ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

চীন দেশ নিয়ে বই-পুস্তকে যেটুকু পড়েছিলাম এর বাইরে কোনো ধারণা আমার ছিল না। চাক্ষুষ দেখার সাধ মনে মনেই ছিল। সেই ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি এই দেশের ছোট-খাটো নাক বোঁচা মানুষগুলো কিভাবে আস্তে আস্তে প্রযুক্তিতে উন্নতি করে পুরো বিশ্বে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করছে। স্কুলে যখন পড়ি তখন থেকেই দেখতাম সেফটিপিন থেকে শুরু করে ব্যাটারি, জ্যামিতি বক্স, ইয়ংচেং বা হিরো ফাউন্টেন কলম, তেলাপোকা মারা ওষুধ সবই চীন দেশ থেকে আমদানি। আর আজ এই একবিংশ শতাব্দীতে প্রযুক্তির একচ্ছত্র অধিপতি তারা। ইউরোপ, আমেরিকা যে জিনিস একশো টাকায় বেঁচে, চীন তা কুড়ি টাকায় বাজারে ছেড়ে দেয়। তা সে টেলিভিশন বা ফ্রিজই হোক কিংবা মোবাইল ফোন।

 

প্রাচীন চীন

তো সেই চীন দেশে যাবার একটা সুযোগ এবার পাওয়া গেলো। খোঁজ-খবর নিয়ে জানলাম প্রথমবার চীনের ভিসা পাওয়া নাকি বেশ কষ্টসাধ্য। বাধ্য হয়ে চিরাচরিত দালাল ধরে টাকা-পয়সা খরচ করে ভিসা জোগাড় হলো। পরিচিত এক ট্রাভেল এজেন্ট থেকে প্লেনের টিকেট কেটে চায়না ইস্টার্ন এর ফ্লাইটে চেপে বসলাম। প্লেনে ঢুকেই বেশ একটা চৈনিক চৈনিক পরিবেশ লক্ষ্য করলাম। বিশেষ করে ফ্লাইট এটেন্ডেন্ট আর খাবারের মেনু দেখে পরিষ্কার বোঝা যায় এটা চাইনিজ এয়ারলাইন্স। ঢাকা টু কুনমিং এর ফ্লাইট ডিউরেশন হলো আড়াই ঘন্টা মতো। হালকা খাবার, বাদাম আর কফি পান করে সময়টা বেশ চলে গেলো। কুনমিংয়ে যখন নামলাম তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে। ইমিগ্রেশন আর কাস্টমস সেরে এয়ারপোর্ট থেকে বের হতেই আট দশ জন বাংলাদেশি আমাদের ঘিরে ধরলো। প্রত্যেকেই আমাদের তাদের সাথে নিয়ে যেতে ইচ্ছুক। সবার দাবি তাদের গেস্ট হাউস সব চাইতে ভালো। দেশি খাবারের ব্যবস্থা আছে। কেউ কেউ আবার গাইড সেবাও দিবে।

দেশের বাইরে এই শ্রেণির বাংলাদেশিদের নিয়ে আমার পূর্ব অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর না হওয়াতে এদের উপর ঠিক ভরসা করতে পারছিলাম না। আবার ভরসা না করেও উপায় ছিল না। যেহেতু স্থানীয় লোকজন ইংরেজি খুব একটা বোঝে না। বাধ্য হয়েই কথা বার্তার ভব্যতা দেখে একজন বাংলাদেশির সাথে চুক্তি করে নিলাম। এয়ারপোর্ট থেকে ওদের গেস্ট হাউসে নিয়ে যাবে, থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা সহ একটা ফিক্সড অ্যামাউন্ট ওদেরকে ডেইলি বেসিসে দিতে হবে। এতদিন জানতাম চীনের মুদ্রার নাম ইউয়ান, কিন্তু এখানে দেখি সবাই বলে আরএমবি। পুরো নাম হচ্ছে রেনমিনবি (Renminbi)।

ছেলেটার নাম পলাশ (ছদ্মনাম)। বাংলাদেশের বিক্রমপুরে বাড়ি। অনেক বছর ধরে চায়নাতে থাকে। একজন বাংলাদেশি এখানে ট্রেডিং ব্যবসায় করে আর একটি পাঁচ তলা বাড়ি ভাড়া নিয়ে গেস্ট হাউস বানিয়ে এখানে বেড়াতে আশা বাংলাদেশি বা ভারতীয়দের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে অর্থের বিনিময়ে। এইরকম প্রচুর বাংলাদেশি চায়নাতে আছেন যারা অনেকদিন ধরে এই দেশে ব্যবসা করেন। কেউ কেউ আবার চাইনিজ মেয়ে বিয়ে করে এখানে স্থায়ি আসন গেড়ে বসেছেন। পলাশের কাজ হলো মূলত এয়ারপোর্ট থেকে লোকজনকে কনভিন্স করে ওদের গেস্ট হাউসের অতিথি করা, তাদের পিক এন্ড ড্রপ এর ব্যবস্থা আর রান্না বান্না করা। ওর সাথে আরো দুই-তিন জন সহকারি আছে। একজন চাইনিজ ড্রাইভারকে ওদের সাথে যুক্ত করা হয়েছে, যার কাজ হলো ট্রান্সপোর্ট সুবিধা দেয়া এবং এই ভাড়ার টাকার একটা অংশ এই গেস্ট হাউসের মালিকের সাথে শেয়ার করা। এই ড্রাইভার এর মুখে বাংলা শুনে কিছুটা অপ্রস্তুত হলাম। কারণ সে শুধুই অশ্লীল বাংলা গালি-গালাজ ছাড়া আর কোনো শব্দ জানে না। একজন ভিনদেশির মুখে নিজের ভাষা শুনে (তাও আবার তার দেশে) যতটা না খুশি হওয়ার কথা তার চেয়ে বেশি রাগ হলো। রাগ গিয়ে পড়লো মূলত পলাশদের মতো বাংলাদেশিদের উপর, যারা আমার দেশের সভ্যতা-সংস্কৃতি শেখানোর বদলে এইসব আজে-বাজে জিনিস এদের শেখায়।

যাইহোক, এদের গেস্ট হাউসটা খারাপ না। এক রুমে দুইটা করে বেড, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। খাবার দাবার একেবারেই দেশিয়। প্রথম ডিনার করলাম ভাত, ডাল, মুরগির মাংস আর আলু ভর্তা দিয়ে। এদের আপ্যায়নেও ঘাটতি ছিল না। প্লেটে জোর করে খাবার তুলে দেয়। কম খেলে মন খারাপ করে। টাকার বিনিময়ে সেবা ঠিকই, কিন্তু একটা পারিবারিক পরিবেশ আছে। এর মধ্যে গেস্ট হাউসের মালিক এসে একবার সৌজন্য সাক্ষাৎ দিয়ে গেলেন। ভদ্রলোকের অল্প বয়স এবং যথেষ্ট মিশুক প্রকৃতির।

