ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

বছর শেষ হতে চলল।  ২০১৫ কে বিদায় দিয়ে ২০১৬ কে বরণ করে নেবার আয়োজন চলছে সর্বত্র।  নানা রকম আয়োজন- ছোট, বড়, মাঝারি, শালীন, অশালীন, শুকনো, ভেজা আরও কত কি! আমাদের দেশে বর্ষবরণ আসলে দুই ভাগে হয়।  একটা বাংলা নববর্ষ, যেটা বাংলা সংস্কৃতির ধারক বাহক মানে বাংলাদেশের বৃহৎ অংশের মানুষরা উদযাপন করে থাকেন। এই উত্সব দেশব্যাপী, সার্বজনীন। আর দ্বিতীয়টা হচ্ছে ইংরেজি বা গ্রেগরিয়ান নববর্ষ যা মূলত প্রধান প্রধান শহর কেন্দ্রিক এলিট(?) সমাজের মানুষ এবং কিছু সংখ্যক তথাকথিত অতি আধুনিক মানুষের। এটা উত্সব না, উনারা বলেন `পার্টি’।  বাঙালীর নববর্ষে মাঝে মাঝে ওই সব আধুনিক মানুষরা ঢুকে পড়েন একদিনের বাঙালী সেজে `লেট’স হ্যাভ আ লুক’ বলে । অপরদিকে ইংরেজী নিউ ইয়ার পার্টিতে সবার প্রবেশাধিকার নায়, সামর্থ্য নায়, বেশির ভাগ মানুষের রুচি নায়।

বাংলা নববর্ষে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে চেক পোস্ট বসাতে হয় না, মদের দোকানে বা হোটেলে নজরদারী করতে হয় না, বিশেষ বিশেষ এলাকায় রাত ৮ টার পরে প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে হয় না। আধুনিকতার নামে সময়কে উচ্ছৃঙ্খল করার বিশেষ ব্যবস্থা থাকে এইসব পার্টিতে।  প্রশ্ন হচ্ছে কারা যায় এইসব পার্টিতে? অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি- সমাজের ধনিক শ্রেণীর সন্তানেরা, দুর্নীতিগ্রস্ত আমলা পিতামাতার সন্তানেরা, কিছু কিছু দেশদরদী মহান রাজনীতিবিদদের সন্তানেরা আর কিছু বখে যাওয়া তরুণ তরুনী।  `লেট’স এনজয়’ বলে শুরু হয় উদ্দামতা, অশ্লীলতা, নারী নিগ্রহ আর একসময় নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খিস্তি খেউর করা।  আহা! কী আনন্দ! কী এনজয়মেন্ট! কী সংস্কৃতি!

এটা কোনো উত্সব নয় যেখানে আমার বোনকে বা কন্যাকে একাধিক যুবক টানাটানি করবে, যেখানে আমার ভাই বা পুত্র মদ খেয়ে খিস্তি খেউর করবে, যেখানে আমি উত্সব শেষে অন্যের কাঁধে ভর দিয়ে টলতে টলতে বাড়ি ফিরব। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন `আনন্দকে ভাগ করলে দুটি জিনিস পাওয়া যায়; একটি হচ্ছে জ্ঞান এবং অপরটি হচ্ছে প্রেম’ অথচ আমাদের এই পার্টিতে না আছে জ্ঞান না আছে প্রেম।

পশ্চিমাদের অনুকরণ না করে এসো চেষ্টা করি এমন কিছু করতে যাতে পশ্চিমারা আমাদের অনুকরণ করতে শেখে।  `Ohh f***, I think I’m high’ এটা তোমার পূর্ব পুরুষের ভাষা নয়, তোমার ভাষা অনেক মর্যাদা সম্পন্ন, রুচিশীল ।  এই আধুনিকতা না শিখে বরং চল ওদের শেখাই `এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি- নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার’।

আমি নিউ ইয়ার পালনের বিরোধী নই, অবশ্যই পালন করবো তবে তা যেন আমার পরিবার, আমার সমাজ আর আমার সংস্কৃতিকে অসম্মান করে না হয়।  আয়োজন এমন হবে যেন বাবা, মা, ভাই, বোন্ সকলের সম্মিলন।  বছরের প্রথম দিনের খবরের কাগজে এমন ছবি কারোরই কাম্য নয় যে, কিছু ছেলেমেয়ে দুই হাত দিয়ে তাদের মুখ ঢেকে রেখেছে আর পুলিশ তাদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। এ কেমন আনন্দ যাতে আমার মুখ আমাকেই ঢাকতে হয়।  হজরত আলী বলেছিলেন `রাতের অন্ধকারে এমন কাজ করোনা যাতে দিনের আলোয় মুখ লুকাতে হয় আর দিনের বেলায় এমন কিছু করোনা যাতে রাতের ঘুম নষ্ট হয়’।

আমার মত পুরনো মানুষের এই লেখা যদি কোনো আধুনিক মানুষের মনে আঘাত দিয়ে থাকে তবে আমি ক্ষমাপ্রার্থী।