ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

 

হে দুর্নীতিগ্রস্ত পিতার সন্তানেরা,

আশাকরি পিতার কালো টাকার বদৌলতে তোমরা সকলে অতীব সুন্দর দিনাতিপাত করিতেছ। তোমাদের ক্ষমতা, শান-শওকত, বিলাস-বৈভব আমাদের মনে কিঞ্চিত ঈর্ষা, কিঞ্চিত ক্ষোভ এবং কিঞ্চিত লজ্জার উদ্রেক করে। তোমরাতো সবাই দেশে কিম্বা বিদেশে উচ্চ (!) শিক্ষা গ্রহণ করেছ অথবা করছ, তাই তোমাদের জ্ঞান নিয়ে আমার কোনো প্রশ্ন নায়। যে শিক্ষা তোমরা তোমাদের পাঠ্য পুস্তক, শিক্ষক অথবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আহরণ করেছ তার উপর আস্থা রেখে নিতান্ত বাধ্য হয়ে আজ এই খোলা চিঠি তোমাদের উদ্দেশ্যে লিখছি। হৃদয়ের কোনো এক কোনে এখনো একফোঁটা বিশ্বাস জমে আছে যে হয়ত তোমরা একদিন সব বুঝতে পারবে, সঠিক শিক্ষার রস আস্বাদন করে তোমাদের পিতাদেরকে রোগ মুক্ত করতে সচেষ্ট হবে।

তোমরা জানো যে আমাদের জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে ষোলো কোটি। এই সাড়ে ষোলো কোটি মানুষের মধ্যে তোমরা হচ্ছো অল্প কয়েকজন ব্যক্তি।  তোমাদের পিতারা কেউ বড় আমলা, সরকারী কর্মকর্তা/কর্মচারী, ধনাঢ্য ব্যবসায়ী অথবা রাজনীতিবিদ। তোমরা কি জানো সম্পদের বেশির ভাগ অংশ কুক্ষিগত করে রেখেছেন এই চার সম্প্রদায়? তোমরা কি জানো দেশের কতগুলো মানুষ এক বেলাও খেতে পায় না? কতজন মানুষের মাথার উপরে ছাদ নায়, কয়টি শিশু স্কুলে যেতে পারে না, কত শিশু অপুষ্টিতে মারা যায় ? তোমাদের পিতারা যদি দুর্নীতি না করতেন তবে আমাদের দেশের কোনো মানুষ না খেয়ে থাকত না, কোনো শিশু বিনা চিকাত্সায় মারা যেত না।  কারণ তোমাদের পিতারা এদের সম্পদকে নানা ছলচাতুরীর মাধ্যমে নিজেদের করে নিয়েছেন।

তোমাদের কি ভালো লাগে যখন তোমরা দেখো তোমরা যে বিলাস বহুল জীবন যাপন কর যা তোমাদের কষ্টার্জিত নয় বরং অন্যের সম্পদ লুট করে তোমাদের পিতারা তোমাদের জন্য তথাকথিত ভবিষ্যত গড়ছেন? তোমাদের কি ভালো লাগে যখন দেশের নব্বই ভাগ লোক তোমাদের এবং তোমাদের পিতাদের ঘৃনা করে ? তোমাদের সামনে হয়ত ভয়ে কিছু বলতে পারে না কিন্তু পিছনে তোমাদের শুধু মুখে নয় সমগ্র দেহে থুথু দেয়।  দেশের নব্বই ভাগ মানুষের অভিশাপ নিয়ে তোমরা তোমাদের ভবিষ্যত গড়ছ।  একবার ভেবে দেখো কী মূল্য আছে এই বিত্তের, বৈভবের আর ক্ষমতার? তোমরাও তো মানুষ! তোমাদের কী আত্মসম্মান বলে কিছুই অবশিষ্ট নায় ?

