ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টি, পকেটমার, ডাকাত, ছিনতাইকারী ও ছেলেধরা এদের ভয়ঙ্কর আতঙ্কে মানুষ দিশেহারা। এসব সিন্ডিকেটের কবলে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ জিম্মি হচ্ছে, সর্বস্ব খোয়াছে ও মূল্যবান জীবন হারাচ্ছে। এগুলোকে একই পরিবারের ভিন্ন ভিন্ন সদস্য বলা যায়। সারা দেশকে এরা একটি জালের মধ্যে বন্দী করে রেখেছে। এদের কাছে জনগন জিম্মি হয়ে আছে। দেশের জনগনকে যেমন এরা আতংকের মধ্যে রাখে তেমনি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকেও ২৪ ঘণ্টা আতঙ্কের মধ্যে রাখে। মানুষের জান-মালের নিরাপত্তার ভীষণ অভাব। এ নিরাপত্তা কীভাবে আসবে? কখন আসবে তা বলা অত্যন্ত কঠিন। জান-মালের নিরাপত্তার জন্য সবাইকে সতর্ক ও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। তাহলে কিছুটা নিরাপদে থাকা যাবে। আমার আত্মীয়ের একটি মর্মান্তিক বাস্তব ঘটনা বর্ণনা করছি। আমার মনে হয় এ থেকে পাঠকবৃন্দ কিছুটা অভিজ্ঞতা নিয়ে শতর্ক হওয়ার প্রয়াস পাবেন। মর্মান্তিক এ ঘটনার দিন তার সহযাত্রী আরও দুইজন মারা গিয়েছিল। সে অবশ্য ১৯ দিন মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করে হাসপাতালে মারা যায়। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় তিনটি তাজা প্রাণ পৃথিবীর জীবন থেকে অকালে ঝরে পরল। এ ধরণের মর্মান্তিক ঘটনা কারও কাম্য নয়। কিন্তু আমাদের দেশে প্রতিদিন ঘটছে এমন অসংখ্য ঘটনা। মনে হয় এসব দেখার কেউ নেই। যাদের পরিবারে এমন ঘটনা ঘটে তারা একটি বাক্য উচ্চারণ করে সান্তনা পায়। সেটি হল, “যার মরণ যেথায় নাও বাইয়া যায় তথায়।” অর্থাৎ কখন, কোথায় কীভাবে মরণ হবে তা আল্লাহই নির্ধারণ করে রেখেছেন। এ ধরণের বাক্যই স্বজন হারাদের সান্তনা দেয়। এছাড়া আর কোন সান্তনা বা বিচার পাওয়ার আশা তাদের নেই।
নোটন ঈদের কয়েকদিন আগে ঢাকা যায়। আত্মীয় ও বন্ধুদের বাসায় কয়েকদিন বেড়ায়। পরিবারের বায়না অনুযায়ী ঈদের বাজার সম্পন্ন করেছে। এবার চলে আসার পালা।
ছয় বন্ধু একসাথে বাড়িতে আসবে। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে হাওড় এক্সপ্রেসে নেত্রকোণা আসবে। ০৪-১০-২০১৪ ইং তারিখ রাত ১২টায় বিমানবন্দর স্টেশনে এসেছে। রাত একটার কিছুক্ষণ আগে ‘হাওড় এক্সপ্রেস’ ইন্টারসিটি ট্রেনে উঠল। ঈদের আগের দিনের, ট্রেন এর বর্ণনা করার আর অপেক্ষা রাখেনা। তারা ট্রেনের ভিতরে উঠার সুযোগ না পেয়ে ছাদে উঠল। রাত ১টা বাজার পর নোটন তার মাকে ফোন দিয়ে জানাল যে, তারা ট্রেনে উঠেছে। ট্রেনটি সকাল পাঁচটায় নেত্রকোণা স্টেশনে পৌছার কথা। সকালে তার মা তাকে বারবার ফোন দিয়ে মোবাইল বন্ধ পায়। মা চিন্তায় অস্থির হয়ে যায়। তার ছোটভাই বাবুকে তার মা স্টেশনে খবর নিতে বলে। স্টেশনে খবর নিয়ে জানল, ট্রেন এসে আবার ঢাকার দিকে চলে গেছে। তখন তাদের চিন্তা আরও বেড়ে গেল। নোটনের স্ত্রী তখন ছিল পূর্বধলা, বাবার বাড়িতে। তার মা ধরে নিয়েছে নোটন তাহলে পুর্বধলা তার শ্বশুর বাড়িতে চলে গিয়েছে। মা তার বউমাকে ফোন দিয়ে জানল, সেখানেও যায়নি। কিছুক্ষণের মধ্যে বাবু চলে গেল নেত্রকোণা স্টেশনে।
