভন যে কুর্দি সরকার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে)। ধরে নেই কোনো না কোনো ভাবে তমাল মিয়ারা হয়ত একদিন দেশে ফিরে যাবে বা যেতে বাধ্য হবে কিন্তু দেশে গিয়ে কি ওই মহাজনের হাত থেকে বাঁচতে পারবে?  আচরণের প্রসঙ্গ যখন আসলো, একটা উদাহরণ দেই – এখানকার একটা ব্যাঙ্কে আমার অফিসিয়াল কাজে মিটিং ছিল।  আমি ছাড়াও আমার বস এবং অন্য দেশের প্রতিনিধি সেই মিটিং এ উপস্থিত।  হঠাত একটা ছেলে মিটিং রুমে ঢুকলো চায়ের ট্রে নিয়ে।  তার বুক পকেটে মোবাইল ফোন এবং দুই  কানে ইয়ার ফোন লাগানো।  একজন তার কাছে পানি চাইতে সে শুনতে পেল না এবং ভদ্রলোক মোটামুটি বিরক্ত হলেন।  বলাবাহুল্য, এই টি বয়টি বাংলাদেশী।  তার কোনো জ্ঞানই নেই যে একটা অফিসের ডেকোরাম কি রকম হয়। এটা তার দোষ না।  সে যে স্থান থেকে এসেছে তাতে তার এইসব জানবার কথা না। অথচ যদি এইসব লোকগুলাকে বিদেশ আসার আগে একটা সঠিক ট্রেনিং দেওয়া হতো,. তবে তারা সবকিছু শিখে আসতে পারত এবং ভালো ভাবে কাজ করে দেশের সম্মান বাড়াতে পারত।

`বাজারে নিশ্তেমা’ বলে এইখানে একটা বড় বাজার আছে, যেটা এই বাংলাদেশীদের আড্ডাস্থল। শুক্রবার এইখানে গেলে দেখা যাবে প্রচুর বাংলাদেশী, কেউ রাস্তার ধারে ফুটপাতে দোকান দিয়ে বসেছে, কেউ অন্য দোকানে চাকরী করছে আর আছে সেই দালালের দল। এই দালালদের চলাফেরা, কথা বলার ধরন, পোশাক এইগুলো দেখলে আপনার মনে পড়ে যাবে, আমাদের গ্রাম অঞ্চলে রাজনীতির সাথে জড়িত যে সব পাতি মাস্তান আছে তাদের কথা। এরা এদেশকেও এদের অভয়ারণ্য বানিয়ে ফেলেছে। একটা জাতির সম্মানের বারোটা বাজানোর জন্য এই দালালগুলোই যথেষ্ট।

এতো গেল সমস্যার কথা, এখন আসা যাক সমাধানের কথায়। আমি সম্পূর্ণ ভাবে আমার ব্যক্তিগত কিছু মতামত এখানে দিচ্ছে, হয়ত সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা ব্যক্তিবর্গ তাঁদের সমাধানের সাথে এই গুলো যোগ করলে এইসব তমালরা ভবিষ্যৎ এর বিপদ থেকে রক্ষা পাবে।

১. সর্ব প্রথম দেশের সকল নাগরিককে নিদেনপক্ষে অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন করে তোলা (যাতে তারা তাদের পাসপোর্ট এর নামটা পড়তে পারে )

২. In House সভা সেমিনারের সংখ্যা কমিয়ে মাঠ পর্যায়ে জন সচেতনতা বৃদ্ধি করা।

৩. সরকারী অনুমোদন প্রাপ্ত ম্যানপাওয়ার প্রতিষ্ঠান ছাড়া কোনো একক দালাল কে প্রশ্রয় না দেয়া।

৪. সকল প্রতিষ্ঠান এর সামনে থেকে দালালদের বিতাড়িত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা।  যেমন, BMET, BAIRA, BOESL, ফিঙ্গার প্রিন্ট দেয়ার অফিস, সরকারী টাকা জমা দেয়ার ব্যাংক এর শাখা এই সব স্থানে গেলেই দেখা যায় দালালদের অত্যাচার কাকে বলে।

৫. প্রতিটি গ্রামের দুই একজন গন্য মান্য ব্যক্তি কে দায়ীত্ব দেওয়া, যাঁরা তাঁর গ্রামের কেউ চাকুরীর জন্য বিদেশ যেতে চাইলে সব কাগজপত্র এবং বিস্তারিত জেনে একটি ছাড়পত্র দিবেন যা না দেখালে এয়ারপোর্ট ইমিগ্রেশন যাত্রীকে দেশ ত্যাগের অনুমতি দিবে না। হতে পারে এই দায়িত্ববান ব্যক্তি কোনো স্কুলের প্রধান শিক্ষক কিম্বা মসজিদের ইমাম। (তবে কোনো ভাবেই যেন কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিকে এই দায়িত্ব দেওয়া না হয়)।