সকালে পলাশ বললো, “চলেন ভাইজান, বাজার থেকে ঘুরে আসি”। দেশে তো অনেক বাজার করি, এইবার দেখি চীন দেশের বাজার কেমন। কাছেই বাজার, হেঁটেই যাওয়া যায়। বাজারটা বেশ বড়। প্রথমেই ঢুকলাম মাছের বাজারে। নানা রকমের মাছ। ছোট, বড়, মিঠা পানির, সামুদ্রিক সব আছে। কাঁকড়া, ব্যাঙ এর অভাব নাই। একপাশে দেখলাম কয়েকটা লোক চৌকির উপর বসে আছে বড় বড় বটির মতো কিছু একটা নিয়ে। কাছে গিয়ে দেখলাম এটা বটি না। বটির পাটাতনের মতো কাঠের পাটাতন, আর এর মাথায় বড় সাইজের একটা লোহার পেরেক লাগানো। কয়েকজন ক্রেতা বেশ কিছু সাপ কিনেছেন আর এই লোকগুলো সেই সাপের চামড়া ছিলে কেটে-কুটে প্যাকেটে ভরে দিচ্ছে। চামড়া ছোলার পদ্ধতিটি অসাধারণ। সাপের লেজে ধরে জোরে সাপের মাথাটা ওই ধারালো পেরেকের মাথায় গেঁথে দিচ্ছে, আর একজন অন্য পাশ থেকে একটানে সাপের ‘আলেজমস্তক’ চামড়া ছিঁড়ে ফেলছে। ব্যাঙের দোকানে দেখলাম ড্রামের মধ্যে জ্যান্ত ব্যাঙ, আবার কেউ কেউ ড্রেসিং করা ব্যাঙও বিক্রি করছে। মাংসের দোকানে আস্ত আস্ত শূকর ঝুলছে। গরু-খাসিও আছে। সবজি বলতে চোখে পড়লো টমেটো, বেগুন, মুলা আর বিশাল সাইজের ফুলকপি ও বাঁধাকপি। এখানেও দেখলাম কুলি আছে, যারা ছোট ছোট ট্রলি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

আমাদের কুনমিংয়ে খুব একটা কাজ নেই। আমাদের মূলত গন্তব্য হচ্ছে ঝুজি এবং ইয়ু অঞ্চলে। ঝুজিতে একটা ব্যবসায়িক মিটিং আছে, আর ইয়ুতে যাবো কিছু জিনিসপত্র দেখতে। কুনমিং থেকে প্লেনেও যাওয়া যায় আবার ট্রেনেও যাওয়া যায়। আজ শুক্রবার এবং শনি-রবি সাপ্তাহিক ছুটি বলে ঐখানে গিয়ে খামোখা বসে থাকতে হবে বলে ঠিক করলাম ট্রেনেই যাবো। এতে পয়সাও বাঁচবে আর যেতে যেতে চীনের অনেক জায়গা দেখাও হবে। সকালে একজনকে সাথে নিয়ে রেল স্টেশনে গেলাম টিকেট কাটতে। কাউন্টারে গিয়ে বললাম ঝুজির দুইটা টিকেট দেন। কাউন্টারের মেয়েটা কোনোভাবেই বুঝতে পারেনা কোথায় যাবো। অনেক কসরৎ করেও যখন পারিনা তখন সবজান্তা গুগল এর সাহায্য। ম্যাপ থেকে জায়গা বের করে দেখাতে বলে ‘ও…. চুছি’। এইখানে উচ্চারণ নিয়ে পরবর্তীতে আরও নানা রকমের সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। যেমন এতদিন ধরে জেনে আসছি চীনের রাজধানী বেইজিং কিন্তু এরা বেইজিং বলে না, বলতে হবে পেইচিং। টিকেট কেটে গেস্ট হাউসে ফিরে এলাম, দুপুরে খেয়ে দেয়ে পলাশদের কাছ থেকে আপাতত বিদায় নিলাম। বিকেল তিনটায় ট্রেন।

কুনমিং রেল স্টেশন বেশ বড়। প্রধান ফটকে একটা মেটাল ডিটেক্টর আছে। সমস্ত ব্যাগেজ এইখানে চেক হয়। ৯/১১ এর পর পুরো পৃথিবীর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। ব্যাগ চেক করে ওয়েটিং রুমে বসে আছি। মানুষ দেখছি। হাজারো রকমের মানুষ! ছেলে, বুড়ো, শুকনো, মোটা, শহুরে, গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ। আসে পাশে অনেক অস্থায়ি দোকান। কেউ বেচে খাবার, কেউ খেলনা আবার কেউ কেউ শরীর ম্যাসাজ করে দিচ্ছে ছোট ছোট ইলেক্ট্রনিক ম্যাসাজ যন্ত্র দিয়ে। হকার গুলো বিচিত্র বাক্যে চেঁচিয়ে যাচ্ছে একই রকম সুর আর লয়ে। একটি পরিবার দেখলাম প্রচুর জিনিসপত্র নিয়ে মোটামুটি গলদ ঘর্ম। ছয় জনের দলে তিনটি একই সাইজের বাচ্চা। সবগুলো একই রকম দেখতে। এরা কি করে যে আইডেন্টিফাই করে কোনটা কে? আমার কাছে সবগুলো একই রকম মনে হয়।

স্টেশনের পাবলিক টয়লেট বেশ পরিচ্ছন্ন।  ক্লিনার আছে সার্বক্ষণিক, যে প্রতিমুহূর্তেই পরিষ্কার করে যাচ্ছে। এখানে টয়লেটে একটা নতুন ধরন দেখলাম। একটা লম্বা জায়গা সামান্য উঁচু আর তার সামনে একই সমান্তরালে একটা ড্রেন। এই ড্রেনের মধ্যে বিশাল সাইজের বরফ ফেলে রেখেছে। ধোঁয়া ওঠা বরফ। লোকজন লাইন দিয়ে সেই উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে বরফের উপর জল ত্যাগ করে যাচ্ছে।

কুনমিং রেল স্টেশন

 

লাউড স্পিকারে ঘোষণা হচ্ছে ‘চ্যাং উং ইয়ুই চুছি ….’ আমার ট্রেন প্ল্যাটফর্ম নম্বর পাঁচে এসে দাঁড়িয়েছে। ব্যাগ কাঁধে নিয়ে নির্দিষ্ট বগিতে গিয়ে উঠলাম। আহা কি সুন্দর ট্রেন! চোখ জুড়িয়ে গেলো। ঝকঝকে তকতকে। গার্ড, সার্ভিস গার্ল সবাই ইউনিফর্ম পড়ে ঘোরাঘুরি করছে। ‘নিহাও’ বলেই কোমর নুইয়ে স্বাগত জানালো। আমার আসন দেখিয়ে দিয়ে মুচকি হেসে সামনে এগিয়ে গেলো। দুই রাত দুই দিনের ভ্রমণ। প্রতেক্যের জন্য আলাদা আলাদা লম্বা আসন বা বিছানা। কম্বল, বালিশ সব ধবধবে পরিষ্কার। এক একটি কম্পার্টমেন্টে মোট ছয়টি করে আসন। প্রতি পাশে একতলা, দুইতলা, তিনতলা। আমার কপালে পড়েছে তিনতলা। প্রতিবার মই বেয়ে উঠো আর নামো। ব্যাগগুলো গুছিয়ে একটু থিতু হলাম। লোকজনের মোটামুটি ওঠা শেষ। গার্ড গেট চেক করে সব বন্ধ করে দিচ্ছে। আমার কম্পার্টমেন্টের সবাই চলে এসেছেন।

