ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

কাবুল থেকে ফিরে কিছুদিন বিশ্রাম নিব বলে ঠিক করলাম।  অনেকদিন পারাবিরিক আনন্দ থেকে বিচ্ছিন্ন।  মেয়েকে স্কুলে আনা নেয়া আর বাজার করা ছাড়া তেমন কোনো কাজ নেই।  মাঝে মাঝে বন্ধুরা আসে, চুটিয়ে আড্ডা দেই – আর টিভি দেখে সময় কাটাই।

আমি হচ্ছি খেটে খাওয়া মানুষ।  সেই ১৬ বছর বয়স থেকে কামলা খেটে বড় হয়েছি।  দুই মাসেই হাঁপিয়ে উঠেছি – কিছু একটা করতে হবে।  চাকুরী খোঁজার চেষ্টা করতে ভাই বলল `চাকুরী তো অনেক করলা, এইবার স্বাধীন কিছু কর, ব্যবসা কর।’  টাকা পয়সা আমার কোনো কালেই ছিল না (ভবিষ্যতেও হবে বলে মনে হয় না)। বললাম টাকা নেই, ব্যবসা করব কিভাবে? গৌরী সেন ছোট ভাই বললো `টাকা আমি দিব, তুমি শুরু কর।’

ব্যবসা শুরু হলো, নিজের নামের নিচে `সি.ই.ও’  জুড়ে দিয়ে কার্ড ছাপানো হলো।  নবীজী বলেছিলেন জ্ঞান অর্জন এর জন্য সুদূর চীন দেশে যেতে  – আমি সস্তায় যন্ত্রপাতি কেনার জন্য চীন দেশে গেলাম। ব্যবসা চলছে – আমি শিখছি কিভাবে মিথ্যা কথা বলতে হয়, কিভাবে কথার বরখেলাপ করতে হয়, কিভাবে পাওনা টাকা আদায় করার জন্য নতজানু হতে হয়।  আট মাসের মাথায় বুঝতে পারলাম এ পথ আমার নয়।  ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি অবস্থা!

বিধাতা বোধহয় পরিস্থিতির উপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছিলেন, আর তাই আমার করুন পরিণতির আগেই আমার ইনবক্সে একটা মেইল পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন।  আমার প্রাক্তন ফিলিপিনো সহকর্মী `রোলানো’ একটা মেইল পাঠিয়েছে। সে এখন কুর্দিস্তান এর একটা টেলিকম কোম্পানীর HR Director। ওদের নাকি একজন VAS Manager লাগবে।  কোম্পানীর C.E.O. Linkedin-এ আমার প্রোফাইল দেখে প্রীত হয়েছেন এবং আমার সাথে যোগাযোগ করতে বলেছেন।  মহামান্য C.E.O. টেলিফোনে আমার একটা স্বাক্ষাতকার নিলেন এবং বেতন ও আনুসাঙ্গিক সুযোগ সুবিধা বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহনের পর চাকুরী দানের নিশ্চয়তা প্রদান করেলন। উইদাউট এনি লস, পনেরো দিনের মধ্যে ব্যবসায় বিক্রি করে দিয়ে কুর্দিস্তান যাবার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম। আলহামদুলিল্লাহ!

২০১৩, অক্টোবর এর ১৬ তারিখে এমিরেটস এর ফ্লাইট-এ ঢাকা থেকে দুবাই হয়ে কুর্দিস্তান এর রাজধানী এরবিলে পৌঁছুলাম।  স্থানীয় সময় তখন সন্ধ্যে সাতটা। এর্বিল এয়ারপোর্ট ছোট এবং ছিমছাম। পরিষ্কার সাজানো গোছানো। ইমিগ্রেশন এবং কাস্টমস এর কর্মকর্তাগুলো স্মার্ট। তাদের ইউনিফর্মও বেশ সুন্দর। মেদহীন শরীরে পোশাকগুলো বেশ মানিয়েছে। নিজের অজান্তেই একটা তুলনা চলে এলো আমার দেশের এয়ারপোর্ট এর কর্মকর্তাদের সাথে। এই তুলনা ব্যবস্থাপনা, ব্যবহার, আচরণ এবং সেবার মান নিয়ে।

পাসপোর্ট নিয়ে ইমিগ্রেশনে দাঁড়ালাম। কোনো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলো না (প্রশ্ন করার দরকারও নেই, কারণ MRP পাসপোর্টে সব তথ্য দেয়া আছে)।  পাসপোর্টে পনের দিনের ভিসার একটা স্ট্যাম্প করে দিয়ে বলল `Welcome to Kurdistan, sir। ‘ আবার তুলনা চলে এলো – আমি গত সাত বছর ধরে বছরে অন্তত দুই বার দেশে আসা যাওয়া করি। কখনই ঢাকা এয়ারপোর্ট-এ কোনো ইমিগ্রেশন অথবা কাস্টমস অফিসারকে যাত্রীদের সাথে সহজ হতে দেখি নাই।  তাঁদের আচরণে মনে হয় প্রত্যেক যাত্রীই যেন চোরাকারবারী।

ইমিগ্রেশন কমপ্লিট করে কাস্টমস-এ গিয়ে বললাম `Nothing to declare’, কোনো প্রশ্ন না করে, শুধু হ্যান্ড লাগেজটা স্ক্যানারে দিতে বলল, ব্যাগ নিয়ে এয়ারপোর্ট ত্যাগ করলাম।

পুরো এয়ারপোর্ট-এ একজন দালাল চোখে পড়ল না, কেউ এসে বললোনা যে, আপনার আগমন কার্ডটা লিখে দেই, এয়ারপোর্ট এর বাইরে ট্যাক্সি ওয়ালাদের উত্পাত নেই।  ইউনিফর্ম পরা ট্যাক্সি ড্রাইভার গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে, একজন করে প্যাসেঞ্জার আসছে – ট্যাক্সিতে উঠছে আর গন্তব্যে চলে যাচ্ছে।

অফিসের গাড়িতে করে গেস্ট হাউসের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।  রাতের এর্বিল অসাধারণ সুন্দর। ঝকঝকে  বড় রাস্তা, রাস্তার দু’পাশে বড় বড় ভবন, বেশির ভাগই কাঁচের দেয়াল।  বড় বড় হোটেলগুলো আলোতে ঝলমল করছে।  রাস্তায় কোথাও কোনো আবর্জনা নেই, সারিবদ্ধ গাড়ি নিয়ম মেনে চলছে।  কোনো পাবলিক ট্রান্সপোর্ট চোখে পড়ল না। শুধুই ব্যক্তিগত গাড়ি। এই দেশে BMW, Mercedes, Dodge, Aston Martin, Infinity, Hummer এর মত দামি দামি গাড়ি যেমন আছে তেমনি আছে প্রচুর Hyundai, Kia, Nissan এর মত সাধারণ গাড়ি। রাস্তায় কোনো যানজট নেই শুধু সিগন্যালের অপেক্ষা ছাড়া।  শহরের মধ্যেও গাড়িগুলো এত স্পীডে চলে যা আমরা ঢাকাতে কল্পনাও করতে পারিনা। মিনিমাম স্পিড সত্তুর কিলোমিটার। পনের মিনিটের মধ্যে গেস্ট হাউসে পৌঁছে গেলাম।

আমাকে সপ্তাহ খানেকের জন্য একটা ভারতীয় গেস্ট হাউসে থাকতে হবে কারণ আমার জন্য যে বাড়িটা ভাড়া নেওয়া হয়েছে সেটা এখনো পুরোপুরি ফার্নিশড হয়নি। কিছু ফার্নিচার কেনা বাকি আছে।  এই গেস্ট হাউসে দক্ষিন ভারতীয় কর্মকর্তারা থাকেন। সবাই তামিল নাড়ুর। কেউ হিন্দি জানে না।  কিছুক্ষণের মধ্যে বুঝতে পারলাম এরা হিন্দি ভাষাটাকে শুধু অপছন্দই করে না রীতিমত ঘৃনা করে। এদের জাতীয়তাবোধ এক্সট্রিম পর্যায়ে।  পরবর্তিতে এদের সঙ্গে যখন ভালোভাবে মিশেছি, আমার মনে হয়েছে এরা নিজেদের ছাড়া আর কাউকে বড় বলে মানতে নারাজ।  যেমন, এদের ধারণা পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত ভাষা হচ্ছে তামিল, সবচেয়ে বুদ্ধিমান/জ্ঞানী জাতি হচ্ছে তামিল, পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর খাবার হলো সাম্বার এবং ইডলি। এদেরকে যদি প্রশ্ন করা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর শহর কোনটা? সম্ভবত এরা বলবে চেন্নাই।  এদের কাছে কোন তামিল পৃথিবীর কোন কোন দেশে কত বড় পজিশনে আছে তার পূর্ণ ডেটাবেস আছে কিন্তু এদেরকে যদি জিগ্গেস করেন ভারত কত সালে স্বাধীন হয়েছে এরা বলতে পারবে না।  ভারতের ইতিহাস কিংবা পৃথিবীর কোথায় কী হচ্ছে এরা জানে না কিন্তু এরা তামিলনাড়ুর পূর্ণ ইতিহাস জানে। এদের ধারণা একমাত্র এ. আর. রহমানই হচ্ছেন সঠিক অস্কার বিজয়ী বাকি সব ভুয়া।  জনাব সুন্দর পিচাই যেদিন গুগল এর সিইও হলেন সেদিন আমরা সবাই (অন্যান্য বিদেশী এবং স্থানীযরা) তটস্থ ছিলাম এই বিষয়ে ওদের অহংকার দেখার জন্য।  অথচ এরা জানে না কতজন উত্তর ভারতীয় কিংবা বাংলাদেশী বা পাকিস্তানি ইউরোপ, আমেরিকায় গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেন।  এরা মনে করে এদের ইংরেজী উচ্চারণ হচ্ছে একমাত্র সঠিক, আমরা যারা বাংলাদেশী বা উত্তর ভারতীয়রা ইংরেজী বলি সেটা একদম ভুল।  যেমন `আমার প্রিয় রং লাল’ এর ইংরেজী এরা বলবে `মাই ফেভারিট্টা কালার ইজ্জ রেড্ডা’ এটাই নাকি সঠিক। এরা তামিল ছাড়া আর কোনো সিনেমা দেখে না।  রজনীকান্ত হচ্ছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অভিনেতা।  দক্ষিন ভারতীয়দের সমন্ধে আমার এই ধারণা শুধু মাত্র আমার সাথে কাজ করা এইসব লোকগুলোর কাছ থেকে পাওয়া।  আমি বিশ্বাস করি সব তামিলরা এরকম নন।

যাহোক প্রসঙ্গে ফিরে আসি। বলছিলাম কুর্দিস্তান এর কথা। কুর্দি একটি জাতি, যাদের ভূমি পৃথিবীর চারটি দেশে অবস্থিত যার নাম `কুর্দিস্তান’।  এই কুর্দিস্তান – ইরাক, ইরান, সিরিয়া এবং তুরস্কে অবস্থিত।  এরা অনেক বছর ধরে নিজেদের একটি ভূমির জন্য কষ্ট করে যাচ্ছে কিন্তু ইরাক ব্যতিত অন্য তিনটি দেশে এরা সেই দেশের আইন কানুনের উপর নির্ভরশীল, আলাদা কোনো স্বাধীনতা নেই।  ইরাকি কুর্দিস্তান হচ্ছে একটি `অটোনোমাস স্টেট’। এদের নিজেদের প্রশাসন আছে, পুলিশ আছে, নিজস্ব সেনাবাহিনী আছে যাদের এরা `পেশমারগা’ বলে।  কুর্দিস্তানে আসতে হলে আপনাকে কুর্দিস্তানের ভিসা নিয়ে আসতে হবে, ইরাকের ভিসা এখানে প্রযোজ্য নয়, তবে কুর্দিস্তানের লোকজন যখন খুশি ইরাকে বা ইরাকের লোকজন যখন খুশি কুর্দিস্তান আসতে পারে।  এমনকি তারা যেখানে খুশি বাড়িঘর বানিয়ে থাকতেও পারে। সাদ্দাম হোসেনের সময় বা তার আগে সরকারী কাজকর্ম সব আরবিতে হত কিন্তু এখন সব কুর্দিতে হয়।  এদের সরকারী নথি পত্রে যে মোহর দেয়া হয় তাতে লিখা থাকে `কুর্দিস্তান রিজিওনাল গভর্মেন্ট, ইরাক’।

