ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

কথায় বলে, `স্বভাব যায় না ম’লে, ময়লা যায় না ধুলে ‘ – আমাদের পরিবহন সেক্টরটার অবস্থা এরকমই।  এরা কোনদিন মানুষ হবে না। এরা পশুত্বকে ভালবাসে, পশু হতে ভালবাসে। কাকে ছেড়ে কাকে ধরবেন? রিক্সাওয়ালা, বেবি ট্যাক্সি চালক, মিনিবাসের কন্ডাক্টর সবাই সমান।  এ বলে আমায় দ্যাখ ও বলে আমায় দ্যাখ।

প্রথমে আসা যাক রিক্সাওয়ালাদের কথায় – ঢাকা শহরে রিক্সা ভাড়া এখন ঘন্টায় ঘন্টায় বাড়ে। রিক্সাওয়ালারা প্রচন্ড রকমের মেধা সম্পন্ন, এরা বুঝে কোন লোকটা বেকুব কিসিমের, কোন লোকটা ঝামেলাহীন আর কোনটা একটু ত্যারা পাবলিক।  যাত্রীর যোগ্যতা বুঝে এরা ভাড়া হাঁকায়।  আমি যেখানে থাকি সেখানে একটা নির্দিষ্ট দূরত্বের ভাড়া এক বছরে বেড়েছে তিন গুন।  এক বছর আগে যা ছিল ৫ টাকা এখন দরদাম করে দিতে হয় ১৫ টাকা।   আর যদি নতুন কাউকে পেয়ে যায় তবে ২০/ ২৫ টাকাও চেয়ে বসে। ভাড়া তো বাড়তি দিলেন তাতেও উনাদের পোষায় না। এদের বেয়াদবিও সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়।  লাইন বেঁধে রিক্সা দাঁড়িয়ে আছে, রিক্সাওয়ালা মহোদয় প্যাসেঞ্জার সীটে বসে চালকের সীটে পা তুলে বিড়ি ফুঁকছেন। ৪/৫ বার জিজ্ঞ্যেস করার পর উনি দাঁত চেপে, ঠোঁট কিঞ্চিত ফাঁক করে প্রশ্ন করবেন `মনিপুর কোন হানে ? আপনি বলবেন `মাইক ওয়ালা মসজিদ এর কাছে‘।  উনি বলবেন `মসজিদের সামনেই নামবেন‘? আপনি বলবেন `না ভাই, একটু সামনে, আমি তো আর মসজিদে থাকি না‘। কপাল ভালো হলে আপনি উনার যাত্রী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করবেন।

এরপর আসা যাক বেবি ট্যাক্সি ওয়ালাদের প্রসঙ্গে।  এঁরা আবার অনেক উঁচু মার্গের ডিজিটাল চালক। এঁদের গাড়িতে একটি করে ইলেক্ট্রনিক মিটার লাগানো আছে সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য। এঁরা প্রতিবছর আন্দোলন করে সরকারী ভাবে ভাড়া বাড়ান তবে তাতে তাঁদের পোষায় না। এঁরা দলবেঁধে পাথরের মত একসাথে বসে থাকেন এবং `Unity is the power’ প্রমান করার জন্য সবাই একজোট হয়ে একই সুরে কথা বলেন। সরকার এঁদের ন্যায্য (?) দাবি পূরণ করেন এবং এঁরা আন্দোলনের ফসল ঘরে তুলেন। ভাড়া বাড়ার পরও এঁরা আগের মতই কির্তন গাইতে থাকেন ৩০ টাকা বাড়ায় দিয়েন, পোষায় না। আমি হলফ করে বলতে পারি সরকার যদি কিলোমিটার প্রতি ১ কোটি টাকা এবং ওয়েটিং-এ প্রতি মিনিট ২ কোটি টাকাও নির্ধারণ করে দেয় তবুও এরা বলবে `২০ টাকা বাড়ায় দিয়েন, পোষায় না‘। এটা এদের স্বভাব, খাসলত – মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এদের পোষাবে না।