তোমরা তো আবার দেশ বিদেশ থেকে উচ্চ শিক্ষা নিয়েছে। অর্থের বিনিময়ে তোমরা অর্জন করেছ MBA, FCA, Barrister ইত্যাদি সনদ। যা তোমরা শিখেছ তোমাদের পিতাদের অর্জিত কালো টাকা আরও বৃদ্ধি করতে, ট্যাক্স ফাঁকি দেবার পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে অথবা আইনের ফাঁক দিয়ে অবৈধ সম্পদ কব্জা করতে।

তোমরা ইতিহাস শেখনি। আজ তোমাদের দু’এক লাইন ইতিহাস শেখাই। তোমরা হয়ত জানো না সমাজ, সভ্যতা, ক্ষমতা, বিত্ত অথবা বৈভব এ সবই Cyclic Order’ এ চলে। আজ যে রাজা কাল সে সাধারণ ভিক্ষুক। একটি উদাহরণ দেই – মোগল বাদশাদের কথা নিশ্চয় জানো ? তাঁদের বিলাসী জীবন, ক্ষমতা সবই আজ ইতিহাসের পাতায়। তাঁদের বংশধরের বর্তমান অবস্থা জানো? মোগল বংশধরেরা এখন কলকাতার মেটিয়া বুরুজ এলাকাতে দর্জির পেশায় নিয়োজিত। কিছুদিন আগে পত্রিকা পড়ে জানলাম মোগল বংশধরের একজন মিউনিসিপ্যালিটিতে পরিস্কারক হিসাবে কর্মরত এবং এক কালের চা বিক্রেতা আজ সেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী। এইভাবে আরও আছে, রাশিয়ার জার ধংশ হয়ে গ্যাছে, ইরানের শাহ এর বংশধর আজ ইরানে ঢুকতে পারে না।

তোমরা হয়ত ভাবতে পারো এইসব কথা তোমাদের বলছি কেন? তোমাদের মহান আব্বাজানদের সরাসরি বললেই তো হয়।  না রে বাবারা হয় না।  কারণ উনারা কারও কথা শুনবেন না।  উনারা মানুষ তো দুরের কথা আল্লাহকেও ডরান না, যদিও উনাদের নামের আগে `আলহ্বাজ’ বিশেষণ থাকে। এই শব্দটা উনারা ব্যবহার করেন মানুষকে ধোঁকা দেবার জন্য, নিজেকে ধার্মিক জাহির করে দুর্নীতির পথকে মসৃন করার জন্য। উনারা শুধু ভালবাসেন তোমাদের, ভয় করেন তোমাদের। তাই তোমরাই পারো এই রোগ থেকে তোমাদের পিতাদের মুক্ত করতে।  দেখো না একবার চেষ্টা করে। বল তোমাদের পিতাদের যে, তোমরা উনাদের অসৎ উপার্জনের অর্থ দিয়ে সুখ কিনবে না, তোমাদের দামী গাড়ির প্রয়োজন নেই, একাধিক বাড়ির প্রয়োজন নেই, ব্র্যান্ডেড পোশাক, জুতোর বদলে সাধারণের পোষাকই তোমাদের পছন্দ।  তোমরা তোমাদের বাবাদের জানিয়ে দাও যে , উনারা যদি অসৎ উপার্জন বন্ধ না করেন তবে তোমরা উনাদের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করবে। উনাদের জানিয়ে দাও তোমরা সমাজের মূল স্রোতে আসতে চাও যেখানে সবাই তোমাদের বন্ধু হবে।

এখনো সময় আছে তোমাদের পিতাদের ফেরাও নতুবা তোমাদের ভবিষ্যত সন্তানেরা হয়ত আমাদের ভবিষ্যত সন্তানদের শৌচাগার পরিস্কারক হিসাবেই নিয়োগ পাবে ইতিহাসের কথা মত। একবার চেষ্টা করে দেখো তোমাদের পিতাদের রোগমুক্ত করতে নচেত তোমাদেরই হারাতে হবে সব কেননা আমাদের হারানোর কিছু নায়।