ক্যাটেগরিঃ আন্তর্জাতিক

ইরাকের কুর্দিস্তানে আছি আজ প্রায় ছয় বছর হতে চললো।  এখানকার ইতিহাস, সমাজ, সভ্যতা, রাজনীতি ইত্যাদি নিয়ে অল্প বিস্তর ধারণা আগে থেকেই ছিল।  নতুন করে কিছু কিছু জ্ঞান যুক্ত হয়েছে চাক্ষুষ দেখার কারণে। মিডিয়ার কল্যাণে ইরাক, কুর্দিস্তান, কুর্দ ইত্যাদি বিষয়ে বাংলাদেশের সবাই কিছু না কিছু অবগত।

আমার মনে হয় এই কুর্দিস্তানের একটি সংখ্যালঘু জাতি `ইয়াজিদি’ সম্পর্কে বাংলাদেশের খুব কম মানুষেরই ধারণা আছে। কুর্দিস্তানে আসার আগে আমি নিজেও এই জাতি সম্মন্ধে কিছুই জানতাম না।  ইয়াজিদিদেরকে নিয়ে আমার আগ্রহ জন্মে যখন তথাকথিত ইসলামিক স্টেট  কুর্দিস্তানের সিনজার পাহাড় দখল করে গণহারে ইয়াজিদি মানুষদের হত্যা করছিলো।  চোখের সামনে দেখলাম কীভাবে এক সপ্তাহের মধ্যে এরবিল শহর ভরে গেলো হাজার হাজার উদ্বাস্তুতে।  বৃদ্ধ, শিশু, মহিলাদের ভয়ার্ত চোখ আমাকে শংকিত করে, লজ্জিত করে।

রাস্তার দুপাশে কিংবা মহল্লার খালি জায়গায় গড়ে উঠলো অস্থায়ী ঘরদোর।  প্রত্যেক ঘরের সামনেই দু’চারটে সূর্যমুখী, সূর্যের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। ধূসর আর নীল চোখের বাচ্চারা ছুটোছুটি করছে। এরা সবাই ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের লোক। সিনজার পর্বত থেকে পালিয়ে এসেছে জীবন বাঁচাতে।

কারা এই ইয়াজিদি?

ঐতিহ্যগত ভাবে ইয়াজিদি লোকের বাস হচ্ছে উত্তর ইরাকের কুর্দিস্তানের নিনেভ এবং দুহক প্রদেশে।  এই দুই প্রদেশের সিনজার পর্বতাঞ্চল এবং শেখান নামক অঞ্চল যেখানে এদের পবিত্র স্থান সমূহ অবস্থিত। ইয়াজিদিরা বিশ্বাস করে তারাই পৃথিবীর প্রথম মানব। প্রায় ছয় লাখ ইয়াজিদির বাস ইরাকে। এর মধ্যে চার লাখের বাস হচ্ছে সিনজার পর্বতে এবং বাকি দুই লাখ রয়েছে পুরো দুহক প্রদেশ জুড়ে। ইরাক ছাড়াও রাশিয়ায় রয়েছে প্রায় চল্লিশ হাজার, জর্জিয়াতে কুড়ি হাজার এবং আর্মেনিয়াতে রয়েছে পয়ঁত্রিশ হাজারের মতো ইয়াজিদি। সিরিয়াতেও রয়েছে বেশ কিছু ইয়াজিদি । চলমান গৃহযুদ্ধের কারণে এই মুহূর্তে সঠিক সংখ্যা বলা না গেলেও ধারণা করা হয় সিরিয়াতে এর সংখ্যা দশ হাজারের কম নয়।

জাতিগতভাবে এরা কুর্দিদের সাথে সম্পর্কিত এবং কুরমানজি (কুর্দি উপভাষা) ভাষায় কথা বলে। কিন্তু এরা নিজেদেরকে কুর্দি মানতে নারাজ। এদেরকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় তোমরা কুর্দি কিনা, এরা একবাক্যে তা অস্বীকার করবে।  এরা নিজেদেরকে একটি সম্পূর্ণ আলাদা জাতি বলে মনে করে।  ধারণা করা হয় এদের এই চেতনা তৈরি হয় ২০১৪ সালের ৩ অগাস্ট যখন জঙ্গি গোষ্ঠী  আইএস ইয়াজিদিদের হত্যা করতে আসে তখন কুর্দি সেনাবাহিনী কোনো রকম প্রতিরোধ না করে, এমনকি এদেরকে সাবধান না করেই মাঝ রাতে নিজেদেরকে প্রত্যাখ্যান করে নেয় ইয়াজিদিদের ভাগ্য আইএসের হাতে সঁপে দিয়ে।

