ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

প্রাচীনকাল থেকেই অসহায়, দুর্বল, দরিদ্র ও পঙ্গু মানুষ ভিক্ষার মত এই ঘৃণ্য কাজটি করে আসছে। তবে পুনর্বাসন ও বরণ-পোষণের ব্যবস্থা না থাকলে জীবন রক্ষার জন্য অসহায় ব্যক্তি ভিক্ষা করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এ ধরণের ভিক্ষুকের সংখ্যা বর্তমানে অনেক অল্প। বর্তমানে সিন্ডিকেটের অধীনে না এসে ভিক্ষা করে জীবন বাঁচানো অনেক কঠিন। ভিক্ষুক হতে হলে তাকে যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। মানুষের সহানুভূতি পাওয়ার মত যোগ্যতা থাকলেই সে একজন যোগ্য ভিক্ষুক। ভিক্ষুকের বাজারে তাঁর অনেক কদর। তারাই ভিক্ষার জন্য সহানভূতি পায় অনেক বেশি।

ভিক্ষার মূল পুঁজি হল সহানুভূতি ও ধর্মীয় অনুভূতি। এ দুটি বিষয়কে ঠিক মত কাজে লাগাতে পারলেই ভিক্ষা একটি লাভজনক ব্যবসা হয়। ইসলাম ধর্মে ভিক্ষাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। আর এই ধর্মকে পুঁজি করে ভিক্ষাবৃত্তি দিন দিন আরও জমজমাট হচ্ছে। রাস্তাঘাটে মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানার নামে এক শ্রেণির লোক ভিক্ষা করে। এছাড়া মাদ্রাসার ছাত্রদের দিয়ে বিভিন্ন কৌশলে ভিক্ষা করানো হচ্ছে। এখানেও ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগানো হচ্ছে। এটি অবশ্য রাষ্ট্রীয়ভাবে মাদ্রাসা শিক্ষাকে গুরুত্ব না দেওয়ার জন্য হয়।

ফুটপাত, বস্তি ও বিভিন্ন এলাকা থেকে শিশুদের ধরে নিয়ে পঙ্গু বানিয়ে ভিক্ষা করাচ্ছে সিন্ডিকেট। এ ছাড়া প্রতিবন্ধি ও পঙ্গু শিশুদেরকে চুরি করে নিয়ে যায় ওরা। প্রচুর ভিক্ষা পাওয়ার জন্য, ভিক্ষাকে লাভজনক করার জন্য, নিজেকে যোগ্য ভিক্ষুক হিসেবে তৈরী করার জন্য নিজের হাত-পা কেটে ফেলতেও দ্বিধা করে না। ঢাকা শহরের বিভিন্ন বস্তিতে শিশুদেরকে পঙ্গু বানিয়ে ভিক্ষার জন্য যোগ্য করে গড়ে তোলা হয়। জন্মের পর শিশু বাচ্চাকে ১৫/২০ দিন হাঁড়ি বা পাতিলের মধ্যে রেখে লালন-পালন করা হয়। এতে শরীরের হার বেঁকে গিয়ে পঙ্গু হিসাবে বড় হয় শিশুটি। ভবিষ্যতে সে যোগ্য ভিক্ষুক হিসেবে গড়ে উঠে।

এ ধরণের জঘন্য কাজটি করার জন্য বস্তির দরিদ্র পরিবারকে চিহ্নিত করা হয়। লোভ দেখিয়ে, টাকার বিনিময়ে ভিক্ষুক সিন্ডিকেটের সদস্যরা শিশুদেরকে পঙ্গু করে গড়ে তোলে। ৫ বছর পর্যন্ত তার মা-বাবা শিশুটিকে নিয়ে ভিক্ষা করে। ভিক্ষার অর্ধেক অংশ সিন্ডিকেটকে দিতে হয়। ৫ বছর পেরিয়ে গেলে সিণ্ডিকেট এই শিশুটিকে তাদের অধীনে নিয়ে ভিক্ষা করায়। বিভিন্ন স্পটে এদেরকে বসিয়ে তাদের তত্ত্বাবধানে ভিক্ষা করায়। এ ধরণের পঙ্গু ভিক্ষুকের সংখা রাজধানিতে হাজার হাজার।

ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশের শহর গুলো ভিক্ষুক সিন্ডিকেটের অধীনে। শহর এলাকায় কোন ভিক্ষুক সিন্ডিকেটের বাহিরে ভিক্ষা করতে পারবে না। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে সিন্ডিকেটের সদস্যরা পঙ্গু ও অন্ধ ভিক্ষুকদের মোটা আয়ের লোভ দেখিয়ে ঢাকা শহরে নিয়ে আসে। থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা সিন্ডিকেটের উপর থাকে। সারাদিন ভিক্ষা করে যা পাবে তার অর্ধেক দিতে হবে সিন্ডিকেটকে। তবে ভাগাভাগির ব্যপারটি ভিক্ষুকের আয়ের উপর নির্ভর করে।

এক ভিক্ষুককে জিজ্ঞাসা করলাম, “তোমাদেরকে ভিক্ষা কম দিলে রাগ কর কেন?” সে উত্তরে বলল, “স্যার আমাদের নেতাদের অর্ধেক দিয়ে দিতে হয়। আর বর্তমানে জিনিস পত্রের দাম অনেক বেশি চলা খুব কঠিন।”
বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায় রাজধানিতে প্রতিদিন ভিক্ষা বাণিজ্য হয় ২০ কোটি টাকা। প্রতি মাসে ভিক্ষা বাণিজ্য হয় ৬০০ কোটি টাকা। এটি নিয়ন্ত্রণ করে ভিক্ষুক সিন্ডিকেট। রাজধানির ৩০০ পয়েন্টে একজন করে লাইনম্যান ভিক্ষুকদের নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। “বাংলামেইল ২৪ ডট কম”- এর তথ্য অনুযায়ী ভিক্ষুক সিন্ডিকেটের সঙ্ঘবদ্ধ চক্রগলো আইন প্রয়োগকারি সংস্থা ও এলাকাভিত্তিক প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করে চালায় ভিক্ষা বাণিজ্য। ছিন্তাইকারীরা ভিক্ষুকদের সাথে যোগসাজশেও ছিন্তাই করে থাকে। অর্থাৎ ভিক্ষুকরা এদেরকে বিভিন্ন তথ্য দিয়ে ছিন্তাইয়ে সহযোগিতা করে। বিনিময়ে তারা পায় বকশিস। আমরা ভিক্ষুক ও ভিক্ষুক সিন্ডিকেট সম্পর্কে যতই লেখালেখি করিনা কেন কোন কাজ হবে না। যদি সরকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেয় তাহলেই এই জঘন্য বাণিজ্য বন্ধ করা সম্ভব।

ভিক্ষুকদের নিয়ে বাণিজ্য করছে ভিক্ষুক সিন্ডিকেট, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর একাংশ ও এদেশের কিছু কিছু এনজিও। এগুলো কঠোর হস্তে দমন করে এদেশের লক্ষ লক্ষ ভিক্ষুককে পুনর্বাসন করতে পারলেই দেশের একটি বড় সমস্যার সমাধান হবে।

দেশের ১০০% জনগণকে সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে পারলেই এরকম প্রত্যেকটি জঘন্য সমস্যা সমাধান করা সরকারের পক্ষে সম্ভব। কারণ আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত হলে কোন ব্যক্তি ভিক্ষা করেনা। আর আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত করার একমাত্র উপায় হচ্ছে সঠিক শিক্ষা।
01

02 04