ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

আমার বা আমার দেশের মানুষের বাংলা উচ্চারণ নিয়ে আমাদের পশ্চিমবঙ্গীয় বন্ধুরা যে, কিছুটা তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেন তা বোধ হয় অনেকেই লক্ষ্য করেছেন।  একটু মনোযোগ দিয়ে উনাদের বাংলা টেলিভিশনের অনুষ্ঠানগুলোর দিকে নজর দিলেই আমার এই অভিযোগটির সত্যতা পরিলক্ষিত হবে। তা হোক সে কোনো রিয়েলিটি শো অথবা টিভি সিরিয়াল।  এছাড়াও ব্যক্তিগত ভাবে আমি আমার অনেক পশ্চিমবঙ্গীয় বন্ধুদের কাছ থেকে এমন ধারণা পেয়েছি।  একবার তো ওপার বাংলার এক দিদিমনি আমায় আহ্লাদে গদগদ হয়ে বললেন, `এই এই আপনাদের ঐ বাঙ্গাল ভাসাটা (ভাষাটা) একবার বলুননা, বেস (বেশ) লাগে কিন্তু শুনতে’।  আমি বললাম, `দিদি আগে আপনাদের ভাসাটাকে, ভাষায় রূপান্তর করুন তারপর না হয় আমাদের বাঙ্গাল ভাষা শুনবেন’।

এঁদের ধারণা আমরা বাংলাদেশের মানুষরা শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে পারিনা। (যদিও আমি মনে করি প্রত্যেকটি মানুষের তার আঞ্চলিক ভাষাটিই তার কাছে শুদ্ধ। যে ভাষায় আমার মা কথা বলে এবং যে ভাষা আমি আমার মায়ের কাছ থেকে শিখি, সেটাই আমার শুদ্ধ ভাষা)। এবং এঁরা গোল গোল উচ্চারণে যে কথা বলেন তাই হচ্ছে শুদ্ধ এবং সভ্য বাংলা।  এঁরা মনে করেন আমাদের বাংলা হচ্ছে, `আইসে’, `খাইসে’ টাইপের।  আমরা এসেছে বা খেয়েছে বলতে পারি না।

বিনয়ের সঙ্গে আমি আমার ঐসব বন্ধুদের বলতে চাই, শুধু আপনারাই নন, আমরাও, এই বাংলাদেশের মানুষও শুদ্ধ (আপনাদের সংজ্ঞা অনুযায়ী) বাংলায় কথা বলতে পারি।

প্রথমত বলতে চাই, প্রত্যেক দেশের অঞ্চলভেদে ভাষা এবং তার উচ্চারণের পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।  যেমন ধরুন আমাদের বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার ভাষা বিভিন্ন রকম যদিও তা সবই বাংলা। একই বাংলা ভাষা বরিশালের লোকজন উচ্চারণ করছেন একভাবে আবার নোয়াখালীর লোকজন করছেন আরেক ভাবে। এইরকম আমাদের চৌষট্টিটি জেলার ভিন্ন ভিন্ন উচ্চারণ এবং টান আছে। প্রশ্ন হচ্ছে আপনাদের কি নেই ? অবশ্যই আছে। উদাহরণ দেয়া যাক –

নিচের যে জেলাগুলোর উদাহরণ দেওয়া হলো এর লোকজন সবাই বাংলা ভাষায় কথা বলে থাকেন কিন্তু তা তাঁদের আঞ্চলিক উচ্চারণে এবং আমি এঁদের প্রত্যেকটি উচ্চারণকে সম্মানের চোখে দেখি।

