ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

11896208_1035099113176586_2871472902542079314_n
ছবিঃ গুগুল থেকে

আমরা জানি শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। কতটুকু শিক্ষা অর্জন করলে প্রকৃত শিক্ষিত হওয়া যায়? একটি দেশের শতকরা কতজন লোক শিক্ষিত হলে এবং কেমন শিক্ষা অর্জন করলে জাতির মেরুদন্ড শক্তিশালী হবে? যে মেরুদণ্ড দিয়ে কঠিন বাধা অতিক্রম করে জাতিকে শক্তিশালী জাতি হিসাবে গড়ে তোলা যাবে। এ বিষয়গুলো কী আমরা জানি বা উপলব্দি করতে পারি? আমি বলব হ্যাঁ জানি, তবে খুব কম নাগরিকেই জানি। এই বিষয় গুলো যতজন লোক উপলব্ধি করতে পারে তারাই প্রকৃত শিক্ষিত। আমার ধারণা সারা দেশে জরিপ করলে এরকম লোক শতকরা পাঁচজন পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। আর এই হিসেবে চিন্তা করলে জাতির মেরুদন্ড অত্যন্ত দুর্বল। এ দুর্বল মেরুদণ্ড নিয়ে দুর্গম পথ পাড়ি দেয়া অত্যন্ত কঠিন কাজ।
আমাদের দেশে একজন নাগরিক ৫ম শ্রেণি পাস করলেই তাকে শিক্ষিত অর্থাৎ সাক্ষর বলা হয়। এ ধরণের শিক্ষিত লোক বা শিক্ষার হার ৬১ জন। এর মধ্যে আবার প্রকৃত সাক্ষর কতজন তাও চিন্তার বিষয়। ‘সাক্ষর’ শব্দটির অর্থ হলঃ ১। শুদ্ধ উচ্চারণে বই পড়তে পারবে ও অর্থ বুঝতে পারবে ২। সঠিকভাবে লিখার দক্ষতা অর্জন ৩। দৈনন্দিন জীবনের হিসাব সঠিকভাবে করতে পারবে ৪।সচেতনতা ও দৃশ্যমান বস্তুসামগ্রী পঠনের ক্ষমতা 5। বর্তমানে এ সাক্ষরতার সঙ্গে যোগাযোগের দক্ষতা, ক্ষমতায়নের দক্ষতা, জীবন নির্বাহী দক্ষতা, প্রতিরক্ষায দক্ষতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতাও সংযোজিত হয়েছে।
আর ‘স্বাক্ষর’ কথাটির অর্থ হলঃ সহি বা সই অর্থাৎ সিগনেচার করা ইত্যাদি। ৫ম শ্রেণি পাস করা ছাত্র জানেনা সাক্ষর ও স্বাক্ষরের পার্থক্য। আমার বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ‘ক’ শাখার ছাত্রকে জিজ্ঞাসা করলাম, “তোমরা কি ‘সাক্ষর’ শব্দটির অর্থ জান?” ৭০ জন ছাত্রের মধ্যে সবাই উত্তর দিল, “সই বা সাইন দেয়া।” আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “স্বাক্ষর/সাক্ষর কত প্রকার?” তারা বলল, “স্যার, স্বাক্ষর কত প্রকার জানিনা তবে এটা জানি স্বাক্ষর অর্থ সাইন করা।” একজন ছাত্রকে ডেকে বোর্ডে নিয়ে আসলাম। তাকে বোর্ডে সাক্ষর/স্বাক্ষর শব্দটি লিখতে বললে সে লিখল ‘স্বাক্ষর’। তারপর আমি বোর্ডে ‘সাক্ষর’ শব্দটি লিখে জিজ্ঞাসা করলাম, “তুমি কি এই সাক্ষরের অর্থ জান?” সে না বোধক উত্তর দিল। সাক্ষরের অর্থ না জেনেই তারা সাক্ষর বা শিক্ষিত হচ্ছে। আর এই সাক্ষর কতটুকু শিক্ষিত তা ভাবার বিষয়।
আমি বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক হলেও মাঝে মাঝে অন্য বিষয়ের শিক্ষকরা ছুটিতে থাকলে তাদের ক্লাস নিতে হয়। একদিন ৮ম শ্রেণির ইংরেজি ক্লাসে গেলাম। ছাত্ররা ভাবছে বাংলার স্যার ইংরেজি ক্লাসে, ফাকে একটু কথা বলে নেই। আমি আবার যে কোন বিষয়ের ক্লাসে যাইনা কেন অযথা কথা বলার সুযোগ দেইনা। প্রথমেই গণিতের কিছু আকর্ষণীয় প্রশ্ন করে ক্লাস শান্ত করলাম। প্রশ্ন গুলোর উত্তর দেয়ার পর জিজ্ঞাসা করলাম, “এক মিটার সমান কত?” ছাত্ররা সবাই উত্তর দিল, “স্যার, ১০০ সেন্টিমিটার।” আমি এবার জিজ্ঞাসা করলাম, “এই ১০০ সেন্টিমিটার বা এক মিটার সমান কতটুকু লম্বা?” তখন সমস্ত ক্লাস নীরব। কিছুক্ষণ পর একটি ছাত্র দাঁড়াল। আমি বললাম, “তুমি কি কাঠি দিয়ে মেপে দেখাতে পারবে কতটুকু লম্বা?” সে বলল, “জি স্যার?” সে একটি কাঠি ও একটি স্কেল নিয়ে কাঠিতে ১০০ সে মি মাপ দিয়ে অতিরিক্ত অংশ ফেলে দিল। তাকে ধন্যবাদ দিয়ে বসতে বললাম। অন্যান্য ছাত্রদের জিজ্ঞাস করলাম, “ তোমরা এ কাজটি করতে পারলেনা কেন?” তারা উত্তর দিল, “ স্যার, এভাবে কেউ শিখায়নি, আমরা তো মুখস্ত করি।” যে ছাত্রটি উত্তরটি বুঝিয়ে দিয়েছিল তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “ তোমাকে এ মাপটি কে শিখিয়েছে?” সে বলল, “স্যার, আমি যখন ৫ম শ্রেণিতে পড়ি তখন একজন বৃদ্ধ স্যার আমাকে পড়াতেন, তিনিই শিখিয়েছিলেন, তিনি হলেন নরেশ স্যার।”
এবার আসা যাক ইংরেজি ক্লাসে। ১০ম শ্রেণির ইংরেজি প্রক্সি ক্লাসে গেলাম। ছত্ররা বলল, “স্যার, এখন ইংরেজি ক্লাস।” আমি বললাম, “আমি জেনেই তোমাদের ক্লাস নিতে এসেছি।” প্রথমেই কয়েকটি প্রশ্ন করার পর উত্তর না দিতে পেরে ক্লাস শান্ত । একটি ছাত্রকে বোর্ডে ডেকে বললাম, “আমি যাই, এর ইংরেজি লিখ।” সে লিখলঃ “I go.” এর “পর তুমি যাও,” “তারা যায়” এ গুলোর উত্তর ঠিক মতই লিখেছে। কিন্তু যখন জিজ্ঞেস করলাম, “সে যায়, এর ইংরেজি লিখ। তখন সে লিখল, “ He go.” আর উদাহরণ দিতে চাই না। এতেই বোঝা যাচ্ছে আমাদের জাতিকে আমরা কেমন গুরুত্ব সহকারে শিক্ষা দান করছি এবং মুখস্ত বিদ্যা গিলাচ্ছি। প্রমথ চৌধুরী যথার্থই বলেছেন যে, “আমাদের স্কুল কলেজের শিক্ষার পদ্ধতি উলটো, এখানে ছেলেদের বিদ্যা গেলানো হয়।” এখানে একটি বিষয় লক্ষ্য করা যায় যে, আমরা দায়ে পড়ে কোনমতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে, কঠোর হয়ে, কঠিন ভাবে দায়িত্ব পালন করছি না। আর একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, শিখানোর উদ্দেশ্যে শিক্ষা দান করছি না। আমরা শিক্ষা দান করছি ভাল ফলাফলের উদ্দেশ্যে। বিগত বছর গুলোতে স্কুল ও কলেজগুলোতে ফলাফলের ঘৃণ্য প্রতিযোগিতা হয়েছে। পাবলিক পরীক্ষায় দুর্ণীতি, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অসদুপায় অবলম্বনসহ বিভিন্ন অপকর্মে অনেক ভাল ভাল প্রতিষ্ঠান জড়িয়ে পড়েছিল। আর এ দুর্ণীতির কথা বুঝতে পেরে সরকার এ জঘন্য প্রতিযোগিতাটি বাতিল করেছে। এটাও একটা ভাল পদক্ষেপ।
n2
ছবিঃ গুগুল থেকে