কুর্দিস্তান মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিকভাবে একতাবদ্ধ একটি অঞ্চল। এখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ কুর্দি জাতির লোক, যারা কুর্দি ভাষায় কথা বলে ও কুর্দি সংস্কৃতি লালন করে।

সেলজুক তুর্কি সুলতান সাঞ্জার সম্ভবত সর্বপ্রথম ১২শ শতকে কুর্দিস্তান নামটি সরকারীভাবে ব্যবহার করেন। তিনি সেসময় কুর্দিদের আবাসভূমি বিজয় করেছিলেন এবং কুর্দিস্তান নামের একটি প্রদেশ গঠন করেছিলেন। এর রাজধানী ছিল বাহার শহর, যা বর্তমান ইরানি হামাদান শহরের কাছেই অবস্থিত। আধুনিককালে কুর্দিস্তান বলতে তুরস্কের পূর্বের কিছু অংশ (তুর্কি কুর্দিস্তান), উত্তর ইরাক (ইরাকি কুর্দিস্তান), দক্ষিণ-পশ্চিম ইরান (ইরানি কুর্দিস্তান) এবং উত্তর সিরিয়ার (সিরীয় কুর্দিস্তান) কুর্দি-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলিকে বোঝায়। ভৌগলিকভাবে কুর্দিস্তান অঞ্চলটি জগ্রোস পর্বতমালার উত্তর-পশ্চিম অংশ এবং তোরোস পর্বতমালার পূর্বাংশ নিয়ে গঠিত। এছাড়া আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার সামান্য কিছু এলাকাকেও কুর্দিস্তানের অন্তর্গত গণ্য করা হয়।

ইরাকি কুর্দিস্তান ১৯৭০ সালে ইরাকি সরকারের সাথে এক চুক্তির মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসন লাভ করে। ২০০৫ সালে ইরাকের নতুন সংবিধানেও ইরাকি কুর্দিস্তানের এই স্বায়ত্তশাসন পুনরায় স্বীকৃতি পায়। ইরাকের প্রতিবেশী ইরানের কুর্দি-অধ্যুষিত এলাকাটিকে কোর্দেস্তন নামের একটি প্রদেশের অন্তর্গত করা হয়েছে। কিন্তু ইরানের এই প্রদেশটি কোন স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ নয়।

বিংশ শতাব্দীতে কুর্দি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে। কিছু কুর্দি জাতীয়তাবাদী সংগঠন কুর্দিস্তান নামের একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র গঠনের প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে কুর্দি-অধ্যুষিত সমস্ত এলাকা বা এর অংশবিশেষ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। অন্যরা বর্তমান রাষ্ট্রীয় সীমানাগুলির মধ্যেই কুর্দি অঞ্চলগুলির স্বায়ত্বশাসনের পরিমাণ বাড়ানোর পক্ষপাতী।

ইরাকি কুর্দিস্তান মূলত চারটি বড় শহর নিয়ে বিস্তৃত। এগুলো হচ্ছে রাজধানী এর্বিল (স্থানীয় নাম হাওলিয়ার), দুহক, সুলায়মানিয়া এবং কারকুক।  এর মধ্যে কারকুক শহরটিকে আমরা সবাই কম বেশি চিনি।  ইরাক যুদ্ধের সময় এই নামটি মিডিয়াতে অনেকবার এসেছে কিরকুক নামে।  কারকুক মূলত বিখ্যাত মানসম্পন্ন তেলের জন্য।  কারকুক নিয়ে এখনো একটা চাপা উত্তেজনা আছে ইরাক এবং কুর্দিস্তানের মধ্যে। ভৌগলিক ভাবে এটা কুর্দিস্তানের অংশ কিন্তু তেল সম্পদের কারণে ইরাক চায় এটা তাদের দখলে রাখতে।

কুর্দিস্তানের প্রেসিডেন্টের নাম মাসুদ বারজানি।  কুর্দিস্তানের জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল কুর্দিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টিরও (কে.ডি.পি) প্রধান জনাব মাসুদ বারজানি।  এই বারজানি পরিবারের প্রধান লক্ষ্য কুর্দি জাতীয়তাবাদ এবং একটি স্বাধীন কুর্দি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।  মাসুদ বারজানির পিতা মুস্তাফা বারজানি এদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রনায়ক। কুর্দিদের মাঝে বারজানি পরিবার অনেক সম্মানের আসনে আসীন।  রাস্তার ধারের মুদি দোকান থেকে শুরু করে হোটেল, রেস্টুরেন্ট, হাসপাতাল, স্কুল, কলেজ, সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠান সব জায়গায় মাসুদ এবং মুস্তাফা বারজানির ছবি টাঙানো।  আমার কাছে কখনই মনে হয় নাই যে এটা জোর করে টাঙানো হয়েছে বরং তাদের আচরণে শ্রদ্ধার ভাব লক্ষ্য করেছি।

ক্ষমতা মানুষকে পরিবর্তিত করে। ইদানিং অবশ্য এই পরিবারকে নিয়ে কিছু কিছু সমালোচনা হচ্ছে। শোনা যায়, দেশের বেশির ভাগ ব্যবসায় বানিজ্য নাকি নিয়ন্ত্রণ করে এই পরিবারের সদস্যবৃন্দ এবং সরকারের অন্যান্য মন্ত্রীবর্গ। যেহেতু সামনে নির্বাচন এবং পূর্ণ স্বাধীনতা পাবার সম্ভাবনা আছে তাই, সরকার ইতোমধ্যে সকলের সম্পদের হিসাব চাওয়া শুরু করেছে।

আমার পনের দিনের ভিসা প্রায় শেষের দিকে। এখন আমাকে `ইকামা’ বা রেসিডেন্ট কার্ড করতে হবে।  যেহেতু আমার অফিস দুহকে রেজিস্টার্ড তাই আমাকে দুহক যেতে হবে সরকারী অন্তর্ভুক্তির জন্য।  এর্বিল থেকে দুহক এর দুরত্ব প্রায় ২০০ কিলোমিটার।  সকাল এগারটায় রওনা দিলাম।  গাড়ি চলছে এর্বিল-দুহক হাইওয়ে দিয়ে ১৪০ কিলোমিটার গতিতে।  সুন্দর মসৃন রাস্তা। দুই পাশে উঁচু উঁচু পাহাড়, পাহাড়ের উপরে কুর্দিস্তানের পতাকা। দূরে তেলের রিগ, মাঝে মাঝে ধু ধু মাঠ, মাঠে মেষের পাল নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে রাখালের দল।  প্রত্যেক দলের সাথে আবার একটা করে কুকুর আছে।  রাস্তার ধারে নানা ধরনের দোকান – সাধারণ মুদি কিংবা চা-কফির টং।  ঘন্টা খানেক চলার পর আমার ড্রাইভার একটা রেস্টুরেন্টে গাড়ি থামালো।  আমরা যেমন ঢাকা চিটাগং যাবার সময় নুরজাহান বা তাজমহলে থামি। পনের মিনিটের বিরতী।  হালকা কিছু স্ন্যাকস নিলাম সাথে রং চা। রেস্টুরেন্টে নামাজের জায়গা আছে, জোহরের নামাজ পরে আবার রওয়ানা দিলাম। এইবার যে পথ দিয়ে যাচ্ছি তা পাহাড়ের উপর দিয়ে।  সমতল থেকে রাস্তা পাহাড়ে উঠে গিয়েছে আবার নিচে লোকালয়ে, আবার পাহাড়ে এইভাবে দুই ঘন্টা পরে দুহক শহরে পৌঁছুলাম।

দুহক শহরটা বেশ সাজানো গোছানো।  ছোট, কিন্তু গর্জিয়াস।  বেশিরভাগ মানুষই ব্যবসায়ী, পয়সাওয়ালা। রাস্তাগুলো বেশ প্রশস্ত, প্রায় সব রাস্তার পাশেই বড় বড় পার্ক, উঁচু উঁচু ভবন।  দুহকিদের ভাষা হচ্ছে বাদীনি।  (কুর্দি ভাষার আবার তিনটা ভাগ আছে – সোরানি, বাদীনি এবং কোর্মান্জী।  এর্বিল এর লোকেদের ভাষা সোরানি)।  রাস্তাগুলো সমতল ভূমিতে আর বাড়িগুলো হচ্ছে ছোট ছোট পাহাড়ের উপরে।  রাস্তার ধারে ছোট বড় নানা ধরনের রেস্টুরেন্ট, তা সে বড় রাস্তাই হোক কিংবা মহল্লার ধারে ছোট রাস্তা।  আর আছে বেকারী শপ। কেক আর চকোলেটের যে কত ভ্যারাইটি!  দুহকের রেস্টুরেন্ট গুলোর একটা মজার ব্যাপার হচ্ছে – আপনি রেস্টুরেন্ট এ ঢুকলেন, টেবিলে বসার সঙ্গে সঙ্গে কম করে হলেও ৮/১০ টা ছোট ছোট পিরিচে করে নানা রকমের সালাদ, জয়তুনের আচার আর দই জাতীয় খাবার আপনার সামনে চলে আসবে।  এরপর বেয়ারা আসবে মেনু কার্ড নিয়ে মূল খাবারের অর্ডার নিতে।  দুপুরের লাঞ্চটা সেরে নিলাম।  খুব এক্সপেন্সিভ মনে হলো না।

আজকে আর কোনো কাজ নেই।  কালকে সকালে  আশায়ীশ (পুলিশ) অফিসে যেতে হবে আমার নিবন্ধনের জন্য তারপর পাসপোর্ট এন্ড ইমিগ্রেশন অফিসে রেসিডেন্ট কার্ড করার জন্য। বিকালে একটা পাহাড়ে বেড়াতে গেলাম।  অনেক উঁচু পাহাড়।  পুরো পাহাড়টাই একটা শহর।  খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮৫ থেকে ৬২৫ এই সময়কার রাজাদের ইতিহাস এখানে দেখা যায়।  পাহাড়ে উঠার প্রথম ধাপে একটা ফলক, তাতে এই সময়ের কথাই উল্লেখ আছে।  কুর্দিস্তানের প্রথম দিকের কোনো এক সম্ম্রাজ্যের রাজপ্রাসাদ এই পাহাড়ের উপর।  অনেক পুরনো ভবন, রাজার আধিকারিকদের বাসস্থান, পার্ক এইসবের নিদর্শন এখনো বোঝা যায়।

পরেরদিন সকালে আমাদের উকিল `আগের’ আমাকে আশায়িশ অফিসে নিয়ে গেল।  আমাকে এক জায়গায় বসিয়ে কাগজপত্র ঠিকঠাক করে, বলল `তোমাকে একটু পরে ডাকবে এবং তোমাকে একা যেতে হবে ইন্টারভিউ এর জন্য’। কিছুক্ষণ পরে আমার ডাক এলো – একটা ঘরে দুই জন পুলিশ আর একজন ইন্টারপ্রেটার।  আমাকে বসতে বলে ইন্টারভিউ শুরু হলো।  দীর্ঘ এবং চরম বিরক্তিকর। আজগুবি সব প্রশ্ন। দোভাষী যিনি আছেন, তাঁর ইংরেজী বুঝতে আবার আরেকজন দোভাষী লাগবে। একদম শেষের দিকে বিরক্তির চরম পর্যায়ে পৌঁছুলাম।

