ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

কুর্দিস্তানে এখন বসন্ত। শীত যাবো যাবো করেও কেন যেন যাচ্ছে না। বিকেলের দিকে চমৎকার হাওয়া গায়ে সুড়সুড়ি দিয়ে যায়। রাতে এখনো চাদর টেনে শুতে হয়।  চারিদিকে ফুলের সমারোহ। আমার বাগানের গোলাপগুলো বেশ পুষ্ট হয়েছে। কদিন পরেই গরম শুরু হবে। এখানকার গরম দুর্বিসহ। তাপমাত্রা বায়ান্ন ডিগ্রি পর্যন্ত উঠে। গরম আসার আগেই সহকর্মীরা একটা পিকনিকের ব্যবস্থা করে ফেললো। সারাদিনের আয়োজন। এখানকার পিকনিক মানে বাড়ি থেকে বিরিয়ানী আর মিষ্টান্ন তৈরি করে দূরে কোথাও যাওয়া আর স্পটে গিয়ে মুরগি অথবা ভেড়ার মাংসের বারবিকিউ। আমরাও তাই করলাম। আমাদের গন্তব্য এরবিল শহর থেকে তিন ঘন্টার দূরত্বে আক্রে নামক স্থানে। সকাল আটটায় যাত্রা শুরু করে সাড়ে এগারোটার দিকে আক্রের প্রায় সাতশো ফুট উঁচু পাহাড়ে উপস্থিত।

দুহক এরবিল হাইওয়ের উপর দিয়ে একটা ডাইভারশন নিয়ে আক্রে যেতে হয়।  দুহক থেকে প্রায় একশো কিলোমিটার পূর্বে আক্রে শহরের অবস্থান। খ্রিষ্ট পূর্ব ৫৮০ সালে কুর্দিশ প্রিন্স `যান্দ’ পাহাড় ঘেরা এই শহরটির পত্তন করেছিলেন। আক্রে ঐতিহাসিক ভাবে খুবই সমৃদ্ধশালী।  এখানে রয়েছে প্রাচীন মন্দির, ভবন, ভাস্কর্য, প্রাকৃতিক ঝর্ণা আর পাহাড়ের মধ্যে গুহা।

সূত্রমতে, প্রাচীন জরথ্রস্ট জাতির আবাস ছিল এই অঞ্চলটি। জরথ্রস্টরা ছিল অগ্নি উপাসক। আক্রে শব্দটি এসেছে প্রাচীন `ইকর’ শব্দ থেকে যার অর্থ আগুন। প্রিন্স যান্দ যখন এই শহরের পত্তন করেন তিনি এই চিন্তা মাথায় রেখেই এর নামকরণ করেন `আকর’ যা কালক্রমে আক্রে নামে পরিচিত হয়। আক্রের বসতি ছিল ইহুদি, খ্রিষ্টান আর মুসলমানের মিশ্রনে।  বর্তমানে মূলত মুসলিমরাই বসবাস করে, কিছু সংখ্যক খ্রিস্টান এখনো থাকলেও ইহুদিদের চোখে পড়ে না। আক্রের আধুনিক ইতিহাসের সূত্রপাত ১৯ শতকে অটোম্যান সাম্রাজ্যের সময়।

আক্রে সিটাডেল বা আক্রে দুর্গ: আক্রে দুর্গ আক্রে শহরের উত্তরাংশে অবস্থিত। খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮০ সালে প্রিন্স যান্দ একটি উঁচু পাহাড়ের সর্বোচ্চ চূড়ায় এটি তৈরি করিয়েছিলেন। কয়েক তলা বিশিষ্ট এই দুর্গটি চারটি পিলারের উপর দাঁড়িয়ে। প্রতিটি পিলারের উচ্চতা ১১০ মিটার। সবার উপরের তলাটি প্রিন্সের বাস ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হতো, মাঝখানেরটি খাদ্য গুদাম আর নিচেরটি ছিল বৃত্যাকার বৈঠকখানা বা দরবার। দুর্গের ভিতরে একটি পানির কুয়ার সন্ধান পাওয়া যায় আর একটি কক্ষ সম্ভবত কারাগার হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