কুর্দিদের এহেন আচরণ ইয়াজিদিদেরকে হতাশ করে।  ধর্মীয় ভাবে কুর্দিরা সুন্নি মুসলমান আর ইয়াজিদিরা নিজেদের ধর্ম অনুসরণ করে যার নাম `ইয়াজিদিজম’। এটাও একটা পার্থক্য তৈরি করে রেখেছে কুর্দি এবং ইয়াজিদিদের মধ্যে।

ইয়াজিদিজম কী?

ইয়াজিদিরা বিশ্বাস করে যে ইয়াজিদিজম বা ইয়াজিদিবাদ হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীনতম ধর্ম এবং ইসলাম, খ্রিষ্টধর্মের কিছু কিছু বিষয় এক হওয়ায় এই ইয়াজিদি ধর্ম এই দুই ধর্মের মতোই অনন্য।

ইয়াজিদিরা বিশ্বাস করে, ঈশ্বর এই পৃথিবী আর আদম-হাওয়াকে সৃষ্টি করতে সাহায্য করার জন্য সাতজন ফেরেশতা সৃষ্টি করেন।


আইএসের কব্জা থেকে মুক্ত হওয়ার পর প্রথম নববর্ষ উদযাপনে জড়ো হয়েছে ইয়াজিদিরা

এরপর ঈশ্বর এই সাতজন ফেরেশতাকে বললেন, `তোমরা আদমের সামনে মাথা নত করো’। একজন বাদে বাকি ছয়জন ফেরেশতা ঈশ্বরের আদেশ পালন করলো। যে ফেরেশতা মাথা নত করলোনা ঈশ্বর তাকে পৃথিবীতে নির্বাসিত করলেন ময়ূর বেশে এবং সে `মালাইকা আত-তাউস’ (ময়ূর ফেরেশতা) নামে পরিচিত হলো। পরবর্তীতে ঈশ্বর এই ফেরেশতাকে সকল ফেরেশতা এবং পৃথিবীতে মানুষের দায়িত্ব দেন।

এটিই মূলত ইয়াজিদিদের উপর নিপীড়ণের মূল কারণ যেখানে দেখা যায় ইয়াজিদিরা একজন পতিত ফেরেশতাকে উপাসনা করে। ইসলাম এবং খ্রিষ্ট ধর্মমতে `শয়তান’ হচ্ছে সেই পতিত ফেরেশতা এবং অনেক মানুষ বিশ্বাস করে ইয়াজিদিরা তাহলে শয়তানের উপাসক।

কিন্তু ইয়াজিদিদের মতে, ইয়াজিদিরা শয়তানে বিশ্বাস করে না এবং শয়তান পাপের উৎস একথাও মানতে নারাজ। এদের বিশ্বাস ঈশ্বর প্রদত্ব সমস্ত ভালো কিছুই মানুষের জন্য এবং মন্দ যা তা সব মানুষেরই কাছ থেকে আসে।

  জ্বলন্ত মোমবাতি নিয়ে লালিশের পবিত্র মাজারে নতুন বছরের প্রার্থনা করছেন ইয়াজিদিরা

ধর্মীয় নিপীড়ন এড়াতে ইয়াজিদিজম প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়েছে কেবল মুখে মুখেই। ইয়াজিদি ধর্মমতে অন্য ধর্মের কেউ ইয়াজিদি ধর্ম গ্রহণ করতে পারবে না। ইয়াজিদি হতে হলে তাকে ইয়াজিদি বাবা-মার সন্তান হতে হবে। এর মানে হলো কেউ ইয়াজিদি না হলে ইয়াজিদি হতে পারবে না। ধর্মীয় আরও কিছু প্রথা এই ধর্মকে দিন দিন সংকুচিত করে ফেলছে যার মধ্যে রয়েছে এদের বিবাহ নিজেদের ধর্মের মধ্যেই হতে হবে। আর তাছাড়া পুরো জাতিটাই শরণার্থী হিসেবে  ছড়িয়ে যাচ্ছে সমস্ত বিশ্বে।