স্টেশন মাস্টারের সাথে পরামর্শ করার পর তিনি থানায় যোগাযোগ করতে বললেন। থানায় গিয়ে কথা বলার পর ওসি সাহেব বললেন, “আমি খুঁজ নিয়ে দেখছি, খবর পাওয়ার সাথে সাথে আমি আপনাদের জানাব। একঘণ্টা পর থানা থেকে ফোন এসেছে। আজ সকালে গফরগাঁও এর কাছে রেল লাইনের পাশে ৬ জন লোককে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া গেছে। আপনারা অতি দ্রুত ময়মনসিংহ চরপাড়া হাসপাতালে চলে যান। তারা সাথে সাথে চলে গেল হাসপাতালে। সেখানে গিয়ে দুটি লাশ মর্গে পেল। নোটনের সহযাত্রী ও বন্ধু দুজনের লাশ। আর নোটনসহ চারজন অজ্ঞান অবস্থায় আছে চিকিৎসাধীন। সেদিনেই দুই সন্তানের লাশ তাদের মা-বাবারা নিয়ে গেলেন। ঈদের খুশি চোখের পানিতে ভেসে গেল। পরের দিন তিনজনের জ্ঞান ফিরে আসে এবং এক সপ্তাহ চিকিৎসার পর বাড়িতে নিয়ে যায়। নোটনের জ্ঞান ফিরে আসেনি। এক সপ্তাহের মধ্যে তাকে ঢাকার এক হাসপাতালে নেয়া হয়। কিন্তু তার কোন উন্নতি হচ্ছিলনা। এভাবে ১৯ দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জালড়ার পর শেষ পর্যন্ত তাকে আর বাঁচানো গেল না। এখন আসা যাক, ওদেরকে বধ করার বাস্তব কাহিনীতে। নোটন ও তার পাঁচ বন্ধু ট্রেনের ছাদে বসে আছে। ট্রেন গাজিপুর পেরিয়ে যাওয়ার পর এক চানাচুর ওয়ালা আসে। তাকে ওরা চানাচুর দিতে বলে। তারা সাবাই পাঁচ টাকার করে চানাচুর নিয়ে খেল। এরপর তারা আর কিছু বলতে পারে না।
কাওরাইদ ও গফরগাঁওয়ের মাঝামাঝি যখন ট্রেনের অবস্থান। দ্রুত গতিতে ট্রেন চলছে। ওরা সবাই অজ্ঞান হয়ে গেছে। অজ্ঞান পার্টি তাদের মোবাইল,টাকা ও ব্যাগসহ যা ছিল সব নিল। তাদের কাজ শেষ হওয়ার পর তারা ওদেরকে চলন্ত ট্রেন থেকে নিছে ফেলে দেয়। সকালে গ্রামের লোকজন দেখতে পায় রেললাইনের পাশে ৬টি লাশ পরে আছে। এলাকার লোকেরা চেষ্টা করার পর বুঝতে পারে একজন মৃত এবং পাঁচজন জীবিত আছে। তারা পুলিশে খবর দেয়ার পর পুলিশ আসে। একটি লাশ ও পাঁচজনকে অজ্ঞান অবস্থায় ময়মনসিংহ চরপাড়া হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালে নেয়ার পর আর একজন মারা যায়। ১৯ দিন পর নোটন চলে যায় পর না ফেরার দেশে। বেঁচে থাকে তিনজন। তারা এখনও অসুস্থ্য অবস্থায় চিকিৎসাধীন আছে।
তাহলে কী অপরাধ করেছিল ওরা? কেনই বা ওদের জীবন দিতে হল? আমরা এসব ঘটনা জানতে পারব, লিখতে পারব, চলে যাওয়া স্বজনদের জন্য আর্তনাত করতে পারব। কিন্তু এসব সমস্যার সমাধান কি কখনও হবে? নাকি এভাবেই শত শত প্রাণ বিসর্জন দিয়ে যেতে হবে? জানি এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে না। যারা এসব প্রশ্নের উত্তর দেয়ার মালিক, তাদের কানে তুলা দেয়া আছে। অর্থাৎ দেবতাদের কান এখন বন্ধ আছে। জানিনা কত প্রাণ বিসর্জন দেয়ার পর এ দেবতার কান খুলবে? আসলে আমাদের দেবতারা হলেন বধির। আর আমরা হলাম মূক। তাই অসুরেরা তাদের কাজ বিনা বাধায় করে যাচ্ছে। অসুরের পূজা যে দেবতা গ্রহণ করে সে দেবতা কখনও অসুর বধ করতে পারে না। তাই জগতে অনাসৃষ্টির প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।

এদেশের ভিতরেই এদের ঘাঁটি বা আস্তানা । কিন্তু আমরা কেন এদের নির্মূল করতে পারিনা? এই বীরের জাতি বড় বড় ইতিহাস গড়তে পারে। যে জাতি তার মুখের ভাষাকে হায়নার কবল থেকে ছিনিয়ে আনতে পারে। সেই জাতির মানুষের মুখের ভাষা স্তব্ধ করে দেয়, তার সর্বস্ব ছিনিয়ে নেয়, প্রাণনাশ করতেও দ্বিধাবোধ করে না। এ কোন স্বাধীন দেশে আমরা বসবাস করি? যে জাতি ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে এ দেশকে স্বাধীন করেছে। সে জাতির জান-মালের কোন স্বাধীনতা নেই। এ কোন অসভ্য জাতি? যে দেশে একজন নাগরিক তার জান-মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা পায় না। সে দেশকে যদি আমরা স্বাধীন দেশ বলি, তাহলে স্বাধীনতার সংজ্ঞা কী হবে? তাহলে কী আমরা স্বাধীনতার তেতাল্লিশ বছর যে স্বাধীনতা পেয়েছি, আজীবন তাই ভোগ করে যাব? না এভাবে চলতে দেয়া যায় না। আসুন আমরা সাবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেই, কীভাবে এসব মানুষ নামধারী পশুদের নির্মূল করা যায়। দেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও আমরা অর্থাৎ সুনাগরিকগণ একসাথে সচেতন ও সোচ্চার হই।