ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

 

আমাদের সমাজে একটি শ্রেণি আছে যারা শারীরিক সক্ষমতায় প্রায় অচল কোন ভারি কাজ করতে পারে না, জন্মগত ভাবে অঙ্গহানি, কোন দুর্ঘটনায়, অটিজম, বড় কোন রোগে অঙ্গহীন বা অতিরিক্ত বয়সের কারণে নি:সন্তান ব্যক্তি, আর্থিক ভাবে অসচ্ছল যাদের জায়গা জমি নাই, আরো বিভিন্ন কারণে ফকির বা মিসকিন হিসেবে পরিচিত । এদের মধ্যে যদি কেহ সমাজে ভিক্ষা করে জীবন যাপন করেন তাহলে আমরা তাদেরকে ফকির বা মিসকিন বলে থাকি । ফকির মিসকিনরা আমাদের আত্মীয় স্বজন ভাই বোন ও তারা আমাদের সমাজের অবিছেদ্য অংশ তাতে কাহারো দ্বিমত নাই আমারও নাই । এনাদের যে কেহ যে কোন ধর্মের অনুসারি হতে পারে এটা আমরা সবাই কম বেশী জানি ।
তারা সবার কাছে হাত পাতে কিছু টাকা পয়সা বা অর্থের জন্য । সেই অর্থে তাদের পরিবার পরিজন চলে কেন রকমে । সুখে-দু:খে অল্প অর্থে কোন রকমের দিন গুজরান । তাদের প্রায়ই আমার দৃষ্টিতে সৎ জীবন যাপন করে । এনারা পরম করুণাময়ের উপর অতি নির্ভরশীল।

এনাদের মধ্যে আবার কারো কারো এক সময় বড় সংসার ছিল । তাদের সংসারে ছিল হাসি খুশিতে ভরা সভ্য সমাজের এক মহোনীয় সংসার । হয়তো কোন কারণে আর্থিক ক্ষতিতে সব হারিয়েছেন নতুবা নদীর ভাঙ্গনে সংসারের সব হারিয়ে আজ নিঃস্ব । হয়ত উপযুক্ত কোন সন্তান না থাকায়, এক সময় অতিরিক্ত বয়সের কারণে মানুষের কাছে বাধ্য হয়ে হাত পাতে । আর যে টুকু ওঠে সেই টুকু দিয়ে কোন রকমে জীবন চলে । এদের মধ্যে আবার অনেকে সুন্দর সুন্দর গজল কেরাত বলে ভিক্ষা করে, অনেকে আবার বাদ্য যন্ত্র বাজায়ে গান করে সাহায্য পার্থনা করে । যার ইচ্ছা হয় দু টাকা দেয় আবার কেউ দেয় না তাতে তাদের কোন অভিযোগ নেই ।

আমার কথা সেই খানে নয় অন্যখানে আমরা কী অতি দু:খি মানুষদের সাথে কেমন আচরণ করি আর তাদের হক আমরা আদায় করি কী না । সেই খানেই আমার অতি সামান্য আলোচনা ।
“ভিক্ষুককে দেখে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া উচিত নয় । বরং তাকে দেখে আলালাহর নেয়ামত স্বরণ করা উচিত । কোন ভিক্ষুক অথবা অভাবী লোককে আগমন করলে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সাহাবায়ে কেরামদের বলতেন তোমরা তার জন্য আমার কাছে সুপারিশ করো । তোমরা ছয়াব পাবে । আল্লাহ্ যা চাইবেন, আমি ভিক্ষুককে তাই দিব। কিন্তু তোমরা বিনা কায়ক্লেশে সুপারিশের সোয়াব পেয়ে যাবে ।” (বুখারী)