শরণার্থী ক্যাম্পগুলো, যেখানে প্রচুর ইয়াজিদি শরণার্থী বাস করছেন সেগুলো উত্তর ইরাকের ইয়াজিদিদের পবিত্র স্থানের কাছাকাছি অবস্থিত। এদের অত্যন্ত পবিত্র স্থান `লালিশ’ এই ক্যাম্পগুলোর খুবই কাছে আর যার কারণে এরা এদের ধর্মীয় আচার থেকে কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন নয়।  এদের প্রধান ধর্মীয়ও নেতারা সকলেই এই লালিশ শহরে বাস করেন।

ইয়াজিদিদের প্রার্থনা কেমন?

ইয়াজিদিরা দৈনিক পাঁচবার প্রার্থনা করে। ১।  ভোর বেলার প্রার্থনা (সূর্যোদয়ের আগে)  ২। সূর্যোদয়ের সময় ৩। দ্বিপ্রহরের সময় ৪। বিকেলে বেলা এবং ৫।  সূর্যাস্তের সময়। তবে বেশিরভাগ ইয়াজিদি মাত্র দুই বারই প্রার্থনা করে আর তা হলো সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তর সময়।  এই দুই সময় এরা সূর্যের দিকে এবং বাকি সময় গুলো লালিশের (যেখানে এদের পবিত্র মন্দির অবস্থিত)  দিকে মুখ করে  প্রার্থনা করে। এই দৈনিক প্রার্থনা বাইরের লোকেদের উপস্থিতিতে করা নিষিদ্ধ। বুধবার হচ্ছে ইয়াজিদিদের পবিত্র দিন এবং শনিবার হলো বিশ্রামের দিন।


লালিশ এর মন্দির


শেখ আদি ইবনে মুসাফিরের কবর, লালিশ

ইয়াজিদিরা কেন নির্যাতিত?

মূলত ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণেই ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের লোকজন নিপীড়ণের লক্ষ্য হয়েছে।  তবে এই নিপীড়ন সবসময় সহিংস রূপে ছিলোনা। এদের ভূমি থেকে উচ্ছেদও এদের প্রতি নিপীড়ণের একটা কারণ। ধর্মীয় বিচার ছাড়াও আরেকটি কারণে ইয়াজিদিরা নিপীড়িত হয়েছে আর তা হলো সাদ্দাম হোসেন কর্তৃক উত্তর ইরাকে আরব বসতি বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে অনারব ইরাকিদের বাস্তুচ্যুত করার চেষ্টা ।

ইয়াজিদিরা এখন কোথায়?

অনেক ইয়াজিদি পরিবার জার্মানি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক এবং অস্ট্রেলিয়াতে পুনর্বাসিত হয়েছে।  অনেকে বিশ্বের অন্যান্য শরণার্থীদের সাথে মিশে এখনো উন্নত দেশগুলোতে আশ্রয়ের চেষ্টা করে যাচ্ছে। আর হাজার হাজার ইয়াজিদি বাস করছে ইরাক আর সিরিয়ার শরণার্থী ক্যাম্পে।


শরণার্থী ক্যাম্পে ইয়াজিদি শিশু

তিন দিনের রোজা শেষে  আইএসের  হত্যাকাণ্ডের স্বীকার স্বজনদের কবরে ইয়াজিদিদের শ্রদ্ধা নিবেদন। সিনজার পাহাড়, কুর্দিস্তান

ইয়াজিদি এমন এক সম্প্রদায় যারা নিজেদের ঐতিহ্য এবং স্বতন্ত্র ধর্ম পরিচয়কে সংরক্ষণ করার চেষ্টা  করেও ধীরে ধীরে পৃথিবীর বুক থেকে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। কোনো একদিন হয়তো শুধুই ইতিহাসের পাতায় নাম পাওয়া যাবে ইয়াজিদিদের।

তথ্যসূত্র: কেরি আর্মস্ট্রং এর নিবন্ধ এবং স্থানীয় অধিবাসী

মন্তব্য ৬ পঠিত