`বীরভূম’ লাল মাটির এই জেলার লোকজন যে ভাষায় কথা বলেন তা বাংলা। কিন্তু ওঁদের মধ্যে একটু সাঁওতালী টান পরিলক্ষিত হয়।  যেমন সহি বাংলায় আপনি যদি বলেন `তোমার দিনকাল তো ভালোই যাচ্ছে’ ! অথবা `এইসব হবে না, বলে দিচ্ছি ‘ এই দুটো বাক্য বীরভূমের লোকেরা উচ্চারণ করবেন `মুনে হছ্যে আজকাল দিন বেস ভালোই যেছে বট্যে!’ অথবা `ই সব হবে নাকো বৈলে দিছি’।  এই জেলাতেই খুজুটি পাড়া বলে একটি জায়গা আছে। এখানকার লোকজনের উচ্চারণে দেখেছি, এঁরা স কে শ এবং শ কে স বলে থাকেন।  যেমন এক ভদ্রলোক আরেক ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করছিলেন `ব্যাটা তো হলো, তা কী নাম রেখেছো?’ দ্বিতীয়জন উত্তর দিলেন `জী, ঈশা’।  আপনার মনে হতেই পারে ঈশা তো মেয়েদের নাম এবং বলেই ফেললেন ঈশা তো মেয়েদের নাম, আবার উত্তর এলো `তা ক্যানে হবে গো, আমাদের ঈশা নবীকি মেয়ে ছিলেন’? ও বুঝেছি, ঈসা।  ভালো, বেশ ভালো নাম।

এরপর ধরুন মুর্শিদাবাদ জেলার কথা। পাঁচথুপী বলে একটি অঞ্চল আছে, এঁরাও বাংলা ভাষায় কথা বলেন। কিন্তু উচ্চারণের ব্যাপক পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন ধরুন বইয়ের ভাষায় যদি বলি – `আপনাকে কখন থেকে ডাকছি, আপনি তো আসছেন না’ এঁরা বলবেন -`আপনাকে সেই কোখুন থেকে ডেকে যেছি গো, আপনি তো আইসছ্যানই না’। আবার মাড়গ্রাম বলে একটা জায়গা আছে এঁদের বাংলাতো হৃদয় বিদারক। ধরুন,  আপনি কারো বাড়ি গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন নিতাইদা কোথায় ? (এই মুহূর্তে প্রিয় ব্লগার নিতাইদার নামই মনে এলো, একেই বলে ভালোবাসা)।  এঁরা কিভাবে বলবেন? হ্যাঁগো নিতাইদা কোঁথি? উত্তর আসবে, `নিতাইদাকে খুঁজছ্যান? উনি তো পায়খানা গিলছ্যান’।  প্লিজ কেউ ভাববেননা যেন যে, দুনিয়াতে এতকিছু থাকতে ঐ জিনিষটা গিলতে যাবেন কেন? এরমানে হচ্ছে ভদ্রলোক শৌচাগারে অবস্থান করছেন।

চব্বিশ পরগনা কিংবা হুগলী জেলার লোকজন কখনো বলতে পারবেননা `এগুলো’, এঁরা বলবেন `এগুনো’। `এসেছে’ হয়ে যাবে `এয়েচে’। নেবো না, দেব না হয়ে যায় নোবো না দোবো না।  এরকম আরও নানা উদাহরণ দেয়া যাবে।

ঠিক আছে, এইবার হয়তো আপনারা বলবেন এগুলো তো গেলো অঞ্চলভেদে উচ্চারণের তারতম্য। আপনাদের ঢাকার লোকও তো শুদ্ধ ভাবে কথা বলতে পারেনা।  তর্কের খাতিরে এখন মেনে  নিলাম (একটু পরে বুঝিয়ে দিবো, ঢাকার লোকও শুদ্ধ করে কথা বলতে পারে)। একই  ভাবে আমিও বলতে পারি আপনাদের কলকতার লোকও শুদ্ধ বলতে পারেন না।  আবার উদাহরণ – কলকাতার লোকদের একবার বলতে বলুনতো করেছে অথবা খেয়েছে। পারবেন না। উনারা বলবেন করেচে, খেয়েচে। উনারা বানান করার সময় বলবেন `ছ’ কিন্তু বলবার সময় বলবেন `চ’। অনেকটা আমাদের নোয়াখালীর মতো, পয়ে আকার পা নয়ে হ্রস্ব ই কার নি, হানি। ঢাকার লোকজন কিন্তু `হইসে’ যেমন বলে ঠিক তেমনি `হয়েছে’ বলতেও  কোনো কষ্ট বোধ করে না। কিন্তু আপনি হাজার চেষ্টা করেও করেচেকে শুধরাতে পারবেন বলে মনে হয় না।

