ক্যাটেগরিঃ প্রবাস কথন

আজকে আপনাদেরকে আমার কিছু মজার অভিজ্ঞতা বলি, এর কিছু আমার শোনা বাকিটা নিজস্ব।

গল্প ১:
বেশ কিছুদিন আগের ঘটনা, আমাদের দেশ থেকে বিভিন্ন ভাবে ধনী দেশ গুলোতে মানুষজনেরা পাড়ি জমায়, উন্নত জীবনের আশায়। যারা যোগ্য তারা যোগ্যতার মাপকাঠিতে ভিসা পেয়ে যান কিন্তু যারা যোগ্য নন তারা অবলম্বন করেন বিভিন্ন পন্থা, যা মাঝে মাঝে হাস্যরসের জন্ম দেয় আবার একাধারে প্রমান ও করে বাঙ্গালীর বুদ্ধিমত্তার। সেইরকম একটা ঘটনা, আমাদের দেশের সাথে বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি বিনিময় চুক্তি আছে সেই সুবাদে দেশের শিল্পীরা ঐ সকল দেশে যেয়ে পরিবেশন করেন। যেহেতু ভিসা পাওয়াটা খুব কঠিন, তাই যারা যোগ্য নন তারা দুই একজন করে শিল্পী হিসেবে এই সব দলের সাথে ভিড়ে যেতে লাগলেন। বিদেশী দূতাবাসগুলি পড়ল মহা ফাঁপরে। কেননা ওরা টের পেয়েছে ফেরত আসার সময় প্রতিবার দুই একজন করে দল থেকে গায়েব হয়ে যাচ্ছে। কাজেই দূতাবাস গুলো এর বিহিত করার জন্য একটা বুদ্ধি বের করল- ঠিক হল এরপর যেই দল আসবে আকস্মিক ভাবে তাদের পরীক্ষা নেয়া হবে, কে কোন বিষয়ে পারঙ্গম তা জানার জন্য। তো যথারিতি যুক্তরাজ্যের দুতাবাসে ভিসা নেবার জন্য একটা দল গেল এবং যেয়েই জানল- সবাইকে শিল্পী হবার প্রমান দিতে হবে। তো সবাই এটা সেটা বাজাচ্ছে, যে গান গাইবে সে গান গাচ্ছে আর একে একে ভিসার পরীক্ষায় উৎরে যাচ্ছে, বলাই বাহুল্য সেই দলে ছিল দুই ভুয়া শিল্পী যারা কিছুই পারে না। তো দেখতে দেখতে ওদের ডাক চলে এলো, ভিসা অফিসারের চোখ চক চক করছে দেখেই বুঝেছে এই দুজন ভুয়া, এখন শুধু শিকার ধরার অপেক্ষায়- সবারই ভিসা বাতিল করে দিবে আজকে। তো ভিসা অফিসার খুশিতে ডগমগ হয়ে বলল তোমরা যা জানো পরিবেশন করো, অমনি দুইজন পকেট থেকে দুই মন্দিরা বের করে টুং টাং টুং টাং বাজাতে লাগল। ভিসা অফিসার চোখ বড় বড় করে আশেপাশে তাকিয়ে, অবাক হয়ে বলল তোমরা ঘন্টা বাজাচ্ছো কেন?! তখন দুইজন জবাব দিলো- দেখ এইটা একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বাদ্য যন্ত্র এইটা ছাড়া গানের তাল লয় ঠিক রাখা যায় না, আমরা যন্ত্রীদের সামনে থেকে এই যন্ত্র বাজাই আর ওরা সেই কারনে ঠিক ঠাক মতো গান গাইতে, বাজাতে পারে!! এই জবাব শুনে ভিসা অফিসারের তো আক্কেলগুড়ুম- তখন কি আর করে মুখ কালো করে সবাইকে ভিসা দিয়ে ফেলল।

গল্প ২:
এক বাংলাদেশী আমেরিকা প্রবাসী যুগল অনেকদিন যাবৎ আমেরিকায় আছেন। দুই ছেলে মেয়ের জন্ম হয়েছে ঐ খানে। যেহেতু বাংলাদেশী বাবা মা তাই ছেলে মেয়েদের শাসনের বেলায় মাঝেসাঝে টুকটাক চড় থাপ্পড় দিয়ে ফেলেন। তো ছেলে মেয়ে কিভাবে কিভাবে যেন জেনে গেছে এই দেশে বাচ্চাদের গায়ে হাত তোলা নিষেধ, কেউ এইরকম করলেই- ৯১১ এ ফোন করে পুলিশ ডেকে আনা যায়। যথারিতি একদিন ছেলে তার দুষ্টামির জন্য বাবার হাতে মার খেয়েছে এবং বাবাকে শিক্ষা দেবার জন্য ছেলেও তার সদ্য প্রাপ্ত জ্ঞান এর প্রয়োগ ঘটিয়ে পুলিশকে খবর দিয়েছে। পুলিশ এসে ঘটনা জেনে ভদ্রলোককে হুশিয়ার করে দিয়ে গেলো, ভবিষৎ এ যাতে এইরকম ঘটনা আর না ঘটে। পুলিশ আসার পর ছেলে খেয়াল করেছে বাবা কিরকম ভয় পেয়েছে! তো সে কারনে অকারনে এইবার বাবাকে ব্ল্যাকমেইল করতে লাগল, বাবা এই খেলনাটা কিনে দাও ওমুকটা কিনে দাও তমুকটা কিনে দাও, না দিলেই শুধু পুলিশের ভয় দেখায়। ভদ্রলোক পড়ল মহা যন্ত্রনায় একদিন আর রাগ সামলাতে না পেরে বসিয়ে দিল দু ঘা, ব্যাস ছেলেও ৯১১ এ ফোন করে পুলিশকে ডেকে নিয়ে এলো। যথারিতি পুলিশ এসে বাবা মাকে হুমকি দিয়ে গেলো এইবারই তোমাদের শেষ হুশিয়ার করে দিয়ে গেলাম এরপর যদি তোমরা বাচ্চাদের দৈহিক ভাবে র্নিযাতন কর তাহলে বাচ্চাদের তো আমরা নিয়ে যাবোই সেই সাথে তোমাদেরও এই দেশ থেকে ডিপোর্ট করে দিব। বাচ্চারা তো মহাখুশি যা ইচ্ছা তাই করছে কেউ ঠেকাবার নেই, কিছু বলতে গেলেই ৯১১ এর ভয় দেখায়। এইরকম অবস্থা যখন চরমে, বাবা মা অতিষ্ট হয়ে ঠিক করল এদের একটা শিক্ষা দেয়া দরকার। কিন্তু এখানে সেটা অসম্ভব , তাই তারা সাব্যস্ত করল দুইজনকে বাংলাদেশে নিয়ে যাবে যেই ভাবা সেই কাজ। ছেলে মেয়ে ও কিছু সন্দেহ করে নাই ভেবেছে বেড়াতে যাচ্ছে আর কিছু হলে তো পুলিশ আছেই! যেই তারা ঢাকা পৌছে প্লেন থেকে নেমেছে- অমনি বাবা ছেলেকে ধরে পেটাতে শুরু করল, ছেলেও বলল তুমি পুলিশের কথা ভুলে গেলে? দাঁড়াও তোমাকে দেখাচ্ছি মজা- বলেই দৌড়ে গেলো ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে যেয়ে নালিশ দিচ্ছে দেখো- আমার বাবা আমাকে মারছে তুমি এক্ষুণি আমার বাবাকে গ্রেফতার করো। ইমিগ্রেশন অফিসারটি তখন ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলেন ‘কি ব্যাপার আপনার পোলাডারে শুধু শুধু মারতাছেন ক্যান?’ ভদ্রলোক তখন পুরো ব্যাপারটি তাকে খুলে বললেন। তা শুনে পুলিশটি ততক্ষনাৎ বলল, ‘তাই নাকি ভাই ওর তো মাইর কম হইয়া গেছে আমার হইয়া আপনে আরও কয়ডা লাগায় দেন’!!

