ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

ভূতের কাল্পনিক ছবি( ছবিঃ গুগুল থেকে)
ভূতের কাল্পনিক ছবি
জীবনের যে কোন সফলতায় প্রয়োজন জ্ঞান, বুদ্ধি, মেধা, দক্ষতা ও সাহস। কঠিন কোন কাজে সাহসই ব্যক্তিকে নেতৃত্ব দিয়ে থাকে। সাহসই কাজের শক্তি বাড়িয়ে দেয়। সাহস হারিয়ে ফেললেই কাজের শক্তি ম্লান হয়ে যায়। অতিরিক্ত ভয় মানুষের চিত্তকে দুর্বল করে হৃদযন্ত্রের রক্ত চলাচল বন্ধ করে দিতে পারে। যে কোন কঠিন কাজে ভয় পেলে সাহস না হারিয়ে জ্ঞান, বুদ্ধি ও মেধা দিয়ে সাহসকে অটুট রাখতে হবে। ভয় বিভিন্ন ধরণের হতে পারে। আমাদের জীবনে কোন না কোন ভয় প্রভাব ফেলতে পারে। যে কোন একটি ভয়কে নিয়ে বর্ণনা করা যাক। যেমনঃ ভূতের ভয়।
যা অতীত, যা গত, তাই ভূত। তবে হিন্দু মতে ভূতের অনেক সংজ্ঞা আছে । দেবতাদের অনুচর, প্রেতাত্মা ইত্যাদি। তাদের মতে, শ্মশানেই ভূতের আস্তানা। আমরা যারা আধুনিক যুগের শিক্ষিত মানুষ তাদের মতে এর অর্থ শুধুই অতীত। এটাকে কোন প্রাণি বা জন্তু মনে করিনা। ভূত জিনিসটা মনের ব্যাপার। মনে ভূতের অস্তিত্ব থাকলেই ভুতের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। যেমন নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমদের নুহাশ পল্লিতে গিয়ে দেখলাম, ‘ভূতবিলাস’ নামে একটি দর্শনীয় স্থান আছে। সেখানেও তিনি অতীতের স্মৃতিচারণ করেছেন। ভূতের কোন উপস্থিতি পেলাম না।
বিশ্বকবি রবীন্দদ্রনাথ ঠাকুরের ‘জীবিত ও মৃত’ ছোট গল্পে কাদম্বিনি দ্বিতীয়বার মরে প্রমাণ করেছিল যে, সে ভূত নয়। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রোমান্সধর্মী ‘কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাসের কথায় আসা যাক। সমুদ্রতীরবাসিনী প্রকৃতি কন্যা, যে বড় হয়েছে সমুদ্রতীরবর্তী অরণ্যে, সেই কপালকুণ্ডলা কোনদিন ভূতের দেখা পায়নি। এছাড়া ভূতের চেয়ে ভয়ঙ্কর একই উপন্যাসের ‘কাপালিক’ যে দেবতাকে সন্তুষ্ট করার জন্য যুবক-যুবতীকে ধরে নিয়ে শ্মশানে বলি দেয়। সেই ভয়ঙ্কর পিচাশ কাপালিক কখনও ভূতের ভয় পায়নি। কিন্তু আমরা যারা সমাজে বসবাস করি তাদের মধ্যে অধিকাংশ মানুষ ভুতের ভয় পায়। মনোবিজ্ঞানীগণ গবেষণা করে প্রমাণ করেছেন ভূতের অস্তিত্ব বলতে কিছু নেই।আমার এলাকা থেকে সংগৃহীত একটি লোক কাহিনী শোনার পর ব্যাপারটি আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে।
সুশান্ত, বিমল, জগদীশ,কার্তিক ও হিমাংশু(ছদ্মনাম), তারা পাঁচ বন্ধু। তাদের মধ্যে কার্তিক সাহসী এবং গোয়ার টাইপের। সবার বয়স ২৫ বছরের নীচে। বৈশাখ মাস, বিকালে কালবৈশাখীর এক ঝাপটা হয়ে গেছে। এখনও আকাশ মেঘে ঢাকা, প্রচণ্ড বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, অমাবস্যার রাত, গভীর অন্ধকার। তারা বাহিরঘরে বসে তাস খেলছে আর গল্প-গোজব করছে। এক পর্যায়ে সুশান্ত বলল, “কার্তিক, তুই যে এত সাহসের কথা বলছিস, আমরা তোর সাহস পরীক্ষা করতে চাই। সুশান্তর কথায় সবাই সাপোর্ট করল। কার্তিক বলল, “ঠিক আছে, সাহসের পরীক্ষার জন্য আমাকে কী করতে হবে?” সুশান্ত বলল, “শোন তাহলে, আজ অমাবস্যার অন্ধকার রাত, ঠিক ১২টার সময় শ্মশানে গিয়ে একটি শাবল পুঁতে আসতে হবে, তাহলে আমরা বুঝব তোর সাহস আছে।” সবাই বলল, “হ্যা, এটা করতে পারলেই প্রমাণিত হবে তুই সাহসী যুবক।” কার্তিক বলল, “এটা আমার জন্য সহজ কাজ।”