পরেরদিন আবার উকিলের সাথে পাসপোর্ট এন্ড ইমেগ্রেশন অফিস গিয়ে ছবি তুলে দুই ঘন্টার মধ্যে রেসিডেন্ট কার্ড নিয়ে গেস্ট হাউস এ ফিরে এলাম।  খুবই অবাক লাগলো কোনো রকম ঝামেলা ছাড়া, ঘুষ ছাড়া এইরকম একটা সরকারী কাজ হয়ে গেল। পরেরদিন সকালে আবার এর্বিলের পথে রওয়ানা দিলাম।

আমার অফিসটা বেশ সুন্দর। তেরো তলা ভবনের নয় তলায়। চারদিকে কাঁচের দেয়াল, জানালা দিয়ে দিগন্ত দেখা যায়, আকাশ দেখা যায়, প্লেনের ওঠা নামা দেখা যায়।  মনে মনে কবি হয়ে উঠি ! আমার সহকর্মীদের মধ্যে আছে কুর্দি, ইরাকি আরব, লেবানিজ, মিশরী, সিরিয়ান আর ভারতীয়।  বাংলাদেশী আমি একাই। ভারতীয় সবাই দক্ষিণী (তামিল) এরাও বেশ কোঅপারেটিভ, শুধু ওই নাক উঁচু জাতীয়তাবোধ ছাড়া।  অল্পদিনেই সবার সাথে সহজ হয়ে গেলাম।  আমার ডিপার্টমেন্ট এর কাজ বুঝে নিয়ে দেখলাম আরও কিছু জনবল আমার দরকার, বসকে বলতে উনি বললেন আমি যেন লোক পছন্দ করে নিয়োগ দিয়ে দেই এবং উনি সাজেস্ট করলেন যেন সিরিয়ান রেফিউজি নেয়ার চেষ্টা করি।  সিরিয়ান নিতে বলার দুইটা কারণ – এক- এরা শিক্ষিত এবং কাজের প্রতি সিরিয়াস।  দুই- এরা বিপদগ্রস্ত, নিজের দেশের সুখের জীবন ফেলে বেঁচে থাকার তাগিদে এরা কুর্দিস্তানে আশ্রয় নিয়েছে। ভালো লাগলো উনার মহানুভবতা দেখে। এখানে অনেক অফিসে এই উদ্বাস্তু শিক্ষিত তরুণ তরুনীরা সম্মানের সাথে কাজ করে।

সিরিয়ানদের প্রসঙ্গে কিছু কথা শেয়ার করা জরুরী বলে মনে করি। কী অপরাধ ছিল এই সাধারণ সিরিয়ানদের? তারা তো কারো পাকা ধানে মই দিতে যায় নি! বেশ সুখে শান্তিতে দিন পার করছিল তাদের নিজেদের সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য নিয়ে।  বাশার আল আসাদকে সরাতে হবে – বিশ্ব মোড়লের কূটনীতি আর রাজনীতি একটা দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে মানুষের জীবনকে করে তুলল দুর্বিসহ। যেমন করেছে আফগানিস্তানে, ইরাকে, মিশরে। মানলাম তোমরা গায়ে গতরে বেশ বড় তাই তোমাদের নাকটাও বড়, তাই বলে তোমাদের এই উন্নত নাসিকা যত্রতত্র প্রবেশ করিয়ে মানুষের শান্তি নষ্ট করার অধিকার কে দিয়েছে? তৈরী হলো আল কায়েদা আর ইসলামিক স্টেট এর মত সহিংস গোষ্ঠী যারা মুসলমান নাম নিয়ে লক্ষ্য লক্ষ্য মুসলমানকে হত্যা করছে, গৃহহীন করছে, উদ্বাস্তু করছে।  এই তথাকথিত মুসলমানরা ইসলামের মূল বানী থেকে সরে এসে ইসলামের অপবাখ্যা করে ধংস করছে ইসলাম এবং মানব সভ্যতাকে।  আর এরই সুযোগ নিতে তৈরী হচ্ছে নাস্তিক নামধারী একটি দল যাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ইসলাম এবং মুসলমানের গুষ্ঠী উদ্ধার করে ইউরোপ বা আমেরিকায় মাইগ্রেট করা। একদল ধর্মকে ব্যবহার করে আখের গোছায় আর অন্যদল ধর্মের বিষোদগার করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস পায়।  আমি সর্বপ্রথম একজন মানুষ তারপর হিন্দু, ইহুদি, খ্রিষ্টান কিংবা মুসলমান।  আমার ধর্ম আমার বিশ্বাসে, আমার কর্মে, আমার আচরণে আর আমার মানবতায়।

বলছিলাম সিরিয়ানদের কথা। এখানে যেসব সিরিয়ান উদ্বাস্তু আছে তাদের মধ্যে শিক্ষিত, অল্প শিক্ষিত, সচ্ছল, অসচ্ছল সব মিলিয়ে। আমার সাথে যে মেয়েটা কাজ করে সে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর তৃতীয় বর্ষের।  তার অন্য ভাই বোনেরাও লেখাপড়া করত।  নিজেদের বাড়িঘর ফেলে শুন্য হাতে এখানে আসতে বাধ্য হয়েছে।  তার ভাইরা এখানে বিভিন্ন শপিং মলে কাজ করে সেলস ম্যান হিসাবে।  কোনরকমে একটা ছোট ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকে সবাই মিলে। অতীত এখন তাদের কাছে কেবল স্মৃতি।

বেশির ভাগ বড় বড় শপিং মলে সিরিয়ান যুবকরা কাজ করে, আর যারা একটু বয়স্ক তাঁরা কোনো রকমে ছোট খাটো রেস্টুরেন্ট খুলে দিন পার করার চেষ্টা করেন।  আর যারা অসচ্ছল পরিবার থেকে এসেছেন তাঁরা রাস্তার ধারে ফুটপাথে ছোট ছোট দোকান দিয়েছেন বা ট্র্যাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে চকলেট বা টিস্যু বক্স বিক্রি করেন।

মাঝে মাঝে কিছু সিরিয়ান ভিক্ষুকও চোখে পরে, বিশেষ করে মার্কেট এর সামনে।  এরা বিদেশী লোক দেখলেই সাহায্যের জন্য হাত বাড়ায়।

যেসব সিরিয়ান, অফিসে কাজ করে তারা যথেষ্ট কর্মঠ এবং সিনসিয়ার। কাজকে ভালবাসে, শেখার চেষ্টা আছে এবং উন্নতিও করে। অনেকেই চেষ্টা করে এখান থেকে ইউরোপে যাওয়ার, কেউ কেউ সফলও হয়।

কুর্দি জাতি বেশ আন্তরিক।  সহজেই মানুষের সাথে মিশতে পারে।  এদের সৌজন্যতা আমাদের মতই।  কারো সাথে দেখা হলে এরা জিজ্ঞেস করবে `চোয়ানী বেরাম? বাশী? উত্তরে বলবে- বাশেম, সুপাস বেরাম, সারচাও, সারসারেমান’ – মানে হলো `কেমন আছ ভাই, ভালতো? উত্তর হচ্ছে – ভালো আছি, ধন্যবাদ ভাই, তুমি আমার দৃষ্টিতে থাক, তুমি আমার মাথায় থাক সর্বদা। আমার যেসব কুর্দি সহকর্মী আছে তারা মাঝে মাঝেই তাদের বাসায় নিমন্ত্রণ করে, আমার বাসায় আসে।  সহকর্মীদের মধ্যে কিছু আছেন যাঁরা একেবারে বন্ধুর মত, পরিবারের মত হয়ে গেছেন।  আমার কোম্পানীর মালিকের ভাতিজা বিহিস্ত এবং তার স্ত্রী নালীন এরকম বন্ধু পরিবারের একটি।  ছুটির দিন, হঠাৎ কলিং বেলের শব্দ। দেখি নালীন এসছে একগাদা খাবার রান্না করে।  দোলমা বানিয়েছে নিজের হাতে, আমার সাথে খাবে বলে।  বিহিস্ত গ্যাছে দোকানে ড্রিঙ্কস কিনতে।  এদের আন্তরিকতার তুলনা হয় না। খুব সহজেই এরা মানুষের সাথে মিশে যেতে পারে।  আমি ছুটিতে আসব শুনলেই নালীন সহ আমার মেয়ে সহকর্মীরা ইন্টারনেট ঘেঁটে আড়ং এর ড্রেস পছন্দ করতে বসে যায়।  আবার এরা কেউ তুরস্ক বা ইউরোপে বেড়াতে গেলে আমার জন্য একগাদা গিফট নিয়ে হাজির হয়।

আমাদের লজিস্টিক অফিসার লিনা একজন আরব। বাগদাদ এর বাসিন্দা।  এর্বিলেও ওদের বাড়িঘর আছে।  লিনার বাবা একজন নামকরা উকিল।  বাগদাদে থাকেন।  লিনা ওর মা আর ভাইবোনদের সাথে এর্বিল এর বাড়িতে থাকে।  সবাই শিক্ষিত এবং যথেষ্ঠ ধনী।  লিনার মা এখানকার ইউনিভার্সিটির শিক্ষক, ভাই বড় কর্মকর্তা এবং একবোন ইংল্যান্ডে পিএইচডি করছে।  কুর্দিস্তানে আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ হচ্ছে লিনা।  আমি জানিনা কি কারণে লিনা আমাকে এত পছন্দ করে যে, সে জনসম্মুক্ষে আমাকে তার বাবা বলে পরিচয় করিয়ে দেয়। কেউ যদি আমাকে লিনার সামনে জিজ্ঞেস করে আমার সন্তান কয়টি তবে ভুল করেও বলা যাবে না যে একটি মেয়ে এবং একটি ছেলে, বলতে হবে দুই মেয়ে এবং এক ছেলে।  আমি যে বাসাতে থাকি তা লিনাই ঠিক করে দিয়েছে এবং প্রতিনিয়ত খবর রাখে আমার কোনো অসুবিধা হচ্ছে কি না। মাঝে মাঝেই লিনার বাসায় নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যাই আবার লিনার মা ভালো কিছু রান্না করলে আমার জন্য পাঠিয়ে দেন। ওরাও আমার বাসায় আসে, খেয়েদেয়ে নিজেরাই থালা বাটি ধুয়ে দিয়ে যায় আমি একা মানুষ বলে।

আমার বাসাটা এর্বিলের একপ্রান্তে। `আশ্তি সিটি’ বাংলা করলে দাঁড়ায় শান্তি নগর। আশ্তি সিটির নব্বুই ভাগ বাসিন্দাই ইরাকি আরব। আর আমার মত কিছু বিদেশী। শহরের মধ্যে শহর। সারি সারি একতলা আর ডুপ্লেক্স বিল্ডিং, প্রতিটি বাড়ির সামনে তিরিশ ফিট রাস্তা। আছে সুপার স্টোরস, মসজিদ, পার্ক, খেলার মাঠ, গ্রোসারী শপ। এরা গ্রোসারী শপকে বলে মার্কেট।  প্রত্যেক বাড়ির সামনে রাস্তার উপর গাড়ি রাখা।  দিন রাত সবসময় এরা গাড়িগুলো রাস্তার উপর রেখে দেয়।  চুরি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।  চুরি শব্দ বোধয় এদের অভিধানেই নেই।  আমি একবার ভুলে আমার ঘরে তালা না দিয়ে অফিস চলে গিয়েছিলাম, বিকেলে ফিরে দেখি সব কিছু ঠিক ঠাক আছে।  ল্যাপটপ, ক্যামেরা, টেলিভিশন যেখানে যেমন ছিল।

