ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

আশির দশকের টাঙ্গাইলের পানিপড়ার কথা জানেনা এমন লোক খুব কমই আছেন। বাংলাদেশের সব বাস টার্মিনাল থেকে টাঙ্গাইলের পানিপড়া পর্যন্ত স্পেশাল বাস যোগাযোগ ছিল। বাসে লেখা থাকত, ‘ঢাকা-পানিপড়া’। অনেক দূর দূরান্ত থেকে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ এখানে এসে ভিড় করত। ১৯৮৫ সাল, আমি তখন কলেজে পড়ি। বড় মামী একদিন আমাকে বললেন, “সেলিমকে নিয়ে তোকে পানিপড়া যেতে হবে, ওর কানের অনেক চিকিৎসা করার পরও ভাল হচ্ছেনা।” ছোট মামী এ কথা শুনে বলল, “আমার বুক জালা করে আমার জন্যও তেলপড়া নিয়ে আসবা।” বড় মামী আমাকে বেশি আদর করেন। ৫ম শ্রেণি থেকে এসএসসি পর্যন্ত এ মামীর সেবাযত্নেই বড় হয়েছি। উনি আমার মায়ের মত। অত্যন্ত সামাজিক মহিলা। ছোট মামীকে ছোট বেলায় দেখেছিলাম চেহারা মনে নেই। কারণ তিনি অসূর্যস্পশ্যা অর্থাৎ পূর্ণ পর্দাশীল মহিলা, বেগানা পুরুষ তাঁর একটি আঙ্গুলও দেখতে পারেনা। চিন্তা করে দেখলাম, মামীদের কথা ফেলা যাবে না। আর টাঙ্গাইল যাওয়ার বিশেষ কারণ হল আমি ছোটবেলা থেকেই ভ্রমণ পছন্দ করতাম। যে কোন জায়গায় কেউ যেতে বললে চলে যেতাম। তবে খরচ দিতে হত। দুর্গম ও অপরিচিত যায়গায় যেতে আমার খুব ভাল লাগত।

ঐদিন রাতেই সিদ্ধান্ত হল, পরেরদিন সকালে মামাত ভাই সেলিমকে নিয়ে পানিপড়া যাব। দুই মামী মিলে খাওয়া ও যাতায়াতের জন্য এক হাজার টাকা ও সরিষার তেলভর্তি দুটি বোতল দিল। সকালের ট্রেনে নেত্রকোণা থেকে ময়মনসিংহ গেলাম। সেখান থেকে টাঙ্গাইলের বাসে উঠলাম। ময়মনসিংহ থেকে টাঙ্গাইল যেতে সময় লাগল চার ঘণ্টার উপরে। আমাদেরকে যেখানে নামিয়ে দিল, সেখান থেকে গ্রামের ভিতর দিয়ে হেঁটে আরও গেলাম দেড় ঘণ্টা। দুপুরের খাবারের সময় চলে গেছে। প্রচণ্ড খিদে লেগেছে। এখানে গিয়ে জানতে পারলাম থাকা খাওয়াসহ সব ব্যবস্থাই আছে। পানিপড়ার বোতল, তেলপড়ার তেলসহ বোতল আর যা যা লাগে সবই আছে।

আমরা একটা হোটেলে ভাত খেলাম। কিছুক্ষণ পর শুনতে পেলাম, মাইক দিয়ে এনাউন্স করছে যে, এখন আর হুজুর ফুঁ দিবেনা। তেলপড়া নিয়ে এদিনেই চলে যাওয়ার কথা ছিল। অনেক চেষ্টা করার পর হুজুরের শিষ্যরা বলল, “প্রতিদিন আসরের পর হুজুর ফুঁ দেননা, ফজরের নামাজের পর আবার শুরু করেন।” পরে জানতে পারলাম এটা একটা পলিসি। প্রত্যক বাড়িতে রাতে থাকা খাওয়ার হোটেল আছে। আসরের পর ফুঁ দিলে সব মানুষ চলে যায়। হোটেলের ব্যবসা চলেনা। তাই এ ব্যবস্থা করা হয়েছে। খুঁজতে খুঁজতে এক বাড়িতে গিয়ে সিট পেলাম। শীতের সময় ছিল তখন। একটি কাচারি ঘরে পাঁচ/ছয়টি চৌকি পাতা। লেপ-তোষকের ব্যবস্থা আছে। বাড়ির মালিক বলল, “তোমাদের ভাড়া ও খাওয়া বাবদ দুইশত টাকা। রাতে খাওয়া শেষ করে কিছুক্ষণ গল্প করার পর ঘুমিয়ে পরলাম।