ট্রেন চলতে শুরু করেছে। ট্রেন ভ্রমণ আমার খুব পছন্দের একটা বিষয়, তা সে দেশেই হোক বা অন্য কোথাও। বিশেষ করে মফস্বলের স্টেশনগুলো আমায় খুব টানে। ঢাকা থেকে ট্রেনে চেপে যখন চিটাগং যেতাম তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লাকসাম, ফেনী এইসব স্টেশন গুলোকে খুব আগ্রহ নিয়ে দেখতাম। আমার আরেকটি পছন্দের স্টেশন হচ্ছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বোলপুর স্টেশন। ট্রেন অনেকটা পথ চলে এসেছে। কুনমিং শহর ছেড়ে ট্রেন এখন শহরতলিতে। সন্ধ্যে হয়ে আসছে। ধীরে ধীরে জানালার বাইরে অন্ধকার আর ট্রেনের ভেতর আলোকিত হচ্ছে। এর মধ্যে সহযাত্রী দু’একজন সৌজন্য হাসি বিনিময় করেছেন। সবাই যে যার ছোট ছোট চায়ের মগ বের করে তাতে এক মুঠো করে সবুজ চা ঢেলে গরম পানি ভরতে যাচ্ছেন। প্রতিটা বগির সংযোগ স্থানে একটি করে গরম পানির মেশিন বসানো আছে। যে যার মতো সেখান থেকে পানি নিয়ে আসছেন। চীনারা প্রচুর সবুজ চা পান করে। যতক্ষণ জেগে আছে কাপে গরম পানি ঢেলে এই চা পান করেই যাচ্ছে। আর দেখলাম সারা রাস্তা সূর্যমুখীর বিচি ভাজা খেতে,  আমরা যেমন বাদাম খাই যাত্রা পথে। এক মিনিটের জন্য মুখ বন্ধ নেই। আমার সামনের আসনে বসেছে একটি মেয়ে। তের-চৌদ্দ বয়স হবে। সারাক্ষণ বইয়ের দিকে তাকিয়ে। চা শেষ হলে গরম পানি ভরে আবার বইয়ের সামনে।

এরমধ্যে ট্রলি নিয়ে নানা ধরনের হকার এলো। স্যান্ডউইচ, বার্গার, নুডুলস, চকোলেট ইত্যাদি বিক্রি করছে। রাত প্রায় নয়টা বাজে। হঠাৎ দেখি সবাই খুব ব্যস্ত। ব্যাগ খুলে খাবারের বাক্স বের করে ডিনার করতে শুরু করেছে। একসাথে সবাই খাওয়া নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো কেন? খোঁজ নিয়ে জানলাম রাত দশটায় বাতি বন্ধ হয়ে যাবে তাই সবাই তার আগেই খাওয়া-দাওয়া সেরে নিচ্ছে। পলাশ আমাকে একটা বাক্সে মুরগির মাংস আর পরোটা দিয়ে দিয়েছিলো। ওদের দেখাদেখি আমিও খাওয়া শুরু করলাম। আমার মেনুর দিকে কেউ কেউ আড় চোখে একবার দেখেও নিলো। ঠিক দশটায় গার্ড এসে সব বাতি বন্ধ করে দিলো শুধু ওয়াকওয়ের ছোট ছোট বাতিগুলো ছাড়া। একটু একটু শীত লাগছে, কম্বল টেনে নিয়ে শুয়ে পড়লাম।

সকালে হকারের শব্দে ঘুম ভাঙলো। ফ্রেশ হয়ে খাবার বগী খুঁজে নিয়ে স্যান্ডউইচ আর কফি দিয়ে নাস্তা সেরে নিলাম। জানালার ধারে বসে আমি চীন দেখতে শুরু করলাম। কখনো গ্রাম পার হচ্ছি কখনো ছোট ছোট শহর। কখনো সবুজের সমারোহ আবার একটু পরেই রাস্তার ধারের দোকানপাট। মাঝে মধ্যে পাথর কাটার কারখানা, বাজার আবার বাড়িঘর। কখনো কোনো স্টেশনে ট্রেন থামে পাঁচ মিনিটের জন্য। প্ল্যাটফর্মে নেমে এদিক ওদিক দেখি, ছবি তুলি। এরমধ্যে আমার সামনের সিটে বসা বাচ্চা মেয়েটার সাথে সখ্যতা হয়ে গেছে। ইংরেজি খুব একটা বলতে পারে না। তারপরও কথা চালিয়ে যেতে অসুবিধা হলো না। মেয়েটা বাংলাদেশ চিনে না, আমাকে দেখে ইন্ডিয়ান মনে করেছিল। বাংলাদেশ সমন্ধে তাকে কিছু ধারণা দিলাম। হঠাৎ অন্ধকার! কি ব্যাপার? ট্রেন একটা টানেলের ভিতর ঢুকেছে। বিশাল পাহাড়ের পেট চিড়ে টানেল তৈরি হয়েছে। টানা তিন মিনিট লাগলো এই টানেল পার হতে। এরপর শুরু হলো পাহাড় দেখার ধুম। দুই পাশে ছোট, বড়, মাঝারি কত পাহাড়! কখনো সবুজ গাছে ভরা পাহাড় কখনো পাথুরে।

জানালার ধারে চেয়ারে বসে আছি এমন সময় একজন আমার গায়ে হাত দিয়ে শুদ্ধ ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলেন ‘হ্যালো, ইউ ইন্ডিয়ান?’ বললাম, না- আমি বাংলাদেশি। তারপর ধীরে ধীরে আলাপ জমে উঠলো। ভদ্রলোকের নাম মনসুর। একটু অবাক হলাম চাইনিজ মানুষের নাম মনসুর! উনি বোধহয় আমার অবাক হওয়াটা ধরতে পেরেই বললেন আমি মুসলিম। চাইনিজ মুসলিম। মনসুর সাহেবের বাড়ি ইয়ু। আমি যেখানে নামবো তার পরের বা আগের (ঠিক মনে নেই) স্টেশনেই উনি নামবেন। উনার সাথে উনার স্ত্রী আর একটা বছর চারেকের বাচ্চাও আছে। আমার পাশের কম্পার্টমেন্টে উনাদের আসন। উনার স্ত্রীর সাথেও পরিচয় হলো। নাম ফাতেমা আর ছেলেটার নাম আলী। মনসুর সাহেব সিরিয়াতে চাকরি করতেন। দশ বছরের উপর ঐখানেই ছিলেন। ভালো আরবী বলতে পারেন। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। সিরিয়া যুদ্ধের কারণে পরিবার নিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন।

জিজ্ঞেস করলাম চায়নাতে ধর্ম পালন করতে কোনো অসুবিধা হয় কিনা? আমরা তো শুনেছি এখানে ধর্ম পালন নিষিদ্ধ। বললেন- এখন অতটা নিষেধাজ্ঞা নেই। আমরা স্বাভাবিক ধর্মাচার করি তাতে কেউ বাধা দেয় না। ঘরের মধ্যেই ধর্মাচার বেশি হয়। মসিজদে যেতেও বাধা নেই। মনসুর সাহেব অত্যন্ত বন্ধু বৎসল এবং আন্তরিক বলেই মনে হলো। এর মধ্যে আমাকে দুইবার কফি দিয়ে আপ্যায়ন করে ফেলেছেন। বারবার সাবধান করেছেন বাইরে থেকে কোনো খাবার কিনলে উনাকে যেন দেখিয়ে নেই, কারণ হারাম-হালাল আমি বুঝতে পারবো না। এর মধ্যে একটা ঘটনা ঘটে গেছে। একটা স্টেশন থেকে আমি একটা নুডুলস এর কাপ কিনেছি। খাবো বলে প্যাকেটটা হাতে নিতেই মনসুর সাহেবের স্ত্রী ফাতেমা আমার হাত থেকে নুডুলসটা কেড়ে নিয়ে বললেন ‘নো নো, ইটস হারাম’। তারপর উনার কাছ থেকে আরেকটা নুডুলস এনে আমাকে দিলেন। মনসুর সাহেব উনার ফোন নাম্বার দিয়ে বললেন ইয়ুতে গিয়ে উনাকে ফোন দিতে, উনি আমার হোটেলের ব্যবস্থা করে রাখবেন।