নিসঙ্গতা যে কত কষ্টের তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।  চার রুমের একটা বাসায় আমি একমাত্র প্রাণী।  কথা বলার কেউ নেই।  সন্ধ্যা থেকে একা একা সময় পার করা যে কী কঠিন তা ভুক্তভোগীরায় জানেন। একমাত্র ভরসা স্কাইপে পরিবারের সাথে কথা বলা।  অফিস থেকে এসে রান্না করে ডিনারের পর অফুরন্ত সময়। মাঝে মাঝে চেয়ার নিয়ে গেট এর কাছে বসে থাকি, বাচ্চাদের খেলা দেখি। এখানে বাচ্চারা কি পড়াশোনা করে না? রাত দশটা এগারোটা পর্যন্ত রাস্তায় ফুটবল খেলে শরীর ঘামিয়ে বাড়ি যায়।  মাঝে মাঝে বল কুড়িয়ে দেওয়াটাও একটা আনন্দের কাজ বলে মনে হয়। একদম পিচ্চি পিচ্চি বাচ্চারা আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, চোখে চোখ পড়লেই লজ্জা পেয়ে মা বাবার কাছে মুখ লুকায়। বিদ্যূত  চলে গেলে গরমে ঘরে থাকা মুশকিল। উহ চরম গরম! পঞ্চাশ ডিগ্রী তাপমাত্রা, মনে হচ্ছে চুলার উপর বসে আছি। কাঠ ফাটা রোদের কথা শুনেছি, এখানকার রোদ মনে হচ্ছে লোহা ফাটা। বাইরে চেয়ার নিয়ে বসে আকাশ দেখি, তারা দেখি, চাঁদ আর মেঘের লুকোচুরি খেলা উপভোগ করি। আবারো কবি হয়ে উঠি –

`মুখোমুখি বসে আছিআমি আর চাঁদ

চাঁদের পাশে-

উজ্জ্বল গ্রহম্লান নক্ষত্র প্রতিবেশী হয়ে আছে

তারার বেশে।

একাকী অন্ধকারে বন্ধুবিহীনশব্দহীন

আমার অস্তিত্ব-

আলো আর আঁধারের ফারাকআমার

মাঝে স্তিমিত

আমার প্রতিবেশী যাঁরা আছেন, তাঁরা আমার সাথে কথা বলতে চান, মিশতে চান, বন্ধুত্বও করতে চান কিন্তু বাধা হচ্ছে একমাত্র ভাষা।  এঁরা কেউ ইংরেজী বলতে পারেন না, আরবী ছাড়া।  আর আমি একটু আধটু কুর্দি শিখতে পারলেও আরবীটা এখনো আয়ত্ব করতে পারি নাই।  আমার পাশের বাসায় যে ভদ্রলোক থাকেন তিনি খুবই পরোপকারী এবং ভদ্র একজন মানুষ।  আমাদের পানির লাইনে পানি আসে বিকেল তিনটায় আর থাকে পাঁচটা পর্যন্ত যে সময়টায় আমি অফিসে থাকি। সুতরাং আমাকে পানির কষ্ট করতে হয়, মাঝে মাঝে ট্রাকে করে সরকারী পানি কিনতে হয়।  আমার এই কষ্ট দেখে আমার সেই প্রতিবেশী প্রতিদিন আমার পানির মোটর চালু করে দেন এবং আমি যখন বিকেলে বাড়ি ফিরি দেখি ভদ্রলোক গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আমাকে ওয়েলকাম করেন। উনার সাথে আমার `আস সালামুআলায়কুম’ আর `আহলান ওয়া সাহলান’ ছাড়া কোনো কথা হয় না কিন্তু আন্তরিক হাসি বিনিময় হয় যা সহস্র শব্দের থেকেও মূল্যবান।

একবার একটা বিয়ের নিমন্ত্রণ পেলাম।  রাতের বেলায় অনুষ্ঠান। কুর্দি বিয়ে দেখা হয়নি, এইবার সেই সুযোগও এসে গেল। বিকেল বেলায় নালীন ফোন করে বলল, আমি যেন তৈরী থাকি। ওরা আমাকে বাসা থেকে তুলে নিবে। কথা মত সন্ধ্যে বেলায় নালীন, বিহিস্ত এবং আমি বিয়ে খেতে রওয়ানা হলাম। একটি কমিউনিটি সেন্টারে অনুষ্ঠান। অনেক অতিথি উপস্থিত। আমরাও নির্দৃষ্ট আসনে গিয়ে বসলাম।প্রথমে শরবত দিয়ে আমাদের বরণ করে নেওয়া হলো, তারপর একটু পরপর হয় আঙ্গুর অথবা আপেল বা কলা পরিবেশন করা হচ্ছে। সামনে বিশাল হলে বর এবং কনের নিকট আত্মীয়রা গানের তালে তালে কুর্দিস্তানের ঐতিহ্যগত নাচ পরিবেশন করছেন।

এরপর বর এবং কনে আসরে প্রবেশ করলেন, সবাই একে একে বর বধুকে স্বাগত জানালো, পরিচিত হলো। ধর্মীয় বা রেজিস্ট্রেশন এর কাজ কর্ম বোধ হয় আগেই বাড়িতে বসে সেরে নেওয়া হয়েছে। বর এবং কনে  উভয়েরই বিয়ের পোশাক ইউরোপীয় ধরনের। কনে পড়ে আছেন সাদা গাউন এবং মাথায় স্কার্ফ আর বরের পরনে সাদা স্যুট। পরিচয় পর্ব শেষ হলে বর এবং কনেও সবার সাথে নাচে শরীক হলেন। প্রায় প্রত্যেক অতিথিই এই নাচে অংশ গ্রহণ করলেন শুধু আমি ছাড়া।  রাত বাজে এগারোটা, পেটে তো ছুঁচো ডন মারতে শুরু করেছে! অবশেষে মূল ভোজন পর্ব শেষ করে আমরা তিন জনে বাড়ি ফিরে এলাম।

আজকে ১৬ মার্চ।  হালাবিয়া দিবস। আমরা সবাই একসাথে অফিস থেকে বেরিয়ে রাস্তায় সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে মৌনতা পালন করলাম।  এর্বিলের সব রাস্তার ধারে হাজার হাজার মানুষ।  একজন আরেকজনের হাত ধরে দাঁড়িয়ে। ১৯৮৮ সালের এইদিনে সাদ্দাম হোসেন বিষাক্ত গ্যাস দিয়ে হাজার হাজার কুর্দিকে হত্যা করেছিলেন। সাদ্দাম হোসেন কখনই কুর্দি জাতীয়তাকে স্বীকার করতেন না।  পাকিস্তানীরা যেমন স্বাধীনতার আগে আমাদের সাথে আচরণ করত অনেকটা সেই রকম। এই কারণে কুর্দিরা আরবদের পছন্দ করে না এবং সব সময় চেষ্টা করেছে ইরাক থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের।  সেই সময় প্যালেস্টাইনের অবিসংবাদিত নেতা ইয়াসির আরাফাত সাদ্দাম হোসেন কে সমর্থন দিয়ে এই Genocide এর পক্ষ্য নিয়েছিলেন বলে কুর্দিরা ফিলিস্তিনিদেরও পছন্দ করে না এবং যেহেতু ইসরাইল তখন তাদের পক্ষ্যে দাঁড়িয়েছিল, তাই এরা কিছুটা ইসরাইল ঘেঁসা। অবশেষে ইরাক যুদ্ধে সাদ্দাম হোসেনের পরাজয়ের পর এরা স্বায়ত্ব শাসন পুনরায় ফিরে পায়। কুর্দিরা বিশ্বাস করে অতি শীঘ্র তারা পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করবে।

এর্বিল, দুহক বা সুলায়মানিয়া শহরের জীবনযাত্রা অনেকটা ইউরোপের মত।  এদের পোশাক, ফ্যাশন,  চালচলন সবই ইউরোপীয় স্টাইলের।  মানুষজন মোটেই কনজারভেটিভ নয়।  রাস্তায়, অফিসে কিংবা শপিং মলে যে সব মেয়েদের চোখে পরে সবাই জিন্স, টি-শার্ট, জ্যাকেট, উঁচু হিলের জুতো পরিহিত।  বোরখা বা হিজাব খুব একটা চোখে পরে না, আরব মহিলা ছাড়া।  আর এদের মেয়েরা সাজতে খুব পছন্দ করে, যত রকম প্রসাধনী আছে সবই ব্যবহার করে সেজেগুজে বের হয়।  খুব কম মেয়েরই চুল কালো দেখেছি, সবাই সোনালী বা বাদামী রং করে রাখে। চুলের আবার নানা রকম স্টাইল – কার্ল, স্ট্রেট, সিল্কি, বব আরও কত কি! মেয়েগুলো দেখতেও অপরুপ সুন্দর এবং এরা নিজেদের আরও সুন্দর করার চেষ্টা চালিয়ে যায়।  অবাক করার মত বিষয় হচ্ছে এখানে কোনো মেয়েই নিগৃহীত হয় না।  এই যে রাস্তা ঘাটে দিনে রাতে সবাই ঘুরে বেড়াচ্ছে কোনো যুবক তাদের দিকে ফিরেও তাকাবে না, ইভ টিজিং তো দুরের কথা।  যদি কখনো কোনো অপূর্ব রূপবতী চোখে পরে যায়, তবে যুবকরা নিজেদের মধ্যে খুবই আস্তে আস্তে বলবে ` ওয়াল্লাহ! যোর যোর জোয়ানা’ মানে অনেক অনেক সুন্দর। এর বেশী কিছু নয়।

ছেলেরা সবাই নরমাল শার্ট প্যান্ট পরে থাকে। বিয়ে কিংবা যে কোনো জাতীয় উত্সবে এরা এদের জাতীয় পোশাক পড়তে ভালবাসে।  মেয়েরা লম্বা আলখেল্লা টাইপের রংচঙে জামা আর ছেলেরা শার্ট এবং প্যান্ট একসাথে জোড়া দেয়া একধরনের পোশাক। ছেলেদের পোশাকে আবার কোমরের কাছে বিশাল এক ওড়না পেঁচিয়ে রাখে, বেল্টের মত করে।

এরা বোধহয় রান্নাবান্না খুব একটা করে না, প্রায় দেখি রেস্তোঁরাতে গিয়ে ডিনার করে পরিবার সহ অথবা হোম ডেলিভারির সাহায্য নিয়ে বাসায় খাবার আনিয়ে নেয়।  এর্বিল শহর জুড়ে হাজারো রেস্তঁরা আর বিউটি পার্লার।  দোলমা নামে একধরনের খাবার আছে। যাঁরা সৈয়দ মুজতবা আলীর `জিবুতি বন্দর’ গল্পটা পড়েছেন তাঁরা এই দোলমা সমন্ধে কিছুটা জানেন। শশার মত একটা জিনিস মাঝখানে কেটে দুই পাশে চাপ দিলে বেরিয়ে আসে পোলাও বা বিরিয়ানির মত বস্তু। খুবই ছোট আকারের একধরনের লাউ এর মত সব্জী (আমাদের দেশে যে হাইব্রিড শসা পাওয়া যায় অনেকটা সেই সাইজের) এর ভেতর থেকে সব কিছু ফেলে দিয়ে ভিতরটা ফাঁপা করে ভিতরে এই পোলাও বা বিরিয়ানী ঢুকিয়ে দিয়ে রান্না করা হয়।  দোলমা আবার নানা রকমের হয় – লাউ, বেগুন, আঙ্গুর পাতা মোড়ানো, লাউ পাতা মোড়ানো, বাঁধা কপি পাতা মোড়ানো ইত্যাদি। এদের খাবারের তালিকায় আর একটি আবশ্যিক আইটেম হলো সালাদ, নানা রকমের সালাদ আর তাতে জয়তুন (জলপাই)। জয়তুন এরা খুব খায়, ঘরে ঘরে জয়তুন এর গাছ।  জয়তুন দিয়ে বানানো খাবারের যে কত রকম ভ্যারাইটি আছে – সবুজ জয়তুন, খয়েরী জয়তুন, হলুদ জয়তুন। এরা চকলেট এবং পনির এর খুব ভক্ত।  প্রায় সব মিষ্টি জাতীয় খাবারে চকলেট এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় আর আছে পনির এর ব্যবহার।  পনির যে কত রকমের হতে পারে কুর্দিস্তান না এলে জানা হত না। এরা আমাদের মত সেদ্ধ ভাত খায় না।  ভাত রান্না করে অল্প তেল দিয়ে, খবুজ (রুটি) বা সামুন (এক ধরনের ছোট তন্দুর রুটি) এর সাথে খায়, আমরা যেমন তরকারী মাখিয়ে রুটি খাই।