সকালে গিয়ে দেখলাম, পক্ষাঘাতগ্রস্ত, শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্দীদের হুজুর ঝাড়-ফুঁক করছে। কিছু কিছু পক্ষাঘাতগ্রস্ত লোককে চাঙ্গি করে এখানে এনেছে। ঝাড় দেয়ার পর হেঁটে চলে যাচ্ছে। দেখে খুব আশ্চর্য লাগল। পরে জানলাম এগুলো সাজানো নাটক। এত লোকের মধ্যে দেখলাম, অনেক গাড়ি ওয়ালা লোক তাদের শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্দী ছেলে-মেয়েদের ভাল করার আশায় এখানে নিয়ে এসেছে।

প্রতিবন্ধিদের ঝাড় দিয়ে তেলপড়া ও পানিপড়ায় আসতে সকাল ১১টা বেজে গেছে। কিছু লোক পানিপড়া কমিটিকে গিয়ে বলল, “এভাবে লাইন ধরে ফুঁ দিলে সারা দিনেও শেষ হবেনা, আপনারা মাইকে দোয়া পড়ে ফুঁ দেয়ার ব্যবস্থা করেন।” কিছুক্ষণ পর মাইক দিয়ে বলল, “আপনারা সবাই পানি ও তেলের বোতলের মুখ খুলে রাখুন, হুজুর মাইকে দোয়া পড়ে ফুঁ দিবেন।” আমরাও তেলের বোতল খুলে হাতে নিয়ে দাঁড়ালাম। কিছুক্ষণের মধ্যে হুজুর দোয়া পড়ে মাইকে ফুঁ দিলেন। ব্যাস, পানিপড়া ও তেলপড়া হয়ে গেল।

এবার চলে আসার পালা। আবার দেড় ঘণ্টা হেঁটে টাঙ্গাইল শহরে আসলাম। ‘পানিপড়া-ময়মনসিংহ’ বাসে উঠে বসলাম। আসরের সময় ময়মনসিংহ এসে পৌছলাম। বাস থেকে নেমে হাঁটার সময় দেখি ব্যাগ থেকে ফোঁটা ফোঁটা তেল পড়ছে। ব্যাগ সেলিমের কাঁধে ছিল। ব্যাগ খুলে দেখি ছোট মামীর তেলের বোতলটা ভেঙ্গে গেছে। এখন কী করা যায়, দুজনে চিন্তা করছি। সেলিম বলল, “চল আমরা আজ কাইয়ূম ভাইয়ের এখানে থেকে যাই।” ছোট মামার ছেলে হাফেজ আব্দুল কাইয়ূম গাঙ্গিনাপাড় একটি মাদ্রাসায় খারিজি লাইনে পড়ে। মাদ্রাসার হোস্টেলে গিয়ে উঠলাম। গোসল করে খাওয়ার পর সন্ধ্যার দিকে দুজনে বের হয়ে গেলাম। আগের বোতলের সাথে মিলিয়ে ভাঙ্গারি দোকান থেকে একটা বোতল কিনলাম। এটাকে ভাল করে ধুয়ে একপোয়া সরিষার তেল কিনলাম। আমি সেলিমকে বললাম, “এ ঘটনাটি কাউকে বলবিনা।” সে বলল, “ আচ্ছা, কিন্তু হুজুরের ফুঁ লাগবেনা?” আমি বললাম, “হুজুর ও তাঁর ফুঁ সব ভুয়া।” সে বলল, “এসব বললে তোমার গুনা হবেনা?” কিছুক্ষণ বোঝানোর পর সে বুঝতে পারল ফাঁকিবাজির ব্যাপারটা।

পরের দিন সকালে নেত্রকোণা চলে গেলাম। এরপর দীর্ঘদিন এই তেল সেলিমের কানে দেয়া হল। কাজ না হয়ে কানের অবস্থা আরো খারাপ হয়ে গেল। পরে নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ দেখিয়ে কানপঁচা ভাল হয়েছে। আর এদিকে দীর্ঘদিন পর ছোট মামীকে জিজ্ঞাসা করলে বলল, “এখন একটু ভাল আছি।” আর আমি মনে মনে বলি, “যে তেলে কোন ঝাড়-ফুঁক নেই, সেটা দিয়ে একটু ভাল আছে! এর কিছুদিন পর ছোট মামীর অসুখ বেড়ে যায় । বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখিয়ে, অ্যান্ডোস্কোপি করার পর মামী ভাল হয়ে গেছে। এক বছর পর সেলিম আমাকে বলল, “ ভাই তুমিতো ঠিকই বলেছিলে যে, পানিপড়া তেলপড়া সব ভুয়া।