যেদিন ভোর বেলায় ঝুজিতে পৌঁছুলাম সেদিন বেশ ঠান্ডা পড়েছে। ট্রেন থেকে নেমে বেশ খানিকটা হেঁটে স্টেশনের বাইরে এসে দেখি আমার জন্য এন্থিয়া গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে। সম্ভাষণের পর ওর গাড়িতে করে হোটেলে নিয়ে গেলো। আগেই সব ঠিক করা ছিল। চাইনিজদের একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম যে, এদের যারা দেশের বাইরে ব্যবসায় করে তাদের একটি করে ইংরেজি নাম আছে বায়ারদের উচারণের সুবিধার্থে। এন্থিয়ারও এটা ব্যবসায়িক নাম। এন্থিয়া আমাকে হোটেলে নামিয়ে বললো বিকেলে ওর অফিসে নিয়ে যাবে। এইবার পড়লাম মহা ফাঁপরে। দুপুরের লাঞ্চ করতে রেস্তোঁরাতে গেছি। কেউ ইংরেজি বোঝে না। আর তাছাড়া হারাম-হালাল নিয়েও বিপদ। কোনটাতে যে শুকরের মাংস নাই বুঝতে পারি না। এদের সবজিও মুখে দেয়া যায় না। সব স্যুপ টাইপের। ঝালের নাম গন্ধ নেই। গলা ভাত আছে তাও আবার চপস্টিক দিয়ে খেতে দেয়। চামচ চাইলেও কাঠি নিয়ে আসে। মহা বিপদ!

এন্থিয়াকে ফোন দিলাম। ও বললো হোটেলের কাছেই ম্যাগডোনালস আছে ঐখানে গিয়ে বার্গার খেতে। আর দুটো চাইনিজ শব্দ শিখিয়ে দিলো। ‘ইয়ো রো’ মানে গরুর মাংস এবং ‘চু রো’ মানে শুকরের মাংস। ম্যাগডোনালসে গিয়ে বললাম ‘ওয়ান বার্গার প্লিজ, নো চু রো’। ব্যস কাজ হলো। ঝুজিতে যে কয়টাদিন ছিলাম, একা একা খেতে গেলে শুধুই ম্যাগডোনালস আর ‘নো চু রো’। দুপুরে হোটেলের রুম সার্ভিস কল করলাম পানি দেয়ার জন্য। এক চাইনিজ মহিলা ঘরে এসে বলে ‘কি সোমসা’? বুঝলাম এখানে প্রচুর বাংলাদেশি আসে আর এরা তাদের কাছ থেকে দু’একটা বাংলা শব্দ ভালোই রপ্ত করেছে। বিকেলে এন্থিয়া এলো ওর অফিসে নিয়ে যাবে বলে।

ঝুজি অঞ্চলটা হচ্ছে বিশাল বিশাল মেশিনারি তৈরির জোন। চীনে আমাদের মতো সব ইন্ডাস্ট্রি বা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান এক জায়গায় অবস্থিত নয়। এরা সেক্টর অনুযায়ী বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রি বিভিন্ন প্রভিন্সে স্থাপন করেছে। যেমন কোনো রাজ্যে ইলেক্ট্রিক এবং ইলেকট্রনিক্স ইন্ডাস্ট্রি, কোথাও টাইলস এবং সেনেটারি ইন্ডাস্ট্রি আবার কোথাও শুধুই খেলনার ইন্ডাস্ট্রি। তেমনি ঝুজি হচ্ছে এমব্রয়ডারি মেশিনারি তৈরীর বড় বড় কারখানার জায়গা। আমি এখানকার বড় ইন্ডাস্ট্রির একটি ‘লেইজা এমব্রয়ডারি মেশিন কোম্পানি’র মেশিন দেখতে এসেছি। এন্থিয়া এই কোম্পানির আন্তর্জাতিক বিজনেস বিভাগের প্রধান। বিশাল এলাকা নিয়ে ফ্যাক্টরি এবং অফিস। তিনতলায় কোম্পানির মালিকের চেম্বার যিনি আবার কোম্পানির চেয়ারম্যানও। ভদ্রলোকের বয়স পয়ঁষট্টির মতো হবে। ছোটোখাটো মানুষ কিন্তু বিশাল বিত্ত বৈভবের মালিক। ঝুজির প্রথম সারির সম্মানিত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন। আমাদের দেখে চেয়ার ছেড়ে উঠে করমর্দন করলেন এবং চীনা ভাষায় অনেক কিছু বলে গেলেন। এন্থিয়া ইংরেজিতে তর্জমা করে দিলে আমিও প্রতিউত্তর করলাম। কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সানি লু এর মধ্যে চলে এসেছেন। যিনি আবার চেয়ারম্যান সাহেবের ছেলে। প্রথমদিন অফিস দেখা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। কালকে সকালে ফ্যাক্টরি পরিদর্শন এবং মেশিন পছন্দ করে অর্ডার কনফার্ম করতে হবে।

 

লেইজার প্রধান দপ্তর

লেইজার দপ্তরের সামনের সৌন্দর্য

 

রাতে হোটেলে ফিরে এসে আবার সেই ম্যাগডোনালস এবং বার্গার উইথ নো চু রো। আশেপাশের মার্কেট গুলোতে একটা চক্কর দিয়ে এলাম। সুন্দর সুন্দর দোকান, নজর কাড়া পণ্যের সম্ভার, তারচেয়েও সুন্দর লাবণ্য মাখা সেলস গার্লস। এদের হাসি দেখেই জিনিস কিনতে ইচ্ছে করে। নিজের জন্য একটা ইলেকট্রিক রেজার আর বৌয়ের জন্য একটা ব্যাগ কিনলাম। এইদেশে ফেসবুক এলাউড না। টিভি ছেড়ে বিছানায় হেলান দিলাম। সব চ্যানেলই দেখি চাইনিজ। কুনমিংয়ে গেস্ট হাউসে তাও ইন্ডিয়ান চ্যানেল দেখা যেত। হোটেলে ব্রেকফাস্ট কমপ্লিমেন্টারি। সকালে নিচের রেঁস্তোরাতে গিয়ে দেখি বুফে সাজানো রয়েছে। খাবার পছন্দ করতে গলদঘর্ম। তেল নাই, ঝাল নাই শুধু সেদ্ধ সেদ্ধ খাবার। শামুকের মুখ হাঁ করে সাজানো, এক বোল গলা ভাত, আর কি যেন একটা আছে অনেকটা ছোট সাইজের ভাপা পিঠার মতো। কিছু লতাপাতা সেদ্ধ করা। একটা টেবিলে দেখলাম পাউরুটি আর তার পাশে একজন চুলোয় ডিম্ পোচ করে দিচ্ছে। অবশেষে ডিম্, পাউরুটি আর কফি দিয়ে নাস্তা সেরে নিলাম।

ঠিক দশটায় এন্থিয়া এসে ফ্যাক্টরি নিয়ে গেলো। কাল সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছিলো বলে ভালো করে আসে পাশের দৃশ্য দেখা হয়নি। আজ দিনের আলোয় গাড়ির জানালা দিয়ে দেখছি দুপাশের সৌন্দর্য। বিশাল বিশাল কাঁচের ভবন, সুসজ্জিত দোকান, বাজার, ছোট ছোট কারখানা, গাড়ি, গাছ পালা আর মানুষ। এখানে ব্যাটারি চালিত স্কুটার খুব চলে। এই জাতীয় যানবাহন সবই ব্যাটারী চালিত পেট্রল বা ডিজেলের কোনো বালাই নাই। আমাদের দেশে যেমন রিকশা ভ্যান প্রচলিত এখানে এই ইলেকট্রিক ভ্যান।  মালামাল বহন থেকে শুরু করে যাত্রী পরিবহন হিসেবে দেদারসে এর ব্যবহার। মাঝে মাঝে ফসলের জমি। ধান, গম বা জবের ক্ষেত।

 

