ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই অফিসের এক জরুরি কাজে জাখো যেতে হলো। অফিসের গাড়িতে দুই সহকর্মীকে সাথে নিয়ে সকাল সকাল রওনা হলাম জাখোর উদ্দেশ্যে। এরবিল থেকে জাখোর দূরত্ব প্রায় ২০০ কিলোমিটার। ঘন্টা তিনেকের রাস্তা।

ইরাকি কুর্দিস্তানের অন্তর্ভূক্ত দুহক প্রদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর জাখো, দুহক শহরের পঞ্চাশ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে অবস্থিত।

কুর্দিস্তান তুরস্কের সীমান্ত ইব্রাহিম খলিলের ঠিক আট কিলোমিটার পশ্চিমে এই জাখো শহর। এখানে বিভিন্ন ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর বাস। জাখোর রয়েছে ঐতিহাসিক পরিচিতি সেই রোমান যুগ থেকে। এখানে দেখবার মতো অনেক স্থান রয়েছে যা পর্যটকদের আকর্ষণ করে। সিরিয়ায় শুরু হয়ে জাখোর মাঝ দিয়ে তুরস্ক চলে গেছে খবুর নদী। রয়েছে দেলাল ব্রিজ, প্রাকৃতিক ঝরনা, পিকনিক স্পট ইত্যাদি।

দুহক জাখো হাইওয়ে দিয়ে দুর্বার গতিতে গাড়ি এগিয়ে চলছে পশ্চিমে।  মসৃন ঝকঝকে রাস্তা, দুপাশে পাহাড়, গাছপালা, অস্থায়ী রেস্তোরাঁ। হঠাৎ আমাদের গাড়ি চালক শোয়ান বলে উঠলো – `কাকা, তামাশা পেশ খুদ’ মানে  ‘জনাব, সামনে তাকাও’।

আমাদের সামনে বিশাল পাহাড় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে। পাহাড়ের মুখে দুটো বড় বড় ফুটো। একটা দিয়ে গাড়ি ঢুকছে আর পাশেরটা দিয়ে গাড়ি বেরোচ্ছে। পাহাড়ের বুক চিড়ে তৈরি হয়েছে টানেল। এই টানেল পার হলেই আমরা জাখোতে প্রবেশ করবো।

সোনালী আলোতে উদ্ভাসিত অসাধারণ সুন্দর এই টানেল অতিক্রম করছি আর মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছি। টানেল পেরোতেই রোদের ঝলকানিতে এলো শহরের ছোঁয়া। আমরা জাখোতে প্রবেশ করলাম।

টানেলের প্রবেশ পথ

টানেলের ভেতরের দৃশ্য

আমাদের আরেক সহকর্মী কোভান থাকে জাখোতে।  শহরে ঢোকার প্রবেশ মুখে কোভান আমাদের রিসিভ করে প্রথমে নিয়ে গেলো রেস্তোরাঁতে দুপুরের খাবারের জন্য তারপর সেই অফিসে, যেখানে আমাদের মিটিং। মিটিং শেষ করে শহর দেখতে বেরোলাম।

দেলাল সেতু

দেলাল সেতু বা কুর্দি ভাষায় `পিরা দেলাল’ হচ্ছে পাথরে নির্মিত একটি প্রাচীন সেতু।  এই সেতুটি খবুর নদীর উপরে অবস্থিত।  ১৬ মিটার উচ্চতার এই সেতু একটি দর্শনীয় স্থাপনা এবং দেশি-বিদেশি মানুষের পদচারণায় মুখর থাকে সবসময়, বিশেষত বসন্তকালে।

ধারণা করা হয় পিরা দেলাল বা দেলাল সেতু প্রথম নির্মিত হয়েছিল রোমান যুগে। যদিও বর্তমান কাঠামো দেখলে মনে হয় এটা আব্বাসীয় যুগে নির্মিত। পুরো কুর্দিস্তানের মানুষজন এই সেতুটিকে তাদের শান্তি ও আনন্দ উপভোগের স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করে ও পরিবার-পরিজন নিয়ে বেড়াতে আসে।

এই সেতু নিয়ে অনেক কিংবদন্তী রয়েছে যার মধ্যে একটি হলো – বোহতানের রাজপুত্র টাইগ্রিস নদীর উপর একটি সেতু তৈরির জন্য একজন দক্ষ প্রকৌশলীকে আদেশ দেন। সেতুটি তৈরি হয়ে গেলে, রাজকুমার ভাল কাজের উপহার স্বরূপ প্রকৌশলীর ডান হাতটি কেটে ফেলার নির্দেশ দেন যাতে তিনি কখনও এইরকম সুন্দর সেতু অন্য কোথাও নির্মাণ করতে না পারেন।

