ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

আমরা যারা মুসলমান, তারা জিন বিশ্বাস করি। কারণ কোরআনের অনেক জায়গায় জিন সম্পর্কে বর্ণনা করা আছে। যেমনঃ “আপনি বলুনঃ আমার প্রতি ওহী প্রেরণ করা হয়েছে যে, জিনদের একটি দল মনোযোগ সহকারে কোরআন শ্রবণ করেছে, অতঃপর তারা নিজ কওমের কাছে ফিরে গিয়ে বললঃ আমরা তো শুনে এসেছি এক বিস্ময়কর কোরআন- যা সরল পথ প্রদর্শন করে। অতএব আমরা তাতে ঈমান এনেছি। আর আমরা কখনও আমাদের রবের সাথে কাউকে শরীক করবনা।” (সূরা জিনঃ আয়াত-১,২) এবং “আমি সৃষ্টি করেছি জিন ও ইনসানকে কেবলমাত্র এজন্য যে, যেন তারা আমারই ইবাদত করে”(সূরা যারিয়াতঃ আয়াত-৫,৬)। তাহলে বোঝা গেল জিন বস্তুটির অস্তিত্ব আছে।
জিনকে ভয় করার কিছু নেই, কারণ আল্লাহ তায়ালা মানুষের চেয়ে বেশি ক্ষমতা জিনকে দেননি। আল্লাহর পথে চললে জিনও মানুষকে ভয় পায়।
আমাদের গ্রামের আপ্তাব উদ্দিন মুনশি, মসজিদের ইমাম। অল্প শিক্ষিত, বাংলা কিছু কিছু পড়তে পারে। আরবি পড়তে পারে কিন্তু অর্থ বুঝেনা। নামাজে দাঁড়িয়ে পড়ার জন্য বেশ কিছু সুরা মুখস্ত আছে। আমরা যখন ছোট তখন, নির্দিষ্ট কিছু কথা ছিল, যে কথাগুলো তাকে বললে ভীষণ ক্ষেপে যেত। যে তাকে এই কথাগুলো বলত সেই ব্যক্তিকে দৌড়িয়ে কমপক্ষে দুই মাইল নিয়ে যেত। চল্লিশোর্ধ বয়সে মসজিদের ইমামের দায়িত্ব পেয়েছেন। বর্তমানে তাঁর ষাটের উপরে বয়স, কিছুদিন আগেও আর একটি বিয়ে করেছেন। রাতে বাড়ি থেকে মসজিদে যাওয়া-আসার সময় জিন-ভুত ভয় পায়।
একদিন রাতে আক্তার চাচার বাড়ি থেকে তাদের বাড়িতে আসার সময় ভুতের ভয়ে মূর্ছা গিয়েছিল। চাঁদনি রাত, সে পুকুর পাড় দিয়ে বাড়ির দিকে আসছে। পুকুর পাড়ে ১০/১২ ফুট লম্বা একটি তালগাছ, তার নিচ দিয়ে রাস্তা। তালগাছের নিচে আসার সাথে সাথে তার পিঠে পড়ল এক থাপ্পর। অনেক রাত পরে তাকে খুঁজতে গিয়ে দেখে তালগাছের নিছে পরে আছে। ধরাধরি করে বাড়িতে এনে প্রচুর পানি ঢালার পর তার জ্ঞান ফিরে আসে।
পরদিন সাকালে পুকুর পাড়ে গিয়ে অনুসন্ধান করে দেখা গেল যে, তাল গাছে একটি ঈগল পাখির বাসা। ঈগল পাখি তালপাতায় বসেছিল। ইমাম সাহেব গাছের নিচে আসার সাথ সাথে পাখি ভয়ে ঝাপটা মেরে শব্দ করে উড়ে যায়। চাঁদের আলোতে পাতার ছায়া তার শরীরে পরে। পাতার ছায়াকে ভুতের হাত মনে করে প্রচন্ড ভয়ে মূর্ছা যায়।
আমাদের গ্রামের মসজিদের আশেপাশ কোন বাড়ি নেই। ঈদগাহ মাঠের সাথে গোরস্তান এরপর মসজিদ । মসজিদের পাশে জঙ্গল। আর একদিন এই ইমাম সাহেব এশার নামাজ শেষ হওয়ার পর মসজিদে তালা লাগিয়ে বাড়ি চলে গেলেন।
পরদিন ইমাম সাহেব খুব ভোরে মসজিদে এসে অজু করে ফজরের আযান দিলেন। মসজিদের দরজার তালা খুলে ঢুকার সাময় দেখে ভিতরে গোল টুপি ও যুব্বা পরা জিন শুয়ে আছে। দেখার সাথে সাথে জিন জিন বলে চিৎকার দিয়ে সে মূর্ছা যায়। জিন চিৎকার শুনে ঘুম থেকে উঠে তাকে অনেক্ষণ ডাকার পর জ্ঞান ফিরে আসে। চোখমেলে তাকে দেখার পর আবার মূর্ছা যায়। এর মধ্যেই মুসুল্লিরা চলে আসে। তারা এসে মুখে পানি ছিটা দেয়ার পর জ্ঞান ফিরে আসে এবং চিৎকার করে বলতে থাকে জিন জিন। সবাই জানতে চাইলো, কী হয়েছিল? জামাই রশীদ ভাইয়ের ছেলে আনু বলল, “সব ঘটনা আমি জানি।” পরে সে আসল ঘটনা খুলে বলল।
আনু এশার নামাজ পড়তে এসেছিল জামাত শেষ হওয়ার পর। তার নামাজ শেষ হতে একটু দেরি হয়ে যায়। সে মসজিদের এক কোণায় নামাজ পরছিল। ইমাম সাহেব ভেবেছিল সবাই চলে গেছে। দরজা তালা বন্ধ করে ইমাম সাহেব বাড়ি চলে যায়। আনু শান্তশিষ্ট ও ভদ্র ছেলে। সে অনেক চেষ্টার পর কোন মানুষের সাড়া না পেয়ে মসজিদেই ঘুমিয়ে পড়ে। আর ইমাম সাহেব আনুকে দেখেই জিন ভেবেছিল। জিনের ঘটনাটা সৃষ্টিও করেছিল ইমাম সাহেব নিজে। ভয় পাওয়ার বিশেষ কারণ ছিল যুব্বা পরা মুসুল্লি আমাদের গ্রামে কেউ ছিলনা। আনু মাদ্রাসা থেকে এই প্রথম যুব্বা পরে বাড়ি এসেছিল। ইমাম সাহেবের শোনা জিনের গল্পের সাথে আনুর পোশাক মিলে যায়। তিনি জানেন জিন নামাজ পড়ার সময় মানুষের রূপ ধরে। আগুনের তৈরী হওয়ায় জিন যে কোন যায়গায় যেতে পারে। তাঁর বদ্ধমূল ধারণা হয়েছিল যে, তালাবদ্ধ ঘরে জিন ছাড়া আর কেউ ঢুকতে পারবেনা। এই জন্য আনুকে চিনার পরও সে বলছিল, “ এটাই জিন, আনুর শরীরে আছর করে আছে। সকল ঘটনা শোনার পর সে যখন বুঝতে পারে যে, এই ঘটনা ঘটানোর নায়ক সে নিজেই, তখন বিশ্বাস করল, এটা আনু, জিন ছিলনা।