ঝুজির গ্রামে ফসলের ক্ষেত

ঝুজি শহরের বাড়ি ঘর

গন্তব্যে পৌঁছে গেছি। বিশাল ফ্যাক্টরি এরিয়া। বিশাল বিশাল মেশিন তৈরি হচ্ছে। একেকটা পার্টস এক এক সেকশন থেকে তৈরি হয়ে এক জায়গায় জড়ো হচ্ছে। তারপর ফাইনাল ইন্স্টলেশন। কোয়ালিটি সেকশনের লোকজন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রতিটা মেশিন চেক করছে। একটা মেশিন ডেলিভারির আগে এক সপ্তাহ ধরে এই চেকিং চলে। এদের অনুমোদন পেলেই মেশিন প্যাকিং এবং ডেলিভারি সেকশনে যাবে। এরপর শিপিং কোম্পানির লোক এসে মেশিন নিয়ে যাবে কাস্টমারকে ডেলিভারি দেয়ার জন্য।

 

মেশিনের পারফর্মেন্স কোয়ালিটি চেক হচ্ছে

 

ফ্যাক্টরি পরিদর্শন শেষে সানি লু এবং এন্থিয়ার সাথে বসে প্রাইস নেগোশিয়েট করলাম। এরা বেশ দর কষাকষি করতে পারে বলে মনে হলো। শেষপর্যন্ত চেয়ারম্যান সাহেব এসে আরেকটা স্পেশাল ডিসকাউন্ট দেয়াতে এইবেলা দফা রফা হলো।

 

লেইজার চেয়ারম্যান এবং এমডির সাথে

 

চেয়ারম্যান সাহেব আমাদের নিয়ে লাঞ্চ করবেন বলে কাছের একটা রেস্তোরাঁতে নিয়ে গেলেন। এই ভদ্রলোক যে এই অঞ্চলে বেশ সম্মানিত ব্যক্তি তা আগেই বলেছি। রেস্তোরাঁতে ঢুকতেই দেখি যারা আগে থেকে বসে ছিল সবাই খাওয়া ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেলো এবং নিহাও নিহাও করে সম্মান জানালো। আমরা ভেতরের দিকে একটা রিজার্ভড কক্ষে চলে গেলাম। চেয়ারম্যান সাহেব আমাকে ইশারায় ডেকে নিয়ে একেবারে রেঁস্তোরার রান্না ঘরে। থরে থরে মাছ, মাংস, সবজি সাজানো। সবই কাঁচা। চিংড়ি মাছের দিকে আঙ্গুল তুলে ইশারায় বোঝালেন এইটা অর্ডার করতে চান। সানি এসে তর্জমা করে বোঝালো যে আমি কোনটা খাবো পছন্দ করতে আর চেয়ারম্যান সাহেবের চিংড়ি মাছের একটা প্রিয় ডিশ আছে ঐটা আমাকে টেস্ট করতেই হবে। সূর্যমুখীর বিচি আর কোল্ড ড্রিঙ্কস টেবিলে সার্ভ করা হয়েছে। মূল খাবার আসতে ঘন্টা খানেক লাগবে।

চীন বিষয়ে এন্থিয়া আর সানির সাথে আলাপচারিতা জমে উঠলো। সামনে নাকি চাইনিজ নববর্ষের ছুটি। এটাই ওদের সবচেয়ে বড় উৎসব। টানা পনেরো দিন ছুটি। পুরো চীন তখন স্থবির। কোনো কাজ নেই শুধুই আনন্দ। নববর্ষে এরা গ্রামের বাড়িতে যাবে, বৃদ্ধ মা বাবাকে নিয়ে উৎসব পালন করতে। সাধ্য অনুযায়ী কেনাকাটা করবে। ট্রেনে বাসে জায়গা পাওয়া দুস্কর। এখন থেকেই উৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। ঝুজি নাকি বিখ্যাত মুক্তার জন্য। এই অঞ্চলে প্রচুর মুক্তার খামার আছে। একটু গ্রামের দিকের লোকজন ঘরে ঘরে মুক্তার চাষ করে। বিভিন্ন মান অনুযায়ি দামের তারতম্য আছে তবে অনেক সস্তা। ঝুজিতে আমার কাজ শেষ এরপর যাবো ইয়ু। এন্থিয়া বললো তোমরা কালকে এখানে থাকো, চেয়ারম্যান সাহেব বলেছেন কালকে তোমাদের ঝুজি ঘুরে দেখাতে। পরশু আমাদের গাড়ি তোমাদের ইয়ু পৌঁছে দিবে।

 

ঝুজি – মুক্তোর স্বর্গ

খাবার চলে এসেছে। এইবার ভাত দেখে ভালো লাগলো। গলা ভাত না, হালকা তেলে ভাজা ঝরঝরে। সাথে আস্ত মাছ রান্না। মাছের রং দেখে জিভে পানি চলে আসলো। সবজি, স্যুপ, গ্রিলড চিকেন আর সেই বিখ্যাত চিংড়ি মাছ। প্রচুর পরিমানে বিভিন্ন ধরনের গরম সসে ডোবানো ছোট ছোট কাঁচা চিংড়ি। চিংড়ি গুলো সম্ভবত পরিষ্কার করা হয়নি। কিন্তু খেতে খারাপ লাগলো না। সাথে ওয়াইনের গ্লাস আর আমার জন্য কোকের ক্যান। লাঞ্চ বেশ তৃপ্তিদায়ক ছিল। খাওয়া শেষে আবার লেইজার অফিসে। বিদায় নেবার আগে চেয়ারম্যান সাহেবের অফিসে বিদায়ী স্বাক্ষাৎ পর্বে একটা সুদৃশ্য গিফট প্যাক আমার জন্য অপেক্ষা করছিলো। চেয়ারম্যান সাহেব আগ্রহ নিয়ে প্রতিটা আইটেম দেখাচ্ছেন। একটা বাক্সে অনেক গুলো ছোট ছোট প্যাকেটে গুঁড়ো মু ক্তা। এইটা আমার বৌয়ের জন্য। এন্থিয়া ঠাট্টা করে বললো এই গুঁড়ো মুক্তা মুখে মাখলে নাকি আমার বৌয়ের গায়ের রং ওর মতো হয়ে যাবে। আমার জন্য এক কার্টন দামি সিগারেট আর একটা লাইটার, কোম্পানির ক্যালেন্ডার আর ডাইরি। ধন্যবাদ জানিয়ে অফিস থেকে এন্থিয়াকে নিয়ে বের হলাম।

 

সুস্বাদু মাছের কারী

চেয়ারম্যান সাহেবের প্রিয় চিংড়ি ডিশ

 

আজ এবং কাল এন্থিয়া আমাকে ঝুজি ঘুরিয়ে দেখাবে। প্রথমেই গেলাম এন্থিয়ার স্বামীর বাথরুম ফিটিংস এর দোকানে। কত ডিজাইনের যে বেসিন, কমোড, শাওয়ার আর ফিটিংস। এরা ডিজাইন দিয়েই বিশ্ব বাজার ধরে ফেলবে। রাত আটটার দিকে এন্থিয়া, ওর স্বামী আর আমি বের হলাম হোটেলের দিকে। এই দুই তারকা হোটেলে আমার নিজের খরচেই থাকা। এন্থিয়া বললো চেক আউট করতে কারণ এইবার আমার জন্য চেয়ারম্যান সাহেব একটি চার তারকা হোটেলের ব্যবস্থা করেছেন, আজ রাতে সেখানেই থাকবো। মনে মনে একটু হেসে নিলাম, ব্যাটা আগে অর্ডার কনফার্ম করেছে তারপরে এইসব আয়োজন।