এরপর প্রকৌশলী যখন জাখো শহরে ফিরে এলেন, এই শহরের মেয়র তাকে খবুর নদীর উপর একটি সেতু তৈরির অনুরোধ করেন। প্রকৌশলীর মনের মধ্যে ক্ষোভ এবং জেদ কাজ করছিলো। তিনি স্বীদ্ধান্ত নিলেন এই সেতু তিনি এক হাত দিয়েই তৈরি করে রাজপুত্রের অন্যায়ের প্রতিশোধ নিবেন। কাজ শুরু হলো কিন্তু  যখনই  সেতুটির মধ্যভাগের কাজ শেষ হয় ঠিক তখনই সেতুটি ভেঙে পরে, প্রতিবারই একই ঘটনা।

সমস্যা সমাধানে এক জোতিষী এগিয়ে এলেন।  তিনি জানালেন, এই বাধা কাটাতে একটি প্রাণ উৎসর্গ করতে হবে। কোনো এক প্রতুষ্যে সূর্যোদয়ের সময় সর্বপ্রথম যে এই সেতুতে পা রাখবে তাকে উৎসর্গের মধ্য দিয়ে এই ফাঁড়া কাটানো সম্ভব। তা হোক সে কোনো মানুষ বা কোনো পশু।

দেলাল সেতু

পরেরদিন সকালে প্রকৌশলী নদীর ধারে অপেক্ষা করছেন এবং খানিক পরেই দেখতে পেলেন তার কন্যা (মতান্তরে ভাতিজি) দেলাল সেতুর দিকে এগিয়ে আসছে তার কুকুরটির সাথে। প্রকৌশলীর বুকটা ধক করে উঠলো। মনে মনে প্রার্থনা করতে লাগলেন দেলাল যেন সেতুতে পা না রাখে। কুকুরটি দেলালের সামনে চলে এলো ছুটতে ছুটতে। প্রকৌশলী প্রার্থনা করেই যাচ্ছেন।

হঠাৎ কী হলো, কুকুরটি গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে হঠাৎ গতি কমিয়ে দিলে, দেলাল সামনে চলে এসে প্রথম পা রাখলো সেতুর উপর। প্রকৌশলী চিৎকার করে মূর্ছা গেলেন।  চেতনা ফিরে পাওয়ার পর তিনি দেলালকে পুরো ঘটনা খুলে বললে, দেলাল কিছুক্ষনের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গেলো এরপর স্বাভাবিক হয়ে দেলাল জানালো  সে তার শহরটির জন্য, এই শহরের মানুষের উপকারের জন্য তার জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। শেষ পর্যন্ত দেলালের জেদের কাছে হার মেনে প্রকৌশলী সেতুর নিচে তাকে কবর দিলেন।

দেলাল সেতু

এদিকে ঘটনা শুনে দেলালের স্বামী শহরে ফিরে দ্রুত সেতুর কাছে এসে, কোদাল দিয়ে সেতুর নিচে খনন শুরু করেন, যেখানে দেলাকে কবর দেয়া হয়েছে।  খনন করার সময়, তিনি তার মৃত স্ত্রী দেলালের চাপা কণ্ঠস্বর শুনতে পান – ’মাটি খোঁড়া বন্ধ কর।  আমি শরীরে আঘাত পাচ্ছি। আমি স্বেচ্ছায় এই পরিণতি মেনে নিয়েছি।  আমি চাই আমার দুই বহু দিয়ে চিরদিন এই সেতুকে ধরে রাখি’। বাধ্য হয়ে দেলালের স্বামী মাটি খোঁড়া বন্ধ করেন এবং ভাগ্যকে মেনে নেন।

সেই থেকে জাখো শহরের বুকে দেলালের দুই বাহুতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই দেলাল সেতু।  কথিত আছে এখনো নাকি প্রতিবছর কেউ না কেউ এই সেতুর এক প্রান্তে এসে নদীতে ঝাঁপিয়ে আত্মহত্যা করে।

খবুর নদী

সেতুকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ছোট্ট বাজার। স্থানীয় সংস্কৃতির জিনিসপত্রের সম্ভার নিয়ে পসরা সাজিয়েছে অস্থায়ী দোকান। বাদামের  দোকান।  সুন্দর একটি বইয়ের দোকান দেখে চমৎকার লাগলো।  কাঠ দিয়ে তৈরি এই দোকানে রয়েছে নানা বইয়ের সমাহার- জাখোর ইতিহাস, কুর্দিস্তানের ঐতিহ্য নিয়ে  কুর্দি আর আরবি সংস্করণ।