এখানে সাধারণ স্ন্যাকস বলতে বোঝায় শর্মা আর ফেলাফেল। আমাদের মত সিঙ্গারা, সামোসা, পুরি, আলুচপ এইরকম না।  শর্মা (সঠিক উচ্চারণ সোয়ার্মা) খুব প্রচলিত খাবার, ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ডিনার সব সময় শর্মা প্রচলিত।  নানা রকমের শর্মা – শর্মা স্যান্ডুইচ, শর্মা মিল, আরাবিয়ান শর্মা, মিরিশ (চিকেন) শর্মা, লাহাম (বীফ) শর্মা।  শর্মার নাম শুনলে এখন শরমিন্দা হই, এই ক’বছরে এত শর্মা খেয়েছি যে অরুচি ধরে গ্যাছে।  অপেক্ষাকৃত সস্তার স্ন্যাকস হচ্ছে ফেলাফেল। সামুন এর মাঝখানে কেটে ভিতরে বেগুন ভাজি, আলু ভাজি, একধরনের ডালের বড়া, সালাদ আর জয়তুন ভরে দিয়ে একটা স্যান্ডুইচ এর মত বানানো হয়।  মাত্র এক হাজার দিনার দাম। রাস্তার মোড়ে মোড়ে এই ফেলাফেলের দোকান।  সন্ধ্যার সময় লোকজন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই ফেলাফেল খায় আর কেউ কেউ ব্যাগ ভর্তি করে বাড়ির জন্য নিয়ে যায়।

কুর্দিস্তানের বোধ হয় তেমন কোনো শিল্প কারখানা নেই।  কৃষি কাজও খুব একটা চোখে পরে না।  খাদ্য থেকে শুরু করে নিত্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই আমদানি নির্ভর। আর এই বাজার বলা যায় পুরোটায় ধরে রেখেছে তুরস্ক। সাধারণ বিস্কুট, সবজি থেকে শুরু করে যন্ত্রপাতি, কলকব্জা, ইলেকট্রিক কিংবা ইলেকট্রনিক্স দ্রব্যাদি সবই তুরস্কের। শপিং মল গুলোতে ব্র্যান্ডেড যত পোশাকের দোকান আছে নব্বুই ভাগই তুরস্কের।  এর্বিলের রাস্তায় বের হলেই চব্বিশ চাকার ট্রেইলার চোখে পড়বে, যা তুরস্ক থেকে পণ্য নিয়ে প্রবেশ করেছে বা পণ্য খালাস করে তুরস্ক ফিরে যাচ্ছে। কিছু কিছু জিনিসপত্র ভারত থেকেও আমদানি করা হয় যেমন, চাল, ডাল, মশলা ইত্যাদি।

আমাদের বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরাও ইচ্ছে করলে এই বাজার ধরতে পারেন। বিশেষ করে তৈরী পোশাক আর খাদ্য দ্রব্য। আমি মোটামুটি আমার বস থেকে শুরু করে সমস্ত আরব এবং কুর্দি বন্ধুদের মাঝে আমাদের প্রাণ এর আমসত্বকে ব্যাপক পপুলার করে ফেলেছি। আমার বস তো আমাকে প্রাণ এর সাথে যোগাযোগ করতে আদেশ দিয়ে ফেললেন।

এর্বিলের রাস্তায় বড় বাস খুব একটা চোখে পড়ে না, শুধু স্থলপথে তুরস্ক যাওয়ার জন্য কিছু দেখা যায়।  আর এরা নিজেদের দেশে বিভিন্ন শহর বা স্টেটে যাতায়াত করতে প্রাইভেট কার বা ট্যাক্সি ব্যবহার করে।  যাদের তাড়া থাকে তারা ডোমেস্টিক এয়ারলাইনস এর দারস্থ হয়।  পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বলতে দুই একটা মাইক্রোবাস দেখা যায়।  প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই দুই একটা করে গাড়ি আছে বিধায় ট্রান্সপোর্ট নিয়ে এদের কোনো সমস্যা নেই। গাড়ির ব্যাপারে এরা বেশ সৌখিন বলে মনে হয়।  সবারই দামী দামী গাড়ি, উদাহরণ  হিসাবে বলা যায় আমার বাড়ির সামনে মুদির দোকানদার লাফির কথা।  দুই ভাই মিলে দোকানটা চালায়। আর লাফি চালায় Dodge এবং তার ভাই চালায় BMW।

দেখতে দেখতে শীত চলে এলো। এখানকার আবহাওয়া চরম ভাবাপন্ন।  গরমের সময় প্রচন্ড গরম আর শীতে প্রচন্ড ঠান্ডা।  কখনো কখনো মাইনাসে চলে যায়।

কাল রাত থেকে এরবিল এর আকাশটা অভিমানী মেয়ের মত মুখ গোমড়া করে আছে। থেমে থেমে জল গড়িয়ে পড়ছে আকাশের বারান্দা থেকে। আমাদের দেশে সাধারণত বর্ষা কিংবা গরমের সময় বৃষ্টি হয়, এখানে উল্টো। বৃষ্টির কোনো মৌসুম নেই। কিন্তু শীতে বেশ জোরে সরেই বৃষ্টি নামে।

ভোর বেলায় বৃষ্টির শব্দে ঘুম ভাঙ্গলো। বেশ শীত শীত লাগছিল। তাপমাত্রা ৬ ডিগ্রির নিচে। কন্বল থেকে খানিকটা যুদ্ধ করেই বের হতে হলো, রাতে হিটার চালাতে ভুলে গিয়েছিলাম। গরম কাপড় গায়ে জড়িয়ে বাইরে বের হয়ে দেখি স্ফটিকের মত বৃষ্টি ঝরছে। সামনের পার্কটা আরও সবুজ হয়ে গ্যাছে, আমার বাগানের গোলাপগুলো আরো উজ্জল দেখাচ্ছে। এমন দিনে কারো অফিস যেতে ইচ্ছে করে?

আমার তামিল সহকর্মী কাম বন্ধু সাহায়া বললো, আজ বিকেলে কাজ না থাকলে সিটাডেল ঘুরতে যাব কি না?  ইতিহাস আমার পছন্দের বিষয়, এক কথায় রাজি হয়ে গেলাম। এর্বিল এর পুরনো অংশে `এর্বিল সিটাডেল’ বা `এর্বিল দুর্গ’ অবস্থিত। স্থানীয় ভাষায় `ক্কালা হাওলিয়ার’।  আগেই বলেছি এর্বিল এর আদি এবং স্থানীয় নাম হাওলিয়ার আর ক্কালা হচ্ছে দুর্গ আমরা যাকে কেল্লা বলে থাকি। এর্বিল সিটাডেলকে বিশ্বের প্রাচীনতম ক্রমাগত অধ্যুষিত শহর বলে মনে করা হয়।  সিরিয়ার দামাস্কাস সিটিও অনেক পুরনো কিন্তু তা ক্রমাগত অধ্যুষিত ছিলনা। পুরনো নিদর্শন গুলো থেকে বোঝা যায় যে এই দুর্গের বয়স কমপক্ষে ৮,০০০ বছর। খ্রিষ্টাব্দ প্রথম শতাব্দিতে Adiabene রাজত্বের সময়কালে এর্বিল খ্রিষ্টানদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল, যদিও পরবর্তিতে Adiabene রাজারা ইহুদি ধর্মকে বরণ করেছিলেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে সিটাডেলের অভ্যন্তরে তিনটি মসজিদ, দুটি মাদ্রাসা, এবং একটি হামাম খানা (গোসল খানা) ছিল। এ ছাড়াও দুটি `তাকিয়া’ (সম্মেলন কেন্দ্র) ছিল, যেখানে সুফী, দরবেশ, ধর্মপ্রান মুসলমানরা ধর্মীয় আচার অনুশীলন করতেন। `সামা খানা’ বা `শামা খানা’ বলে একটা হল রুমের অস্তিত্ব পাওয়া যায় যেখানে সুফী দরবেশগন `থিকির’ (ধর্মীয় শ্লোক, আমরা যাকে জিকির বলে থাকি) আবৃত্তির সঙ্গে নাচের আসর বসাতেন।

সেই সময় সিটাডেলএ দুই ধরনের তাকিয়া লক্ষ্য করা যায় – সবচেয়ে প্রাচীন তাকিয়াটির অধিকারী ছিলেন শেখ শরিফ, যাঁদেরকে কাদেরিয়া তরিকার অনুসারী বলে মানা হয়।  এঁরা প্রতি সোম এবং শুক্রবার এঁদের ধর্মীয় আচার পালন করতেন।  আর দ্বিতীয় তাকিয়াটির অধিকারী ছিলেন মুল্লা খিদির আল-তেলাফারী ইনিও কাদেরিয়া তরিকার অনুসারী।  এই দুইটি তাকিয়াই এখন বিলীন হয়ে গ্যাছে, যা শুধু বিংশ শতাব্দিতে আঁকা কিছু চিত্রকর্মে ছাদের উপর গম্বুজ দেখে চিন্হীত করা যায়।

বর্তমানে UNICEF সিটাডেলকে World Heritage ঘোষণা করেছে। সরকারী ভাবে এর সংস্কারের কাজ চলছে, তাই ইচ্ছে থাকা সত্বেও পুরো সিটাডেল ঘুরে দেখা সম্ভব হলো না।

`বাজার-এ-নিস্তিমা’। এর্বিল শহরের পুরনো এলাকার বিশাল বাজার। অনেকটা আমাদের চক বাজারের মত। একটা বিষয় আমাকে খুব অবাক করে, সব দেশের পুরনো শহর গুলো প্রায় একই রকম দেখতে। কলকাতা, কাবুল, চীন এবং এখন কুর্দিস্তানের এর্বিল এর পুরনো শহর দেখছি। বিশেষ করে কলকাতা, কাবুল এবং এর্বিল এর পুরনো শহর এর সাথে আমাদের লালবাগ, ঢাকেশ্বরী, মিটফোর্ড এর অনেক মিল দেখতে পাই।
সেই বাজার-এ-নিস্তিমাতে কী নেই? কাঁচা বাজার থেকে শুরু করে, পোশাক, জুতো, ঘড়ি, টেলিভিশন, ইলেকট্রিক, ইলেকট্রনিক্স, পারফিউম সব …. পাইকারী দোকান, খুচরো দোকান এমনকি ফুটপাথে হকার এর সম্ভার।
শুক্রবারে প্রচুর বাংলাদেশির দেখা পাওয়া যায়। ছুটির দিনে এরা রাস্তার পাশে অস্থায়ী দোকান নিয়ে বসে। সিঙ্গারা, পুরি, সমোসা ইত্যাদি বানিয়ে গরম গরম বিক্রি করে। কুর্দিরা ঝাল খেতে পারে না, ইদানিং দেখি অনেক কুর্দিও এই সব ঝাল খাবার কিনে নিয়ে যায়। সিঙারাতে কামড় দিয়ে বলে `ওয়াল্লা-যোর যোর তিশা’। বাঙালি পারেও বটে! হঠাৎ সে দিন দেখি রসগোল্লা বিক্রি করছে। জিভে পানি চলে এলো ! ৩,০০০ দিনার দিয়ে একটা রসগোল্লা খেয়ে দেখি খারাপ না। অপেক্ষায় আছি, কবে যেন পহেলা বৈশাখে পান্তা ভাত আর ইলিশও মিলবে।

