ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

ইসলামের পাঁচটি মূল ভিত্তির মধ্যে চতুর্থ ভিত্তি হল হজ্জ। প্রত্যেক মুসলমান ব্যক্তি আশা করে জীবনে একবার হজ্জ পালন করবে। প্রতি বছর এই ফরজ কাজটি করার জন্য সারা বিশ্ব থেকে লাখ লাখ মুসলমান চলে আসেন মক্কায়। সকলেরই আশা থাকে পবিত্র হজ্জ পালন করার পর যার যার বাড়িতে চলে যাবে। কোন ব্যক্তিই চায়না হজ্জ করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় মৃত্যু হোক। আর কোন আত্মীয়-স্বজন চায়না হজ্জে গিয়ে তার আপনজন মারা যাক।
গত ১১-৯-২০১৫ ইং তারিখ শুক্রবার ঈদুল-আযহার ১২ দিন পূর্বে মসজিদ আল হারামে মারা যান ১০৭ জন হাজী। মাগরিবের নামাজের পুর্বে প্রবল ঝড় ও তুমুল বৃষ্টির কারণে এ দুর্ঘটনাটি ঘটে। কারণ হলঃ মসজিদুল হারামের বর্ধিতাংশের কাজ চলছিল। এ জন্য ছাদের উপর বড় বড় ক্রেন রাখা ছিল। প্রবল বাতাসে ক্রেন উল্টে মসজিদুল হারামের ছাদে এসে পড়ে। ছাদ ধসে মুসুল্লিদের উপর পড়ে। তখন মাগরীবের নামাজের জন্য মুসুল্লিগণ হ্যারাম শরিফে সমবেত হন। এখানে অধিকাংশই ছিলেন বিভিন্ন দেশ থেকে আসা হাজীগণ।
মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় জমায়েত হল হজ্জ। আর এ বছর প্রায় ২০ লক্ষ হাজি হজের উদ্দেশ্যে সৌদি গিয়েছে। এ সময় কেন মসজিদুল হারামের কাজ চলছিল? এ কাজ হজ্জের সময় স্থগিত রাখা উচিত ছিল।
আজকের “প্রতিদিন বাংলাদেশ” লিখেছে যে, “দুর্ঘটনার আগে সরকারের পক্ষ থেকে ভারি বৃষ্টি, তীব্র বাতাস ও ঝড়ের পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল।“ কিন্তু আমার কথা হল, ‘ছাদে রাখা ক্রেগুলো কেন সরকার সরাতে পারলনা? এটা কী সরকারের অবহেলা নয়?” পত্রিকাটি আরও বলেছে, “ ইতিপূর্বে ২০০৬ সালে হজ্জের সময় পদদলিত হয়ে শতাধিক হাজির মৃত্যু ঘটে। পবিত্র হজ্জের আনুষ্ঠানিকতা শুরুর আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। এ সময় উচিত ছিল সংস্কার কার্য স্থগিত রাখা। হাজিদের নিরাপত্তা বিধানের জন্য সৌদি সরকারের আরও আন্তরিক হওয়া জরুরি ছিল।”

১৩-৯-২০১৫ ইং তারিখের “ভোরের পাতা” পত্রিকাটি এ ঘটনায় কাউকে দোষারোপ না করে নিহত হাজিদের সুসংবাদ দিয়েছে। এ সুসংবাদটিতে অবশ্য নিহত হাজিদের স্বজনরা শান্তনা পাবে। এ পত্রিকার সুসংবাদের শিরোনামটি ছিলঃ “মক্কায় ক্রেন দুর্ঘটনায় নিহত হাজীদের জন্য সুসংবাদ”। সুসংবাদটি ছিলঃ “এ দুর্ঘটনায় যাঁদের মৃত্যু হয়েছে, তাঁরা শহীদের মর্যাদা পাবেন।” শহীদের মর্যাদা পাওয়ার ১০টি কারণও উল্লেখ করেছেন। তা হলঃ

১. জুমার দিনে (রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জুমার দিনে বা জুমার রাতে মৃত্যুকে কবরের আজাব থেকে নিষ্কৃতি লাভের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন; তিরমিজি, হাসান)।
২. জুমার দিনের শেষ সময়ে (যা দোয়া কবুলের সময়)।
৩. পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম এবং আল্লাহর সবচেয়ে পছন্দনীয় শহরে।
৪. পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ঘর কাবার পাশে।
৫. হজের মতো অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদতের মধ্যে।
৬. হজের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল তওয়াফরত অবস্থায়।
৭. ইহরাম পরিহিত অবস্থায় (রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি ইহরাম অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, কিয়ামতের দিন সে লাব্বাইক… পাঠ করতে করতে উঠবে)।
৮. বৃষ্টিরত অবস্থায় (বৃষ্টি হলো আল্লাহর রহমত); বৃষ্টির পানি শহীদের রক্ত ধুয়ে দিচ্ছে!
৯. ক্রেন ধসে মৃত্যু (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো কিছু ধসে বা কোনো কিছুতে চাপা পড়ে মৃত্যুকে শহীদী মৃত্যু হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন)।
১০. সারা বিশ্বের অগণিত মুসলিম এ দুর্ঘটনায় নিহতদের জন্য দোয়া করছেন, আল্লাহতায়ালা যেন তাঁদের ক্ষমা করে দেন এবং তাঁদের শহীদ হিসেবে কবুল করে নেন।

আবার অনেকেই ক্রেন দুর্ঘটনায় নিহত হাজিদের ছবি দিয়ে ফেসবুকে স্টেটাস দিয়েছে যেঃ “মক্কায় যারা শহীদ হলেন তাদের ছবি এটা। হেসে হেসে জান্নাতে চলে যাচ্ছে, আপনারা চান এই রকম মৃত্যু??”