অস্থায়ী বইয়ের দোকান

শরশিশের প্রাকৃতিক ঝরনা

শরশিশ হচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্ক সীমান্তের নিকটবর্তী জাখোর একটি আসিরিয়ান গ্রাম। এই অঞ্চলে গ্রীষ্মের সময় শীতল আবহাওয়ার জন্য এই গ্রামটি প্রসিদ্ধ। এটি ইরাকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্রগুলির মধ্যে একটি। গ্রামটিতে দুটি গির্জা রয়েছে, যার মধ্যে একটি মূলত চতুর্থ শতাব্দীতে খ্রিস্টধর্মের আগমণের আগে নির্মিত এবং অন্যটি সিনাগগ, যা ৪০০ বছর আগে নির্মিত হয়েছিল। এখানে রয়েছে একটি প্রাকৃতিক ঝর্ণা যাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে পিকনিক স্পট।

 

 

বাহনিনা গুহা

এই গুহাটি বাতোফা  উপজেলার মধ্যে বাহনিনা পাহাড়ের মাঝখানে অবস্থিত। এটি একটি অনেক পুরানো গুহা, এতে রয়েছে স্বচ্ছ পানির ধারা। ১৯৭৩ সালে পূর্ববর্তী বাথ পার্টির শাসনের বিরুদ্ধে কুর্দি সংগ্রামের সময়, এই গুহাটি আহত পেশমার্গাদের (কুর্দি সৈনিক) চিকিৎসার জন্য একটি হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।  জাখো শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই গুহাটিতেও প্রচুর পর্যটকের আনাগোনা লক্ষ্য করা যায়।

 

নিউ জাখো সিটি

শহরের ভেতর শহর। জাখো শহরের উপকণ্ঠে পাহাড়ের উপরে তৈরি হচ্ছে বিশাল আবাসিক এলাকা। পরিবেশের প্রতি লক্ষ্য রেখে ৭১৫ একর জমির উপর তৈরি এই প্রকল্পের ৬০ শতাংশ জায়গা খালি রেখে দেয়া হয়েছে সবুজায়নের জন্যে। প্রকল্পে রয়েছে প্রায় সাড়ে তিনশো ডুপ্লেক্স ভিলা, সাড়ে ছয়শো এপার্টমেন্ট, পাবলিক স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, শপিং মল, মসজিদ, চার্চ, মন্টানা নামে জাখোর সবচেয়ে বড় এবং সুন্দর রেস্তোঁরা।

পাহাড়ের সর্বোচ্চ চূড়ায় রয়েছে পর্যটকদের জন্য ছোট ছোট ভিলা। তৈরি হচ্ছে লাইট হাউজের আদলে সুউচ্চ আলোর টাওয়ার যা জাখোর যে কোনো জায়গা থেকে দেখা যাবে। এই টাওয়ার তৈরিতে নাকি কয়েক মিলিয়ন ডলার খরচ হবে।

 

পাহাড়ের চূড়ায় তৈরি হচ্ছে পর্যটকদের জন্য ছোট ছোট ডুপ্লেক্স

মন্টানা রেস্তোরাঁ

 

 

মন্টানা রেস্তোরাঁ হচ্ছে জাখো শহরের সম্ভবত সবচাইতে সুন্দর রেস্তোরাঁ। তারকা খচিত রেস্তোরাঁ আছে কিনা আমার জানা নেই, থাকলে এই রেস্তোরাঁর গায়ে নিঃসন্দেহে ৪চার-পাঁচ তারা লেগে যেত। বিশাল এলাকা জুড়ে রেস্তোরাঁ, সামনে রয়েছে উন্মুক্ত আকাশের নিচে সাজানো বাগানে বসার ব্যবস্থা। আছে নানাবিধ ভাস্কর্য, কৃত্রিম ফোয়ারা আর আছে আলোর ঝলকানি।

এখানে বিয়েশাদির অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা আছে দেখলাম। একজোড়া সদ্য বিবাহিত বর-কনে বিয়ের সাজে বাগানে নানান ভঙ্গিমায় বসছে, হাঁটছে আর পেশাদার ছবিওয়ালারা ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক শব্দ চালিয়ে যাচ্ছে। এরা আবার ড্রোনের সঙ্গে ক্যামেরা লাগিয়ে ছবি তুলছে। মানুষের পয়সা থাকলে কত কী করা যায়!

তথ্যসূত্র: কোভান রশীদ, কুর্দিস্তান বোর্ড অফ ট্যুরিজম
ছবি: সুমন মাহমুদ খান, গুলিজার হামো এবং সৈয়দ আশরাফ মহি-উদ্-দ্বীন

 

মন্তব্য ৯ পঠিত