ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

file
কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘কালান্তর’ গ্রন্থের ‘হিন্দুমসুলমান’ প্রবন্ধে বর্ণনা করেছেনঃ যে দেশে প্রধানত ধর্মের মিলেই মানুষকে মেলায়, অন্য কোন বাঁধনে তাকে বাধতে পারে না সে দেশ হতভাগা। সে দেশ স্বয়ং ধর্মকে দিয়ে যে বিভেদ সৃষ্টি করে সেইটে সকলের চেয়ে সর্বনেশে বিভেদ। মানুষ বলেই মানুষের যে মূল্য সেটিকেই সহজ প্রীতির সঙ্গে স্বীকার করাই প্রকৃত ধর্মবুদ্ধি। যে দেশে ধর্মই সেই বুদ্ধিকে পীড়িত করে রাষ্ট্রিক স্বার্থবুদ্ধি কি সে দেশকে বাচাতে পারে? ইতিহাসে বারে বারে দেখা গেছে, যখন কোন মহাজাতি নব জীবনের প্রেরণায় রাষ্ট্রবিপ্লব প্রবর্তন করেছে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে প্রবলভাবে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর ধর্মবিদ্ধেষ।
Mkl-13
কাজী নজরুল ইসলামের ‘হিন্দু-মুসলমান’ প্রবন্ধে নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের আলাপচারিতায় রবীন্দ্রনাথ বর্ণনা করেন, “অবতার-পয়গম্বর কেউ বলেননি, আমি হিন্দুর জন্য এসেছি, আমি মুসলমানের জন্য এসেছি, আমি খ্রিষ্টানের জন্য এসেছি। তারা বলেছেন, আমরা মানুষের জন্য এসেছি। কিন্তু কৃষ্ণের ভক্তরা বলেন, কৃষ্ণ হিন্দুর, মুহম্মদ(স) এর ভক্তরা বলেন, মুহম্মদ(স) মুসলমানের, খৃষ্টানরা বলেন, খৃষ্ট খ্রিষ্টানদের। আর এ নিয়েই যত বিপত্তি। মনিষীদের উদাহরণ দিয়ে বক্তব্য আর বড় করতে চাই না।

বর্তমানে ভারতে গরু নিয়ে শুরু হয়েছে ধর্মবিদ্ধেষ। আর এই ধর্মবিদ্ধেষই ভারতে বারবার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। দেখা যাক গরু সমস্যা নিয়ে বর্তমান ভারতের হিন্দু বুদ্ধিজীবী ও অসম্প্রদায়িক ব্যক্তিগণ কী বলেন।
বাড়িতে গরুর মাংস রাখা ও গরুর মাংস খাওয়ার গুজবে এক বৃদ্ধকে পিটিয়ে খুন করা হয়েছে ভারতের উত্তর প্রদেশের গ্রেটার নয়ডায়। এই ঘটনা নিয়ে উঠেছে নিন্দার ঝড়। গো-মাংস ভক্ষণের এই নারকীয় বিরোধিতার প্রতিবাদে সরব হয়েছেন অনেকেই।

ভারতের প্রখ্যাত লেখিকা শোভা দে বলেছেন, তিনি এই মাত্র গো-মাংস খেলেন। এ জন্য কেউ যদি তাকে মারতে চায় তাহলে তিনি তার মুখোমুখি হতে প্রস্তুত।[সিলেট টুডে টুয়েন্টি ফোর ডট কম] ধর্মান্ধতার তীব্র প্রতিবাদ করে ভারতীয় প্রেস কাউন্সিলের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট তথা ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি মার্কেন্ডেয় মন্তব্য করেছেন যে, তিনিও গো-মাংস খেয়েছেন, হিম্মত থাকলে তাকে কেউ মেরে দেখাক। তিনি আরও লিখেছেন, তার লাঠি ওইসব লোকেদের জন্য অপেক্ষা করছে।[bdnewslink.24.com]

বলিউডের প্রবীণ অভিনেতা ঋষি কাপূরও নিজেকে গো-মাংস ভক্ষণকারী হিন্দু বলে দাবি করেছেন। তীব্র বিরোধিতার মধ্যেও নিজের মন্তব্যে অনড় তিনি।[Dhaka time online] পাটনায় সাবেক মুখ্যমন্ত্রী লালু প্রসাদ বলেছেন, বিজেপি গরুর রাজনীতি হাতিয়ার করে দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের খেলায় নেমেছে। এটা ঠিক নয়। বহু হিন্দু আছে যারা গরু খায়। গরু খাওয়ার অপরাধে কাউকে পিটিয়ে মারা অন্যায়।[ইউরো বিডি নিউজ]

এ নিয়ে প্রশ্ন করেছেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও রাহুল গান্ধী। দুজনেই বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সমালোচনা করেন। বিজেপি-বিরোধী দলগুলো প্রচার শুরু করে দিয়েছে, গরুর রাজনীতির মধ্য দিয়ে তারা দেশে ধর্মীয় মেরুকরণের চেষ্টা করছে, যাতে ভোটে জেতা সহজতর হয়। ভারতের ২০ কোটি মুসলমান ছাড়াও বহু অমুসলিম গরুর মাংস খায়। ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মাংস রপ্তানিকারক দেশ।
[প্রথম আলো অনলাইন]

