ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

পুরুষ জাতীয় ভূতকে আমরা ‘ভূত’ বলে জানি। স্ত্রী জাতীয় ভূতকে ‘পেত্নী’ বলি। কিছু কিছু জায়গা ছিল শৈশবে দিনের বেলায়ও ভূত পেত্নীর ভয় পেতাম। যেমনঃ গোরস্তান, শ্মশান, কালিমন্দির, মঠ, বটগাছ,নির্জন জায়গা ও জঙ্গল। এছাড়া রাতের বেলায় তো ভূত-পেত্নীর ভয়ে ঘর থেকে বেরই হতাম না। শৈশবে ভূত-পেত্নীর ভয় সবাই পায়, আমিও পেতাম। আমার ছোটভাই সোহাগ আরও বেশি ভয় পেত। আমার কথা না শুনলে আমি তাকে ভূতের ভয় দেখাতাম। ভয় পেয়ে অনেক জোরে কান্নাকাটি করত । আবার আদর করে সাহস দিলেই কান্না থেমে যেত।
আমাদের বাড়ি থেকে পশ্চিম দিকে নদীর পাড় দিয়ে দেড় মাইল গেলে মস্ত বড় ফিলুয়ার বিল। বিলের পাড়ে বিশাল চারণভূমি। প্রতিদিন বিকালে গরুর পাল নিয়ে চারুণভূমিতে ছেড়ে দিতাম। চারণভূমিতে প্রচুর ঘাস ছিল, আশেপাশে কোন ফসলের ক্ষেত ছিল না। গরু ছেড়ে দিয়ে রাখাল বালকেরা বল খেলতাম। এভাবে চলত অগ্রহায়ণ মাস থেকে জ্যৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত। আসলে চারণ ভূমিতে গরুর পাল নিয়ে আমাদের না গেলেও চলত। স্কুল থেকে আসার পর বিকেলে রাখাল ছেলেদের সাথে চারণ ভূমিতে বল খেলার জন্য আমরা যেতাম। এছাড়া বিলে মাছ ধরা, ও অন্যান্য খেলাধুলা করার জন্যই গরুর পাল নিয়ে বিলে চলে যেতাম। এটি ছিল দুরন্তপনার একটি অংশ।

নদীর উত্তর পাড়ে আমাদের গ্রাম ‘সনুড়া’। দক্ষিণ পাড়ে হিন্দুপাড়া ‘হুগলি’। নদী বাঁক নিয়ে একটি শাখা উত্তরে ও অন্য শাখাটি দক্ষিণ দিকে চলে গেছে। মোহনার দক্ষিণ-পূর্ব পাড়ে শ্মশান। শ্মশানের পর গভীর বন, এর পর চারণভূমি। সন্ধ্যার পূর্বেই চারণভূমি থেকে গরু নিয়ে বাড়ি যাচ্ছি । হঠাৎ লক্ষ্য করে দেখি লাল গাভীটা পালে নেই। পাশের জঙ্গলে ঢুকে গেছে, শ্মশানের জঙ্গল। এ জঙ্গলে বড় কোন গাছ নেই। আছে শুধু বেতগাছ। শ্মশানের দিকে যাওয়ার সরু রাস্তা ছাড়া আর কোন রাস্তা নেই। বেতগাছের ঘন কাঁটার জন্য এর ভিতরে কেউ ঢুকতে পারে না। নদীর পাড়ে শ্মশানের কাছে প্রচুর ঘাস। গাভী ঘাস খেতে খেতে শ্মশানের দিকে চলে গেছে। আর একদিন নদীতে গোসল করানোর সময় এই গাভীটাই নদী পার হয়ে শ্মশানে চলে গিয়েছিল। সারাদিন ঘাস খাওয়ার পর আমাদের দুই কামলা এটাকে খুঁজে বের করেছিল। আজও সে এই কাজ করেছে। যে জাগার পাশ দিয়ে দিনের বেলায় গেলে ভয় পাই, আর সেখানে সন্ধ্যার পর গরু খুঁজতে যাওয়া? বাবারে! ভয় লাগে—। তাই আমরা অন্য গরু নিয়ে বাড়ি চলে গিয়েছি। বাড়ি গিয়ে এই ঘটনাটি বাবাকে বলার পর বাবা বললেন, “বাছুর কোথায়? আমি বললাম, “দেখনা এই যে হাম্বা হাম্বা করছে?” তখন বাবা বললেন, “ বাছুর বেঁধে রাখ, তাহলে গাভী চলে আসবে। কিছুক্ষণ পর দেখি গাভীটি দৌড়ে বাড়ির দিকে আসছে। তখন বুঝতে পারলাম সন্তানের মমতায় গাভীটি চলে এসেছে। ছোট বেলায় অত্যন্ত দুরন্ত হলেও ভূত-পেত্নীর ভয় ছিল।