রোজা চলে এলো। কুর্দিস্তানে প্রথম রোজা। বাড়িতে আমি একা – একমাত্র রোজাদার, একমাত্র নামাজী।  অফিস থেকে ফিরে অফুরান সময়, ইফতারি বানানোর কোনো ঝামেলা নেই।  আমার ইফতারির মেনু হচ্ছে – ১ টা আপেল, ১ গুচ্ছ আঙ্গুর, ফলের জুস, খেজুর আর টক দই। মাঝে মাঝে শর্মা কিনে আনি। একা একা ইফতার করা যে কি বিরক্তিকর তা যাঁরা না করেছেন তাঁরা বুঝবেন না।  একাকিত্ব ঘোচাতে স্কাইপ অন করে মেয়েকে বলি ভিডিও অন করতে, আমি ইফতার করি – আমার মা দেখে, বউ দেখে, ছেলে মেয়ে দেখে।

একদিন ইফতারির আগে কলিং বেলের শব্দে বাইরে বের হয়ে দেখি, একটি ছোট ছেলে ট্রেতে করে খাবার নিয়ে দাঁড়িয়ে।  আমার সামনের বাসা থেকে আমার জন্য ইফতার পাঠিয়েছে। মুখোমুখি বাড়ি, ভদ্র মহিলা হিজাব পরে তাঁর দরজায় দাঁড়িয়ে আমাকে দেখে হাসি বিনিময় করলেন এবং বোঝাতে চেষ্টা করলেন এটা ওঁদের কাস্টম। আমি খুশি হয়ে উপহার গ্রহণ করলাম।  উপহার তো নিলাম কিন্তু বিনিময়ে আমাকেও তো কিছু পাঠাতে হবে।  একদিন বউ এর কাছ থেকে পায়েশ বানানোর কারিগরী বিদ্যা অর্জন করে একবাটি নিয়ে হাজির হলাম প্রতিবেশীর দরজায়। আবারও সেই universal language `হাসি’ বিনিময় করে ফিরে এলাম।

আরেক দিনের কথা, আমার আরেক প্রতিবেশী (একটু দূরবর্তী) এক গাদা ইফতার নিয়ে হাজির। কোনো কথা বলতে পারে না আরবি ছাড়া।  হড়বড় করে কিসব বলে গেল তার মধ্যে কয়েকবার বলল `খয়রাত’।  এই শব্দ তো পরিচিত, `খয়রাত’, মনে মনে ভীষণ রাগ হলো – বেটা কি আমাকে মিসকিন ভেবেছে নাকি, আমি কি ভিক্ষুক? জোর করে খাবার ধরিয়ে দিয়ে বেটা চলে গেল।  রাগ কমছে না।  আমার সহকারী দিলাভ কে ফোন দিলাম, কন্ঠস্বরে রুক্ষতা! `হ্যালো দিলাভ, হোয়াট ইজ খয়রাত’? ইয়েস স্যার, খয়রাত মিনস গিফট।  ওকে থ্যান্ক ইউ’। রাগ মনে হয় কমতে শুরু করেছে। কত সুন্দর একটা শব্দকে আমরা ভিক্ষা বলে চিন্হিত করেছি।  ভাষার প্রসঙ্গ যখন চলে এলো তবে আরেকটা উদাহরণ দেই, আমাদের হুজুররাও ঠিক মত না জেনে কত ভুল ভাল যে বলেন তাঁদের ওয়াজ মাহফিলে। দেখবেন ওয়াজ মাহফিলে বা যেকোনো বয়ানে হুজুররা বলছেন – `আল্লাহ  আমাদেরকে দুনিয়াতে এই এই জিনিস দিয়েছেন, এত সুখ দিয়েছেন আবার মৃত্যুর পর এত এত দিবেন, সবাই বলেন মারহাবা। সকলে সমস্বরে বলে উঠেন মারহাবা মারহাবা।  `মারহাবা’ আরবী শব্দ যার অর্থ হচ্ছে `হ্যালো’। কারো সাথে দেখা হলে আরবরা প্রথমেই বলে মারহাবা, ফোন ধরে বলে মারহাবা। তাহলে হুজুরদের কথা অনুযায়ী মনে হচ্ছে আল্লাহ আমাদের যে সব সুখ সম্পদ দান করেছেন তার জন্য আমরা সবাই আল্লাহকে বলব হ্যালো হ্যালো।

নাম নিয়েও আছে নানা রকমের বিভ্রাট। আমাদের দেশের লোকজন মনে করেন সন্তানের নাম আরবীতেই রাখতে হবে। আরবীতে নাম রাখা নিয়ে কোনো সমস্যা নেই কিন্তু একটু বুঝে শুনে অর্থ জেনে রাখাটা ভালো। অন্যের কথা আর কী বলব! আমার নিজের নাম নিয়েই যে বিভ্রান্তিতে পড়েছিলাম সেই উদাহরনই যথেষ্ট। আমার পুরো নাম দেখে কিছু আরবীয় বন্ধু একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করলো তোমার নামটা আসলে কী? তারপর একটা একটা করে প্রতিটা শব্দের অর্থ আমাকে বুঝিয়ে দিল। সৈয়দ মানে হচ্ছে মিস্টার বা জনাব।  এরা সাধারণত উচ্চ পদস্থ, সম্ভ্রান্ত কোনো ব্যক্তির (যেমন বড় সরকারী ব্যক্তি, কূটনীতিক, বড় গ্রুপ অফ কোম্পানির চেয়ারমেন) নামের আগে সৈয়দ ব্যবহার করে। যেহেতু আমাদের নবীজী (স:) সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্য ছিলেন তাই তাঁর নামের আগেও সৈয়দ ব্যবহার করা হত। এটা কোনো বংশ নয় বরং উনার বংশ ছিল কুরাইশ। এরপর আসা যাক আমার নামের বাকি অংশে, `আবু আশরাফ’ মানে হচ্ছে আশরাফের পিতা আর `মহি-উদ্-দ্বীন’ হচ্ছে আমার পারিবারিক নাম। তাহলে বাংলা অর্থ করলে আমার নামের মর্মার্থ হচ্ছে `জনাব আশরাফের পিতা যিনি মহি-উদ্-দ্বীন পরিবার থেকে এসেছেন’।  এখানে আমার নিজের নাম খুঁজে পাওয়া যায় না।  এখন আমার যা বয়স তাতে এফিডেভিট করে নাম বদলানোর আর কোনো মানে হয় না।

আজকে লিনার বাসায় ইফতারীর নিমন্ত্রণ ছিল।  লিনার বাবা বাগদাদ থেকে এর্বিল এসেছেন, উনার সাথে সৌজন্য স্বাক্ষাত প্লাস ইফতারী। এদের ইফতারী মানে একেবারে ডিনার।  প্রথমে হালকা ফলমূল আর শরবত খেয়ে নামাজ পড়ে নেয় তারপর বসে মূল ইফতারী খেতে।  পোলাও বা বিরিয়ানি, রুটি, চিকেন, দুম্বার মাংশ, সালাদ, টক দই, ফলমূল, চা এইসব হচ্ছে ইফতার কাম ডিনারের মেনু।  পেট ফুলে ঢোল হওয়ার উপক্রম।

লিনার বাবাও অসাধারণ মিশুক মানুষ, ভালো ইংরেজী বলতে পারেন।  অনেক কথা হলো, বললেন আমি যদি আমার ফ্যামিলি নিয়ে আসতে চাই তবে উনাকে বলতে উনি ভিসা সহ সবকিছুর ব্যবস্থা করে দিবেন। ভদ্রলোক রিসেন্টলি একটা গাড়ি কিনেছেন, লিনাকে গাড়ির চাবি দিয়ে বললেন আমাকে গাড়িটা দেখাতে। ওরে বাবা এটা কি গাড়ি নাকি? কী নেই গাড়িতে, টেলিভিশন, ফ্রিজ, সোফা, ছোট্ট একটা ডাইনিং টেবিল, একটা পিচ্চি কিচেন, টয়লেট, একটা দুইতলা খাট। রাতের বেলায় লিনা নিজে গাড়ি করে আমাকে বাড়িতে পৌঁছে দিল।

কুর্দিস্তানে না আসলে হয়ত জানাই হতো না যে এই রকম মানুষও এই পৃথিবীতে বাস করে। সম্ভবত এই চরিত্রের মানুষ এই বিশ্ব সংসারে একজনই আছে। The One and Only !! এঁর নাম `আরাম’ । এই মহান দায়িত্বহীন লোকটিকে আমাদের রেসিডেন্ট কার্ড নবায়নের দায়ীত্ব দেয়া হয়েছে। আজ ছয় মাস পূর্ণ হলো। গত ছয় মাস ধরে এই অথর্ব লোকটা প্রতিদিন বেলা ১১:৩০ এ ঘুম থেকে উঠে এবং ১২:৩০/০১:০০ টায় অফিসে এসে বলে `ওয়াল্লা মুশকিলা, সরকারী অফিস বন্ধ হয়ে গ্যাছে, কালকে যাব’।

বিশ্বাস করুন, খোদার কসম করে বলছি, গত ছয় মাস ধরে এই অপদার্থটা ঠিক একই কথা বলে যাচ্ছে! এবং বিশ্বাস করুন এই লোকের চাকুরী বহাল তবিয়তে আছে। অতপর অফিস নতুন উকিল নিয়োগ দিয়ে আমাদের রেসিডেন্ট কার্ড নবায়নের ব্যবস্থা করলো।

কুর্দিদের উত্সব বলতে মূলত নওরোজকেই বুঝায়।নববর্ষের এই উত্সব ছাড়া অন্যান্য উত্সবে তেমন আনন্দ চোখে পড়ে না। ঈদ কিংবা বড়দিনের উত্সব হয় তবে তা নওরোজের মত নয়। চার/পাঁচ দিনের সরকারী ছুটি। সবাই তাদের গ্রামের বাড়িতে চলে যাবে, নতুন নতুন পোশাক পরে পার্কে বেড়াতে যাবে, গান আর নাচের উত্সব।  রেডিও টিভিতে স্পেশাল অনুষ্ঠান আর আছে সৌজন্য সাক্ষাত। ট্যাক্সি চালক, দোকানদার, রেস্টুরেন্ট এর বেয়ারা যার সাথেই দেখা হোক নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাতে কেউ ভুল করবে না। `নওরোজ পীরজ বে’ মানে হলো শুভ নববর্ষ।

২০১৪ সালের অগাস্ট মাস কুর্দিস্তানের জন্য একটি ভয়াল সময়। কুর্দিস্তানের উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত সিনজার  পাহাড় ইসলামিক স্টেট এর জঙ্গিরা দখল করে নেয়। প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ পাহাড়ের মধ্যে ইসলামিক স্টেট এর ফাঁদে আটকা পরে। সিনজার পাহাড়ের বেশির ভাগ অধিবাসী হচ্ছে সংখ্যালঘু ইয়াজিদী সম্প্রদায়। কিছু কিছু ইয়াজিদী পালাতে সক্ষম হলেও প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ নিহত হয়। মেয়েদেরকে ধরে নিয়ে যায় দাস হিসাবে, ধর্ষিত হয় অসংখ্য নারী। অল্প বয়সী মেয়েদের বিক্রি করা হয় তথাকথিত জিহাদিদের কাছে। পরবর্তিতে সিনজার মুক্ত হলেও এখনো অনেক নারী ইসলামিক স্টেট এর হাতে বন্দী। আমার বস ইয়াজিদিদের উদ্ধারে ব্যপক ভুমিকা রেখেছিলেন। হেলিকপ্টার ক্র্যাশ করে মাথায় প্রচন্ড আঘাত পেয়ে এখনো চিকিত্সা নিতে হচ্ছে।  সেই দুর্ঘটনায় পাইলট সহ আরও তিন জন মারা যান।