যাইহোক, ব্যাগ অ্যাণ্ড ব্যাগেজ সহ নতুন হোটেলে। এরপর এন্থিয়া নিয়ে গেলো একটা ফুট ম্যাসাজ পার্লারে। সেখানে আমার পা ম্যাসাজ করে দিবে। এখানে নাকি এটা বহুল প্রচলিত। মোড়ে মোড়ে এই ফুট ম্যাসাজ পার্লার। যার যার ইজি চেয়ারে শুয়ে পড়লাম। এন্থিয়ার স্বামী, এন্থিয়া এবং আমি। তিন কন্যা একটি করে প্লাস্টিকের গামলাতে হালকা গরম পানি নিয়ে তাতে সাবান শ্যাম্পু মিশিয়ে আমাদের পায়ের পাতা গোড়ালী পর্যন্ত মাস্যাজ করতে লাগলো। কিছুক্ষন পরে দেখি যে মেয়েটি আমার ম্যাসাজ করছিলো সে কি যেন একটা বললো তাতে এন্থিয়া আর ওর স্বামী হেসেই খুন। জিজ্ঞেস করলাম, ঘটনা কি? বলে ‘এই মেয়ে বলে যে তুমি যদি এক সপ্তাহ ওর কাছে এইরকম ম্যাসাজ নাও তাহলে তোমার কালো পা ওর মতো সাদা হয়ে যাবে’। বললাম ‘উল্টোটাও হতে পারে ওর ফর্সা হাত আমার মতো কালো হয়েও যেতে পারে’। রাতে ওদের সাথে ডিনার করে হোটেলে ফিরে এলাম।

পরেরদিন সকালে এন্থিয়া আমাদের একটা পার্কে নিয়ে গেলো। প্রাচীন ইতিহাস সম্বলিত এই পার্ক শি শি (Xi Shi) নামের এক সুন্দরী গোয়েন্দা কে নিয়ে। খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ৫০৬ সালে শি শির জন্ম চীনের ইয়ু নামক রাজ্যে। ঝুজি তখন ইয়ু রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। সেই সময় সমস্ত চায়না বিভিন্ন রাজাদের নিয়ন্ত্রণে আলাদা আলাদা ভাবে প্রতিষ্ঠিত। কথিত আছে সেই সময়ে পুরো চায়নাতে চার জন রমনী ছিলেন অপরূপ সুন্দরী। এঁদেরকে বলা হতো ‘ফোর বিউটি’ বা ‘চার সুন্দরী’। শি শি ছিলেন সেই চারজনের একজন। শি শির বাবা ছিলেন একজন চা ব্যবসায়ী। বর্ণনা মতে শি শি এতটাই সুন্দরী ছিলেন যে, তিনি যখন ব্যালকনিতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পুকুরের দিকে তাকিয়ে থাকতেন, তখন তাঁর রূপের ঝলকে মাছেরা বিমুগ্ধ হয়ে সাঁতার কাটা ভুলে যেত, উড়ন্ত পাখি তাঁকে দেখে মাটিতে পরে যেত, চাঁদ মুখ ঢাকতো আর ফুলেরা লজ্জা পেতো।

এ সবই রূপকথা। তবে ইতিহাস হচ্ছে- ইয়ু রাজা গৌজিয়ান একবার উ রাজা ফুচাই এর সাথে যুদ্ধে পরাজয় বরণ করে রাজা ফুচাই কর্তৃক বন্দী হন। এতে করে ইয়ু রাজ্য উ রাজ্যের একটি করদ রাজ্যে পরিণত হয়। রাজা গৌজিয়ান তিন বছর বন্দি থাকেন এবং মুক্তির পরে নিজ রাজ্যে ফেরত এসে উ রাজার উপর গোপনে প্রতিশোধ নেয়ার উপায় খুঁজতে থাকেন। গৌজিয়ানের মন্ত্রী ওয়েন ঝং বুদ্ধি দেন রাজ্য থেকে একজন সুন্দরী মেয়েকে গোপন ট্রেনিং দিয়ে রাজা ফুচাইকে উপঢৌকন হিসেবে প্রেরণ করে, রাজাকে তার প্রেমের ফাঁদে ফেলে উ রাজ্যকে ধ্বংস করার। রাজা ফুচাইয়ের নারী প্রীতি আগে থেকেই প্রসিদ্ধ ছিল। সেই সময় ইয়ুতে শি শির মতো সুন্দরী আর কেউ ছিলোনা। গৌজিয়ানের আরেক জন মন্ত্রী ফ্যান লি খুঁজে বের করেন শি শিকে এবং প্রয়োজনীয় ট্রেনিং দিয়ে তৈরি করতে থাকেন। ট্রেনিং শেষে শি শিকে উ রাজ্যে পাঠানো হয় রাজা ফুচাইয়ের কাছে। শীঘ্রই শি শি রাজা ফুচাইকে নিজের রূপ এবং ব্যবহারে বশ করে ফেলেন। ফলশ্রুতিতে ফুচাই শি শির প্ররোচনায় তার শ্রেষ্ঠ উপদেষ্টা এবং সেনাপতি উউ ঈশুকে হত্যা করেন। এই সেনাপতির মৃত্যুতে উ রাজ্যের সেনাবাহিনী দুর্বল হয়ে পড়ে এবং রাজা ফুচাই শি শিকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সেনাবাহিনী যখন একেবারে ভঙ্গুর পর্যায়ে ঠিক তখনি অতর্কীর্তে রাজা গৌজিয়ান উ আক্রমণ করে বসেন। উ’র তখন ক্ষমতা নেই নিজেকে রক্ষা করার এবং পরাজয় বরণ করা ছাড়া। রাজা ফুচাই নিজের ভুল বুঝতে পেরে পরবর্তীতে আত্মহত্যা করেন।

 

শি শি

 

উ পতনের পর ফ্যান লি তার মন্ত্রিত্ব থেকে অবসরে যান এবং শি শিকে বিয়ে করে পর্দার আড়ালে চলে যান। উপকথায় জানা যায় যে লোকজন নাকি একবার তাদেরকে তাইহু লেকে নৌকাতে করে ঘুরে বেড়াতে দেখেছে তারপর আর কেউ কোনোদিন শি শিকে দেখেনি। আবার কেউ কেউ বলে শি শি পানিতে ডুবে মারা গেছেন। যাই হোক শি শিকে ইয়ু তে অনেক সম্মানের চোখে দেখা হয় কারণ তিনি যেভাবে নিজের জীবন বিপন্ন করে ইয়ু রাজ্যের সম্মান পুনরুদ্ধার করেছেন তা ইতিহাসে লেখা আছে।

এই পার্কটি শি শি’র নানা রকমের ভাস্কর্য, সেই ছোট্ট পুকুর, সেই সময়ের আদলে তৈরী নৌকা এই সব দিয়ে সাজানো। আছে একটি ছোট্ট জাদুঘর যেখানে শোভা পাচ্ছে শি শি’র বিভিন্ন ভঙ্গিমার পেইন্টিংস, সেই যুগের ছোটোখাটো অস্ত্র আর ব্যবহার্য জিনিসপত্র।

 

শি শি পার্কের ভাস্কর্য

পার্কে যথেষ্ট লোক সমাগম আছে। পুকুর পাড়ে বসে হাঁসের খেলা দেখি আর সূর্যমুখীর বিচি খেতে খেতে শি শি’র গল্প শুনি এন্থিয়ার কাছ থেকে। অসম্ভব সুন্দর একটা পরিবেশ আর কেমন যেন একটা ভালো লাগা ছুঁয়ে গেলো। চোখের সামনে ভেসে ওঠে শি শির জ্যান্ত প্রতিচ্ছবি। আমাদের পিছনেই দোতলা বাড়িটির ওই বারান্দায় নিশ্চয় শি শি হেলান দিয়ে দাঁড়াতেন আর এই তো সেই পুকুর যার মাছেরা তাঁর দিকে তাকিয়ে সাঁতার কাটা ভুলে যেত। মনের অজান্তেই আড়াই হাজার বছর আগে ফিরে যাই।

