ক্যাটেগরিঃ সাম্প্রতিক

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও তার পরবর্তী সময়ের ইতিহাসে তাজউদ্দিনের নাম এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতই। এই দেশ ও দেশের জনগনের জন্য তাজউদ্দিন পরিবারের ত্যাগ অনস্বীকার্য। কেবল যে তাজউদ্দিন এই জাতির জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছিলন তা নয় তাঁর স্ত্রী সৈয়দা জোহরা তাজের ত্যাগও ছিল বিশাল। ৭১ এর ২৭ই মার্চ তাজউদ্দিন স্ত্রী জোহরাকে উদ্দেশ্য করে একটি চিঠি লিখে রেখে চলে যান। ঐ চিঠির ভাষা ছিল এমন “আসার সময় বিদায় নিয়ে আসতে পারিনি। তাই আমায় ক্ষমা করে দিও। আমি চলে যাচ্ছি। জানিনা কবে দেখা হবে। তুমি সন্তানদের নিয়ে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির সাথে মিশে যেও।” এই চিঠির ভাষাই প্রমাণ করে দেয় এরা দেশ ও জাতির জন্য কত কিছু ত্যাগ করেছেন।

একটি চিঠি লিখে রেখে গোটা পরিবারকে এক অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিয়ে তিনি চলে গিয়েছিলেন। তখন তো প্রচন্ড দুঃসময় জোহরার। তিনি কিছুক্ষণ স্থীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন চিঠিটির দিকে। কোথায় যাবেন! কি করবেন! কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না। কিন্তু যুদ্ধের নয় মাস তাজউদ্দিনের অবর্তমানে জোহরা সংগ্রাম করেছেন। বিপদ নিশ্চিত জেনেও নিয়মিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ রেখেছেন। যখন তার সাহায্যের প্রয়োজন হয়েছে তিনি বিপদ অগ্রাহ্য করে সাহায্য করেছেন। তার বাসাতেই প্রথম স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান রেকর্ড হয়।

যাই হউক দেশ স্বাধীন হলো তাজউদ্দিন ফিরে এলেন। কিন্তু এরপরের ইতিহাস তো আরোও করুণ। মাত্র ৪ বছরের মাথায় তাজউদ্দিনকে হারায় তার পরিবার। ৩ মেয়ে ১ ছেলেকে নিয়ে শুরু হয় জোহরার জীবন সংগ্রাম। এতগুলো বছর কেটে গেলেও তাজউদ্দিনের মত একজন নেতা কেবল একটা দিবসের স্মরণ সভায় বেঁচে রইলেন। স্বামীর প্রাপ্য সম্মান না দেয়ার অভিমানে সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দিন নিজেকে গুটিয়ে নিলেন। স্বাধীনতার এতগুলো বছর কেটে গেলেও তাজউদ্দিনের মত একজন নেতা আমরা তৈরি করতে পারিনি। আসলে তাজউদ্দিনের তুলনা কেবল তাজউদ্দিনই। অথচ আমরা এতটাই অকৃতজ্ঞ জাতি হয়ে গেছি এই মানুষটাকে তাঁর প্রাপ্য সম্মানটুকু দেইনি।

লজ্জিত হই যে আওয়ামীলীগের সাথে তাজউদ্দিন তাঁর গোটা জীবন ব্যয় করেছেন সেই আওয়ামীলীগেরই একটা অংশ তাঁর বিরুদ্ধতা করে। অভিমানী জোহরা স্বামীর প্রাপ্য সম্মান না দেয়ার অভিমানে নিজেকে আড়াল করে নিয়েছিলেন। আর অনেকটা আড়ালে থেকেই গত ২০ তারিখ তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তাদের যোগ্য সম্মান না দেয়ার অভিমান বেঁচে থাকবে চিরকাল। জোহরা তাজউদ্দিনকেও আমরা সেই অভিমান নিয়েই বিদায় দিয়েছি। এই লজ্জার দায় পুরো বাঙালি জাতির। পরিশেষে বলবো যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন তাজউদ্দিন পরিবারের নাম থাকবে। তাই এই পরিবারকে যোগ্য সম্মান না দেয়ার দায় এ জাতি কোনদিনও এড়াতে পারবে না।