ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থার সফলতা ও ব্যর্থতা সম্পর্কে আলোকপাত করার আগে সৃজনশীল প্রশ্ন সম্পর্কে আলোচনা করা প্রয়োজন। প্রশ্নকে প্রথমে প্রধান দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। (১) বদ্ধ প্রশ্ন (২) মুক্ত প্রশ্ন। আর সৃজনশীল প্রশ্নের প্রথম প্রশ্নটি অর্থাৎ (ক) নং প্রশ্নটি বা জ্ঞানমূলক প্রশ্নটি হলো বদ্ধ প্রশ্নের অন্তর্ভুক্ত। এ প্রশ্নের উত্তর শিক্ষার্থী পঠিত বিষয় থেকে পায়। কেবল জানা তথ্য স্মরণে এনে এ বদ্ধ প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। এ প্রশ্নের উত্তর সুনির্দিষ্ট।
এছাড়া বাকী তিনটি প্রশ্ন (খ) অনুধাবনমূলক (গ) প্রয়োগমূলক ও (ঘ) উচ্চতর দক্ষতামূলক প্রশ্নগুলো হলো মুক্ত প্রশ্নের অন্তর্ভুক্ত। এসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর পঠিত বিষয়ে থাকে না। শিক্ষার্থীকে চিন্তা ভাবনা করে উত্তর দিতে হয়। এ ধরণের প্রশ্ন শিক্ষার্থীর চিন্তা ও দক্ষতা বিকাশের সাথে সাথে সৃজনশীল প্রতিভার বিকাশ ঘটায়। এরূপ প্রশ্ন শিক্ষার্থীর বুদ্ধিবৃত্তির উন্নয়ন ঘটায়।

এক নম্বরের জ্ঞানমূলক প্রশ্নটি সৃজনশীল না হলেও চারটি প্রশ্ন নিয়ে গঠিত মোট ১০ নম্বরের একটি প্রশ্নকে আমরা সৃজনশীল প্রশ্ন বলি। মূলত জ্ঞানমূলক প্রশ্নটি ছাড়া বাকী তিনটি প্রশ্ন সৃজনশীল। জ্ঞানমূলক- ০১ নম্বর; অনুধাবনমূলক-০২ নম্বর; প্রয়োগমূলক-০৩ নম্বর; এবং উচ্চতর দক্ষতামূলক-০৪ নম্বর।

প্রত্যকটি সৃজনশীল প্রশ্নের জন্য একটি উদ্দীপক বা দৃশ্যকল্প, চিত্র, সারণি, ডায়াগ্রাম, চার্ট ইত্যাদি থাকবে। সাধারণত জ্ঞানমূলক ও অনুধাবনমূলক প্রশ্নের উত্তর উদ্দীপকে থাকবে না। এ দুটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে পাঠ্যবই অর্থাৎ পঠিত অংশ থেকে। আর প্রয়োগমূলক ও উচ্চতর দক্ষতামূলক প্রশ্নের উত্তর পঠিত অংশ ও উদ্দীপকের আলোকে দিতে হবে।

এখন আসা যাক, সৃজনশীল প্রশ্নের ১০টি নম্বর কোথায় লুকিয়ে আছে তা বের করার কৌশল কী?

একটি সৃজনশীল প্রশ্নে আপাত দৃষ্টিতে আমরা দেখি, জ্ঞানমূলক- ০১ নম্বর; অনুধাবনমূলক-০২ নম্বর; প্রয়োগমূলক-০৩ নম্বর; এবং উচ্চতর দক্ষতামূলক-০৪। কিন্তু আসলে নম্বর বন্টন করা আছে অন্য রকম। যেমনঃ উচ্চতর দক্ষতার জন্য আছে ০১ নম্বর। প্রয়োগমূলক প্রশ্নের জন্য আছে ০২ নম্বর। অনুধাবনমূলক প্রশ্নের জন্য আছে ০৩ নম্বর। এবং জ্ঞানমূলক প্রশ্নের জন্য আছে ০৪ নম্বর। অর্থাৎ সম্পূর্ণ বিপরীত ধর্মী।

(ক) জ্ঞানমূলক প্রশ্নঃ এ প্রশ্নের উত্তর এক শব্দে, এক বাক্যে, এক অনুচ্ছেদে দিতে হবে। তবে বেশিরভাগ প্রশ্নের উত্তর এক বাক্যে। এ প্রশ্নের উত্তরের জন্য ০১ নম্বর।