এইবার আসা যাক জ্ঞানী, গুণী, বুদ্ধিজীবিদের কথায়। আমাদের দেশের এই শ্রেণীর লোকদের দু’একজনের নাম নিয়েই বলা যায়, যেমন শ্রদ্ধেয় সৈয়দ শামসুল হক, সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, প্রয়াত নরেন বিশ্বাস, প্রয়াত ওয়াহিদুল হক এরকম আরও অনেকে আছেন যাঁদের নানা বক্তব্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শোনার সৌভাগ্য হয়েছে। এঁদের উচ্চারণ এতই নিখুঁত যে স্বয়ং ড: মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বেঁচে থাকলে, উনিও কোনো খুঁত ধরতে পারতেন বলে মনে হয় না।  কিন্তু আপনাদের এই লেভেলের শ্রদ্ধাভাজন একজনের (যাঁদের বক্তব্য আমি শুনেছি) মুখেও `আজকে’ শব্দটার সঠিক উচ্চারণ শুনতে পেলাম না।  এঁরা সবাই বলেন `আজগে’। ঠিক কী কারণে `ক’ কে `গ’ বানিয়ে শব্দকে শুদ্ধ করা হচ্ছে, বুঝতে পারি না।

আসলে আপনার বা আমার উচ্চারণ কিন্তু মূল সমস্যা নয়।  একটু খেয়াল করলে দেখবেন, আমাদের উভয়ের বাংলা ভাষাটা কিন্তু নষ্ট করছে অন্য আরেকটি দল।  আপনাদের ক্ষেত্রে বর্তমান প্রজন্মের কিছু কিছু অতি আধুনিক সদস্য আপনাদের ভাষায় হিন্দি ভাষার অনুপ্রবেশ ঘটাচ্ছে অত্যন্ত্য সাবলীল ভাবে আর আমার দেশের একই প্রজন্মের কিছু কিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী এবং এফ.এম. রেডিও চেষ্টা করছে ইংরেজী ধাঁচে বাংলা শেখানোর। এরা যখন বাংলা বলে তখন দেখবেন বাক্যের শেষ শব্দটির শেষ অক্ষরটি এরা পূর্ণাঙ্গ ভাবে উচ্চারণ করছে না। কিছুটা অনুচ্চারিত থেকে যায় ইংরেজী ঢঙে।  এদের বর্ণমালায় আবার দেখবেন শুধু একটাই র জাতীয় অক্ষর আছে।  এরা সব গুলো `র’ এর উচ্চারণই করে `ড়’ দিয়ে। যেমন ধরুন গার্লফ্রেন্ড তার বয়ফ্রেন্ডকে বলছে `না আমি কালকে আসতে পাড়বোনাআড় কখনোই আসবো না’। এইরকম।

যা হোক, তর্ক করতে চাইলে আরও অনেক করা যাবে কিন্তু এটা আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি শুধু বলতে চাই যে, ওপার বাংলার প্রীয় মানুষগুলোর মুখনিঃসৃত প্রতিটি উচ্চারণ সত্য, সুন্দর, শুদ্ধ ঠিক তাঁদের মায়ের মতো এবং উল্টোদিকে আমার এই বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের উচ্চারিত প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি অক্ষর সত্য, সুন্দর, শুদ্ধ যেমন শুদ্ধ আমাদের মা এবং মাটি।

সুতরাং আজগে থেকে ভাষার উচ্চারণ নিয়ে মিথ্যে অহমিকার অবসান হোক, দুই বাংলার মানুষ গুলান শুধুই মিল্যা মিশা থাকুক গলা জড়াইয়া।

আর আসুন সম্মিলিত ভাবে আমাদের ঐ আধুনিক প্রজন্মকে বোঝাতে চেষ্টা করি `বাছারা ভাষাকে ভালোবাসতে শেখো যা তুমি পেয়েছো তোমার মায়ের কাছ থেকে‘।