একই ভাবে ইরাকের আরেক শহর `মসুল’ দখল করে ইসলামিক স্টেট। একটা সমৃদ্ধ শহর ধর্মের নামে কিভাবে নিশ্চিহ্ন করে দিল। মানুষের হাহাকার দেখলে নিজেকে মানুষ ভাবতেও ঘৃনা হয়। আমাদের এর্বিল শহর উদ্বাস্তুতে ভরে গেল। সবাই শুধু নিজেদের প্রানটা নিয়ে কোনরকমে পালিয়ে এসেছে। আমার বাসার সামনে `নাভেদ’ নামে এক ভদ্রলোক একটা সব্জীর দোকান দিয়েছেন। সম্ভ্রান্ত পরিবার। তিনটা যুবতী মেয়ে আর দুই ছেলে নিয়ে কোনো রকমে দিনপাত করছেন। অথচ মসুলে উনার নিজের বাড়ি, গাড়ি, ব্যবসায়। সব কিছু ফেলে দিয়ে শুধু মেয়েদের সম্ভ্রম রক্ষা করতে কোনো রকমে পালিয়ে এসছেন। কিছু ভুল মানুষ ধর্মের ভুল ব্যখ্যা দিয়ে ধর্মকে প্রতিনিধিত্ব করছে আর ফলশ্রুতিতে যেটা দেখতে পায়, এখানকার যুব সমাজ ইসলাম নাম শুনলেই ঘৃণার চোখে তাকায়।  তারা নিজেদেরকে মুসলমান পরিচয় দিতে ঘৃনা করে, কেউ ধর্ম পালন করলে উপহাস করে। অথচ কেউ বোঝে না, ধর্মের নামে এইসব কুকীর্তি কেবল তেল লুট আর অস্ত্র বিক্রির অজুহাত মাত্র।

আমার একাকিত্বের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। পহেলা জানুয়ারী ২০১৫। আজ বড় আনন্দের দিন। আমার ছেলেবেলার বন্ধু এবং দীর্ঘদিনের সহকর্মী সুমন এর্বিল আসছে। আমার অফিসে লোক লাগবে, বস বলল আমার রেফারেন্সে বাংলাদেশ থেকে কাউকে আনতে। (বাংলাদেশীদের কর্মদক্ষতা এবং দায়িত্ববোধ এদের কাছে প্রশংসিত)। এয়ারপোর্ট-এ সুমন কে রিসিভ করে প্রাণ ফিরে পেলাম। মানিক রতন আবার একসাথে – আলহামদুলিল্লাহ।

আগেই বলেছি, এখানকার ব্যবসায় বানিজ্য বেশির ভাগই তুর্কীদের দখলে।  বড় বড় শপিং মল, যেমন ফ্যামিলি মল, মাজিদি মল, রয়্যাল মল ইত্যাদিতে যে সব দোকান আছে ধরতে গেলে সবই তুর্কী মালিকানায়।  যত ব্র্যান্ড আছে যেমন LC Waikiki, DeFacto, Red Tag, Home Istanbul সবই তুরস্কের। এমনকি বড় বড় সুপার মার্কেটগুলোও তুর্কীদের। আছে তুর্কি রেস্টুরেন্ট, বারবার শপ, মেয়েদের বিউটি পার্লার আর ম্যাসাজ সেন্টার। রাত এগারটার দিকে সুমনকে নিয়ে এর্বিল শহর ঘুরতে বেরুলাম। সুমন প্রথমে একটু অবাক হলো কারণ ও আসছে আফগানিস্তান থেকে, যেখানে দিনের বেলাও ঘর থেকে বের হতে পারত না। ঘোরাঘুরি করে ক্লান্ত হয়ে `প্রেগো’ নামে (আরবরা উচ্চারণ করে `ব্রেগো’ যেহেতু আরবী বর্ণমালায় `P’ বা `প’ অনুপস্থিত) একটা সিরিয়ান রেস্তরাঁতে খেতে গেলাম। এদের সোয়ার্মা অসাধারণ। পেট ভরে ডিনার করে রাত দেড়টায় ঘরে ফিরলাম।

কুর্দিস্তানের কথা বলছি অথচ এখনো পেশমার্গার সাথে পরিচয় করানো হলো না, এটা অন্যায়, অবিচার। কুর্দিস্তানের নিজস্ব সেনাবাহিনীর নাম `পেশমার্গা’। কুর্দি ভাষায় এর অর্থ হচ্ছে `যে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ায়’। পেশ মানে দাঁড়ানো আর মার্গা মানে মৃত্যু। এই যোদ্ধারা অসীম সাহসী। এরা পার্সিয়ান সাম্রাজ্য, অটোম্যান সাম্রাজ্য, এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে আর এখন লড়ে যাচ্ছে তথাকথিত ইসলামিক স্টেট জঙ্গীদের বিরুদ্ধে। এদের দেশ প্রেম, জাতীয়তাবোধ অপিরিসীম। মূলত এদের কল্যানেই এই জঙ্গী গোষ্ঠিগুলো কুর্দিস্তানে তেমন সুবিধা করতে পারে নায়। এদের কল্যানে কুর্দিস্তান এখনো নিরাপদ। অর্থনৈতিক সংকটের সময় এরা প্রায় এক বছর কোনো বেতন পায়নি তবুও এরা এদের দায়িত্বে অবিচল ছিল। বর্তমান প্রেক্ষাপটে পেশমার্গাকে স্যালুট জানাতেই হয়।

কুর্দি জাতি মোটামুটি কর্মঠ কিন্তু এখানে যেসব আরবরা বাস করে তাদের বেশির ভাগই অলস প্রকৃতির। আমি কাউকে নয়টার অফিস বেলা এগারটার আগে আসতে দেখিনি। অফিসে এসে প্রথম আধাঘন্টা চলে যাবে চা-সিগারেট খাওয়া আর কুশল বিনিময়ে। এরপর আধাঘন্টা নিজের ডেস্কে বসবে তারপর চলে যাবে লাঞ্চে। একঘন্টা পরে ফিরে ডেস্কে বসবে আর আবার আধাঘন্টা পরে চলে যাবে চা পানের বিরতিতেতে। অফিস টাইমের বেশির ভাগই ব্যয় করবে চা-সিগারেট আর আড্ডাতে। আর আছে ফেসবুক আসক্তি, চ্যাটিং।  যতক্ষণ জেগে আছে তসবিহ গোনার মত আঙ্গুল চলেই যাচ্ছে মোবাইল ফোনে। জরুরী অফিসিয়াল মেইল এর উত্তর দেয়ার চাইতে ফেসবুকিং কিংবা বন্ধুদের সাথে চ্যাটিং এদের কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ। আমার ধারণা মতে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা এদের অলসতার মূল কারণ। প্রত্যেক নাগরিক কোনো কাজ না করেও সরকার থেকে ভাতা পায় যা তাদেরকে কর্মবিমুখ হতে সাহায্য করেছে। জানিনা কতদিন এরা এইভাবে চলতে পারবে ? একদিন এদের তেলের ভান্ডার তো শেষ হবে, তখন কী করবে ?

অত্যাধিক তাপমাত্রার কারণে ইরাকে রোববার পর্যন্ত সরকারী ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। গরম কী জিনিস হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। সূর্য্য মামা যেন মাথার এক হাত উপরে। ছাদের উপরে ট্যাঙ্কের পানি ফুটন্ত মনে হয়। গোসল করার আগে বালতিতে বরফ দিয়ে পানি ঠান্ডা করতে হলো। রাস্তা দিয়ে যদি এক ঘন্টা হাঁটা যায় (যদি যায়) তবে চেহারা মুখপোড়া বাঁদরের মত হয়ে যাবে। আজকের লাঞ্চ আর মাইক্রো ওভেনে গরম করতে হবে না, দুই মিনিট রোদে রাখলেই হয়ে যাবে। আমার জিন্সের প্যান্টটা রোদে দিয়েছিলাম, বেশ কুড়মুড়ে হয়েছে।

এইবার আপনাদের সাথে পরিচয় করানো যাক একটি মজার চরিত্রের। একজন `মলিন মোহাম্মদ’ ফুল অফ এন্টারটেইনমেন্ট।একদিন বাজারে বাংলাদেশী এক লোক আমাকে অনুরোধ করলো একটা বাংলাদেশী ছেলেকে কোনো কাজের ব্যবস্থা করে দিতে। ছেলেটা অবৈধ ভাবে থাকে, প্রচুর লোন করে এদেশে এসেছে, এখন অনেক বিপদে আছে। বসের সাথে কথা বলে ওকে আমাদের অফিসে টী বয় হিসেবে নিয়োগ দেয়া হলো। বয়স চব্বিশ পঁচিশ হবে, ভরপুর পান্ডিত্য। এমন কোনো কাজ নেই যা সে জানে না। কিছু বললেই বলে `আমি ডুবাই (দুবাই) ছিলাম, ফার্নিচার কোম্পানীতে কাজ করসি, আমি পারুম না তো কে পারবো’। বহু ভাষাবিদ মলিন আমাকে স্বেচ্ছায় আরবী শেখানোর দায়ীত্ব নিল! প্রথমদিন আমাকে সংখ্যা শেখানোর পাঠ শুরু হলে আমি জানতে চাইলাম এক কে আরবীতে কি বলে? মলিন এর উত্তর `এক হইলো গিয়া অহেত’। আমি বললাম `ভাই এইটা অহেত না, শব্দটা `ওয়াহেদ’, মলিন মানতে নারাজ কারণ সে ডুবাই ফেরত আর আমি নাদান বাংলাদেশী। একদিন আবিস্কার হলো মলিন কয়েক মাস ইরানেও ছিল তাই সে ফার্সি ভাষাতেও পান্ডিত্য অর্জন করেছে। দীর্ঘ দিন কাবুলে থাকার কারণে আমিও যে কিঞ্চিত ফার্সি জানি সেটা আবার মলিন জানে না তাই সে আমাকে ভুল ভাল ফার্সি শেখানোর সুযোগও হাত ছাড়া করতে চাইল না। আর তারপর আছে কুর্দিস্তান এবং কুর্দি ভাষার পান্ডিত্য। আমার একবছর আগে সে কুর্দিস্তান এসেছে তাই সে আমার চাইতে কুর্দিস্তান সমন্ধে বিস্তর জ্ঞান রাখে। আমাকে জানালো `বাই (ভাই) এহানের সব চেয়ে বড় মার্কেটের নাম হইল ফ্যামিলি মহল, আপনারে একদিন নিয়া যাব’। নুর মহল এর নাম শুনেছি, তাজ মহল এর নাম শুনেছি কিন্তু পারবারিক মহল বা ফ্যামিলি মহল এর নাম এই প্রথম শুনলাম। আমি বললাম `ভাই মলিন ঐটা মহল না শব্দটা হবে `মল’। এখানেও মলিনের আপত্তি, বলে `আরে না বাই, কুর্দিরা মহলই কয়’। আমি হাল ছেড়ে দিলাম।মলিন অন্যের কথা শুনবে কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তে অনড়।  ওর প্রিয় সংলাপ হচ্ছে `আমনের কথা মানি কিন্তুক আমি যেইডা কইসি ঐডাও ঠিক’।

মলিন কে বাজার করতে বললে একগাদা জিনিস কিনে নিয়ে আসবে, নিজে থেকে তিন ডজন কলা কিনে নিয়ে এসে টাকা চাচ্ছে, যদি প্রশ্ন করি এতগুলা কলা কেন কিনলা নষ্ট হবে তো? মলিনের উত্তর `আমগো তো লাগেই’। একবার মলিনকে বললাম এক কেজি খাসীর মাংশ কিনে আনো। মলিন এক কেজি খাসীর হাড্ডি কিনে নিয়ে এলো। বললাম `এইটা কি কিনসো, সবটাইতো হাড্ডি’? মলিন বলে দোকানদার দিল।  আমি বললাম তুমি দেখে আনবা না ? মলিন নিশ্চুপ।  আমি আবার বলি, যদি এই জিনিষটা তুমি নিজের টাকায় কিনতা তাহলে কি এই রকমই আনতা? মলিন বলে `নাহ দেইখা নিতাম’। একে আপনি কি বলবেন, বোকামি?