আমাদের বাড়িতে ছাগলও লালন-পালন করা হত। ছাগলকে ঘাস খাওয়ানো, বন্দে (মাঠে) নিয়ে যাওয়া,নিয়ে আসা, এই কাজগুলো করতাম আমি ও সোহাগ। বাড়ির সামনে নদী থাকায় ছাগল চড়াতে হত বাড়ির পিছনে। আমি তখন দ্বিতীয় শ্রেণিতে এবং সোহাগ ছোট ওয়ানে। প্রতিদিন স্কুল ছুটি হলে দুপুরে গোসল ও খাওয়ার পর বকরী নিয়ে চলে যেতাম বাড়ির পিছনে। বাড়ির পিছনে বড় জঙ্গলের ভিতর দিয়ে যে রাস্তা, সেটা দিয়েই বন্দে আসা-যাওয়া করতে হত। এ রাস্তাটিতেই ছিল বেশি ভূতের ভয়। একা যাওয়া তো দূরের কথা, দুজন গেলেই ভয় পেতাম। সোহাগ আমার সাথে এ রাস্তা দিয়ে যেতে ভিষণ ভয় পেত। আমিও একা যেতে পারতাম না, তাই তাকে সঙ্গে নিতাম। আর একা একা বন্দে গিয়ে ভাল লাগত না এবং ভয়ও পেতাম। আর আমি তাকে রেখে একা কোথাও যেতে পারতাম না। সেও আমাকে ছাড়া একা থাকতে পারতো না। বলা যায় একই বৃন্তের দুটি ফুল।

প্রতিদিন বন্দে যাওয়ার আগে আমাদের একটা প্রস্তুতি ছিল। একটি মুত্তা বেতের মোটা মুছলা (পাটি), খেলার সরঞ্জাম, ফল ও পিঠা জাতীয় কিছু খাবার ইত্যাদি। তিন/চার ঘন্টা সময় খাওয়া, খেলা ও গল্প করে কাটিয়ে দিতাম। ধান ক্ষেতের বড় আইলে মুছলা বিছিয়ে বসা ও শোয়ার সুন্দর পরিবেশ গড়ে তুলতাম। আমাদের সাথে বাড়ির সমবয়সী আরও ছেলেরা মাঝে মাঝে যেত।
একদিন বন্দে ছাগল ছেড়ে দিয়ে বাবার সাথে আমরা বাজারে চলে গেলাম। বাজার থেকে আসতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যায়। আম্মা বন্দ থেকে ছাগল নিয়ে আসতে বলল। সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে দেখে ঐদিন ভয়ে সোহাগ আমার সাথে যায়নি। আমাদের বাড়ির লালমিয়া ভাই বন্দে যাচ্ছে দেখে তাঁর সাথে চলে গেলাম। আমার ছাগল খুঁজে বের করতে একটু দেরি হয়ে যায়। এদিকে লালমিয়া ভাই বাড়ি চলে আসে। এদিক-সেদিক তাকিয়ে দেখলাম কেউ নেই। ভয়ে গা ছম ছম করে উঠল। অন্ধকার হয়ে আসছে, পশ্চিম দিগন্তে লাল আভা দেখা যচ্ছে। ভূত-পেত্নীর কথা মনে আনতে না চাইলেও এমনিতেই চলে আসছে। বড় চিন্তা হল কীভাবে বাগের রাস্তা পার হব। এ মুহূর্তে আমার সাথে দুটি ছাগল ছাড়া আর কেউ নেই। হঠাৎ উত্তর দিকে চেয়ে দেখি চিপ চিপে লম্বা, মাথায় সাদা চুল ও সাদা শাড়ি পড়া একটি পেত্নী আমার দিকে দ্রুত বেগে ছুটে আসছে। এখন আর আমার বাগের রাস্তার ভয় নেই। পেত্নী দেখে প্রচণ্ড ভয়ে আল্লাহর নাম স্মরণ করে বাড়ির দিকে ছাগল নিয়ে দিলাম দৌড়। আমিও দৌড়ি পেত্নীও আমার দিকে দৌড়ে আসে। হঠাৎ একটি ডাকের আওয়াজ শুনলাম। মঞ্জিল ভাই আমাকে ডেকে ডেকে বাগের রাস্তা দিয়ে আসছে। আমার নাম ধরে মঞ্জিল ভাইয়ের ডাক শুনে শান্ত হলাম। সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় আম্মা মঞ্জিল ভাইকে পাঠিয়েছে। পেত্নীর কথা মঞ্জিল ভাইকে কেঁদে কেঁদে বলতে বলতে পেত্নী আমাদের কাছে এসে বলল, “ মঞ্জিল তোরা এখানে কী করিস?” মঞ্জিল ভাই বলল, “আপনি সন্ধ্যা সময় কই থাইখ্যা আইছেন?” পেত্নী বলল, “বাহাম গেছিলাম বাবা, বেয়াইর বাড়িতে।” আমি দেখেই চাচিকে চিনলাম। পশ্চিম পাড়ার কাদির ভাইয়ের মা। মঞ্জিল ভাই বলল, “এই দেখ, এইডা কে, পেত্নী না।” চাচী বলল, “আমিও ভয় পাইয়া দৌড়াইয়া আইতাছি, তোমরারে পাইয়া ভালাই অইল।” পরে তিনজন বাড়িতে গেলে এ ঘটনা নিয়ে সবাই অনেক মজা করেছে।