মেঘালয়ের পাহাড় থেকে নেমে আসা খরস্রোতা কংস নদীর পাড়ে গভীর জঙ্গল। জঙ্গলের ভিতর দিয়ে সরু রাস্তা পেরিয়ে নদীর তীরে শ্মশান । আশেপাশে কোন লোকালয় নেই। মেঘাচ্ছন্ন অমাবস্যার অন্ধকার গভীর রাত। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ভূতুরে পরিবেশের জন্য উপযুক্ত সময়। অন্য বন্ধুরা তাকে একটি শাবল হাতে দিয়ে বলল, “যা, আমরা এখানেই থাকব, তুই আসলে তোকে একটা পুরষ্কার দিব। এরপর সবাই বাড়িতে গিয়ে ঘুমাব।
কার্তিক একটি ধুতি পরিধান করে লোহার শাবল হাতে নিয়ে শ্মশানের দিকে ছুটল। তাদের গ্রামের পরে বিস্তৃত মাঠ, এরপর গভীর বন পার হয়ে শ্মশানের কাছে গেল। তার কাছেই শেয়ালের ডাক শোনা যাচ্ছে। এখানে প্রতিদিনেই লাশ পুড়ানো হয় । শ্মশানে ধুঁয়া উড়ছে, তার মনে হছে সন্ধ্যার আগেই শবদাহ হয়েছে। ভয়ে তার বুকটা ধুক্ ধুক্ করে উঠল। তাও সে সাহস করে সামনে এগিয়ে গিয়ে ঈশ্বরের নাম নিয়ে শাবল পুঁতে ফেলল।
এদিকে চার বন্ধু কার্তিকের অপেক্ষায় বসে আছে। শ্মশান থেকে ফিরে আসতে সময় লাগার কথা এক ঘণ্টা। কিন্তু দুইঘণ্টা পার হওয়ার পরও কার্তিক ফিরে আসছে না। সুশান্ত বলল, “চল বাড়ি গিয়ে ঘুমাই, ও মনে হয় শ্মশানে না গিয়ে বাড়ি গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। কার্তিকের বাড়ি একটু দূরে, পশ্চিম পাড়ায়। আর বাকি চারজনের বাড়ি পাশাপাশি। মাঝে মাঝে কার্তিক বিমলের সাথে রাত্রে ঘুমায়। তার বাড়ির লোকজন মনে করেছে, আজও কার্তিক বিমলের সাথে ঘুমিয়েছে।
সকালে কার্তিকের ছোটভাই রবি(ছদ্ম নাম) বিমলদের বাড়িতে তাকে খুঁজতে এসে পায়নি। তার বন্ধুরা জানতে পেরেছে যে, কার্তিক রাতে বাড়িতে যায়নি। সবাই তাকে খুঁজতে খুঁজতে শ্মশানে গেল। শ্মশানে গিয়ে দেখে সেই শাবল জায়গা মতই পুঁতা আছে। তার পাশে কার্তিকের লাশ পরে আছে। তাহলে কে হত্যা করেছে তাকে? নিশ্চই ভূতে হত্যা করেছে কার্তিককে? না, নিশ্চয় না। এখন দেখা যাক রহস্যটা কী ছিল। শ্মশানে গিয়ে কার্তিক প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিল কিন্তু সাহস হারায়নি। সাহস করে যখন মাটিতে শাবল পুঁতে তখন তার ধুতির আঁচলসহ পুঁতে ফেলে। যখন সে চলে আসতে চায় তখন পিছন থেকে ধুতিতে টান পরে। সাথে সাথে তার সমস্ত সাহস পণ্ড হয়ে যায়। প্রচণ্ড ভয়ে হার্টফেল করে, মানে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। যে শ্মশানে কার্তিক সাহস পরীক্ষা করতে গিয়েছিল, সেই শ্মশানেই তাকে দাহ করতে হয়েছে।
(পোস্টটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে লেখা, পোস্টের গল্পটি লোক কাহিনী থেকে সংগৃহীত)