আমরা যারা মুসলমান তারা কি আমলে নেই এই হাদিসটি ?
একদিন উত্তরার আজমপুরে ফুটপাতে এক কাপ চা খাচ্ছি । আমার সামনে ষাটোর্দ্ধ এক মহিলা ভিক্ষুক এক ভদ্রলোকের কাছে আল্লাহর অয়াস্তে খয়রাত চেয়ে হাত পাতল । অমনি সেই ভদ্রলোক মহিলা ভিক্ষুকে এমন দাবর মারল ভিক্ষুককের সাথে আমরা হতোবিহ্বল হয়ে পরলাম । সেই মহিলা ভিক্ষুক ছেঁরা কাপরের আঁচল টেনে চোখের পানি মুছতে মুছতে হেঁটে চলে গেলেন । বুকে যেন আমার সব দু:খ পতিত হলো । এমটি কি ঠিক হয়েছে ? আমরা যারা নিজেকে সভ্য ভাবি ? কৃপণতা ও নিষ্টুরতা কারণে প্রকৃত অভাবী ও পঙ্গু ভিক্ষুকদের ঘৃণার চোখে দেখছি এবং তাদের অবস্থার প্রতি এতটুকু মনোযোগ দেই না । বরং উল্টো তাদের সাথে ঠাট্টা বিদ্রূপ ও কঠোর ব্যবহার করতেছি । মাঝে মাঝে ধাক্কা দিয়ে বের করে দিচ্ছি ।