এরপর আছে মিনিবাস। চালান গ্যাসে কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ১ সেন্ট বাড়লে উনারা ভাড়া বাড়ানোর আন্দোলনে নেমে পড়েন, কিন্তু কখনও ১ ডলার কমলেও উনারা ভাড়া কমান না।  এদের ইউনিয়ন আবার মহা শক্তিধর। হাত উঁচু করলেই সব বন্ধ। এঁরা নিজেদেরকে রাস্তার মালিক বলে মনে করেন।  যেখানে সেখানে এঁরা লোক উঠাতে বা বাম পা দিয়ে নামাতে পারেন। রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে এঁরা যাত্রী উঠান তাতে পিছনে ২ কিলোমিটার জ্যাম তৈরী হলেও কেউ কিছু বলতে পারবে না।  এঁরা প্রত্যেক গাড়িকে `ডাইরেক্ট’ বানিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করেন কিন্তু প্রতিটি স্টপেজে এঁরা যাত্রী উঠান।  এটা এঁদের জাতীয় অধিকার।  কেউ কিছু বলতে পারবেন না, বললেই চলন্ত গাড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবার অধিকার এঁরা রাখেন। ইদানিং আবার দেখি কিছু কিছু মিনিবাসে `ডাইরেক্ট’ লিখার বদলে লিখা থাকে `খোদার কসম, ডাইরেক্ট’। কতটা নির্লজ্য হলে এরকম লিখা সম্ভব। সিটিং সার্ভিসে দাঁড়িয়ে লোক না নিলে এঁদেরও পোষায় না।

আসলে আমার দেশে বেসরকারী চাকুরীজীবি মধ্যবিত্ত ছাড়া আর কারও পোষায় না। এই মানুষগুলো তাদের জীবনকালে কলুর বলদের মত খেটে যায়, বছর শেষে ৫% ইনক্রিমেন্টের আশায় রাত পর্যন্ত অফিসে বসে থাকে, ছেলেমেয়েদের সামান্য সামাজিক চাহিদা মেটাতে হিমশিম খায়, পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে ধার দেয়ার লোক খুঁজতে থাকে, স্ত্রীর ঘ্যান ঘ্যানানি বন্ধ করতে সেকেন্ড হ্যান্ড ফ্রীজ বিক্রির বিজ্ঞাপন খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু  কোনো অভিযোগ নেই, অনুযোগ নেই। ভাব খানা যেন `এমনই তো হওয়ার কথা’। কারণ এদের পোষায়, পুষিয়ে নিতে হয়। আমি এই শ্রেণীর অনেক পরিবার দেখেছি, যাঁরা এইভাবে জীবন যাপন করেছেন, আখেরে আসলে শুধুমাত্র এঁদেরই পোষায়।  এঁদের ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে মানুষ হয়েছে, সমাজে ভালো অবস্থান তৈরী করে নিয়েছে, দেশ বিদেশে সুনাম কুড়িয়েছে এবং একদিন মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়েছে `যে অমুকের ছেলেটা বেশ বাবার মুখ উজ্জল করেছে, ওর বাবাটা অনেক কষ্ট করে ছেলে মানুষ করেছে’। এঁদের পোষাবে নাতো, কার পোষাবে ? সততা মানুষকে পুষিয়ে নেয়ার শিক্ষা দেয়।

আর, কোনদিন পোষাবে না এইসব মানুষ ঠকানো ধুরন্ধর ব্যক্তিদের, অভাব যাদের কোনদিন শেষ হয় না।  তা সে রিক্সাওয়ালা, বেবিওয়ালা, ঘুষখোর সরকারী চাকুরীজীবি, দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ী কিম্বা আমাদের তথাকথিত জনদরদী রাজনীতিবিদ। কিছু কিছু মানুষ সম্পদের পাহাড় গড়ছেন, কেউ কেউ বিদেশে  টাকা পাচার করছেন আর আখেরে `আমার কিছুই হলো না‘ আক্ষেপ নিয়ে মৃত্যুর দিন গুনছেন।  এঁরা পুষিয়ে নেয়ার বদলে শুধুই মানুষিক দৈন্যতাকে পুষছেন।