ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

গ্রামের ছেলে-মেয়েদেরকে সাঁতার শিখাতে হয় না। দেখে দেখে,ডুবতে ডুবতে, ভাসতে ভসতে, পানি খেতে খেতে সাঁতার শিখে ফেলে। তবে মাঝে মাঝে বিপদও হয়ে যায়। আষাঢ় মাস হঠাৎ পাহাড়ি ঢলে মাঠ-ঘাট ডুবে গেছে। বৃষ্টির মধ্যে সবাই সাঁতার কাটছে, আমি তখন সাঁতার শিখিনি। তবে সবার সাথে পানিতে নামি, ডুব দিতে পারি, গলা পানিতে গিয়ে দাঁড়াতে পারি। নদীর পাড়ে একটি লাটিম গাছ ছিল, সেটা নদীর দিকে ৪৫ ডিগ্রি কোণে হেলান দিয়ে আছে। যারা সাঁতার জানে তারা সবাই একে একে গাছে উঠে আর বার বার পানিতে লাফ দেয়। আমিও সবার দেখা দেখি গাছে উঠে পানিতে লাফ দিলাম। পানির নিচে গিয়ে পা ঘাসের মধ্যে লাগল। পায়ের সাহায্যে মাটিতে ভর দিয়ে মাথা পানির উপরে উঠিয়ে একবার শ্বাস নিলাম। আবার ডুবে গেলাম, আমার জানা ছিল কোনদিকে পানি কম। দম প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছে, এখন আর উপরে না উঠে নিচের ঘাস শক্ত করে ধরে যেদিকে পানি কম সেদিকে অনেকটা গেলাম। তারপর উপরে উঠে দেখি কোমর পানি । এতক্ষণে পানি অনেকটাই খেয়ে ফেলেছি। এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখলাম আমার এ ব্যাপারটি কেউ দেখল কিনা। পরে বুঝতে পারলাম কেউ দেখেনি। প্রত্যেকেই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত ছিল, নদীর পাড়েও কেউ ছিলনা। তখন মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল। আমি তখন অনুভব করছিলাম যে, মৃত্যুর দোয়ার থেকে ফিরে এসেছি। এরপর এমন সাঁতার শিখলাম, সাঁতারে আর কোনদিন কেউ পিছে ফেলতে পারেনি।
সাঁতার শিখা শেষ হওয়ার পর যে কোন জায়গায় সাঁতার কাটতে পারি। তবে পরিচিত নদীতে সাঁতার কাটার মজাই অন্যরকম। সবচেয়ে বেশি মজা পেতাম আমার বাড়ির সামনের নদী ও বাড়ির পশ্চিমের খালে সাঁতার কাটতে। সাঁতার কাটতে গেলেই আমরা পাঁচ/ছয় জন দলবেঁধে নেমে যেতাম। শ্রাবণ মাস নদী খরস্রোতা, খাল আরও বেশি খরস্রোতা। খালের উপরে বড় সাঁকো, জাঙ্গাল পানিতে ডুবে গেছে। হাঁটুপানি, উরুপানি ভেঙ্গে প্রখর স্রোতের মধ্য দিয়ে হেঁটে অনেকটা যাওয়ার পর সাঁকোতে উঠে খাল পাড় হতে হয়। এখন অবস্য সেই খাল নেই, সেই জাগাটিতে বড় বড় পুকুর কেটে বাড়ি করা হয়েছে। বর্ষাকালের সেই দৃশ্য এখনও স্মৃতিপটে আঁকা আছে।
একদিন দশ/বার জনের একটি দল সাঁতার কাটতে নেমে গেলাম। বার বার সাঁকোর উপরে উঠে পানিতে ঝাপ দেয়া। এভাবে অনেকক্ষণ চলার পর আমার বাবা একটা লম্বা লাঠি নিয়ে আমাদেরকে দৌড়ান দিল। এভাবে আর কিছুক্ষণ চললে সাঁকোই ভেঙ্গে যেত। দৌড়ানি খেয়ে আমরা সবাই চলে গেলাম সাঁকো থেকে আরও একটু উত্তরে। এখন শুরু করলাম লাই খেলা । খালের পাড়ে ছিল জারুল গাছ। স্রোতের টানে মাটি সরে যাওয়ায় খালের পাড়ের সব শিখর বেরিয়ে গেছে। এক পর্যায়ে ডুব দিয়ে ভাটির দিকে যাওয়ার সময় দুই শিখরের মাঝখানে মাথা ঢুকে যায়। অনেক চেষ্টা করেও ছুটতে পারছিনা। বুঝতে পারছি মুহূর্তের মধ্যে ছুটতে না পারলে নিশ্চিত মরণ। মরণের আগে আল্লাহর নাম নিয়ে সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করলাম। নিচের শিখরটাকে দুই হাতে শক্ত করে ধরে নিচে চাপ দিয়ে মাথা টান দিয়ে বের করে আনলাম। তবে আমার একটা জিনিস মাথায় ছিল যে, মাথা যেহেতু ঢুকেছে বের করাও সম্ভব হবে। কিন্তু পানির নিচে হওয়াতে সময়ের ব্যাপার ছিল ও মৃত্যুর ঝুঁকি ছিল। ২৫ সেকেন্ডের মধ্যে আমাকে কাজটি করতে হয়েছে। অনেকটা পানিও খেতে হয়েছে। ঘাড়, কপোল ও কপালের অনেকটা চামড়া উঠে গিয়েছিল।
আমরা যারা গ্রামে বড় হয়েছি অর্থাৎ গ্রামের দুরন্ত বালক তারা অসংখ্য প্রতিকুল অবস্থার মোকাবেলা করে বড় হয়েছি। অভিজ্ঞতার আলোকে বিভিন্ন সমস্যার মোকাবেলা করতে পেরেছি। আর যারা শহরের পরিবেশে বড় হয় তারা হঠাৎ করে গ্রামে গেলে বিভিন্ন দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে। এরা হল ননীর পুতুল। এমন একটা মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আমার মনে আছে।
আমি তখন নেত্রকোণা আঞ্জুমান আদর্শ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র। ১৯৮২ সাল, বিকাল বেলা খবর পেলাম দুই ভাই একসাথে পানিতে ডুবে মারা গেছে। যে ঘাটে মারা গেছে সেটি মগড়া নদীর পাকাঘাট, আমাদের বাসার পাশেই। প্রতিদিন এই ঘাটে আমরা গোসল করার সময় প্রায় এক ঘণ্টা সাঁতার কাটি। ছোটবেলা থেকে এই ঘাটে সাঁতার কাটি কিন্তু আমাদের কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি। সদর হাসপাতাল আমাদের বাসার পাশেই, সেখানেই লাশ নিয়ে এসেছে। আমি, আমার মামাত ভাই সাঈদ, আমার বন্ধু হেলিম, কিরণ, চয়ন, ফারুক আরও অনেকেই দৌড়ে গিয়ে দেখলাম, খবর শুনে হাজার হাজার লোক লাশ দেখতে এসেছে। পরে জানতে পারলাম, মোক্তার পাড়ার অর্থাৎ আমাদের পাড়ার জানু মোক্তার সাহেবের মেয়ের দিকের নাতি ওরা। ঢাকাতেই সেটেল, ওদের বাবা বড় ডাক্তার। এ বছরেই এসএসসি পরীক্ষায় স্টার নম্বর পেয়ে পাশ করেছে। ওদের মৃত্যুর কারণ ছিল সাঁতার না জানা। এ দুর্ঘটনাটি আমি এখনও ভুলতে পারিনা।