ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

আমার মত হাজারও প্রবাসী বাংলাদেশির মনে একটাই প্রশ্ন “দেশি থেকে প্রবাসী কেন?” এ প্রশ্নের উত্তরটা আসলে এক কথায় দেয়া সম্ভব না। যে দেশে জনগণের জীবনের কোন নিরাপত্তা নেই সে দেশের জনগণ প্রবাসী হবে এটাই কি স্বাভাবিক নয়? বিগত কয়েক বছরের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকে তাকালে খুব সহজেই বোধগম্য হয় যে এখানে মানুষের জীবন কতটা সস্তা হয়ে গেছে। প্রতিদিনের আহার নিদ্রার মতই গুম, খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজী, সন্ত্রাসী ইত্যাদি নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে সাধারণ জনগণ কারো জীবনেরই কোন নিরাপত্তা নেই এদেশে।

গত কয়েকটি বছর ধরে অমানুষিক অত্যাচারের স্বীকার হতে হয়েছে সাংবাদিকদের। সাংবাদিকতার মত মহান এই পেশায় জড়িত থাকা লোকগুলোকেও নিরাপত্তা দিতে ব্যার্থ এদেশ। তাহলে এসব মানুষের প্রবাস জীবন বেছে নেয়া ছাড়া কি-ই বা করার আছে? একজন সাংবাদিকের যেকোন লেখা যদি কোন ব্যক্তি বা দলের স্বার্থে আঘাত করে তখনই তার জীবন হয়ে যায় হুমকির সম্মুখীন। শুধু যে তার একার তা নয়, হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়ে তার গোটা পরিবার। কখন যে তাকে বা তার পরিবারটাকে হত্যা করা হয় কে জানে সে কথা? হত্যার পর ন্যায় বিচারও জোটে না এসব অভাগাদের। এমন হাজারোও ঘটনার উদাহরণ রয়েছে যে সাংবাদিকদের অত্যাচারের ঘটনাগুলো বিচারাধীন ও তদন্তনাধীন ইত্যাদি বিভিন্ন চলমান প্রক্রিয়ার কথা বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

শুধু কি সাংবাদিক এমন ঘটনার স্বীকার নাকি দেশের সাধারণ মানুষগুলোও এমন নিরাপত্তাহীনতার স্বীকার। ঘর থেকে বেরুলেই যে তাকে গুম বা খুনের স্বীকার হতে হবে না এমন কোন নিরাপত্তা নেই। নারীর অবাধ চলাচলের কোন নিরাপত্তা নেই। কখন কোথায় যে কে ধর্ষণের স্বীকার হয় এমন আতংকে থাকতে হয় সব সময়। কি ভয়ংকর এক পরিস্থিতিতে বাস করছে এদেশের জনগন। মানসিক চাপ থেকে মুক্তি আর নিজের জীবনের নিরাপত্তার স্বার্থে অনেকেই বাধ্য হয়ে দেশ ছাড়েন। জীবনের মায়ায় নিরাপত্তার আশায় পাড়ি জমান প্রবাস নামক জীবনে।

স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এদেশের জনগণ এক থমথমে পরিস্থিতিতে ছিল এই বুঝি গোলাগুলি শুরু হলো, এই বুঝি ধরে নিয়ে গেল কারো মা, বোন, এই বুঝি নিখোঁজ হয়ে গেল কারো বাপ কিংবা ভাই। এত সব অনিশ্চয়তা আর মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে এদেশের জনগন যুদ্ধ করে দেশটাকে স্বাধীন করেছিল একটু স্বস্তি, শান্তি আর নিরাপত্তার আশায়। কিন্তু স্বাধীনতার এতগুলো বছর কেটে গেলেও আজো এদেশের জনগনকে নিরাপত্তার অজুহাতে ঠেলে দেয়া হচ্ছে প্রবাস জীবনে। এদেশ তার কাংখিত স্বস্তি, শান্তি আর নিরাপত্তা লাভে আজো ব্যার্থই রয়ে গেছে।

কিন্তু কেন আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন ন্যাক্কারজনক অবস্থা? আমাদের দেশে আইন আছে, আইন প্রণয়নকারী সংস্থাও আছে, আছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীও। তাহলে কিসের অভাবে এদেশের জনগন নিরাপত্তাহীনতায় ভোগছে? কেন নিজের নিরাপত্তার জন্য জন্মভূমি ছেড়ে পাড়ি জমাতে হচ্ছে ভিন্ন কোন দেশে?

এসব প্রশ্নের উত্তর একটিই ব্যক্তিগত স্বার্থে আইন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করার কারণেই এমন নিরাপত্তাহীনতায় ভোগছে জনগন আর বেছে নিচ্ছে প্রবাস জীবন। আইনের যথাযথ বাস্তবায়নের অভাব এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতার অভাব রয়েছে ব্যাপক। তাই অপরাধীকে শাস্তির আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। যার ফলে অপরাধীর অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে চরম আকারে এবং জনগণের নিরাপত্তা লোপ পাচ্ছে।

কিন্তু এসবের শেষ কোথায়? এসবের শেষ একমাত্র জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা বিধানের মাধ্যমেই সম্ভব। কাজেই আমাদের দেশের সরকারকে কঠোর হস্তে আইনকে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের মাধ্যমে দেশের জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তবেই এসব সমস্যার সমাধান আসবে।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক পারিস বার্তা