১৯৯৬ সাল। আমি তখন ঢাকা বিশববিদ্যালয়ের ছাত্র। আমার গবেষণার বিষয় ছিল “শিক্ষার জন্য খাদ্য কর্মসূচী।” প্রাথমিক শিক্ষার এই প্রজেক্টের উপর গবেষণা। ফিল্ডে গিয়ে গবেষণা করে দেখা গেলঃ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছত্র-ছাত্রী ভর্তির হার বেড়েছে দ্বিগুণ। সেটা হচ্ছে যারা আগে স্কুলে যেতনা তারা গম পাওয়ার লোভে বিদ্যালয়ে যাচ্ছে। পড়ার উদ্দেশ্যে যাচ্ছে না। এতে শিক্ষার পরিবেশ আরো নষ্ট হচ্ছে। যে সকল ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষার উদ্দেশ্যে বিদ্যালয়ে আসত তাদের আচরণে প্রভাব ফেলছে নতুনদের আচরণ। এতে শিক্ষার মান নিচে নেমে যাচ্ছে। অর্থাৎ কোয়ালিটি কমে যাচ্ছে এবং কোয়ানটিটি বাড়ছে। এছাড়া প্রধান শিক্ষকসহ অনেক শিক্ষা অফিসার দুর্ণীতিতে জড়িয়ে পড়েছে। কিছুদিন পর অবশ্য এ প্রজেক্টি সরকার বন্ধ করে দেয়। এটাও একটা ভাল কাজ।
বাঙালি জাতিকে রাহুর গ্রাস থেকে মুক্ত করতে হলে সরকারকেই পদক্ষেপ নিতে হবে। আর প্রথম পদক্ষেপ হল শিক্ষার মান উন্নয়ন। দুর্ণীতিকে কঠোর হস্তে দমন করে শিক্ষাক্ষেত্রে যে সকল ভুলত্রুটি আছে তাঁর সঠিক সমাধান করতে হবে। তাহলে জাতি রাহুর গ্রাস থেকে আস্তে আস্তে মুক্তি পাবে বলে আশা করা যায়।