ক্যাটেগরিঃ ভ্রমণ

 
Hazrat_Shahjalal_International_Airport

 

মা অসুস্থ, তাই দেশে যেতে হবে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে টিকিট হলো। সংগে আমার ৩ বছরের ছেলে এবং সাদা রঙের বউ। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে, হেলসিংকি-লন্ডন-দিল্লি হয়ে অবিশ্রান্ত ক্লান্তি পেড়িয়ে যখন বাংলাদেশের আকাশ সীমানায় আসি তখন মনটা যেন আবগে আপ্লুত হয়ে যায়। এইতো আমার জন্মভুমি যেখানে কেটেছে আমার কুঁড়িটি বছর।আকাশ থেকে আশুলিয়ার ইটভাটার চিমনিগুলো দেখে মনে আর তর সয়না, এইতো এসে পড়েছি, আর মাত্র কিছুক্ষন। আমার ছেলের হাজারো প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে ক্লান্ত আমি।ঐ লম্বা লম্বা খাম্বা গুলো এখানে কে রেখেছে? ঘর বাড়ি গুলো এত এলোমেলো কেন? ইত্যাদি টাইপের জিজ্ঞাসা, বুঝতে পাড়ছি অন্যান্য যাত্রীদের বিরক্তির কারন হচ্ছে সে, কিন্তু ভাষা টা অন্য হওয়ার কারনে অনেক বাঙ্গালি যাত্রীরা আবার আগ্রহ নিয়ে তাকাচ্ছে, কি বলে এই ছুট্ট ছেলেটি। আর আমার মন টা পড়ে আছে বিমানের বাইরে, ভাবছি কখন এটা মাটিতে নামবে, কখন বেরুবো এখান থেকে, কখন দেখবো প্রি্য় জন্মভুমিটিকে, মা কে।

বিমান অবতরন করলো, সবার মধ্যে হুড়োহুড়ি লেগে যায়, কে কার আগে নামবে, কে শুনে বিমান বালাদের মানা, ব্যস্ততাটা বুঝি। বিমান থেকে আবশেষে নামলাম, ক্লান্তি দুর হলো, ছেলে জিঞ্জেস করে, আব্বা, এটা কি বাংলাদেশ? হ্যাঁ বাবা, এটা বাংলাদেশ, এই দেশেই তোমার বাবার জন্ম, উত্তর দেই গর্ব ভরে। বিমান থেকে নামার পর উঁচু সরু পথ দিয়ে বেড়ুচ্ছি, বউয়ের প্রথম এক্সপ্রেশন, “অভার পাসটা আসলেই খুব সরু এবং অনেক উঁচু, ভয়ংকর। তার কথায় কান দেই না, শুধু বলি এটা বাংলাদেশ, দ্যাখো এখানে কি অদ্ভুদ সুর্য্য উঠেছে, কোথাও তুষার নেই, এখানে মোটা ওজনের জ্যাকেটের প্রয়োজন নেই যদিও এটা জানুয়ারী মাস। ও ভুলে যায় উঁচু সরু অভার পাস এর কথা। (যারা জেট এয়ার এ যাতায়াত করেন হয়তো তারা ব্যাপারটা লক্ষ্য করবেন, বিমানবন্দরের একেবারে দক্ষিনের এরাইভাল ওয়ের কথা বলছি, অন্য কেউ specially আমরা বাংলাদেশিরা এই অভার পাসটি কে হয়তো কোন তোয়াক্কা-ই করবোনা কিন্তু ওদের কাছে এটা একটু অন্যরকম লাগতেই পারে কারন ওদের দেশে এভাবে হয়তো একটি অভারপাস কোনদিনই তৈরী করতোনা।)