(খ) অনুধাবনমূলক প্রশ্নঃ এ প্রশ্নের দুটি অংশ আছে। দুটি অংশের জন্য দুই নম্বর নির্ধারণ করা আছে। প্রথম অংশে প্রশ্নটি অনুধাবন করে প্রদত্ত প্রশ্নের আলোকে সঠিক উত্তরটি বিশ্লেষণ করতে হবে। এর জন্য আছে ০১ নম্বর। দ্বিতীয় অংশে প্রদত্ত প্রশ্নের আলোকে এ প্রশ্নের সাথে সামঞ্জস্য রেখে মনে থাকা বা জানা কিছু জ্ঞানমূলক কথা লিখতে হবে এর জন্য আছে ০১ নম্বর। এক কথায় বলতে গেলে (খ) নং প্রশ্নে জ্ঞানমূলকে-০১ নম্বর এবং অনুধাবনে-০১ নম্বর, মোট দুই নম্বর। (খ) এর উত্তর সাধারণত আধা পৃষ্ঠা থেকে এক পৃষ্ঠা পর্যন্ত লেখা যেতে পারে। তবে এ দুটি অংশ আলাদা কোন শিরোনাম বা পয়েন্ট দিয়ে লেখা যাবে না। দুটি প্যারা বা অনুচ্ছেদে লখা যেতে পারে।
(গ) প্রয়োগমূলক প্রশ্নঃ এ প্রশ্নে তিনটি অংশ আছে। সঠিকভাবে প্রয়োগের উত্তর দিতে পারলে ০১ নম্বর। তার পাশাপাশি প্রয়োগমূলক প্রশ্নের সাথে সামঞ্জস্য রেখে জ্ঞানমূলক ও অনুধাবনমূলক বর্ণনা করতে হবে এ তিনটি অংশেও আলাদা কোন শিরোনাম বা পয়েন্ট দিয়ে লেখা যাবে না। অর্থাৎ জ্ঞানের জন্য ০১, অনুধাবনের জন্য ০১, এবং প্রয়োগের জন্য ০১, মোট তিন নম্বর।

(ঘ) উচ্চতর দক্ষতামূলক প্রশ্নঃ এ প্রশ্নে চারটি অংশ আছে। উচ্চতর দক্ষতার জন্য ০১ নম্বর, প্রয়োগমূলক দক্ষতার জন্য ০১ নম্বর, অনুধাবনের জন্য ০১ নম্বর এবং জ্ঞানমূলকের জন্য ০১ নম্বর, মোট চার নম্বর। তবে সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর লিখার সময় খেয়াল রাখতে হবে যে, জ্ঞানমূলক আছে চারবার, অনুধাবনমূলক আছে তিনবার, প্রয়োগঅমূলক আছে দুইবার এবং উচ্চতর দক্ষতা আছে একবার। জ্ঞানমূলক বর্ণনা চার অংশে চার রকম হবে, অনুধাবনমূলক বর্ণনা তিন অংশে তিন রকম হবে, প্রয়োগমূলক বর্ণনা দুই অংশে দুই রকম হবে। একই রকম বাক্য বা বর্ণনা লিখলে নম্বর কমে যাবে। অর্থাৎ ছাত্র-ছাত্রীদের সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তরে সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটাতে হবে তাহলেই সফলকাম হতে পারবে।

এতক্ষণ বর্ণনা করলাম ৬০ নম্বরের সৃজনশীল প্রশ্নের কথা। এখন বাকী ৪০ নম্বরের বহুনির্বাচনি প্রশ্নের কথায় আসা যাক।
বহু নির্বাচনি প্রশ্নেও সৃজনশীল প্রশ্নের মতই চিন্তন দক্ষতার চারটি স্তর বিদ্যমান থাকবে। যথাঃ জ্ঞানের স্তর, অনুধাবন স্তর, প্রয়োগ স্তর ও উচ্চতর দক্ষতার স্তর। প্রশ্নপত্র প্রণয়নের সময় এ চারটি স্তর বিবেচনায় রাখতে হবে। জ্ঞান স্তরের প্রশ্ন দিতে হবে ৩০%-৪০%, অনুধাবন স্তরের প্রশ্ন দিতে হবে ৩০%-৪০%, প্রয়োগ স্তরের প্রশ্ন দিতে হবে ১০%-২০% এবং উচ্চতর দক্ষতার স্তরের প্রশ্ন থাকবে ১০%-২০%। অর্থাৎ জ্ঞান ও অনুধাবন স্তর হতে ৭০% এবং প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতার স্তর হতে ৩০% প্রশ্ন থাকবে। গণিতের বেলায় আবার তিনটি স্তর থাকবে। সহজ, মধ্যমান ও কঠিন। প্রশ্ন প্রনয়নের সময় সহজ প্রশ্ন থাকবে ৩০%, মধ্যমানের প্রশ্ন থাকবে ৫০%, এবং কঠিন প্রশ্ন থাকবে ২০%।