গল্প ৩:
বছর পাঁচেক আগের ঘটনা একবার কোন এক কনফারেন্স এটেন্ড করার জন্য যাচ্ছি থাইল্যান্ড এর চিয়াংমাই, আমাদের দলে ৭/৮ জন লোক রয়েছে, একে একে সবাই ইমিগ্রেশন পেরিয়ে যাচ্ছি- ইমিগ্রেশন পেরিয়ে আবার সবাই একসাথে হচ্ছি। হঠাৎ দেখি সঙ্গের একজন সঙ্গী নেই- খোঁজ নিয়ে জানা গেল ওকে সন্দেহ হওয়ায় ইমিগ্রেশন পুলিশ আটকে দিয়েছে এবং একটা আলাদা ঘরে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তখন আমি আর সাথে আরেকজন গেলাম দেনদরবার করতে। যেয়ে বললাম কি ব্যাপার আমাদের লোককে আটকে রেখেছ কেন? পুলিশ সোজা সাপ্টা জবাব দিল ‘তোমাদের লোককে আমাদের সন্দেহ হয়েছে এই কারনে আটকে রেখেছি’। আমরা আমাদের কাগজ পত্র দেখিয়ে বললাম দেখো আমরা একটা কনফারেন্সে এসেছি আমাদের ভিসা টিসা সব ঠিক ঠাক আছে তোমরা অহেতুক সন্দেহ করছ, ওকে ছেড়ে দাও। তখন পুলিশ অফিসারটি তার ভাঙ্গা ইংরেজীতে যা বলল তা হচ্ছে দেখো বুঝলাম সব ঠিক আছে কিন্তু এই লোকের পাসপোর্ট ঠিক নাই। জিজ্ঞেস করলাম কি রকম, সে বলল এই লোক দেখ লম্বায় ৬ ফুট এর মতো কিন্ত পাসপোর্টে লিখা আছে সাড়ে ৫ ফুট কি করে সম্ভব? বললাম কই দেখি অফিসারটি পাসপোর্ট দেখাল আর তাতে সত্যি সত্যিই উচ্চতা সাড়ে ৫ ফুটই লিখা। ব্যাপারটা আর কেউ না হোক আমরা বুঝলাম, এটা পাসপোর্ট অফিসের গাফলতির কারন- তখন পাসপোর্ট ছিল হাতে লিখা এবং সেটাও যে মান সম্মত ছিল তাও না, পাসপোর্ট বেশীরভাগ সময়ই লিখা হতো পাসপোর্ট অফিসের পিয়নদের দিয়ে যার কারনে মাঝে মাঝে এক একজনের নামের অদ্ভুত অদ্ভুত সব বানান দেখা যেত। এই ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে মি:, সে:মি এর জায়গায় ভুল করে ৬ ফুট একজন লোককে সাড়ে ৫ ফুট বানিয়ে দিয়েছে। এই কথা তো তখন আর বলা যাবে না, আমি পাসর্পোটটা নেড়েচেড়ে দেখতে লাগলাম দেখি ইস্যু ডেট ৫ বছর আগের, হালে রিনিঊ করা হয়েছে। আমি আর কিছু না পেয়ে বললাম এই দেখ এইটা ৫ বছর আগের ইস্যু করা তখন ওর বয়স কম ছিল এখন বয়স বেড়েছেতো এই জন্য ৬ ইঞ্চি বেশী লম্বা হয়ে গেছে। এই কথা শুনে ওরা কনভিন্সড হয়ে প্রায় ছেড়েই দিচ্ছিল বাধ সাধল এক মহিলা অফিসার বলল এক মিনিট দাঁড়াও, আচ্ছা ওর বয়স কতো? বুঝলাম আবার ফেঁসে যাচ্ছি আমি বললাম ৩০, সে বলল তুমি জানো না ২০/২১ এর পর মানুষের আর উচ্চতার বৃদ্ধি ঘটে না, আমি বললাম দেখ ও একটা স্পেশাল কেইস ওর হরমনাল ডিসঅর্ডার এর কারনে ও দিন দিন লম্বা হচ্ছে আমি শিওর পরেরবার ও যখন আসবে তখন তুমি ওকে আরেকটু লম্বা পাবে। মহিলা আমার কথায় অবাক হয়ে কি বুঝল কে জানে আমাদের ছেড়ে দিল। আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম, আর ওই বেটাকে গালি দিতে দিতে বললাম বেটা পরেরবার পাসপোর্ট ঠিক করবি নয়তো তোকে এয়ারপোর্টেই ফেলে যাবো লম্বা হবার পরীক্ষা দেয়ার জন্য।