সরু সেতু (!) থেকে বের হলাম, বিমান বন্দরের কোরিডোর দিয়ে হাটছি, চেক ইন এর সিকিউরিটি গেইট দিয়ে ঢুকতে উদ্দত এমন সময় কয়েকজন বিমানবন্দর কর্মকর্তা (!) এসে আমাদের থামিয়ে দিলেন, বললেন, আরে ভাই রাস্তা দ্যাখেন না? এইটা তো চেক আউট গেইট, এক্সিট তো পিছনে হাতের ডান দিকে রাইখা আসছেন!! ছোটখাটো হুছট খেলাম মনে হচ্ছে, বউয়ের সামনে খানিকটা লজ্বা ও । মনে মনে ভাবি দেশের প্রতি ভালবাসার টানে মনে হয় অন্ধ হয়ে গেছি, তা না হলে রাস্তা ভুল করি কিভাবে, আর আমিই না হয় রাস্তা ভুল করলাম ওতো সাইন দেখে যেতে পারতো! গত ১৮ ঘন্টায় এরকম ৩টি বিমান বন্দর পারি দিয়েছি কোথাও তো কোনো ভুল হলোনা। লন্ডনের হিথ্রু বিমান বন্দর নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যস্ততম বিমান বন্দরের একটি, সেখানেও তো কোন ভুল করিনি, তা হলে এখানে!! ভুল করার কারনটি বুঝতে খুব বেশি সময় লাগলোনা, যে রাস্তা দিয়ে অন্যরা যাচ্ছে সেখান দিয়ে বের হলাম আর অবাক দৃস্টিতে দেখলাম সেখানে কোনো সাইন নেই। ভাবলাম নিজের চোখ ভুল দেখছে কিন্তু আমাদের মত আরো কয়েকজনও এরকম আশ্চর্য তাকিয়ে রইলো; বাহঃ কোথাও কোনো সাইন নেই।সাধারণত বিমান থেকে নামার পর প্রথমেই অন্তত EXIT, FLIGHT CONNECTION এই সাইন গুলো থাকে, কিন্তু এখানে সেটা দেখা গেলোনা। যাক বাবা তার পরও তো বাংলাদেশ, আমার প্রিয় জন্মভুমি বাংলাদেশ। কিছুক্ষণ হাটার পর একটি সাইন চোখে পড়লো, এটা দেখে সত্যিই মনে হলো বাংলাদেশে এসে পড়েছি।“একটা পান খেয়েছেন কি?” সাইনটি দেখছি আর আহ্ কি দারুন দেশের গন্ধ অনুভব করছি, পানের পিক আর চুনের দাগে ভরা সেই ঢাকার ইলেকট্রিকের খাম্বা গুলো চোখে ভেসে উঠছে।দেশকে বিদেশিদের কাছে তুলে ধরার জন্য এ এক দারুন বিজ্ঞাপন, কিন্তু এই বড় বিলবোর্ড আকারের বিজ্ঞিপনটির পাশাপাশি যদি ঢোকার শুরুতে EXIT সাইনটা থাকতো তাহলে হয়তো এই পানের চিত্রটি আরো ১০ মিনিট আগে উপভোগ করা যেতো।
ঢোকতে দেরী হওয়ায় চেক আউট এ লম্বা লাইনের পিছনে জায়গা পেলাম। বউ আর ছেলের বিদেশী পাসপোর্ট হওয়ায় ওদের লাইনটি ছোট, তাই ওরা চেক আউট চৌকির কাছাকাছি চলেগেলেও আমার সামনে আরো অন্তত জনা চল্লিশেকের লাইন, সেখানেও আবার হুড়োহুড়ি, কার আগে কে যাবে। ওদের হুড়োহুড়ির কারন বুঝি, দেশের মাটিতে এসেও যেন দেশকে ছোঁয়া যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে জেলখানা থেকে হাজতির মুক্তি, এই তো জেলারের সীলটা পাসপোর্টে পড়লেই বেকসুর খালাস। ধৈর্য্য ধরি, আর ভাবি এই জেলারদের (!) যদি একটু প্রশিক্ষণ দেয়া যেতো! দাত কিটিমিটি করি কিন্তু কিছু বলতে পারিনা। একজন আসামিকে খালাস দিতে এদের যে সময় ব্যয় হয় ঠিক সে সময়ে উন্নত দেশে অন্তত ৪জন যাত্রীর চেক আউট করা সম্ভব।(যাত্রীদের কে আসামি কেন বলছি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, পৃথিবীর একমাত্র আমাদের দেশেই যাত্রীদের সংগে সম্ভবত আসামি স্বরুপ ব্যবহার করা হয়) আমার বউ আর ছেলের পালা চলে এসেছে, কিন্তু আমিতো এখনো অনেক দুরে। দুর থেকে লক্ষ্য করলাম অফিসার সাহেব (!) চৌকির ভেতর থেকে কি যেন বলছেন আর আমার বউ হতভম্ভ আর ভ্যাবাছচ্যাগা খেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বুঝতে আর বাকি রইলনা যে ভাষার সমস্যা হচ্ছ।ইউকে তে পড়ালেখা করা আর জীবেনের অর্ধেকটা সময় সেখানে পার করে আসা আমার বউ কি ইংরেজী ভুলে গেলো? বুকে সাহস বেঁধে অফিসারদের অনুরোধ করলাম, আমি ওকে সাহায্য করতে পারি কিনা আর যদিও আমার বাংলাদেশি পাসপোর্ট আমি ফরেইন পাসপোর্র্ট লাইনে এসে এক সংগে চেক আউট হতে পারি কিনা। অনুরোধ গৃহীত হলো। আমার লাইন ছেড়ে আমি ফরেইন পাসপোর্ট লাইনে এসে ওদের সাথে যোগ দিলাম। আমার বউ মনে হলো হাফ ছেড়ে বাঁচলো।
এর পর শুরু হলো আমাদের চেকআউট পালা । আগামী অংশে লিখবো আমাদের ৩ জনের এই সুখকর (হাস্যকর) চেক আউট পর্ব।

জিতেন খন্দকার
ফিনল্যান্ড
sziten@yahoo.com

 

(২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লেখা)