মলিনের হিসাবের জ্ঞানও মারাত্বক। একদিন আমি সুমনকে বললাম যে, আমদের মাসে খাওয়া বাবদ চারশ ডলার খরচ হচ্ছে, কিন্ত ইদানিং আমরা কিছুটা বেহিসেবি হয়ে যাচ্ছি এরকম চলতে থাকলে আমাদের কিন্তু চারশ ডলারে কুলাতে পারব না। উল্লেখ্য চারশ ডলারে আমাদের তিন জনের তিন বেলা খাবার, বিকালের স্ন্যকস, চা, কফি আর পানির খরচ হয়ে যায়, যা আমি আর সুমন অর্ধেক অর্ধেক শেয়ার করি। আমাদের আলাপ শুনে মলিন বলে উঠলো `বাই আমনে চিন্তা কইরেন না, এক কাম করেন-আমারে পাঁচশ ডলার দ্যান দেহেন আমি ক্যামনে চালায়। শুধু চা, কফি, পানি এইসব আমনারা কিনবেন, আর সকালের নাস্তার আলাদা হিসাব’। বুঝুন ঠ্যালা – কী অংক !

মলিনের মৃত্তিকা বিজ্ঞানেও অপার জ্ঞান ! একবার সুমন দেশ থেকে কিছু ধনিয়ার বিচি নিয়ে গেল। উদ্দেশ্য আমাদের বাসার সামনের লনে লাগাবে আর ধনিয়া পাতার চাষ হবে। মলিনকে বলা হলো গাছ লাগাতে। মলিন জ্ঞান দিয়ে দিল `এহন গরমের মইধ্যে লাগান যাইব না’।কেন লাগানো যাবে না? `কারণ হইতাসে এইহানের মাটির নীচে পোরচুর ত্যাল, গরমে বেবাক ত্যাল উপরে উইঠা আহে, তাই গাছ অইব না’। জিওগ্রাফিতে মাস্টার্স করা সুমন নিশ্চুপ হয়ে যায়।

মলিনের আরেকটা মজার গুন হলো কথায় কথায় প্রবাদ বলা। কোনো প্রশ্ন করলে মলিন উত্তর দিবে `ইংরেজিতে একটা কথা আছে না’ বলেই বাংলাতে প্রবাদটা বলা শুরু করবে। একটা উদাহরণ দেই – ধরুন আমরা রাতের বেলায় ডিনারে মুরগি আর ডাল রান্না করেছি। মলিনকে প্রশ্ন করা হলো তরকারী কেমন হয়েছে? মলিনের উত্তর – `ইংরেজিতে একটা কথা আছে না, জামাই আমার যেমন তেমন দেবর হইলো মনের মত’।এর মানে হচ্ছে মুরগির থেকে ডাল বেশি সুস্বাদু হয়েছে। এখানে মুরগিকে জামাই এবং ডালকে দেবর উপমা দেওয়া হয়েছে।  আসলে মলিনের কথা বলতে গেলে একটা পূর্ণ বই হয়ে যাবে তাই এখানেই খ্যামা দেই, অন্য প্রসঙ্গে আসি।

কাল থেকে এরবিলে শুরু হয়েছে কুত্তা বিলাই বৃষ্টি। এইরকম বৃষ্টি এখানে এই প্রথম দেখলাম। এখানকার মানুষজন এত বৃষ্টিতে অভ্যস্ত নয়। সবাই খুব আতঙ্কিত। রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে গ্যাছে, অপেক্ষাকৃত নিচু বাড়িগুলোর পার্কিংলটে পানি ঢুকেছে। গাড়ির চাকা অর্ধেক পানিতে আর এতেই এরা মহা আতংকে গাড়ি থামিয়ে হায় হায় করছে, `এখন কী হবে?’ মনে হচ্ছে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করা হবে ! এরাতো আর আমার দেশের বর্ষা কিংবা রাস্তা দেখেনি ! সবার মুখে মুখে `ওয়াল্লা মুশকিলা, কাকা – যোর যোর বারান’

এর মধ্যে হঠাৎ একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল।  আমি পড়ে গিয়ে হাত ভেঙ্গে ফেললাম। সবাই আমাকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটল। এদের চিকিত্সা ব্যবস্থা কী অসাধারণ।  ব্যবসায়িক মনোভাব লক্ষ্য করা গেল না।  ডাক্তার আমাকে দেখে বললেন রিস্টে ফ্র্যাকচার হয়ে গ্যাছে, তবুও নিশ্চিত হওয়ার জন্য এক্সরে করতে হবে।  রাত হয়ে যাওয়ার কারণে এক্সরে করার লোকজন চলে গ্যাছে তাই উনি এখন প্লাস্টার করে দিচ্ছেন কাল এসে এক্সরে করে উনাকে যেন রিপোর্টটা দেখিয়ে নিয়ে যায়। কত টাকা লাগবে প্রশ্ন করলে উনি বললেন টাকা কালকে এসে এক্সরে করার পর দিয়েন এখন ক্যাশ কাউন্টার বন্ধ হয়ে গ্যাছে।  অবাক হলাম – আমাদের দেশ হলে রোগী মরুক বাঁচুক আগে ফর্ম ফিলাপ কর, টাকা জমা দাও তারপর ডাক্তার আপনাকে দেখবেন।  আর এখানে আগে চিকিত্সা পরে অন্যান্য কাজ কর্ম। এখানকার ডাক্তাররা বোধহয় ওষুধ কোম্পানীর কাছ থেকে কমিশন খান না। আমাকে কোনো ওষুধ প্রেসক্রাইব করলেন না, বললেন ওষুধের দরকার হবে না, শুধু এক মাস পরে এসে আরেকবার এক্সরে করে উনাকে দেখাতে। দেড় মাসের মাথায় আমার প্লাস্টার খুলে দিয়ে শিখিয়ে দিলেন নিজে নিজে কিভাবে থেরাপী নিতে হবে।

আমার হাত ভাঙ্গার ঘটনা নিউটন সাহেবের তৃতীয় সূত্রের কথা মনে করিয়ে দেয়। হাত ভাঙ্গার বিপরীত প্রতিক্রিয়া হচ্ছে সুমন রান্না করা শিখে ফেলল।  সুমন পানি গরম করতে গেলেও চিন্তা করত আগে চুলা জ্বালাবো নাকি আগে পানি চুলায় দিব।  সেই সুমন এখন পাকা রাঁধুনী। প্রথম কয়েকদিন আমাকে দাঁড়িয়ে থেকে ইনস্ট্রাকশন দিতে হত এখন সে সেল্ফ ইন্ডিপেন্ডেন্ট। কথায় আছে `নেসেসিটি ইজ দ্য মাদার অফ ইনভেনশন’, সুমন এখন নিত্য নতুন রেসিপি ইনভেন্ট করছে।

এই প্রথম পরিবারের অভাব খুবই বাজে ভাবে অনুভব করলাম। এক হাতে কাজ করা যে কী কষ্টের তা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। গোসল করতে যাব, সুমনের সাহায্য নাও ভাঙ্গা হাত প্লাস্টিক দিয়ে মুড়ে দেয়ার জন্য, ঘুমোতে যাব, সুমন কে বলি আমার বিছানাটা তৈরী করে দিতে, কাপড় ইস্তিরি করতে হবে, সুমন ইস্তিরি হাতে তৈরী। এমনকী জুতোর ফিতে বাঁধতেও সুমনের সাহায্য ছাড়া চলতে পারি না। সুমনের অকৃত্রিম সাহায্য আমাকে `আবেগে কাইন্দালছি’ টাইপের অবস্থায় নিয়ে যায়।

আবার শীত চলে এলো । কখনো কখনো তাপমাত্রা মাইনাস ছয়/সাত পর্যন্ত নেমে যায়। এইরকম শীতে সাহায়া পাহাড়ে যাবার এন্তেজাম করে ফেলল।  এক শুক্রবার সবাই মিলে পাহাড় জয়ের আনন্দে বেরিয়ে পড়লাম।

`কোরেক মাউন্টেন’ কুর্দিস্তানের সর্বোচ্চ পাহাড়। সমতল থেকে প্রায় পাঁচ হাজার ফিট উঁচুতে। অসাধারণ সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি। শীতের এই সময়ে বরফে ঢেকে যাওয়া পাহাড় কী অপরূপ! শুধুই সাদা আর সাদা। এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড় `কেবল কার’ এ করে ছুটে যাওয়া, সবশেষে সর্বোচ্চ চুড়ায়। চোখে না দেখলে এর সৌন্দর্য্য বর্ণনা দেওয়া অসম্ভব। পাহাড়ের একদম উঁচুতে `রিসোর্ট’ আছে, রাত্রে থাকা যায়। শীত ফুরোনোর আগেই আরেকবার আসতে হবে রাতে থাকার জন্য। রাতের বরফে ঢাকা পাহাড় নিশ্চয় আরও অপরূপ!

তুষার ঢাকা পাহাড়ের উপর ছোট বড় সবাই স্কেটিং করছে, শিশুদের লাফালাফি আর `বরফ মানুষ’ বানানোর প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে কিশোর ছেলে মেয়েরা। বরফের বল বানিয়ে একে অন্যকে ছুঁড়ে মারছে আর কপট রাগের ভঙ্গিতে মেয়েগুলো তাদের বয়ফ্রেন্ডের দিকে তেড়ে যাচ্ছে। বুড়োরাও বসে নেই, দাদাজান দাদীজানের বাহু ধরে আইসক্রিম খেতে খেতে ছোট্ট টিলার উপর উঠানোর চেষ্টা করছেন।

পাহাড়ের উপর একটা ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট আছে। দুপুরে সেখানেই লাঞ্চ সেরে নিলাম। ইন্ডিয়ান এবং কুর্দি মেনুর সংমিশ্রন। সন্ধ্যে নামার আগেই কেবল কারে করে পাহাড় থেকে সমতলে ফিরে এলাম।

এর মধ্যে দুই বছর শেষ হয়ে গেল।  আবার নতুন করে কন্ট্রাক্ট সাইন করলাম পরবর্তী দুই বছরের জন্য। আল্লাহ চাইলে আরও বেশ কিছুদিন কুর্দিস্তানে থাকতে চাই। এই দেশ বসবাসের জন্য খুবই ভালো এবং এতদিনে নিজেকে এখানে বেশ মানিয়ে নিয়েছি।

—————————————-

* এই লেখায় কুর্দিস্তানের ইতিহাসের অংশটুক কুর্দি বন্ধুদের মুখ থেকে শোনা, উইকিপিডিয়া এবং কুর্দিস্তান সরকারের প্রকাশিত `কুর্দিস্তান গাইড’ থেকে নেওয়া হয়েছে।

** লেখায় ব্যবহৃত ছবিগুলোর কয়েকটি আমার কুর্দি বন্ধু সাঈদ খোকির ক্যামেরায় তোলা।