ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

আমি যখন ছোট তখন গ্রামের যানবাহন বলতে ছিল সাইকেল ও মোটরসাইকেল । যারা একটু সৌখিন ও পয়সা ওয়ালা তাদের মোটরসাইকেল ছিল। আমাদের বাড়িতে সাইকেল থাকলেও বাচ্চাদের ধরতে দিত না। আমি সাইকেল চালানো শিখেছি, আমার বড় দুলাভাইয়ের সাইকেল দিয়ে। তিনি আমাদের বাড়িতে আসলে সাইকেল নিয়ে চলে যেতাম সারা দিনের জন্য। তিনি না আসলে নিজেই চলে যেতাম আপাদের বাড়িতে। তাদের বাড়ি মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে হাপানিয়া গ্রামে। এ সময় সাইকেল এর সিটে বসলে আমার পা পেটেলের নাগাল পেত না। ডান হাতের বগল সিটে রেখে রড ধরে বাম হাতে হ্যান্ডেল ধরে বান্দরঝুলা অবস্থায় সাইকেল চালানো শিখেছি। সাইকেল চালানো শিখা অবস্থায় ছোট-খাটো অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছে। আর হাতে-পায়ের জখম সবসময় থাকতো। যেমনঃ পা কাটা, হাতের ছাল উঠে যাওয়া, মচকে যাওয়া ইত্যাদি। এসবের মধ্যেও হাল ছাড়িনি।
আমি যখন ৫ম শ্রেণিতে উঠি তখন বড় মামাকে বলে নেত্রকোণায় এসে ভর্তি হওয়ার অনুমতি পেয়েছি। মামারা তিন ভাই বোন, আমার মা, বড় মামা ও ছোট মামা। ছোট মামা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক, গ্রামের বাড়িতে থাকেন। বড় মামা ১ম শ্রেণির ঠিকাদার। শহরের বড় ধনিদের মধ্যে একজন। তার বিশাল বাড়ী কোর্টের অপজিটে মোক্তার পাড়ায়। মামার ছেলে-মেয়ে ছয় জন, চার মেয়ে দুই ছেলে। কাওছার আপা ছাড়া সবাই আমার ছোট। নেত্রকোণা দত্ত উচ্চ বিদ্যালয়ে ৫ম শ্রেণিতে ভর্তি হই।

এখন শুরু হল আমার শহরের জীবন। আগের চেয়ে দুরন্তপনা আরও বেড়ে গেল । কারণ আমার মামাতো ভাই-বোনেরা আমার চেয়েও বেশি দুরন্ত। এদের সাথে বসবাস করতে গিয়ে আমাকে আরও বেশি দুরন্ত হতে হয়েছে। দুরন্তপনার মধ্যে ছিল, ছাঁদে উঠা,গাছে ঊঠা,ঘূড্ডি ঊড়ানো,মগড়া নদীতে সাতার কাটা, সাইকেল চালানো এবং মারামারি করা। মারামারি করার কারণ আমার মামাত ভাই সাঈদ অত্যন্ত ঝগড়াটে ছিল। তাকে বাঁচিয়ে আনতে আমাকে অনেক সময় ঝগড়া করতে হতো। স্কুল, লেখা-পড়া ও দুষ্টুমির ফাঁকে আমাদের অনেক কাজ করতে হত। মামা ছিলেন পরিশ্রমি মানুষ। কাজের লোক ও আমাদেরকে নিয়ে বাড়ির সমস্ত কাজ করতেন। মামা বাড়িতে না থাকলেও সবাই মিলে বাড়ির কাজ করতে হত। কাজের মধ্যে ছিল, কাপড় ধোয়া, ঘরমুছা, বাথরুমে পানি দেয়া ও সমস্ত বাড়ি পরিষ্কার করা। এছাড়া আমার একটা অতিরিক্ত কাজ ছিল বাজার করা। সবচেয়ে বিরক্তিকর কাজ ছিল বারবার মামীর এটা-সেটা বাজার থেকে এনে দেয়া।

গাছে উঠার ব্যাপারে আমি অব্যস্ত ছিলাম। সাঈদ আমার সাথে সাথে গাছে উঠা শিখেছে। বাড়ির উত্তর-পূর্ব কোণায় বাউন্ডারি ওয়ালের ভিতরে একটি বড় জামগাছ ছিল। অনেকেই জামগাছে উঠে জাম পারছি, আমাদের সাথে সাইদও উঠেছে। মামা বাহির থেকে আসছে দেখে সাঈদ নামতে গিয়ে নিচে পরে গেছে। তখন আমরাও নেমে গেলাম। কিছুক্ষণ পর সাঈদ বলল, “আমার হাতে প্রচণ্ড ব্যথা”। আমি তখন বুঝতে পারলাম হাত ভেঙ্গে গেছে। হাসপাতালে নেয়ার পর এক্সরে করে ধরা পরল হাত ভেঙ্গেছে। হাত প্লাস্টার করে গলায় ঝুলিয়ে দিল এক মাসের জন্য।

‘জালেক সাইকেল স্টোর’-এর জালেক ভাই সাইকেল, রিক্সা ও গাড়ির মেকার হিসাবে নেত্রকোণার সেরা। আমাদের বাসার সামনেই তাঁর দোকান বড় মসজিদ মার্কেটে। সে সাইকেল ভাড়া দেয় ঘণ্টায় তিন টাকা। প্রতিদিন সাঈদ আর আমি ছোট সাইকেল ভাড়া নিয়ে এক/দুই ঘণ্টা চালাই। কোন সময় টাকা দেই, আবার কোন সময় টাকা দেই না।

আমার সখ ছিল শীতের ছুটিতে ছোট সাইকেল নিয়ে বাড়িতে যাব। নেত্রকোণা থেকে আমাদের বাড়ি ১২ মাইল। তখন হাঁটা অথবা সাইকেল ছাড়া আর কোন যানবাহন ছিল না। এই প্রথম সাইকেলে চড়ে বাড়ি যাওয়া। প্রচণ্ড সখও ছিল, আবার ভয়ও করছিল। জালেক ভাইকে পাঁচ টাকা দিয়ে একটা ভাল সাইকেল নিলাম। জালেক ভাই বলল, “দুই ঘণ্টার বেশি হলে কিন্তু আর সাইকেল পাবিনা। বাসায় আগেই বলে এসেছিলাম যে, আমি বাড়ি যাচ্ছি। সাইকেলের ব্যাপারে কেউ জানেনা।

পরেরদিন জালেক ভাই বাসায় গিয়ে খবর পেল আমি বাড়ি গেছি। কংস নদীর পাড় ঘেষে বেতাটির রাস্তা। সড়কের উচ্চতা পাঁচফুট, নদীর পাড় থেকে পানি দশ ফুট নিচে। পনের ফুট নিচে সাইকেল সহ বিদ্যুৎ বেগে পানিতে পরে গেলাম। আমি ছিটকে গিয়ে পানিতে, আর সাইকেল কাদায় আটকে গেল। তেমন কিছু হয়নি সাইকেল পরিষ্কার করে আবার বাড়ির দিকে চললাম। আমার সবচেয়ে ভাল লেগেছিল, যখন সাইকেল দেখে লোকজন তাকিয়ে থাকত। আর যখন ছোট ছেলে-মেয়েরা সাইকেলের পিছনে দৌড়ে আসত। তিনদিন পর বাড়ি থেকে এসে জালেক ভাইকে ৩০ টাকা দিলাম। সে রাগে বলল, “সাইকেল যে নিয়ে এসেছিস এটাই আমার ভাগ্য।