 

শি শি পার্কের পুকুর

শি শি পার্কের পুকুর 

পার্কের ভেতরে পর্যটকদের জন্য আছে বেশ কিছু স্যুভেনির আর মুক্তার দোকান। মুক্তার গয়না, বিভিন্ন মাপের মুক্তা আর মুক্তার গুঁড়ো পাওয়া যায় এই সব দোকানে। কয়েকটা মুক্তার মালা কিনলাম পরিচিত জনদের জন্য। একটা রেঁস্তোরাতে ঢুকে লাঞ্চ সেরে নিলাম তারপর হোটেলে। আজ আর কোথাও যাবো না। শি শির ঘোর থেকে বের হতে ইচ্ছে করছে না। রাতটা হোটেলে কাটিয়ে সকালে রওয়ানা দিবো ইয়ুর উদ্দেশ্যে।

মনসুরকে ফোন দিয়ে জানালাম আমি আসছি। মনসুর ড্রাইভারকে বলে দিলো কোন হোটেলে যেতে হবে। হোটেলে ঢুকতেই দেখি মনসুর হোটেলের লবিতে বসে আছে। সালাম বিনিময়ের পর রুমে নিয়ে গেলো। তারপর সারাদিন আমার সাথে বিভিন্ন যন্ত্রাংশের পাইকারি দোকানে, ছোট ছোট ফ্যাক্টরিতে। এখানে দেখলাম সবাই ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট। তা সে ছোটই হোক আর বড়। প্রায় প্রত্যেক ঘরেই একটা না একটা কারখানা আছে। ছেলে মেয়ে সমান তালে কাজ করে চলেছে। এদের বেশ পয়সাও আছে মনে হয়। সবারই দামি দামি গাড়ি। অডি, মার্সিডিজ, বিএমডব্লিউ, এস্টন মার্টিন। বিকেল নাগাদ আমার কাজ শেষ। এখানে প্রচুর ইন্ডিয়ান আর বাংলাদেশি চোখে পড়লো। ইন্ডিয়ান রেঁস্তোরাও আছে। পেট ভরে হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি দিয়ে লাঞ্চ সারলাম। বিকেলে মনসুর একটা মার্কেটে নিয়ে গেলো। বিশাল মার্কেট। কি নাই সেখানে। যা দেখি তাই কিনতে মন চাই। এই প্রথম ভিক্ষুক চোখে পড়লো। একজন বিকলাঙ্গ বৃদ্ধ। তাকে ঘিরে রেখেছে দুটি ফুটফুটে বাচ্চা। পকেটে যে কয়টা খুচরো পয়সা ছিলো দিয়ে দিলাম। ব্যাগ ভরে বাচ্চাদের জন্য কিছু খেলনা কিনলাম। ছেলের জন্য হেলিকপ্টার, মেয়ের জন্য পুতুল আর কানের দুল। মায়ের জন্য একটা ম্যাসাজ যন্ত্রও কেনা হলো।

হোটেলে জিনিসপত্র রেখে প্লেনের টিকেট কাটতে গেলাম। সকালের ফ্লাইট গোয়াংঝো টু কুনমিং। মনসুর রাতে ডিনার করাবে তার আগে একটু সাইট সিইং হয়ে যাক। কাছেই একটা নদীর ধরে নিয়ে গেলো। আসে পাশে প্রচুর হোটেল। ছোট ছোট বাচ্চারা স্বল্প বসনা মেয়ের ছবি হাতে নিয়ে কাছে ঘেঁষে আর আস্তে আস্তে বলে ‘ওয়ান্ট গার্লফ্রেন্ড’? এরা সব হোটেল গুলোর দালাল। প্রস্টিটিউশন এখানে বেশ ওপেন মনে হলো। প্রতি রাতেই হোটেলের ইন্টারকমে কল আসে ম্যাসাজ গার্ল লাগবে কি না জানতে চেয়ে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে এক ভারতীয়কে দেখলাম একজনের সাথে দর কষাকষি করছে। নদীর পাড় আলোকসজ্জায় ভরপুর। বসবার মতো সুন্দর সুন্দর বেঞ্চ। নদীতে আলো ঝলমলে ছোট ছোট স্টিমার ভেসে বেড়াচ্ছে। মনসুর বললো ওগুলো ভাসমান রেঁস্তোরা। লোকজন টিকেট কেটে পানিতে ভাসতে ভাসতে গান শুনে আর ডিনার করে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে কফি খেলাম। আজ শীত কি একটু বেশি নাকি নদীর ধারে বলে ঠান্ডা লাগছে? রাত নয়টা নাগাদ আমাকে হোটেলে নামিয়ে মনসুর বিদায় নিলো।

 

ইয়ু’র নদী, পিছনে স্টিমার রেঁস্তোরা

 

সকালে চেক আউট করে এয়ারপোর্ট। কুনমিংয়ে পলাশকে বলা আছে আমাদের পিক করতে। গোয়াংঝো এয়ারপোর্টটা খুব একটা বড় না। তবে যাত্রী আছে প্রচুর। টিকেট নিয়ে একটা কাউন্টারে দাঁড়ালাম। লম্বা লাইন। সামনে থেকে এয়ারলাইনসের এক কন্যা আমার টিকেট দেখে বললো ‘গো তু চি’। আমি এই লাইন থেকে সরে ইংরেজি ‘C’ লেখা কাউন্টারে দাঁড়ালাম। একটু পর আবার সেই কন্যা ‘গো তু চি, গো তু চি’। বুঝলাম আমি আবার ভুল জায়গায় দাঁড়িয়েছি। মনে পড়লো বেইজিং যদি পেইচিং হয় তাহলে ‘চি’ হবে ‘জি’।  মাথা খুলে গেছে – ‘G’  লেখা কাউন্টারে গিয়ে দাঁড়ালাম।

কুনমিংয়ে দুই দিন থাকবো। শুনেছি এখানে নাকি একটা স্টোন ফরেস্ট আছে। হাতে যেহেতু কোনো কাজ নেই, একবার ঘুরে আসা যাক। প্রায় সাড়ে তিনশো স্কয়ার কিলোমিটার এলাকা জুড়ে চীনের ইউনান প্রদেশে এই পাথরের অরণ্য অবস্থিত। ভূতত্ববিদদের মতে কমপক্ষে দুইশ সত্তর মিলিয়ন বছর আগে প্রাকৃতিক ভাবেই এই স্টোন ফরেস্ট তৈরি হয়েছে। পুরো অঞ্চলটাই উঁচু উঁচু পাথরে ছেয়ে আছে। মনে হয় যেন পাথরের গাছগুলো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। প্রবেশ মুখেই বিশাল পাথরের মনুমেন্ট তাতে লিখা রয়েছে শিলিন স্টোন ফরেস্টের নাম। তারপর সামনে পিছনে ডানে-বাঁয়ে সবখানেই শুধু পাথর আর পাথর। খুব সাজানো গোছানো। মনে হয় বিধাতা নিজেই এর ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন করেছেন। দেখেলেই মনে হয় যেখানে যে পাথরটা থাকা দরকার সেটা সেখানেই আছে। মাঝে মাঝে আছে সবুজ গাছপালা যা নিয়মিত সুন্দর করে পরিচর্যা করা হয়। আছে ঝিউয়ান এবং কিফেং নামের দুটি প্রাকৃতিক গুহা, চ্যাং এবং ইউয়ে নামের দুটি প্রাকৃতিক লেক আর আছে দেইদি নামের একটি ঝর্ণা। এই ফরেস্ট নিয়েও রয়েছে নানা রকমের মিথ।  তবে দুটো মিথ মোটামুটি কাছাকাছি।