ভারতে প্রাচীন কাল থেকে গরু সমস্যা ছিল, এখনও আছে। “গরুর মাংস নিয়ে কী ছিল মহাত্মা গান্ধীর অবস্থান?” এই শিরোনামে লেখা vaTi Bangla blogspot.com(gmail) এ প্রকাশিত ভারতের কিংবদন্তী নেতা মহাত্মা গান্দীর কিছু উদ্ধৃতি তুলে ধরছি। “আমরা কোরআনের অনেক আয়াত পাঠ করি। কিন্তু কেউ যদি আমাকে এই আয়াত পড়ার জন্য বাধ্য করতো তবে আমি সেটা পছন্দ করতাম না। ঠিক সেভাবেই কেউ যদি গরু জবাই বন্ধ না করে তবে আমি কিভাবে তাকে এটা না করার জন্য বাধ্য করতে পারি? ভারতীয় ইউনিয়নে তো শুধুমাত্র হিন্দুরাই আছে এরকম না। এখানে অনেক মুসলিম, পার্সি, খ্রিষ্টান এবং অন্য ধর্মালম্বীরা রয়েছেন।”
52ea79652fda0-Untitled-4
গান্ধী ভারতের হিন্দুদের ভুল ধারণা সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন যে, “তারা মনে করছেন ভারত হিন্দুদের রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। তবে ভারত তাদের প্রত্যেকেরই রাষ্ট্র যারা এখানে বাস করে। আমরা যদি এখানে গরু জবাই বন্ধ করি এবং পাকিস্তানে যদি তার বিপরীত ঘটে তখন ফলাফল কি হবে? মনে করুন তারা বললো শরীয়ত এবং ধর্মীয় নিয়মানুযায়ী মন্দিরে যাওয়া নিষেধ। সুতরাং কোন হিন্দুই মন্দিরে যেতে পারবেন না। আমি যদি পাথরের মধ্যে স্রষ্টাকে খুঁজে পাই তবে আমার বিশ্বাসের জন্য অন্যকে কিভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করতে পারি। আমাকে যদি মন্দিরে যেতে বারণ করা হয় তবুও আমি মন্দিরে যাব।”

ধর্ম কী সে বিষয়টি না জেনেই আমরা শুধু গরু জবাই বন্ধের জন্য চিল্লাচিল্লি করি বলে মনে করতেন গান্ধী। তার পরামর্শ ছিলো বিষয়টি সংবিধানের আওতায় না নেয়ার। তিনি লিখেছেন, ‘আমাকে অনেকে প্রশ্ন করে, মুসলামানরা এত নৃশংস কাজ করেছে যে এই ধর্মের কাকে আমরা বিশ্বাস করবো তা নিয়ে আমরা সন্দিহান, ভারতীয় ইউনিয়নের মুসলমানদের প্রতি আমাদের ব্যবহার কেমন হওয়া উচিত। পাকিস্তানে অমুসলিমদের কী করা উচিত?’
“এ প্রশ্নের জবাব আমি পূর্বেই দিয়েছি এবং আমি আবারো বলছি ভারতে বিভিন্ন ধর্ম বিশেষ করে হিন্দু, শিখ, মুসলমান এবং খ্রিষ্টানরা কিভাবে জীবন-যাপন করছেন এবং ভারতের প্রতি তারা কি দায়িত্ব পালন করছেন সে বিষয়টি দেখতে হবে। পাকিস্তান নিজেদের মুসলমান রাষ্ট্র বলতে পারে কিন্তু ভারতীয় ইউনিয়ন সকলেরই। আমাদের সকলের মধ্যেই এখন ভীরুতা রয়েছে। একে ঝেড়ে ফেলে সকলকেই সাহসী হতে হবে। মুসলমানদের সামনে নিজেকে সাহসী প্রমাণ করার দরকার নেই।”

নৈরাজ্যবাদী দর্শনে আলোকিত গান্ধী প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘আমরা কি ভারতীয় ইউনিয়নের কোটি কোটি মুসলমানকে দাস বানিয়ে রাখতে পারি? যে অন্যকে দাসে পরিণত করে সে নিজেও একদিন দাসে পরিণত হয় বলে মনে করতেন তিনি।

ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাস পড়লে দেকা যায় প্রাচীনকাল থেকে ভারতে বেশিরভাগ দাঙ্গা হয়েছে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাকে নিয়ে। তাই ভারত বাসীকে এই সাম্প্রদায়ীকতা পরিহার করে জাতিগতভাবে এগিয়ে যাওয়া উচিত। অন্যের ধর্ম নিয়ে চিন্তা না করে নিজ নিজ ধর্ম পালন করা উচিত। একে অন্যের ধর্মকে মর্যাদা দেয়াই হল ধর্মের কাজ।

[তথ্যসূত্রঃ প্রথম আলো ও ইউরো বিডি নিউজ]