নামাজ কায়েম করি না আল্লাহর পথে চলি না । আল্লাহর হক আদায় করি না । গুনা করে মাপ চাই না । কিন্তু ভিক্ষুক দেখলে আল্লাহর ওয়াস্তে মাপ চাই । এ যেন নব্য যুগের নব্য ফ্যাশান । মায়া মমতাহীনের নতুন আমদানী । মাপ চেয়ে ভিক্ষুকে বিদায় করে দেয় । আমি বলছি না য়ে সবাই করে, তবে অধিকাংশেই আপনারা একটু খেয়াল করলেই দেখতে পারবেন । আর দু:খের বিষয় এই যে বেশির ভাগ মানুষ ভিক্ষুকের এমন অবস্থা করে ভিক্ষুকের চোখের পানি ঝরা ছাড়া কোন গন্ত্যত নাই । ভিক্ষুককে বিয়ে বাড়ির পাত্রির মতো পর্যবেক্ষণ করে তার অঙ্গ পতঙ্গ আর শরীরটা ঠিক আছে কি না । যদি অঙ্গ-পতঙ্গ আর শরীরটা একটু মোটা থাকে ঐ ভিক্ষুকের, তাহলে সেই ভিক্ষুকের চোখের পানিতে তার বুক ভিঁজবে তাতে কোন সন্দেহ নেই । শতকরা ৯৯% বলবে “কাম করে থেতে পারিস না।” কাম করে খেতে পারলে সে তোমার কাছে হাত পাততে যেত না কখনোই । আপনি যখন কাজ করতে পান বলে যেমন খয়রাতি করেন না তেমনি তারা খয়রাতি না করে কাজে চলে যেত ।
আর একটা কথা তারা না বললে ছাড়বে না শক্তি থাকতে আমাদের রাসুল (সাঃ) ভিক্ষা করতে বলছে না কি ? খারাপ কথা বলেন নি, তবে আপনি একটা মানুষের দেখেই সে সুস্থ কি না জেনে ফেললেন । কঠিন কোন রোগের কথা নাই বললাম একটা সাধারণ রোগের জন্য কত যে বিজ্ঞ ডাক্তারা পরীক্ষা নিরিক্ষা করেন তার তো হিসেব নাই । তার পর সুস্থ্য অসুস্থ্য । কিন্তু ফকির মিসকিনকে দেখেই বলে দেই মোটা তাজা মানুষ কাজ করে থেতে পাস না ।
তার পর ছেলে মেয়ে আছে কি না । যদি বলে আছে তাহলে তো আর কথাই নেই । কেমন ছেলে মেয়ে জন্ম দিয়েছেন শেষ বয়সে আপনাকে খাওয়ায় না । হায়রে পোড়া ঘায়ে নুনের ছিটা, দু:খের সাগরে হানা মারা । এতো কষ্টের কথা শুনার পর অপলোক চোখে কার কাছে যেন দীর্ঘস্বাশ ফেলে । সেই শ্বাস অজান্তে হারিয়ে যায়।
একজন ভিক্ষুকে কতো কিঃমি হাঁটতে হয় সে নিজেও যানে না । কোন দোকানে বা কোন ব্যক্তির কাছে গেলে বলে যান যান পরে আসেন । যার যাওয়ার নেই কোন ঠিকনা সে না কি আবার সেখানে ফিরে আসবে ।
রাসুল (সা:) বলেন “যে ব্যক্তি আমার উম্মতের কারও অভাব কেবল তাকে খুশি করার জন্য পুরণ করে, সে আমাকে খুশি করে, আর যে আমাকে খুশি করে, সে আল্লাহকে খুশি করে । আল্লাহ তাকে জান্নাতে দাখিল করবেন।” (বায়হাকী)
আমার চোখের দেখা একটু কথা বলে আমি শেষ করব । দহগ্রাম-আঙ্গারপোতা ভারতে ঘেরা একটা বাংলাদেশী ছিটমহল । ১৯৯২ সালে তিনবিঘা করিডোর উন্মুক্ত হওয়ার আগে এটা ভারতেই বলা যেত । আমাদের হাট-বাজার পড়াশুনা মেখলিগঞ্জ মহকুমায় করতাম । সেই গ্রাম দুটোতে প্রায় বার হাজার হিন্দু-মুসলমান বাস করতাম । মুসলমানের সংখ্যাই বেশি ছিল ।মুসলমানরা প্রায় সবাই ছিল দিনমুজুর আর ভিক্ষুক। তারা সবাই ভারতের অবস্থা সর্স্পণ হিন্দু বাড়িতে গিয়ে কামলা আর ভিক্ষা করত । কারণ ভারতে মুসলমান কোন কোন অঞ্চলে নেই বললেই চলে । ভারতের এই মহকুমায় মুসলমান এতো কম যে মুসলমানরা মুসলমানের বাড়িতে গিয়ে কাজ করবে আর ভিক্ষা করবে সেই পরিবেশ নেই । হিন্দুরা কোন দিন কোন ভিক্ষুকে খালি হাতে ফিরায় নি । কটু কথা বলে নি । তাদের সাহায্যে সহযোগিতায় গরীব মানুষরা জীবিকা র্নিবাহ করতেন ।
অথচ আমরা আজ মুসলমান হয়ে মুসলমানের জীবন কেরে নিচ্ছি । আস্তিক নাস্তিক নিয়ে সামান্য ব্যপারে জীবন কেরে নিচ্ছি । ভিক্ষুককে গলা ধাক্কা দিয়ে আমাদের সামন থেকে তাড়িয়ে দিচ্ছি । পেট্রোল বোমা দিয়ে শরীর জ্বালিয়ে দিচ্ছি । পথের শিশুরা রাস্তার ধারে না খেয়ে মশার কামরে ঘুমায় । একবার আমাদের দেখার সময় নেই । বলুনতো ভাই বাংলাদেশের সাথে তো আমাদের সংযোগই ছিল না, ইসলামী শরীয়া মতে তাহলে আমরা কি করতাম ? না খেয়ে বাল-বাচ্ছা সহ মরে যাওয়া ভালো ছিল । না উপোরক্ত বিষয় ঠিক ছিল ? মানুষের প্রতি দরদী হওয়ার কী আমাদের কোন প্রয়োজন নেই । আমাদের আয়ের উপর তাদের কী কোন হক নেই । দয়া করে আপনার মমতাবোধকে মেরে ফেলবেন না । মমতাবোধ বাঁচলে এই সমাজ বাঁচবে, বাঁচবে দেশ আর বাঁচবে এই পৃথিবী ।