একটি হলো- এই পাথুরে জঙ্গলটি ‘য়ি’ গোষ্ঠীভুক্ত আশিমা নামের একটি মেয়ের জন্মস্থান। কোনো এক যুবকের প্রেমে পড়ার পর তাকে ঐ ছেলেকে বিয়ে করতে নিষেধ করা হয় কিন্তু আশিমা সেই নিষেধ অমান্য করে বলে অভিশপ্ত হয়ে পাথরে রূপান্তরিত হয়। এখনো সেই পাথরটি আশিমার নাম বহন করে চলেছে। আর তাই প্রতি বছর ষষ্ঠ চন্দ্র মাসের চব্বিশ তারিখে ‘য়ি’ জাতি আশিমাকে স্মরণ করতে মশাল উৎসব উদযাপন করে থাকে। এই উৎসবে মূলত লোক নৃত্য আর কুস্তির আয়োজন থাকে।

আর দ্বিতীয় মিথটি হচ্ছে- আশিমা নামের এক অপরূপ কন্যার জন্ম এই এলাকায় এবং সে আহেই নামের এক যুবকের প্রেমে পড়ে। কিন্তু গ্রামের সর্দারের ছেলে আঝি একদিন আশিমাকে অপহরণ করে নিয়ে যায় এবং তাকে বিয়ে করতে জোর করে। এই শুনে আশিমার প্রেমিক আহেই আঝিকে একটি প্রস্তাব দিয়ে বলে যে একটি গানের প্রতিযোগিতা হবে আর এই প্রতিযোগিতায় যে জিতবে সেই আশিমাকে বিয়ে করবে। আঝি রাজি হয় এবং তিন দিন ব্যাপী সেই প্রতিযোগিতা শেষে আঝি হেরে গেলে আশিমা মুক্ত হয়। কিন্তু ফেরার পথে নদী পার হওয়ার সময় দুষ্ট আঝির সৃষ্ট কৃত্রিম বন্যায় আশিমা পানিতে ডুবে মারা যায়। তারপর আশিমা একটি পাথরে রূপান্তরিত হয় তারপর এই আশিমা পাথরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে এই বিশাল পাথুরে অরণ্য। স্থানীয়রা বিশ্বাস করে কেউ যদি এই আশিমা পাথরের সামনে দাঁড়িয়ে তার নাম ধরে ডাকে তো আশিমা তার ডাকে সাড়া দেয়। তবে কারো ডাকে আশিমা সাড়া দিক আর না দিক, এই পাথরের সৌন্দর্যের ডাকে প্রতিদিন শত শত মানুষ ছুটে আসে একে দেখতে।

 

স্টোন ফরেস্টের প্রবেশ মুখ

স্টোন ফরেস্ট – ১

স্টোন ফরেস্ট – ২

স্টোন ফরেস্ট- ৩

 

রাতের চীন অন্যরকম। রাতের বেলায় চীন যেন নতুন করে জেগে ওঠে। মানুষজন বিশেষ করে তরুণ এবং যুবারা সব রাস্তায় বের হয়ে আসে। রাস্তায় রাস্তায় আড্ডা, রেস্তোঁরাতে মুখোমুখি যুবক যুবতীর ফিশ ফাশ, আধো আলোতে কিছুটা ঘনিষ্ঠতা। এখানে সন্ধ্যের পর সব রাস্তার পাশে অস্থায়ি খাবারের দোকান বসে যায়। ফোল্ডিং চেয়ার আর টেবিল দিয়ে মুহূর্তেই রেস্তোঁরা তৈরি। বারবিকিউ হচ্ছে তেলাপিয়া মাছের কিংবা মুরগির। পুরো রাস্তা জুড়ে খাবারের গন্ধ। সবার হাতে বিয়ারের বোতল আর টেবিলে মাছ অথবা মুরগির বারবিকিউ। কেউ কেউ চা কফিও নিচ্ছে। এইরকম চলবে রাত দশটা পর্যন্ত তারপর যে যার মতো হাত ধরাধরি করে ঘরমুখো।

মহল্লার মধ্যে যে ছোট ছোট বাজার আছে সেখানে ফুটপাথে হকার বসে। নানা রকমের পণ্যের সমাহার। এক লোক দেখি থ্রীডি পোস্টার বিক্রি করছে। মক্কা শরীফ, মদিনা শরীফ, সূরা ইয়াসিন, যীশুখ্রিস্ট, মাদার মেরী, গৌতম বুদ্ধ এই সবের পোস্টার। এরা ধর্ম মানে না কিন্তু ব্যবসার জন্য ঠিকই বোঝে কোন জিনিস বানালে কেমন চলবে।

কুনমিং এবং গোয়াংঝো এই দুই জায়গাতেই দেখলাম আফ্রিকানদের অবাধ বিচরণ। বেশিরভাগই অনৈতিক কাজের সাথে জড়িত। মূল ব্যবসায় হচ্ছে ড্রাগ ডিলিংস আর স্মাগলিং। অনেকে আবার চাইনিজ মেয়ে বিয়ে করেছে। ধবধবে ফর্সা ছোট খাটো চীনে মেয়ের বর হচ্ছে বিশাল দেহি কালো কুচকুচে আফ্রিকান। তাদের মেয়েটা আবার শ্যামলা আর কোঁকড়ানো চুল।

শেষের দিন পলাশ আমাকে ঘড়ির মার্কেটে নিয়ে গেলো। পাইকারি বাজার। চোখে না দেখলে বিশ্বাস হবে না, এমন কোনো বিখ্যাত ব্র্যান্ড নেই যার রেপ্লিকা এখানে নেই। রোলেক্স, ওমেগা, টিসট, ফাইভ ইলেভেন থেকে শুরু করে প্যাটেক ফিলিপ পর্যন্ত। রেপ্লিকার আবার স্তর আছে এক, দুই তিন…… পাঁচ এইরকম। এক নম্বর রেপ্লিকার দাম সব চাইতে বেশি তারপর কমতে থাকে। কেউ যদি এক কেন তিন নম্বরের রেপ্লিকাও দেখিয়ে বলে এটা অরিজিনাল, খুব কম মানুষ তা ধরতে পারবে। দশ হাজার ডলারের রোলেক্স আপনি দশ হাজার টাকায় পাবেন। সুন্দর ফিনিশিং। ডিজাইন, লোগো সব হুবুহু, সময় নির্ভুল। কে দেখতে আসবে আপনার হাতের ঘড়ি আসল না রেপ্লিকা? ঘড়ি পাগল আমিও দু-একটা কেনার লোভ সামলাতে পারলাম না।

দেখতে দেখতে নয় দিন পার হয়ে গেলো। কাল রাতে দেশে ফিরবো। পলাশ যথেষ্ট সাহায্য করলো আমার ব্যাগ গুছাতে। পরের দিন ওরাই এয়ারপোর্ট পৌঁছে দিয়ে বিদায় নিলো।

চীন দেখার সাধ ছিল তার কিছুটা পূরণ হলো কুনমিং, ঝুজি আর ইয়ু দেখে। কিন্তু চীনের প্রাচীর আর রাজধানী পেইচিং না দেখলে কি আর চীন দেখা পূর্ণ হয়? দুঃখ রয়ে গেলো বুলেট ট্রেনে চড়তে পারলাম না বলে। নিশ্চয় সুযোগ পেলে আবার আসবো অদেখা চীনকে দেখবো বলে। আপাতত গুড বাই চীন।