আক্রে সিটাডেল

আক্রের প্রধান মসজিদ: আক্রে উপত্যকায় অবস্থিত প্রধান মসজিদটি পুরোনো শহরে অবস্থিত। অন্যান্য মসজিদগুলোর চাইতে এটি আকারে বেশ বড়। এর সুউচ্চ মিনার আশেপাশের পাহাড় আর এর অধিবাসীদের স্বাগত জানাতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মসজিদের কম্পাউন্ডের ভিতরে এখনো দু’একটি প্রাচীন গাছ চোখে পড়ে।

আক্রের প্রধান মসজিদ

 

আক্রের ঐতিহাসিক চার্চ: হাজার বছরের পুরোনো একটি চার্চ দেখতে পেলাম প্রায় চারশো ফুট উঁচু একটি পাহাড়ে। পরিত্যক্ত এই চার্চটির ধ্বংসাবশেষ দেখেই বোঝা যায় এটি কত পুরোনো। প্রথমে অটোম্যান এবং পরবর্তীতে ইরকি সরকারের ধংসযজ্ঞের পর আনফাল এবং কুর্দিশ গৃহযুদ্ধের সময় খ্রিষ্টানরা নিজেদেরকে প্রান্তিক গোষ্ঠী হিসেবে ভাবতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে আক্রে ছাড়তে শুরু করে ফলশ্রুতিতে এখন অনেক শূন্য গ্রাম দেখা যায় পাহাড় ঘেরা এই অঞ্চলে যা ছিল মূলত খ্রীষ্ঠান অধ্যূষিত।


আক্রের ঐতিহাসিক চার্চ

 

কালে পাহাড়: আক্রের সবচাইতে উঁচু পাহাড়ের নাম কালে পাহাড়। মানুষের তৈরী রাস্তা দিয়ে এর সর্বোচ্চ শিখরে ওঠা যায়।  পাথরের তৈরি এই পাহাড়ে সবখানেই ধ্বংসাবশেষ চোখে পড়ে। পাহাড়ের স্তরে স্তরে রয়েছে পুরোনো দিনের ঘরবাড়ি যাতে বাস করে হাজারো পরিবার।

পাহাড়ে ওঠার পথে

কালে পাহাড়

কালে পাহাড়ের পুরোনো সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ

কালে পাহাড়ের পুরোনো সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ

পুরোনো বাড়ি ঘরের ধ্বংসাবশেষ

পাহাড়ের উপরে পুরোনো ঘরবাড়ি

পাহাড়ে প্রাচীন গুহা

পাহাড়ের গুহায় জরথ্রস্টদের প্রাচীন মন্দির

শায়খ আব্দুল আজিজ (র:) এর তাকিয়াহ: মধ্যপ্রাচ্যে সুফিবাদ এবং কাদেরিয়া তরিকার প্রবর্তক বড়পীর শায়খ আব্দুল কাদির গিলানী (র:) এর ছেলে শায়খ আব্দুল আজিজ (র:) এর তাকিয়াহ বা খানকা অবস্থিত এই আক্রের পাহাড়ে।  কালের বিবর্তনে আজ তা ধ্বংস প্রাপ্ত। শায়খ আব্দুল আজিজ (র:) বিখ্যাত মুসলিম যোদ্ধা সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর সাথে জেরুজালেম যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন।  শায়খ আব্দুল আজিজ (র:) ১২০৫ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যু বরণ করেন। প্রতি শুক্রবারে সুফী মতাবলম্বীরা তাঁর মাজার দুপুর থেকে প্রার্থনার আয়োজন করে থাকেন।

শায়খ আব্দুল আজিজ (র:) এর প্রাচীন তাকিয়াহ এর ধ্বংসাবশেষ

শায়খ আব্দুল আজিজ (র:)বর্তমান মাজার

সুফিবাদের অনুসারীরা `দফ’ বাজিয়ে সুফী সংগীতের মাধ্যমে প্রাথর্নারত

 

আক্রের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য: আক্রের সৌন্দর্য সৃষ্টিকর্তার এক অপার নিদর্শন। এই সৌন্দর্য্য মুখে বলা বা লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করা কষ্টসাধ্য। আক্রের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য প্রকাশে লেখার বদলে ছবির আশ্রয় নিলাম।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

তথ্য সূত্র: কুর্দিস্তান ২৪, কুর্দিস্তান ট্যুরিজম বোর্ড, স্থানীয় অধিবাসী
ফটো ক্রেডিট : কুর্দিস্তান ২৪, সুমন মাহমুদ খান, দারওয়ান হামা সাঈদ, সোলিন আব্দ-আল-কাদের