বহুনির্বাচনি প্রশ্ন তিন প্রকার। যথাঃ ১। সাধারণ বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ২। বহুপদী সমাপ্তিসূচক প্রশ্ন ৩। অভিন্ন তথ্যভিত্তিক প্রশ্ন।
১। সাধারণ বহুনির্বাচনি প্রশ্নঃ এ ধরণের প্রশ্ন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রশ্ন প্রণেতাগণের কাছে যথেষ্ট পরিচিত। এর আলোচনা নিষ্প্রয়োজন।
২। বহুপদী সমাপ্তিসূচক প্রশ্নঃ এ ধরণের প্রশ্নের সূচনাতে তিনটি তথ্য দেয়া হয়। এই তিনটি তথ্য সম্পর্কিত ৪টি উত্তর থেকে শিক্ষার্থীকে একটি বাছাই করতে হয়। এ ধরণের প্রশ্নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের অনুধাবন ও উচ্চতর দক্ষতা যাছাই করা সম্ভব।
৩। অভিন্ন তথ্যভিত্তিক প্রশ্নঃ এ ধরণের বহুনির্বাচনি প্রশ্নে সরবরাহ করা একই তথ্য/উদ্দীপক থেকে কয়েকটি প্রশ্ন করা হয়। প্রশ্নগুলো পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত হবে। প্রশ্নটির কাঠামো সাধারণ বহুনির্বাচনি অথবা বহুপদী সমাপ্তিসূচক হতে পারে।

সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতি নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তবে এতক্ষণ আমি যে সকল নিয়ম-কানুন ও কৌশল এর বর্ণনা করলাম তা শিক্ষকদের দক্ষতার সহিত আয়ত্ত্ব করে সঠিকভাবে কাজ করতে হবে। তাহলেই জাতি উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে পারবে।

বিগত ১০ বছরে বাংলাদেশ সরকার সৃজনশীল পদ্ধতিকে সফল করার জন্য অনেক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এখনও আশানুরূপ ফল অর্জন করা সম্ভব হয়নি। এস,ই,এস,ডি,পি,; টিকিউআই-১; টিকিউআই-২ সহ আরও অন্যান্য সরকারি সংস্থা কাজ করে যাচ্ছে সৃজনশীল পদ্ধতিকে সফল করার জন্য। আমরা অর্থাৎ শিক্ষক সমাজ ও সরকার যদি সঠিকভাবে কাজ করি তাহলে এ কাজে সফল হওয়া সম্ভব।

যে সকল কারণে সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থায় মারাত্মক বাধার সৃষ্টি হচ্ছে তা সরকারকে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। কারণগুলো নিম্নরূপঃ
১। সঠিকভাবে প্রশিক্ষণ প্রদান ও গ্রহণে নজরদারি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
২ প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর তা সঠিকভাবে প্রয়োগ হচ্ছে কীনা তা নজরদারির মধ্যে রাখা। এ কাজটি করার জন্য উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে অনেক শিক্ষা অফিসার রয়েছেন। তাঁরা সঠিকভাবে মনিটরিং করছেন না।
৩। সৃজনশীল পদ্ধতির ক্যান্সার হল বাজারের নোট ও গাইড বই। এই গাইড ও নোট বইয়ের জন্য সৃজনশীল পদ্ধতিতে পঁচন ধরেছে। এ ধরণের নোট ও গাইড বই বাজার থেকে ধ্বংস করতে হবে। এ কাজটি পারে একমাত্র সরকার।
৪। ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠা কোচিং সেন্টারকে সমূলে ধ্বংস করে দিতে হবে। এটিও সরকারের কঠোর পদক্ষেপের ব্যাপার। প্রশিক্ষণ ছাড়াই তাঁরা মনগড়া পাঠদান করে যা এ শিক্ষা ব্যবস্থার উপর মারাত্মক হুমকি স্বরূপ। এদের শিক্ষাদান বিদ্যালয়ের শিক্ষাদানের সাথে বিতর্কের সৃষ্টি করে যা মারাত্মক বাধাস্বরূপ।
৫। বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি সরকারের দৃষ্টি এড়িয়ে বিভিন্ন কোম্পানির নিকট হতে মোটা অংকের টাকা নিয়ে কৌশলে নোট ও গাইড বই কিনতে ছাত্র-ছাত্রীদের বাধ্য করে। আশ্চর্যের বিষয় হল ১০০ টাকার বই অভিভাবকদের কিনতে হয় ৪০০ টাকা দিয়ে। একজন শিক্ষার্থীকে সরকার বিনামূল্যে বই দেয় কিন্তু গাইড ও নোট বই কিনতে হয় প্রায় তিন হাজার টাকার। যার জন্য বিনামূল্যে বই দেয়ার সুফল জনগণ ও সরকার পাচ্ছে না।
৬।শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অনুযায়ী বিদ্যালয়ের অর্ধবার্ষিক ও বার্ষিক পরীক্ষা গ্রহণ করবে নিজেদের প্রণয়ন করা প্রশ্নের মাধ্যমে। কিন্তু দুই একটি বিদ্যালয় ছাড়া বেশিরভাগ বিদ্যালয় বাজার থেকে কিনে আনা প্রশ্নের মাধ্যমে পরীক্ষা গ্রহণ করে। আমার মনে হয় এ ব্যাপারে কোন নিয়মের তোয়াক্কা করে না কোন প্রতিষ্ঠান। এসব দেখার কেউ আছে বলেও মনে হয় না।