ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

অসংখ্য অধমের এই দেশে যে দুএকজন উত্তমের দেখা মেলে তাদের স্থায়িত্ব খুবই স্বল্পকালীন। ১৬ কোটি মানুষের মাঝ থেকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া যায় অমুক অমুক লোকগুলো উত্তম ঘরানার। এঁরা ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হন আবার সময়ের আগেই ফুরিয়ে যান বিধাতার অমোঘ নিয়মে। এই দেশের সবাই জনদরদী, দেশ প্রেমিক!  এঁরা এতটাই দরদী যে কোটি কোটি টাকা ইনভেস্ট করেন জনসেবা করতে। যেখানে ইনভেস্টমেন্ট আছে সেখানেই প্রফিট এন্ড লসের বিষয় এসে দাঁড়ায় জনসেবা ব্যবসার ব্যালেন্স শীটে।

আনিসুল হক চলে গেলেন ঠিক সেইরকম একটা সময়ে, যখন আমরা এই অভাগা জনগণ বা জাতি আশার আলো দেখতে শুরু করেছিলাম। যখন আমাদের মধ্যে হঠাৎ একটি বোধের উদয় হলো যে, না সবাই এক রকম নয়।  গোবরেও পদ্ম ফোটে। আমাদের এই পঁচা গলা রাজনীতির আকাশে একটি ধ্রুব তারার মতো তিনি এসেছিলেন।  একটা ঝাঁকুনি দিলেন তারপর চলে গেলেন।

আনিসুল হকের মৃত্যুতে সবাই শোকাহত। সাধারণের শোক তাদের বুকের গহীনে। সেই শোকের প্রকাশ নেই, প্রচার নেই। ছিল কেবল ভালোবাসার মৌন হাহাকার। আর একদল জনসেবক কথার ফুলঝুরি ছড়িয়ে দিতে লাগলেন মঞ্চে, টিভি স্ক্রীনে, পত্রিকায়, বক্তৃতায়। বছরের পর বছর জনসেবার ঠিকাদারি নিয়ে এঁরা নিজের উন্নতি ছাড়া কিছুই করতে পারেননি, আর এঁরাই আবার আনিসুল হকের কর্ম নিয়ে গুণ কীর্তন করতে থাকেন গর্ব ভরে। আনিসুল হক দুই বছরে যা করতে পেরেছেন এঁরা সারা জীবনেও তা করে দেখাতে পারেননি।

পুরো দেশটা আজ নর্দমায় পরিণত হয়েছে। সমাজের প্রতিটি শাখা আজ দুর্নীতি আর অনাচারের আবরণে আচ্ছন্ন।  রিক্সাওয়ালা বেশী ভাড়া চাইছে কারণ জিনিসপত্রের দাম বেশী, জিনিস পত্রের দাম বেশী কারণ পথে পথে চাঁদা দিতে হয়। অটোরিকশা মিটারের বাইরে ভাড়া চাইছে কারণ মালিককে বেশী জমা দিতে হয়, মালিক বেশী চাইছে কারণ বেশী দামে অটোরিকশা কিনতে হয়েছে। বাস সিটিং সার্ভিস বলে রাস্তার মোড়ে মোড়ে গাড়ি থামিয়ে প্যাসেঞ্জার তুলছে। ছাল চামড়া উঠে যাওয়া গাড়ি গুলো সহজেই ফিটনেস সার্টিফিকেট পেয়ে যাচ্ছে ঘুষের বিনিময়ে। মাংসের দোকানদার ওজনে কম দিচ্ছে। মাছওয়ালা যমুনার রুই বলে ফরমালিন দেয়া হাইব্রিড মাছ বিক্রি করছে। এলাকার ক্যাডার আর পুলিশকে চাঁদা দিয়ে ফুটপাথ দখল হচ্ছে। ডোনেশন না দিলে স্কুলে ভর্তি হওয়া যাচ্ছে না। বাড়িওয়ালা ইচ্ছেমতো বাড়ি ভাড়া বাড়িয়ে যাচ্ছে। ঘুষ ছাড়া হাসপাতালের সিট পাওয়া যাবে না। এই ফিরিস্তির শেষ যেমন নেই তেমনি দেখারও কেউ নেই।

এই দেশেই জন্মেছিলেন শের-এ-বাংলা, সোহরাওয়ার্দী, ভাসানী, বঙ্গবন্ধু। এই দেশেরই তরুণ যুবারা নিঃস্বার্থ ভাবে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। তাঁদেরই উত্তরসূরি আমরা। সময় এখন ঘুরে দাঁড়ানোর। এতো সহজে হাল ছাড়বো না।

এখনো আমাদের রাজনীতিতে হাতে গোনা কিছু মানুষ আছেন যাঁরা দেশ নিয়ে ভাবেন। এই সব মানুষগুলো যদি নিজ কাঁধে দায়িত্ব তুলে না নেন তবে এই দেশ কোনোদিন আলোর মুখ দেখবে বলে বিশ্বাস হয় না। সর্বোপরি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আকুল আবেদন তারা যেন সত্যিকারের ত্যাগী এবং সৎ ব্যক্তিদেরই মনোনয়ন দেন যারা দেশ ও দেশের মানুষের উপকারে আসবেন।

আর যেসব জনদরদী শুধুই আনিসুল হকের গুণকীর্তন করছেন কিন্তু নিজেরা শোধরাবেন না বলে ঠিক করেছেন উনাদের নিয়ে কোন আশা না করাই ভালো। কারণ এঁদের তত্ব হলো ‘তুমি উত্তম তাই বলিয়া আমি অধম হইবো না কেন?’