৬. এয়ারপোর্ট ইমিগ্রেশনকে বিশেষ ভাবে নজর রাখতে হবে, যে মানুষটা টুরিস্ট ভিসা নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যাচ্ছে, তার কি আসলেই টুরিস্ট হিসাবে যাওয়ার মত যোগ্যতা আছে কি না ? আমাদের ইমিগ্রেশন এর কর্মকর্তারা যথেষ্ট বুদ্ধিমান এবং এঁরা সহজেই ধরে ফেলতে পারেন।  [যদি কারো কুর্দিস্তান এর পেপার ভিসা (টুরিস্ট কিম্বা জব অথবা রেসিডেন্ট কার্ড) থাকে তবে কোনো সমস্যা নেই।  এই ভিসা থাকলে কুর্দিস্তান আসলে নিয়োগকর্তা সহজেই রেসিডেন্ট কার্ড এর ব্যবস্থা করে দেন এবং এটা শতভাগ বৈধ]।

৭. বেসরকারী উদ্যোগে ট্রেনিং সেন্টার চালু করা (এবং অবশ্যই তাতে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিকে সম্পৃক্ত না করা)। এই ট্রেনিং সেন্টারে শিক্ষা দেয়া হবে, কিভাবে প্লেনে ভদ্র ভাবে বসতে হয়, অন্য যাত্রীর সাথে চিত্কার করে ঝগড়া না করা, টেক অফ এবং ল্যান্ডিং এর সময় মোবাইল বন্ধ রাখা না রাখলে কি সমস্যা হয় তা বুঝিয়ে দেয়া, এয়ার হোস্টেসের সাথে কিভাবে ব্যবহার করতে হবে, বিদেশে মানুষের সাথে কী রকম আচরণ করলে দেশের সম্মান বৃদ্ধি পাবে, অফিসের নিয়ম কানুন ইত্যাদি।

৮. সুদখোর মহাজনী ব্যবসাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা এবং কঠোর শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা করা।

৯. সর্বপরি আমাদের জনপ্রতিনিধি এবং সরকারী কর্মকর্তা/কর্মচারীদের দুর্নীতি মুক্ত হওয়া অতীব জরুরী এবং তাঁদের মধ্যে নিস্স্বার্থ সেবার মনোভাব তৈরী না হলে শুধু এই সেক্টরই নয় কোনো কিছুতেই আমাদের উন্নতি হবে না।

উপরের যুক্তিগুলো অনেকের কাছে কঠিন কিম্বা অবাস্তব মনে হলেও, এটা বিবেচনায় নেবেন বলে আমি মনে করি যে এই শর্তগুলো শুধুই আমাদের নিরীহ খেটে খাওয়া অভাবী মানুষদের নিরাপদ রাখার জন্য। মনে রাখতে হবে, এই সম্মানিত মানুষগুলো তাদের জীবন বাজি রেখে, পরিবার পরিজন ফেলে কষ্টের দিন পার করে আর এদের টাকায় আমার দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়।

মাঝে মধ্যে এয়ারপোর্ট কিম্বা কিছু কিছু সরকারী অফিসে এদের সাথে যে ব্যবহার করা হয় তা খুবই নিন্দনীয়।  এরা আমাদের দেশের সম্পদ এদেরকে সম্মান দিন এবং উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে এই সম্পদকে আরও মূল্যবান করে তুলুন।

পুনশ্চ: পরিশেষে সংশ্লিষ্ট সরকারী বিভাগের কাছে অনুরোধ তাঁরা যেন অনতিবিলম্বে কুর্দিস্তানে তাঁদের একটি কনস্যুলেট অফিস খোলার ব্যবস্থা করেন। এটি একটি খুবই ভালো বাজার এবং ইতোমধ্যে ভারত তাদের কনস্যুলেট অফিস খুলেছে। প্রচুর ভারতীয় আসছেন বৈধ পথে আর বাংলাদেশীরা আসছেন ইরাক হয়ে অবৈধ/অনিরাপদ পথ দিয়ে।   এই রকম চলতে থাকলে এই বাজারটি আমাদের হাতছাড়া হতে খুব বেশী সময় লাগবে না আর সেই সাথে আমদের কিছু নিরীহ দরিদ্র মানুষ পথে বসবেন।