12027523_772276986252290_6155150200785278327_n
আজ যখন হজের ফিরতি ফ্লাইটটি বাংলাদেশে এসে পৌঁছে তখন ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনে লাইভ অনুষ্ঠান দেখছিলাম। তখন একজন মহিলা হাজি কেঁদে কেঁদে কথা বলছিল। মনে হচ্ছিল সে মৃত্যুর দোয়ার থকে ফিরে এসেছে। কেন এমন আতঙ্ক? কী হয়েছিল হজ্জে গিয়ে? আর একজন মহিলা হাজি বলছিল, “ প্রচন্ড গরম ও ভীরের মধ্যে উপর থেকে পানি স্প্রে করছিল। এই পানি রাস্তায় জমে রাস্তা পিচ্ছিল হয়ে হাটার অযোগ্য হয়। রাস্তার একটি গর্তে পানি জমে। অনেক হাজি হোঁচট খেয়ে পরে যায়। সাথে সাথে অনেক হাজি একজনের উপর আরেকজন পরে যায়। এরপর শুরু হয় হুড়াহুড়ি।
mina-300x210
অন্যদিকে হজ্জের এ দুটি দুর্ঘটনার জন্য অব্যবস্থাপনা ও গাফিলতিকেই দুষছেন বিশ্ব নেতারা। আরো বেশি হাজি টানতে অবকাঠামো নির্মাণে সৌদি সরকার শত শত কোটি ডলার খরচ করছে। অথচ হাজিদের নিরাপত্তার দিকটি বরাবরই তারা অবহেলা করছে। হাজিদের মধ্যেও তারা বৈষম্য করেছে। ধনী দেশের হাজিদের জন্য যত সুবিধা রয়েছে, গরিব দেশের হাজিদের জন্য তা নেই। ব্যবস্থাপনায় নানা অসংগতির কারণেই বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে। ঘটনার পরপরই বিশেষ করে ইরানের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হচ্ছে, বৃহস্পতিবার সকালে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান আল সৌদের গাড়িবহর মিনায় এসেছিল। যুবরাজের সঙ্গে ছিল প্রায় সাড়ে ৩০০ নিরাপত্তারক্ষী। যুবরাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শয়তানের স্তম্ভে যাওয়ার অন্তত দুটি পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তাই অন্য পথগুলোতে প্রচণ্ড ভিড়ের সৃষ্টি হয়। এ থেকেই পদদলিত হওয়ার ঘটনা ঘটে। একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীও দাবি করেছে, হঠাৎ শয়তানের স্তম্ভে যাওয়ার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ইসহাক সালেহ নামের এক কেনীয় হাজি বলেন, ‘আমি ঘটনার জন্য সৌদি কর্তৃপক্ষকেই দায়ী করব।’

দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যবসায়ী জায়িদ বায়াত বলেন, ‘রাস্তা বন্ধ থাকায় সংকীর্ণ পথে তীব্র ভিড়ের সৃষ্টি হয়। পায়ের চাপায় পড়ে গরমে আর শ্বাসকষ্টে লোকজন মারা যায়। চোখের সামনেই অনেককে মরতে দেখেছি।’
ঘটনার পর শুক্রবার রাতেই ইরানের হজ সংস্থার প্রধান সাঈদ ওয়াহিদকে উদ্ধৃত করে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলা হয়, সৌদি সরকার সঠিক তথ্য প্রকাশ করছে না। মিনায় নিহতের সংখ্যা ৭৬৯ জন নয়, অন্তত দুই হাজার।
ইরানসহ বেশ কয়েকটি দেশ মিনার ট্র্যাজেডির জন্য সৌদি কর্তৃপক্ষকে অভিযুক্ত করে বলছে, সৌদি কর্তৃপক্ষ হাজিদের নিরাপত্তার বিষয়টি ঠিকভাবে দেখভাল করতে পারেনি। এই কাজে তাদের গাফিলতি ছিল। ইরানের পাশাপাশি সরব হয়েছে ইন্দোনেশিয়াও। মুখ খুলেছেন নাইজেরিয়ার হজযাত্রী দলের প্রধানও। প্রশ্ন উঠেছে, হজের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব এককভাবে সৌদি সরকারের হাতে থাকবে, নাকি তা যৌথভাবে মুসলমানপ্রধান দেশগুলোর হাতে থাকা উচিত?

{তথ্য সংগ্রহঃ ভোরের পাতা, বাংলাদেশ প্রতিদিন ও কালের কণ্ঠ। ছবিঃ ভোরের পাতা]